নেপালে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে তরুণদের নেতৃত্বে হওয়া জেন-জি আন্দোলনের এক বছর পূর্ণ হয়েছে। আন্দোলনটি দেশটির রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন আনলেও এর সঙ্গে যুক্ত আহত ও নিহতদের পরিবারের অনেকের জীবন এখনো অনিশ্চয়তা, চিকিৎসার খরচ ও অপূর্ণ প্রতিশ্রুতির মধ্যে আটকে আছে।
২০২৫ সালের ৮ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে তৎকালীন কেপি শর্মা ওলি সরকারের নিষেধাজ্ঞাকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ শুরু হয়। তবে আন্দোলনকারীদের ক্ষোভ ছিল আরও গভীরে—দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, পক্ষপাতিত্ব এবং দীর্ঘদিন ধরে অল্প কয়েকজন প্রবীণ রাজনীতিকের হাতে ক্ষমতা ঘুরপাক খাওয়ার বিরুদ্ধে। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দ্রুত সহিংসতায় রূপ নেয়। ৮ সেপ্টেম্বর ও পরদিনের সহিংসতায় ৭৬ জন নিহত এবং ২ হাজার ৬৩৮ জন আহত হন।
রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন
আন্দোলনের পর ওলি পদত্যাগ করেন এবং ১২ সেপ্টেম্বর সাবেক প্রধান বিচারপতি সুশীলা কারকির নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। ছয় মাস পর সংসদ নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়। দলটির নেতা বালেন্দ্র শাহ—র্যাপার, স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার ও কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র—৩৫ বছর বয়সে প্রধানমন্ত্রী হন। নেপালের দীর্ঘদিনের প্রচলিত রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য এটি ছিল বড় পরিবর্তন।
কিন্তু আন্দোলনে আহতদের প্রত্যাশা অনুযায়ী পরিবর্তন আসেনি। ২৫ বছর বয়সী রাকেশ মাহাতো আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে আহত হয়ে এক বছর ধরে হাসপাতালে আছেন। তার মেরুদণ্ডের নিচের অংশের স্নায়ু ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় চিকিৎসকেরা তাকে জানিয়েছিলেন, ভবিষ্যতে হুইলচেয়ারের ওপর নির্ভর করতে হতে পারে। মাহাতোর অভিযোগ, তাকে কে গুলি করেছে এবং কেন করেছে—এখনো তার তদন্ত হয়নি।
তদন্ত হলেও বিচার নিয়ে প্রশ্ন
সাবেক প্রধান বিচারপতি গৌরী বাহাদুর কারকির নেতৃত্বাধীন তদন্তে বলা হয়, বিক্ষোভ দমনে পুলিশ অতিরিক্ত ও নির্বিচার শক্তি ব্যবহার করেছিল। কারফিউ জারির আগে প্রায় চার ঘণ্টা নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালায় এবং পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব তা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়। তদন্তের সুপারিশ বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেয় শাহ সরকারের প্রথম মন্ত্রিসভা। পরে ওলি ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখককে গ্রেপ্তার করা হলেও সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে তারা মুক্তি পান। এখনো তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ মামলা দায়ের করেনি।
আহতদের চিকিৎসা ও সহায়তার প্রতিশ্রুতিও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। আন্দোলনের পর আহতদের বিনা মূল্যে চিকিৎসা, পরিবারের একজনের চাকরি, আহতদের যোগ্যতা অনুযায়ী কর্মসংস্থান, ক্ষতিপূরণ ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। ডিসেম্বরের চুক্তিতে নিহত ও আহতদের জন্য স্থায়ী কল্যাণব্যবস্থা, চিকিৎসা, মানসিক সহায়তা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং স্মৃতিসৌধের কথাও বলা হয়।
চিকিৎসা ব্যয় ও ভাতা নিয়ে ক্ষোভ
কাভ্রের কামাল ঘিমিরে জানান, চিকিৎসার খরচ সরকার বহন করবে বলা হলেও তাকে ওষুধসহ ফলোআপ চিকিৎসার ব্যয় নিজেকেই বহন করতে হয়েছে। তার পরিবারের দাবি, চিকিৎসায় প্রায় ১৫ লাখ নেপালি রুপি খরচ হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, নির্ধারিত হাসপাতাল ব্যবস্থার বাইরে নিজ উদ্যোগে করা চিকিৎসা বা কেনা ওষুধের বিল সরকার ফেরত দেয় না।
আহতদের জন্য মাসিক ভাতার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। গুরুতর আহতরা ৯ হাজার এবং অত্যন্ত গুরুতর আহতরা ১৮ হাজার নেপালি রুপি পান। তবে সিন্ধুলির রবি ভান্ডারি বলেন, তার পাওয়া ৯ হাজার রুপি মাসিক ভাতাই বাসাভাড়ার জন্য যথেষ্ট নয়।
আন্দোলনের শহীদ পরিবারগুলোর অভিযোগও একই। উদয়পুরের আম্বিকা বিকের স্বামী সান্তোষ আন্দোলনে গিয়ে আর ফেরেননি। পরে তিনি সরকারি চাকরি পেলেও আয় দিয়ে পরিবারের ভাড়া, খাবার ও সন্তানদের শিক্ষা-চিকিৎসার ব্যয় মেটানো কঠিন। তার অভিযোগ, নিহতদের পরিবারের জন্য দেওয়া প্রতিশ্রুতির বড় অংশই এখনো পূরণ হয়নি।
জেন-জি প্রতিনিধিরা বলছেন, আহত ও নিহতদের পরিবারের দাবিগুলো এখনো উপেক্ষিত। সরকারের আইনমন্ত্রী সোবিতা গৌতম অবশ্য বলেছেন, বিষয়গুলো নিয়ে কাজ চলছে এবং জেন-জি কাউন্সিলকে সরকার ও ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলা হবে। তবে আন্দোলনের এক বছর পরও আহতদের অনেকের প্রশ্ন একই—যে পরিবর্তনের আশায় তারা রাস্তায় নেমেছিলেন, সেই পরিবর্তনের সুফল তাদের জীবনে কবে আসবে?
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















