জীবনের অনেকটা সময় আমি নিজেকে মজা করেই বলেছি—আমি অনেক কিছু করতে পারি, কিন্তু কোনো একটি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নই। রান্না করেছি, সেলাই করেছি, সূচিকর্ম করেছি, নকশা করেছি, বাগান করেছি, নানা কিছু সংগ্রহ করেছি, লিখেছি এবং নিজের হাতে জিনিস তৈরি করেছি। কোনো একটি বিষয়ে আগ্রহ তৈরি হলে প্রবল উৎসাহে তার পেছনে ছুটেছি, আবার নতুন কোনো কৌতূহল সামনে এলে সেদিকেও মন চলে গেছে।
আমার হাত যেমন খুব একটা স্থির থাকতে চায়নি, আমার মনও তেমন এক জায়গায় থেমে থাকেনি।
তবু এত কিছুর পরও নিজেকে কখনো একজন গবেষক বা শিক্ষাবিদ হিসেবে ভাবিনি। একাডেমিক জগৎকে মনে হতো এমন একটি পরিসর, যেখানে অধ্যাপক, ইতিহাসবিদ ও গবেষকরাই স্বাভাবিকভাবে বিচরণ করেন। তাদের অনেকেই ছোটবেলা থেকেই জানতেন, কী নিয়ে পড়বেন এবং ভবিষ্যতে কী হতে চান।
আমি সেই মানুষদের একজন ছিলাম না।
কিন্তু জীবনের ৬৪ বছরে এসে সেই ধারণা বদলে গেল।
আমি আবার পড়াশোনায় ফিরলাম।
যে বয়সে মানুষ সাধারণত জীবনের গতি কমিয়ে আনার কথা ভাবে, আমি তখন বই, বক্তৃতা, পুরোনো পাণ্ডুলিপি, তথ্যসূত্র আর রাত জেগে গবেষণার মধ্যে নিজেকে নতুনভাবে আবিষ্কার করলাম।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি ছিল পড়াশোনার প্রতি আমার দৃষ্টিভঙ্গিতে। আমি শুধু পরীক্ষায় ভালো করার জন্য পড়ছিলাম না, এমনকি একটি ডিগ্রি অর্জনের জন্যও নয়। আমি আসলে জ্ঞান অনুসন্ধানের আনন্দে মগ্ন হয়ে পড়েছিলাম।
একটি প্রশ্ন আমাকে আরেকটি প্রশ্নের কাছে নিয়ে যেত। একটি তথ্যসূত্র খুলে দিত নতুন কোনো দরজা। শত শত বছর আগে লেখা একটি বাক্যও কখনো কখনো আমাকে গভীর রাত পর্যন্ত ভাবিয়ে রাখত। পুরোনো পাণ্ডুলিপি হাতে নিয়ে ভাবতাম—কে এটি লিখেছিলেন, কেন একটি নির্দিষ্ট শব্দ ব্যবহার করেছিলেন, সেই সময়ের সমাজ কেমন ছিল এবং ইতিহাসের কোন বিস্মৃত সত্য এর ভেতরে লুকিয়ে থাকতে পারে।
এই অনুসন্ধানের পথেই আবার সামনে এলো হুকুম কানুন পাহাং।
পাণ্ডুলিপিটি আগে থেকেই ছিল। কিন্তু এবার আমি সেটিকে শুধু পাহাংয়ের একটি প্রাচীন আইনগ্রন্থ হিসেবে দেখলাম না। মনে হলো, এটি অতীতের একটি সময়ের কণ্ঠস্বর—একটি সমাজ, রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থার চিন্তাধারার সাক্ষ্য।
তখন প্রশ্নের শেষ রইল না।
মেলাকা আমাকে নিয়ে গেল পাহাংয়ের ইতিহাসের দিকে। পাহাং আমাকে নিয়ে গেল সুলতান আবদুল গাফফার মুহিউদ্দিন শাহের কাছে। আইন নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে সামনে এলো সমুদ্র, বন্দর, সার্বভৌমত্ব এবং শাসনব্যবস্থার নানা প্রশ্ন। একসময় বুঝতে পারলাম, গবেষণাটি আমি যেভাবে শুরু করার পরিকল্পনা করেছিলাম, তার পথ অনেকটাই বদলে গেছে।
একজন শিক্ষার্থী হিসেবে তখন একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেলাম—ইতিহাসকে নিজের ইচ্ছামতো কথা বলানো যায় না।
প্রমাণ যে দিকে নিয়ে যায়, গবেষককে সেদিকেই যেতে হয়।
আমি তাই প্রমাণ অনুসরণ করেছি।
পাণ্ডুলিপি, আইন, রাজবংশের ইতিহাস, নদী, বন্দর ও সমুদ্রপথ—সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনা করে অনুসন্ধান চালিয়েছি মেলাকা ও পাহাংয়ের ইতিহাসের ভেতর দিয়ে। কখনো ছিল প্রবল উত্তেজনা, কখনো হতাশা। এমন মুহূর্তও এসেছে, যখন চোখের জল ধরে রাখা কঠিন হয়েছে।
শেষ পর্যন্ত ৬৫ বছর বয়সে, ২৭ জুলাই, আমি আমার মাস্টার্সের অভিসন্দর্ভ জমা দিলাম—‘দ্য হুকুম কানুন পাহাং: এ সার্বভৌম মালয়-ইসলামিক কনস্টিটিউশন’।
কয়েক সপ্তাহ পর হাতে এলো পরীক্ষার ফল।
দুই পরীক্ষকের নম্বরের গড় ছিল ৯১ শতাংশ। অভ্যন্তরীণ পরীক্ষক কোনো বিষয়বস্তুগত সংশোধন ছাড়াই অভিসন্দর্ভটি গ্রহণের সুপারিশ করেন। বহিরাগত পরীক্ষকও কেবল খুব সামান্য কিছু সংশোধনের কথা বলেন।
প্রতিবেদনগুলো পড়ার পর আমি কেঁদেছি।
তারপর চিৎকারও করেছি।
হয়তো একজন গবেষকের জন্য খুব একটা একাডেমিক প্রতিক্রিয়া নয়। কিন্তু দীর্ঘ মাসের পরিশ্রম, সংশয়, আবিষ্কার, রাত জাগা এবং নিজের ব্যাখ্যা সঠিক ছিল কি না—এসব নিয়ে ক্রমাগত ভাবনার পর সেই মুহূর্তে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন ছিল।
তবে আমাকে সবচেয়ে বেশি স্পর্শ করেছিল নম্বর নয়। বরং দুই পরীক্ষকের এই মূল্যায়ন যে গবেষণাটি শুধু পরীক্ষার কাগজ হিসেবে পড়ে থাকার মতো নয়।
অভ্যন্তরীণ পরীক্ষকের মতে, গবেষণাটিতে মৌলিকত্ব, সুসংগতি ও যথেষ্ট একাডেমিক মান রয়েছে এবং এটি প্রকাশের উপযোগী। বিশেষভাবে তিনি উল্লেখ করেছেন, হুকুম কানুন পাহাংকে একটি সার্বভৌম মালয়-ইসলামিক সংবিধান হিসেবে নতুনভাবে বিশ্লেষণ করা হয়েছে; শরিয়াহর নীতির সঙ্গে স্থানীয় রীতিনীতির সম্পর্ক এবং রাজকীয় ক্ষমতার সঙ্গে জবাবদিহির ভারসাম্যও এতে গুরুত্ব পেয়েছে। তাঁর দৃষ্টিতে, এই বিশ্লেষণ মালয় আইন-ইতিহাসকে একটি নতুন সভ্যতাগত দৃষ্টিকোণ দিয়েছে।
বহিরাগত পরীক্ষকও গবেষণার ফলাফল একাডেমিক প্রকাশনা ও সম্মেলনের মাধ্যমে আরও বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়ার সুপারিশ করেছেন। বিশেষ করে মালয়েশিয়ার উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সাংবিধানিক ও আইনগত পরিচয় বোঝার ক্ষেত্রে এর গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
এই স্বীকৃতি আমার কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
আমি তো শুরু করেছিলাম কেবল একটি পুরোনো পাণ্ডুলিপিকে বোঝার আগ্রহ থেকে। কখনো ভাবিনি, সেই অনুসন্ধান এমন একটি গবেষণায় রূপ নেবে, যা পরীক্ষার পরিসর পেরিয়ে বৃহত্তর একাডেমিক আলোচনার অংশ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করবে।
এখানেই এসে আমার পুরোনো পরিচয়টির কথা মনে পড়ে গেল।
সারা জীবন নিজেকে বলেছি—অনেক কিছু করি, কিন্তু কোনো একটি বিষয়ে বিশেষজ্ঞ নই।
আর ৬৬ বছর বয়সে এসে দেখলাম, অন্তত একটি বিষয়ে আমি সত্যিই ‘মাস্টার’ হয়ে গেছি।
কিন্তু এই গল্পের আসল বিষয় কোনো ডিগ্রি নয়। ৯১ শতাংশ নম্বরও নয়।
আসল বিষয় হলো—কৌতূহলের কোনো অবসরকাল নেই।
আমরা জীবনের প্রতিটি পর্যায়ের জন্য যেন একটি নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করে রেখেছি। কখন পড়াশোনা করতে হবে, কখন বিয়ে করতে হবে, কখন সন্তান মানুষ করতে হবে, কখন পেশাজীবনে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে—এমনকি কখন নতুন কিছু শেখার চেষ্টা থামিয়ে ধীরে ধীরে পেছনে সরে যেতে হবে, তারও যেন একটি অলিখিত নিয়ম আছে।
আমি এখন মনে করি, এই ধারণা ভুল।
সব ফুল একই ঋতুতে ফোটে না।
কারও জীবনে সাফল্য দ্রুত আসে, কারও ক্ষেত্রে সময় লাগে বেশি। কোনো কিছু দেরিতে শুরু করা মানেই যে মানুষটি দেরিতে পৌঁছেছে, তা নয়।
পেছনে তাকালে এখন মনে হয়, রান্না, সেলাই, পড়া, লেখা, সন্তান লালন-পালন, মানুষের সেবা, চারপাশকে পর্যবেক্ষণ, সাফল্য ও ব্যর্থতার অভিজ্ঞতা—এসব কোনো বিচ্ছিন্ন অধ্যায় ছিল না। এগুলোই হয়তো আমাকে পরবর্তী জীবনের জন্য প্রস্তুত করেছে।
যেদিন লাইব্রেরিতে গিয়ে পুরোনো পাণ্ডুলিপি খুলেছিলাম, সেদিন সেখানে শুধু একজন শিক্ষার্থী উপস্থিত ছিল না। সঙ্গে ছিল আমার পুরো জীবনের অভিজ্ঞতা।
হয়তো সেটিই ছিল আমার সবচেয়ে বড় শক্তি।
আমি ৬৬ বছর ধরে শিখেছি—শুধু এতদিন বুঝিনি যে আমি আসলে সারাজীবন একজন শিক্ষার্থীই ছিলাম।
বহু বছর ধরে অনুসন্ধান করেছি, যদিও তখন জানতাম না শেষ পর্যন্ত কী খুঁজে পাব।
এখন বুঝি, জীবনের কোনো অভিজ্ঞতাই পুরোপুরি বৃথা যায় না। কখনো কখনো একটি দীর্ঘ পথের উদ্দেশ্য আমরা বুঝতে পারি অনেক পরে।
তাই নিজেকে ‘দেরিতে ফোটা’ মানুষ বলতে আমার কোনো আপত্তি নেই।
বরং এই পরিচয়টি এখন আমার ভালোই লাগে।
শেখার জন্য নির্দিষ্ট বয়স নেই। নতুন প্রশ্ন করার জন্যও নেই। আর জীবনের একটি পর্যায়ে এসে নতুন কিছু আবিষ্কার করার অধিকারও কারও কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া যায় না।
তবে সব জ্ঞানের উৎস আল্লাহ। আমি যা শিখেছি, যা আবিষ্কার করতে পেরেছি কিংবা সামান্য যে অবদান রাখতে পেরেছি—সবই তাঁর অনুমতি ও অনুগ্রহে।
আলহামদুলিল্লাহ।
জীবনের এই পর্যায়েও শেখার সুযোগ, শক্তি ও কৌতূহল দেওয়ার জন্য আমি আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞ। যে জ্ঞান তাঁর পক্ষ থেকে আমানত হিসেবে পেয়েছি, তা যেন সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারি, অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারি এবং তা যেন মানুষের উপকারে আসে—এই প্রার্থনাই করি।
আর আমার যাত্রা এখানেই শেষ হচ্ছে না।
আমি পিএইচডিতে নিবন্ধন করেছি।
এবার পঞ্চদশ শতাব্দীর পারমেশ্বরের অপেক্ষায় আমার নতুন গবেষণাযাত্রা।
আর একটি বিষয় ইতিহাসের স্বার্থে পরিষ্কার করা প্রয়োজন। আমার স্বামী মনে করিয়ে দিয়েছেন, হুকুম কানুন পাহাংয়ের সঙ্গে পরিচয়ের অনেক আগেই তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল। তাই ঐতিহাসিক নির্ভুলতার স্বার্থে স্বীকার করতেই হচ্ছে—তিনিই ছিলেন আমার জীবনের প্রথম বড় আবিষ্কার।
তেংকু আম্পুয়ান পাহাং তুনকু আজিজাহ আমিনাহ মাইমুনাহ ইস্কান্দারিয়াহ 



















