১০:৫৭ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বড় ক্লাসের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে শিক্ষার্থী, বদলাতে হবে শিক্ষার পদ্ধতি গ্যাস স্টেশনে বসল বিয়ের আসর, তিন পোশাকে চমকে দিলেন ড্রামার কনে ট্রাম্পের মানচিত্রে ‘মার্কিন’ আইসল্যান্ড, ক্ষুব্ধ রেইকিয়াভিক তলব করল মার্কিন রাষ্ট্রদূত এনভিডিয়া–হাগিং ফেস চুক্তিতে বদলে যেতে পারে প্রতিষ্ঠানের এআই কৌশল মেয়ের জন্মের স্মৃতি ধরে রাখতে টেলর সুইফটের প্রিয় গয়না-শিল্পীর অনন্য আংটি ১০–৩০ কাউন্ট সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বাতিল, আপত্তি বিজিএমইএ-বিকেএমইএর সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় সিলেটের চার প্রবাসীর মর্মান্তিক মৃত্যু মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি: মিসরের সামনে যোগ দেওয়ার চেয়েও বড় প্রশ্ন কাঁচা সবুজ টমেটো সংরক্ষণ করুন শীতের জন্য, সহজেই তৈরি করুন মজাদার আচার ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের যেকোনো প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করল মিসর

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চোখে গোপন থাকা কি আর সম্ভব?

প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, মানুষের পরিচয় গোপন রাখার সুযোগ তত সংকুচিত হচ্ছে। কয়েক দশক আগেও কোনো ব্যক্তি কোথাও নিজেকে আড়াল করে রাখতে চাইলে তাকে খুঁজে বের করা ছিল দীর্ঘ ও কঠিন অনুসন্ধানের বিষয়। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেই কাজকে অনেক দ্রুত, নিখুঁত এবং বিস্তৃত করে তুলছে। ফলে শুধু অপরাধী বা পলাতক ব্যক্তিই নয়, নিরাপত্তার কারণে পরিচয় গোপন রাখা সাধারণ মানুষও নতুন ঝুঁকির মুখে পড়ছেন।

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে জার্মান পুলিশ রেড আর্মি ফ্যাকশনের সাবেক সদস্য ড্যানিয়েলা ক্লেটেকে গ্রেপ্তার করে। কয়েক দশক ধরে তিনি আত্মগোপনে ছিলেন। তবে পুলিশের আগে অনুসন্ধানী সাংবাদিকরাও তার পরিচয়ের সূত্র পেয়েছিলেন। বেলিংক্যাটের গবেষক মাইকেল কোলবোর্ন ক্লেটের পুরোনো ছবিকে এআই-নির্ভর মুখ শনাক্তকরণ ব্যবস্থায় পরীক্ষা করেন। বিভিন্ন টুল একই ধরনের ফল দিতে থাকে—বার্লিনে ‘ক্লডিয়া ইভোনে’ নামে পরিচিত এক নারীর সঙ্গে ছবিটির মিল পাওয়া যায়। গ্রেপ্তারের আগ পর্যন্ত তিনি শহরের আফ্রো-ব্রাজিলীয় ক্যাপোইরা নৃত্যাঙ্গনের পরিচিত মুখ ছিলেন।

এই ঘটনাটি দেখিয়ে দেয়, ইন্টারনেট যুগে শুরু হওয়া অনুসন্ধানের পুরোনো খেলাটি এআই কীভাবে সম্পূর্ণ নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে। আগে কোনো ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, প্রকাশ্য নথি, মানচিত্র কিংবা নানা বিচ্ছিন্ন তথ্য ঘেঁটে দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হতো। এখন একই কাজ বিপুলসংখ্যক ছবির সঙ্গে মুহূর্তের মধ্যে তুলনা করে করা সম্ভব।

এর প্রভাব শুধু সমসাময়িক অপরাধ অনুসন্ধানে সীমাবদ্ধ নেই। গত বছর বেলিংক্যাটের আরেক গবেষকের সঙ্গে কাজ করে জার্মান ইতিহাসবিদ জুর্গেন ম্যাথাউস হলোকাস্টের একটি ভয়াবহ ছবির সম্ভাব্য হত্যাকারীকে শনাক্ত করার চেষ্টা করেন। ছবিটিতে যুদ্ধকালীন ইউক্রেনে একটি গর্তের সামনে হাঁটু গেড়ে থাকা এক ইহুদি ব্যক্তির মাথায় বন্দুক তাক করে আছে এক নাৎসি সেনা। আর্কাইভের তথ্যের সঙ্গে উন্নত এআই মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি মিলিয়ে তারা সম্ভাব্য পরিচয় বের করেন।

এ ধরনের অনুসন্ধান সাংবাদিকতার জন্য নিঃসন্দেহে শক্তিশালী হাতিয়ার। নিউইয়র্ক টাইমসের এক অনুসন্ধানে নতুন এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিটকয়েনের রহস্যময় স্রষ্টা সাতোশি নাকামোতোর সম্ভাব্য পরিচয় হিসেবে ব্রিটিশ কম্পিউটার বিজ্ঞানী অ্যাডাম ব্যাকের নাম উঠে আসে। ব্যাক অবশ্য এ দাবি অস্বীকার করেছেন। আবার সানডে টাইমস ও বেলিংক্যাটের গবেষকেরা এআইভিত্তিক PimEyes-এর মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে পলাতক কার্টেল নেতা ক্রিস্টি কিনাহান ও তার ছেলে ড্যানিয়েলকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন।

এমনকি পেশাদার প্রতিষ্ঠান ছাড়াও ব্যক্তিগত অনুসন্ধানকারীরা এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন। অপেশাদার তদন্তকারী অ্যালেক্স বেবার নিজস্ব এআই টুল তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার ‘জোডিয়াক কিলার’-এর প্রকৃত পরিচয় শনাক্ত করার দাবি করেছেন।

কিন্তু এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আসে: সমাজে স্বচ্ছতার সীমা কোথায়?

জনস্বার্থে তথ্য অনুসন্ধান এবং নিছক কৌতূহল বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপের মধ্যে পার্থক্যটি কীভাবে নির্ধারণ করা হবে? এআই আসার আগেও ‘ওপেন-সোর্স ইন্টেলিজেন্স’-এর নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, রাস্তার মানচিত্র, প্রকাশ্য নথি ও অন্যান্য তথ্য জোড়া লাগিয়ে ব্যক্তিকে অনুসরণ করার প্রবণতা ছিল। প্রযুক্তি এখন সেই প্রক্রিয়াকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে বিপুলসংখ্যক ছবির ডেটাবেসের সঙ্গে একটি মুখ মিলিয়ে পরিচয় বের করা সম্ভব।

সমস্যার সবচেয়ে গুরুতর দিকটি দেখা যায় তাদের ক্ষেত্রে, যাদের পরিচয় গোপন থাকাটা নিছক ব্যক্তিগত পছন্দ নয়, বরং নিরাপত্তার প্রয়োজন। ধরুন, সাক্ষী সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় থাকা কোনো ব্যক্তি একটি ফুটবল ম্যাচ দেখতে গেলেন। সেখানে তার মুখ ক্যামেরায় ধরা পড়ল। এআই সেই ছবিকে মুহূর্তের মধ্যে অসংখ্য ছবির সঙ্গে মিলিয়ে ফেলতে পারলে তার গোপন পরিচয় আর কতক্ষণ নিরাপদ থাকবে?Cognitive psychologist explains why AI images fool so many people

একই ধরনের প্রশ্ন তথ্যের নিরাপত্তা নিয়েও উঠছে। অনলাইনে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার জন্য এনক্রিপশন ব্যবস্থার ওপর মানুষ ও প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে নির্ভর করেছে। কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী গাণিতিক যুক্তি প্রয়োগে সক্ষম এআই যদি ক্রিপ্টোগ্রাফিক ব্যবস্থার দুর্বলতা খুঁজে বের করতে পারে, তাহলে এতদিনের নিরাপত্তা কাঠামোও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। জুলাইয়ে Anthropic জানায়, তাদের গবেষকেরা Claude Mythos Preview মডেল ব্যবহার করে ক্রিপ্টোগ্রাফিক অ্যালগরিদমে আক্রমণের উন্নত পদ্ধতি খুঁজে পেয়েছেন। এ ধরনের অগ্রগতি ভবিষ্যতে অনলাইন গোপনীয়তার ধারণাকেই বদলে দিতে পারে।

পরিচয় গোপন রাখার ক্ষেত্রেও একই বিপদ তৈরি হচ্ছে। সমাজ বহু বছর ধরে ছবি ঝাপসা করা, তথ্য মুছে দেওয়া বা পরিচয় আড়াল করার নানা পদ্ধতি তৈরি করেছে। বিশেষ করে মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিকেরা নির্যাতনের শিকার, ভুক্তভোগী এবং তথ্যদাতাদের নিরাপত্তার জন্য এসব কৌশল ব্যবহার করেন। কিন্তু এআই যদি ঝাপসা ছবিকে আবারও বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য মুখের বৈশিষ্ট্য ফিরিয়ে আনতে পারে, তাহলে এই সুরক্ষাব্যবস্থাগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।

শিরিন আনলেন ও গ্যাবি ইভান্স জুনে Tech Policy Press-এ প্রকাশিত এক লেখায় এই উদ্বেগের দিকটি তুলে ধরেন। তারা ঝাপসা করা দুই শিশুর প্রকাশিত ছবি সাধারণভাবে পাওয়া এআই-নির্ভর ছবি পরিষ্কার করার প্রযুক্তিতে পরীক্ষা করেন। ছবিতে মুখের কাঠামো ও কিছু বৈশিষ্ট্য আবার স্পষ্ট হতে শুরু করে। সেটি হয়তো প্রকৃত মুখের নিখুঁত পুনর্গঠন ছিল না, কিন্তু ছবিটি আগের তুলনায় পরিচয়ের কাছাকাছি চলে যায়। বয়স, লিঙ্গ, জাতিগত বৈশিষ্ট্য কিংবা অন্য কারও সঙ্গে সাদৃশ্য সম্পর্কে ধারণা তৈরি হওয়ার সুযোগও বাড়ে। অর্থাৎ নিখুঁত শনাক্তকরণ সম্ভব না হলেও গোপনীয়তার দেয়াল দুর্বল হয়ে যায়।

এটাই আসন্ন প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক। একদিকে থাকবে সরকার, করপোরেশন, সাংবাদিক ও অনুসন্ধানকারীরা; অন্যদিকে থাকবে এমন মানুষ, যাদের নিরাপত্তার জন্য নিজেদের পরিচয় আড়াল করা জরুরি। এআই যত বেশি শক্তিশালী হবে, এই ব্যবধান তত বাড়তে পারে।

তাই প্রশ্নটি কেবল এআই কী করতে পারে, তা নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো—কোন পর্যায়ে তার সেই সক্ষমতা ব্যবহার করা উচিত এবং কার নিরাপত্তার বিনিময়ে তা করা যাবে না। জনস্বার্থের অনুসন্ধান অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু এমন প্রযুক্তির যুগে জনস্বার্থের নামে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ধ্বংস করার সুযোগও সমানভাবে সীমিত করতে হবে।

কারণ ভবিষ্যতের লড়াই শুধু কে কাকে খুঁজে বের করতে পারে, তা নিয়ে হবে না। লড়াই হবে—কার হাতে পরিচয় প্রকাশের ক্ষমতা থাকবে, আর কার হাতে নিজেকে আড়াল করে নিরাপদ থাকার অধিকার থাকবে। এই নতুন বাস্তবতায় জনস্বার্থে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোকেই প্রযুক্তির সুবিধার পাশাপাশি তার ঝুঁকি মোকাবিলার প্রস্তুতিও নিতে হবে।

জনপ্রিয় সংবাদ

বড় ক্লাসের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে শিক্ষার্থী, বদলাতে হবে শিক্ষার পদ্ধতি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার চোখে গোপন থাকা কি আর সম্ভব?

০৮:১৮:১১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, মানুষের পরিচয় গোপন রাখার সুযোগ তত সংকুচিত হচ্ছে। কয়েক দশক আগেও কোনো ব্যক্তি কোথাও নিজেকে আড়াল করে রাখতে চাইলে তাকে খুঁজে বের করা ছিল দীর্ঘ ও কঠিন অনুসন্ধানের বিষয়। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সেই কাজকে অনেক দ্রুত, নিখুঁত এবং বিস্তৃত করে তুলছে। ফলে শুধু অপরাধী বা পলাতক ব্যক্তিই নয়, নিরাপত্তার কারণে পরিচয় গোপন রাখা সাধারণ মানুষও নতুন ঝুঁকির মুখে পড়ছেন।

২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে জার্মান পুলিশ রেড আর্মি ফ্যাকশনের সাবেক সদস্য ড্যানিয়েলা ক্লেটেকে গ্রেপ্তার করে। কয়েক দশক ধরে তিনি আত্মগোপনে ছিলেন। তবে পুলিশের আগে অনুসন্ধানী সাংবাদিকরাও তার পরিচয়ের সূত্র পেয়েছিলেন। বেলিংক্যাটের গবেষক মাইকেল কোলবোর্ন ক্লেটের পুরোনো ছবিকে এআই-নির্ভর মুখ শনাক্তকরণ ব্যবস্থায় পরীক্ষা করেন। বিভিন্ন টুল একই ধরনের ফল দিতে থাকে—বার্লিনে ‘ক্লডিয়া ইভোনে’ নামে পরিচিত এক নারীর সঙ্গে ছবিটির মিল পাওয়া যায়। গ্রেপ্তারের আগ পর্যন্ত তিনি শহরের আফ্রো-ব্রাজিলীয় ক্যাপোইরা নৃত্যাঙ্গনের পরিচিত মুখ ছিলেন।

এই ঘটনাটি দেখিয়ে দেয়, ইন্টারনেট যুগে শুরু হওয়া অনুসন্ধানের পুরোনো খেলাটি এআই কীভাবে সম্পূর্ণ নতুন মাত্রায় নিয়ে গেছে। আগে কোনো ব্যক্তিকে শনাক্ত করতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, প্রকাশ্য নথি, মানচিত্র কিংবা নানা বিচ্ছিন্ন তথ্য ঘেঁটে দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে হতো। এখন একই কাজ বিপুলসংখ্যক ছবির সঙ্গে মুহূর্তের মধ্যে তুলনা করে করা সম্ভব।

এর প্রভাব শুধু সমসাময়িক অপরাধ অনুসন্ধানে সীমাবদ্ধ নেই। গত বছর বেলিংক্যাটের আরেক গবেষকের সঙ্গে কাজ করে জার্মান ইতিহাসবিদ জুর্গেন ম্যাথাউস হলোকাস্টের একটি ভয়াবহ ছবির সম্ভাব্য হত্যাকারীকে শনাক্ত করার চেষ্টা করেন। ছবিটিতে যুদ্ধকালীন ইউক্রেনে একটি গর্তের সামনে হাঁটু গেড়ে থাকা এক ইহুদি ব্যক্তির মাথায় বন্দুক তাক করে আছে এক নাৎসি সেনা। আর্কাইভের তথ্যের সঙ্গে উন্নত এআই মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি মিলিয়ে তারা সম্ভাব্য পরিচয় বের করেন।

এ ধরনের অনুসন্ধান সাংবাদিকতার জন্য নিঃসন্দেহে শক্তিশালী হাতিয়ার। নিউইয়র্ক টাইমসের এক অনুসন্ধানে নতুন এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিটকয়েনের রহস্যময় স্রষ্টা সাতোশি নাকামোতোর সম্ভাব্য পরিচয় হিসেবে ব্রিটিশ কম্পিউটার বিজ্ঞানী অ্যাডাম ব্যাকের নাম উঠে আসে। ব্যাক অবশ্য এ দাবি অস্বীকার করেছেন। আবার সানডে টাইমস ও বেলিংক্যাটের গবেষকেরা এআইভিত্তিক PimEyes-এর মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে পলাতক কার্টেল নেতা ক্রিস্টি কিনাহান ও তার ছেলে ড্যানিয়েলকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছেন।

এমনকি পেশাদার প্রতিষ্ঠান ছাড়াও ব্যক্তিগত অনুসন্ধানকারীরা এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছেন। অপেশাদার তদন্তকারী অ্যালেক্স বেবার নিজস্ব এআই টুল তৈরি করে যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত সিরিয়াল কিলার ‘জোডিয়াক কিলার’-এর প্রকৃত পরিচয় শনাক্ত করার দাবি করেছেন।

কিন্তু এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি সামনে আসে: সমাজে স্বচ্ছতার সীমা কোথায়?

জনস্বার্থে তথ্য অনুসন্ধান এবং নিছক কৌতূহল বা ব্যক্তিগত গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপের মধ্যে পার্থক্যটি কীভাবে নির্ধারণ করা হবে? এআই আসার আগেও ‘ওপেন-সোর্স ইন্টেলিজেন্স’-এর নামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, রাস্তার মানচিত্র, প্রকাশ্য নথি ও অন্যান্য তথ্য জোড়া লাগিয়ে ব্যক্তিকে অনুসরণ করার প্রবণতা ছিল। প্রযুক্তি এখন সেই প্রক্রিয়াকে এমন পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে বিপুলসংখ্যক ছবির ডেটাবেসের সঙ্গে একটি মুখ মিলিয়ে পরিচয় বের করা সম্ভব।

সমস্যার সবচেয়ে গুরুতর দিকটি দেখা যায় তাদের ক্ষেত্রে, যাদের পরিচয় গোপন থাকাটা নিছক ব্যক্তিগত পছন্দ নয়, বরং নিরাপত্তার প্রয়োজন। ধরুন, সাক্ষী সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় থাকা কোনো ব্যক্তি একটি ফুটবল ম্যাচ দেখতে গেলেন। সেখানে তার মুখ ক্যামেরায় ধরা পড়ল। এআই সেই ছবিকে মুহূর্তের মধ্যে অসংখ্য ছবির সঙ্গে মিলিয়ে ফেলতে পারলে তার গোপন পরিচয় আর কতক্ষণ নিরাপদ থাকবে?Cognitive psychologist explains why AI images fool so many people

একই ধরনের প্রশ্ন তথ্যের নিরাপত্তা নিয়েও উঠছে। অনলাইনে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার জন্য এনক্রিপশন ব্যবস্থার ওপর মানুষ ও প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে নির্ভর করেছে। কিন্তু অত্যন্ত শক্তিশালী গাণিতিক যুক্তি প্রয়োগে সক্ষম এআই যদি ক্রিপ্টোগ্রাফিক ব্যবস্থার দুর্বলতা খুঁজে বের করতে পারে, তাহলে এতদিনের নিরাপত্তা কাঠামোও নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে। জুলাইয়ে Anthropic জানায়, তাদের গবেষকেরা Claude Mythos Preview মডেল ব্যবহার করে ক্রিপ্টোগ্রাফিক অ্যালগরিদমে আক্রমণের উন্নত পদ্ধতি খুঁজে পেয়েছেন। এ ধরনের অগ্রগতি ভবিষ্যতে অনলাইন গোপনীয়তার ধারণাকেই বদলে দিতে পারে।

পরিচয় গোপন রাখার ক্ষেত্রেও একই বিপদ তৈরি হচ্ছে। সমাজ বহু বছর ধরে ছবি ঝাপসা করা, তথ্য মুছে দেওয়া বা পরিচয় আড়াল করার নানা পদ্ধতি তৈরি করেছে। বিশেষ করে মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিকেরা নির্যাতনের শিকার, ভুক্তভোগী এবং তথ্যদাতাদের নিরাপত্তার জন্য এসব কৌশল ব্যবহার করেন। কিন্তু এআই যদি ঝাপসা ছবিকে আবারও বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য মুখের বৈশিষ্ট্য ফিরিয়ে আনতে পারে, তাহলে এই সুরক্ষাব্যবস্থাগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে।

শিরিন আনলেন ও গ্যাবি ইভান্স জুনে Tech Policy Press-এ প্রকাশিত এক লেখায় এই উদ্বেগের দিকটি তুলে ধরেন। তারা ঝাপসা করা দুই শিশুর প্রকাশিত ছবি সাধারণভাবে পাওয়া এআই-নির্ভর ছবি পরিষ্কার করার প্রযুক্তিতে পরীক্ষা করেন। ছবিতে মুখের কাঠামো ও কিছু বৈশিষ্ট্য আবার স্পষ্ট হতে শুরু করে। সেটি হয়তো প্রকৃত মুখের নিখুঁত পুনর্গঠন ছিল না, কিন্তু ছবিটি আগের তুলনায় পরিচয়ের কাছাকাছি চলে যায়। বয়স, লিঙ্গ, জাতিগত বৈশিষ্ট্য কিংবা অন্য কারও সঙ্গে সাদৃশ্য সম্পর্কে ধারণা তৈরি হওয়ার সুযোগও বাড়ে। অর্থাৎ নিখুঁত শনাক্তকরণ সম্ভব না হলেও গোপনীয়তার দেয়াল দুর্বল হয়ে যায়।

এটাই আসন্ন প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক। একদিকে থাকবে সরকার, করপোরেশন, সাংবাদিক ও অনুসন্ধানকারীরা; অন্যদিকে থাকবে এমন মানুষ, যাদের নিরাপত্তার জন্য নিজেদের পরিচয় আড়াল করা জরুরি। এআই যত বেশি শক্তিশালী হবে, এই ব্যবধান তত বাড়তে পারে।

তাই প্রশ্নটি কেবল এআই কী করতে পারে, তা নিয়ে নয়। প্রশ্ন হলো—কোন পর্যায়ে তার সেই সক্ষমতা ব্যবহার করা উচিত এবং কার নিরাপত্তার বিনিময়ে তা করা যাবে না। জনস্বার্থের অনুসন্ধান অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু এমন প্রযুক্তির যুগে জনস্বার্থের নামে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ধ্বংস করার সুযোগও সমানভাবে সীমিত করতে হবে।

কারণ ভবিষ্যতের লড়াই শুধু কে কাকে খুঁজে বের করতে পারে, তা নিয়ে হবে না। লড়াই হবে—কার হাতে পরিচয় প্রকাশের ক্ষমতা থাকবে, আর কার হাতে নিজেকে আড়াল করে নিরাপদ থাকার অধিকার থাকবে। এই নতুন বাস্তবতায় জনস্বার্থে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলোকেই প্রযুক্তির সুবিধার পাশাপাশি তার ঝুঁকি মোকাবিলার প্রস্তুতিও নিতে হবে।