জার্মানির স্যাক্সনি-আনহাল্ট রাজ্যের নির্বাচনে উগ্র ডানপন্থী অল্টারনেটিভ ফর জার্মানি (AfD) বড় ধরনের জয় পেয়েছে। ৬ সেপ্টেম্বরের নির্বাচনে দলটি ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট পেয়েছে, যা আগাম জরিপের পূর্বাভাসের চেয়ে প্রায় ৪ শতাংশ বেশি। বিপরীতে কেন্দ্র-ডানপন্থী ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়ন (CDU) ভয়াবহ ধসের মুখে পড়েছে। ২০২১ সালের ৩৭ দশমিক ১ শতাংশ থেকে এবার দলটির ভোট নেমে এসেছে মাত্র ১৭ দশমিক ২ শতাংশে।
নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতিও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রায় ৭৮ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছেন, যা ২০২১ সালের তুলনায় অনেক বেশি। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নতুন করে ভোট দিতে আসা সাবেক অনিয়মিত বা ভোট না দেওয়া ভোটারদের বড় অংশ AfD-কে সমর্থন করেছেন। পাশাপাশি CDU-এর কিছু পুরোনো সমর্থকও দলটি ছেড়ে AfD-কে ভোট দিয়েছেন।
আফডির সমর্থনের পেছনে একাধিক কারণ
স্যাক্সনি-আনহাল্টে AfD-এর সাফল্য শুধু অভিবাসন ইস্যুর ওপর নির্ভর করেনি। দলটির ভোটারদের মধ্যে ৯১ শতাংশ মনে করেন, জার্মানিতে বিদেশি মানুষের সংখ্যা অতিরিক্ত। তবে নিরাপত্তা, অর্থনীতি এবং রাজ্য সরকারের প্রতি অসন্তোষও ভোটের সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

শ্রমজীবী ভোটারদের মধ্যে AfD-এর সমর্থন ছিল ৫৯ শতাংশ। কম শিক্ষাগত যোগ্যতার ভোটারদের মধ্যে তা ৫৭ শতাংশ এবং নিজেদের অর্থনৈতিক অবস্থাকে খারাপ মনে করা ভোটারদের মধ্যে ৬৫ শতাংশ। তবে উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যেও দলটি ৩০ শতাংশ এবং ভালো অর্থনৈতিক অবস্থায় থাকা ভোটারদের মধ্যে ৩৭ শতাংশ সমর্থন পেয়েছে।
৭০ বছরের বেশি বয়সীদের বাদ দিলে সব বয়সী গোষ্ঠীতেই দলটির ভোট ৪০ শতাংশের বেশি। ফলে রাজ্যজুড়ে বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণি ও বয়সের মানুষের মধ্যে AfD-এর বিস্তৃত ভিত্তি তৈরি হয়েছে।
পূর্ব জার্মানির ক্ষোভও বড় কারণ
স্যাক্সনি-আনহাল্টের ভোটে পূর্ব জার্মানির দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অনুভূতিও প্রভাব ফেলেছে। ৭৩ শতাংশ ভোটার মনে করেন, অনেক ক্ষেত্রেই পূর্বাঞ্চলের মানুষ এখনো দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে বিবেচিত হন। AfD সমর্থকদের মধ্যে এই ধারণা আরও প্রবল—৮৩ শতাংশ এমনটা মনে করেন।
জার্মান পুনঃএকত্রীকরণ ঘিরে ক্ষোভ এবং সাবেক কমিউনিস্ট পূর্ব জার্মানির প্রতি একধরনের নস্টালজিয়াকেও AfD রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগিয়েছে।
ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা

সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়া পর্যন্ত সরকার গঠন করবে না—এমন অবস্থান আগে জানিয়েছিল AfD। কিন্তু নির্বাচনের পর দলটির রাজ্য সরকার গঠনের কয়েকটি সম্ভাব্য পথ তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে সম্ভাবনাময় পথ হলো বামঘেঁষা অর্থনৈতিক নীতি ও অভিবাসনসহ কিছু বিষয়ে রক্ষণশীল অবস্থান নেওয়া সাহরা ভ্যাগেনকনেখট জোট বা BSW-এর সঙ্গে সমঝোতা।
BSW নির্বাচনের রাতেই জানিয়েছে, কিছু বিষয়ে AfD-এর সঙ্গে তাদের অবস্থানের মিল রয়েছে এবং AfD-কে পুরোপুরি সরকার থেকে বাদ দেওয়া ‘অগণতান্ত্রিক’ হবে। এ পথ ব্যর্থ হলে গোপন ভোটে CDU-এর কিছু এমপির সমর্থনও AfD-এর প্রার্থী উলরিশ জিগমুন্ডকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
জাতীয় রাজনীতিতেও বাড়ছে চাপ
এই ফল জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিশ মের্ৎসের অবস্থান আরও কঠিন করেছে। ২১ সেপ্টেম্বর মেকলেনবুর্গ-ফোরপোমার্ন রাজ্যের নির্বাচনেও AfD ও SPD-এর সরাসরি লড়াই হতে পারে। একই দিনে বার্লিনে CDU প্রথম হতে পারলেও কম ভোটের ব্যবধানে এমন জয় মের্ৎসের জন্য বড় পরিবর্তন আনবে না।
স্যাক্সনি-আনহাল্টের ফলের পর CDU-এর ভেতরে ডানদিকে আরও সরে যাওয়ার দাবি উঠতে পারে। আবার শ্রমজীবী ভোটার হারানোর বিষয়টি সামনে রেখে পেনশনসহ বড় সংস্কার নিয়েও নতুন করে ভাবার চাপ তৈরি হতে পারে।
সব মিলিয়ে এই নির্বাচন জার্মান রাজনীতির সামনে আরও বড় প্রশ্ন তুলেছে—মূলধারার দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য এতটাই বেড়েছে কি না যে দেশ শাসন করা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। দুর্বল ও মতবিরোধপূর্ণ জোটগুলো সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হলে সেই রাজনৈতিক অস্থিরতা শেষ পর্যন্ত AfD-এরই সুবিধা করে দিতে পারে।

সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















