জার্মানির বিখ্যাত গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ভক্সওয়াগেন তার ৮৯ বছরের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পুনর্গঠনের পথে এগোচ্ছে। চীন থেকে বাড়তে থাকা প্রতিযোগিতা, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক এবং ইউরোপে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতার চাপে প্রতিষ্ঠানটি বড় ধরনের ব্যয় সংকোচনের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছে। এই পুনর্গঠনের আওতায় এক লাখ পর্যন্ত কর্মীর চাকরি ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
তবে কর্মী ছাঁটাইয়ের এই কঠিন সিদ্ধান্ত নেওয়া মোটেও সহজ ছিল না। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা, শ্রমিক সংগঠন, কর্মী পরিষদ এবং গুরুত্বপূর্ণ শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে মতবিরোধ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে পরিস্থিতি দীর্ঘ আইনি লড়াই ও আরও বড় সংকটে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত চাপ, ভয় এবং সমঝোতার মধ্য দিয়ে সংকট এড়ানোর পথ তৈরি হয়।
সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে ভক্সওয়াগেন
ভক্সওয়াগেনে বিশ্বজুড়ে ছয় লাখ পঞ্চাশ হাজারের বেশি মানুষ কাজ করেন। একসময় বিশ্ব গাড়ি শিল্পের অন্যতম শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত এই কোম্পানি এখন একাধিক দিক থেকে চাপের মুখে পড়েছে।
চীনের গাড়ি নির্মাতারা দ্রুত বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার দখল করছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ইউরোপীয় গাড়ি নির্মাতাদের জন্য নতুন চাপ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে ইউরোপে ভক্সওয়াগেনের উৎপাদন সক্ষমতা প্রয়োজনের তুলনায় বেশি হয়ে গেছে।
ফলে বিক্রি ও মুনাফার ওপর চাপ বাড়ার পাশাপাশি উৎপাদন খরচও কমানো জরুরি হয়ে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অলিভার ব্লুম দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছেন, ভক্সওয়াগেনকে ঘুরে দাঁড় করাতে বড় ধরনের কর্মী ছাঁটাই এবং উৎপাদন পুনর্বিন্যাসের কোনো বিকল্প নেই।
এক লাখ কর্মীর চাকরি নিয়ে শঙ্কা
ভক্সওয়াগেনের নতুন পুনর্গঠন পরিকল্পনা কতজন কর্মীর ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলবে, তা এখনো পুরোপুরি নির্দিষ্ট নয়। তবে আলোচনায় এক লাখ পর্যন্ত কর্মীর চাকরি ঝুঁকিতে পড়ার বিষয়টি সামনে এসেছে।
এর আগে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ৫০ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়েছিল। কিন্তু সেই পরিকল্পনাও তীব্র বিরোধিতার মুখে পড়ে।
বিশেষ করে জার্মানির শ্রমিক সংগঠনগুলো ব্যাপক ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। জার্মানির সবচেয়ে প্রভাবশালী শ্রমিক সংগঠন আইজি মেটাল ঘোষণা দেয়, কর্মী ছাঁটাই ঠেকাতে তারা সর্বশক্তি দিয়ে লড়বে।
লোয়ার স্যাক্সনির বিরোধিতাও ছিল বড় বাধা
ভক্সওয়াগেনের পুনর্গঠন পরিকল্পনার আরেকটি বড় বাধা ছিল জার্মানির লোয়ার স্যাক্সনি রাজ্য।
রাজ্যটি ভক্সওয়াগেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শেয়ারহোল্ডার এবং জার্মানিতে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন কার্যক্রমের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। রাজ্য সরকার কর্মী ছাঁটাই এবং চারটি জার্মান কারখানা বন্ধের পরিকল্পনার বিরোধিতা করছিল।
ফলে ভক্সওয়াগেনের ব্যবস্থাপনা ও তত্ত্বাবধায়ক পর্ষদের মধ্যেও মতবিরোধ তীব্র হয়ে ওঠে। কারণ তত্ত্বাবধায়ক পর্ষদে শ্রমিক প্রতিনিধি ও লোয়ার স্যাক্সনির প্রভাব যথেষ্ট শক্তিশালী।
‘পরমাণু বিকল্প’ ব্যবহারের হুমকি
পরিস্থিতি এতটাই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যে ভক্সওয়াগেনের ব্যবস্থাপনা পর্ষদ জরুরি শেয়ারহোল্ডার সভা ডাকার মতো কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রস্তুতি নেয়।
এই সভার মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক পর্ষদের বিরোধিতা পাশ কাটিয়ে কর্মী ছাঁটাইসহ পুনর্গঠন পরিকল্পনা অনুমোদনের চেষ্টা করা হতে পারত।
ভক্সওয়াগেনের অভ্যন্তরীণ আলোচনার সঙ্গে পরিচিত কয়েকজনের মতে, এই পদক্ষেপকে ‘পরমাণু বিকল্প’ হিসেবে দেখা হচ্ছিল। কারণ এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন ক্ষমতাধর পক্ষের মধ্যে সরাসরি সংঘাত শুরু হতে পারত।
এর ফল হতে পারত দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল আইনি লড়াই। এতে ভক্সওয়াগেনের আর্থিক সংকট আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা ছিল।
একজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বলেন, সমঝোতা না হলে ক্ষতির পরিমাণ কল্পনাতীত হতে পারত।
শেষ মুহূর্তে আলোচনায় বসেন শীর্ষ কর্মকর্তারা
এই আশঙ্কাই শেষ পর্যন্ত সমঝোতার পথ তৈরি করে।
ভক্সওয়াগেনের সদর দপ্তর উলফসবুর্গে বুধবার এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসেন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা অলিভার ব্লুম, তত্ত্বাবধায়ক পর্ষদের চেয়ারম্যান হান্স ডিটার পোয়েটশ এবং লোয়ার স্যাক্সনির মুখ্যমন্ত্রী ওলাফ লিস।
এর আগে মঙ্গলবার হ্যানোভারে প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনদের মধ্যে একটি বৈঠক হয়েছিল। সেখান থেকেই পরবর্তী সমঝোতার ভিত্তি তৈরি হয়।
বুধবারের আলোচনায় পরে যোগ দেন ভক্সওয়াগেনের কর্মী পরিষদের শক্তিশালী প্রধান দানিয়েলা কাভালো এবং আইজি মেটালের প্রধান ক্রিস্টিয়ানে বেনার।
সব পক্ষই বুঝতে পারে, সংঘাতে গেলে ক্ষতি হবে সবার। ফলে কঠোর অবস্থান থেকে সরে এসে একটি গ্রহণযোগ্য সমঝোতার দিকে এগিয়ে যায় তারা।
কর্মী ছাঁটাইয়ের অনুমোদন, তবে কিছু পরিকল্পনা স্থগিত
সমঝোতার আওতায় ভক্সওয়াগেন কর্মী ছাঁটাইয়ের অনুমোদন পাওয়ার পথ তৈরি করে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির যাত্রীবাহী গাড়ি ও যন্ত্রাংশ বিভাগকে আলাদা আইনি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার পরিকল্পনা আপাতত পিছিয়ে দেওয়া হয়।
এই সিদ্ধান্ত লোয়ার স্যাক্সনির জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ আলাদা আইনি প্রতিষ্ঠান তৈরি হলে রাজ্যটির ভক্সওয়াগেনের ওপর প্রভাব কমে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল।
অন্যদিকে শ্রমিক প্রতিনিধিদের আলোচনায় যুক্ত করে পুনর্গঠন পরিকল্পনার বিষয়ে একটি অভিন্ন অবস্থান তৈরি করা হয়।
আকস্মিকভাবে পর্ষদ বৈঠক এগিয়ে আনা
সমঝোতা চূড়ান্ত হওয়ার পর ভক্সওয়াগেন তত্ত্বাবধায়ক পর্ষদের নির্ধারিত বৈঠক এক দিন এগিয়ে আনে।
বৃহস্পতিবার সকালে পর্ষদ পুনর্গঠন পরিকল্পনায় সর্বসম্মত অনুমোদন দেয়। বিনিয়োগকারীদের অনেকেই এই সিদ্ধান্তে বিস্মিত হন।
ভক্সওয়াগেনের শেয়ারের দামও এতে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। পাঁচ বছর আগের তুলনায় প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের মূল্য প্রায় এক-চতুর্থাংশে নেমে এসেছিল। ফলে পুনর্গঠন চুক্তিকে বিনিয়োগকারীরা আপাতত স্বস্তির খবর হিসেবেই দেখেছেন।
চার জার্মান কারখানার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত
ভক্সওয়াগেনের চারটি জার্মান কারখানা—এমডেন, জুইকাউ, নেকারজুল্ম ও হ্যানোভার—এখনও বড় অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
এসব কারখানায় বর্তমান গাড়ি উৎপাদন ধীরে ধীরে কমে গেলে ভবিষ্যতে সেখানে নতুন ধরনের পণ্য বা অন্য শিল্পের উৎপাদন চালুর সম্ভাবনা রয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কারখানা বিক্রির কথাও বিবেচনায় আসতে পারে।
তবে কোন কারখানায় কী হবে, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
ছাঁটাইয়ের অনুমোদন মানেই লড়াই শেষ নয়
পর্ষদ পুনর্গঠন পরিকল্পনা অনুমোদন করলেও ভক্সওয়াগেনের জন্য কঠিন পথ এখনো বাকি।
কর্মী ছাঁটাইয়ের বিস্তারিত পরিকল্পনা শ্রমিক সংগঠনগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত করতে হবে। এই আলোচনায় সমঝোতা না হলে জার্মানির বিভিন্ন ভক্সওয়াগেন কারখানায় ধর্মঘটের পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।
অর্থাৎ ব্যবস্থাপনা পর্ষদের অনুমোদন পাওয়া গেলেও বাস্তবে কর্মী ছাঁটাই কার্যকর করা এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।
চীনের প্রতিযোগিতা ও শুল্কের চাপ থাকছেই
ভক্সওয়াগেনের বর্তমান সংকটের মূল কারণগুলোর কোনোটি সমঝোতার মাধ্যমে দূর হয়নি।
চীনা গাড়ি নির্মাতাদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কও ইউরোপীয় গাড়ি নির্মাতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে ইউরোপে অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা ভক্সওয়াগেনের ব্যয় কমানোর প্রয়োজন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিশ্বের অন্যান্য পুরোনো গাড়ি নির্মাতারাও একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছে। কেউ কারখানা পুনর্গঠন করেছে, কেউ উৎপাদন কমিয়েছে, আবার কেউ নতুন গাড়ির প্রকল্প পিছিয়ে দিয়েছে।
ভক্সওয়াগেনের সামনে কঠিন পরীক্ষা
ভক্সওয়াগেনের নতুন চুক্তি আপাতত প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং সম্ভাব্য আইনি সংঘাত এড়িয়েছে। কিন্তু এর মাধ্যমে মূল সংকটের সমাধান হয়নি।
একদিকে বিপুল সংখ্যক কর্মীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। অন্যদিকে শ্রমিক সংগঠনগুলো এখনো ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে। চারটি কারখানার ভবিষ্যৎ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
ফলে ভক্সওয়াগেনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় কাজ হলো দ্রুত বাস্তবসম্মত পুনর্গঠন পরিকল্পনা তৈরি করা এবং একই সঙ্গে শ্রমিকদের সঙ্গে নতুন করে সমঝোতায় পৌঁছানো।
প্রতিষ্ঠানটির একজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বলেছেন, অনিশ্চয়তা এখনো রয়ে গেছে। ভক্সওয়াগেনের নির্বাহী পর্ষদ দ্রুত সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা সামনে না আনা পর্যন্ত সেই অনিশ্চয়তা দূর হবে না।
৮৯ বছরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পুনর্গঠনের সিদ্ধান্ত ভক্সওয়াগেনকে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সেই পথ যে কঠিন ও সংঘাতপূর্ণ হতে পারে—সেটিও এখন স্পষ্ট।
ভক্সওয়াগেনের এই সংকট তাই শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মী ছাঁটাইয়ের গল্প নয়; এটি একই সঙ্গে ইউরোপের গাড়ি শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান, জার্মানির শিল্প অর্থনীতি এবং ভবিষ্যতের গাড়ি বাজারের বড় পরিবর্তনের প্রতিচ্ছবি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















