ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে আটক দুই উত্তর কোরীয় যুদ্ধবন্দীকে দক্ষিণ কোরিয়ায় হস্তান্তরের তথ্য প্রকাশ করায় ইউক্রেনের কাছে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা ও ব্যাখ্যা চেয়েছে দক্ষিণ কোরিয়া। সিউলের দাবি, দুই বন্দীর হস্তান্তরের বিষয়টি গোপন রাখার ব্যাপারে দুই দেশের মধ্যে সমঝোতা হয়েছিল। কিন্তু ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে বিষয়টি প্রকাশ্যে তুলে ধরেছেন।
গত সপ্তাহে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে জেলেনস্কি জানান, ২০২৫ সালের শুরুর দিকে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ময়দান থেকে আটক দুই উত্তর কোরীয় সেনাকে সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ায় পাঠানো হয়েছে। রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধে অংশ নিতে মোতায়েন করা হাজার হাজার উত্তর কোরীয় সেনার মধ্যে ওই দুই ব্যক্তি ছিলেন।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ং অভিযোগ করেছেন, বন্দীদের হস্তান্তর নিয়ে গোপনীয়তা রক্ষার যে সমঝোতা ছিল, ইউক্রেন তা লঙ্ঘন করেছে। তবে ইউক্রেন এমন কোনো গোপনীয়তা চুক্তি থাকার কথা অস্বীকার করেছে।
রোববার দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের জনসংযোগবিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা সিয়ং গি-হং ইউক্রেনের এই তথ্য প্রকাশের ঘটনায় ‘তীব্র দুঃখ’ প্রকাশ করেন। তিনি ইউক্রেনের কাছে আনুষ্ঠানিক ক্ষমা ও বিষয়টি পরিষ্কার করার দাবি জানান।
সিয়ং বলেন, গোপনীয়তা রক্ষার বিষয়ে কোনো সমঝোতা হয়নি—ইউক্রেনের এমন দাবি ‘মিথ্যা’। তার ভাষ্য, এই অবস্থান দুই সরকারের পারস্পরিক আস্থার পাশাপাশি বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কেরও গুরুতর ক্ষতি করেছে।
কেন যুদ্ধবন্দীদের বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছিল
দক্ষিণ কোরিয়ার ভাষ্য অনুযায়ী, দুই দেশের মধ্যে বন্দীদের হস্তান্তর গোপন রাখার সিদ্ধান্তের পেছনে একাধিক কারণ ছিল। সিউল আশঙ্কা করছিল, বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে উত্তর কোরীয় দুই সেনা এবং তাদের পরিবারের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এর সঙ্গে কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাগত বিষয়ও জড়িত ছিল।
অন্যদিকে ইউক্রেনেরও নিজস্ব হিসাব ছিল। কিয়েভের আশঙ্কা ছিল, দুই যুদ্ধবন্দীকে দক্ষিণ কোরিয়ায় পাঠানোর তথ্য প্রকাশ্যে এলে ইউক্রেনের অভ্যন্তরে সমালোচনা হতে পারে। কারণ, রাশিয়ার হাতে আটক ইউক্রেনীয় সেনাদের সঙ্গে বিনিময়ের সম্ভাব্য সুযোগ হিসেবে ওই বন্দীদের ব্যবহার করার সুযোগ হারাতে পারে কিয়েভ।
এ বিষয়ে দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থিত ইউক্রেনের দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য করেনি।
দক্ষিণ কোরিয়ায় বসতি গড়তে চেয়েছিলেন দুই সেনা
ইউক্রেনে অবস্থানকালে গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দুই উত্তর কোরীয় সেনাই দক্ষিণ কোরিয়ায় বসতি স্থাপনের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন। দক্ষিণ কোরিয়া ইউক্রেনকে তাদের উত্তর কোরিয়ায় ফেরত না পাঠানোর অনুরোধ জানিয়েছিল।
সিউলের আশঙ্কা ছিল, উত্তর কোরিয়ায় ফিরে গেলে ওই দুই সেনা নির্যাতন বা নিপীড়নের শিকার হতে পারেন। দক্ষিণ কোরিয়ার আইনে উত্তর কোরিয়াকে দেশটির ভূখণ্ডের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এ কারণে উত্তর কোরিয়া থেকে পালিয়ে আসা ব্যক্তিদের গ্রহণ এবং তাদের আর্থিক সহায়তা দেওয়ার দীর্ঘদিনের নীতি রয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ার।
১৯৫০-৫৩ সালের কোরীয় যুদ্ধের পর থেকে ৩৪ হাজারের বেশি উত্তর কোরীয় দক্ষিণ কোরিয়ায় বসতি গড়েছেন। তাদের বেশির ভাগই গত তিন দশকে দেশত্যাগ করেছেন। অধিকাংশ উত্তর কোরীয় পলাতক বেসামরিক নারী এবং দেশটির অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা উত্তরাঞ্চলের বাসিন্দা। এর তুলনায় উত্তর কোরীয় সেনাদের দেশত্যাগের ঘটনা অনেক বেশি বিরল।
জাতিসংঘে দেওয়া বক্তব্যে জেলেনস্কি দুই সেনাকে দক্ষিণ কোরিয়ায় পাঠানোর বিস্তারিত জানাননি। তবে তিনি বলেন, তাদের একজন আটক হওয়ার বিষয়টি বুঝতে পেরে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি বেঁচে যান বলে জানান জেলেনস্কি।
তথ্য প্রকাশের পেছনে কী উদ্দেশ্য ছিল
কিছু বিশ্লেষকের মতে, জেলেনস্কি এই ঘটনা প্রকাশ করে ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার সরাসরি অংশগ্রহণের বিষয়টি আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে চেয়েছেন। এর মাধ্যমে পশ্চিমা দেশগুলোর কাছ থেকে ইউক্রেনের জন্য আরও সমর্থন আদায়ের চেষ্টাও থাকতে পারে।
তবে দক্ষিণ কোরিয়ার উদ্বেগ ছিল ভিন্ন। সিউলের আশঙ্কা, বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে উত্তর কোরিয়া পাল্টা পদক্ষেপ নিতে পারে। একই সঙ্গে উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টাও এতে জটিল হয়ে উঠতে পারে।
ইউক্রেনকে সহায়তা করলেও অস্ত্র দিচ্ছে না দক্ষিণ কোরিয়া
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে দক্ষিণ কোরিয়া ইউক্রেনকে মানবিক সহায়তা ও অন্যান্য সহযোগিতা দিয়ে আসছে। একই সঙ্গে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন রাশিয়াবিরোধী নিষেধাজ্ঞাতেও যোগ দিয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়া বিশ্বের অন্যতম বড় অস্ত্র রপ্তানিকারক দেশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহযোগিতায় দেশটির একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী রয়েছে। তারপরও ইউক্রেন ও ন্যাটোর পক্ষ থেকে সরাসরি সামরিক সহায়তার আহ্বান জানানো হলেও সিউল তাতে সাড়া দেয়নি। সক্রিয় সশস্ত্র সংঘাতে জড়িত দেশকে অস্ত্র না দেওয়ার দীর্ঘদিনের নীতি বজায় রেখেছে দক্ষিণ কোরিয়া।
রাশিয়া-উত্তর কোরিয়া সামরিক সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ
২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়া নিশ্চিত করে যে, উত্তর কোরীয় সেনারা রাশিয়ার কুরস্ক সীমান্ত অঞ্চলে ইউক্রেনীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে রুশ সেনাদের সঙ্গে লড়াই করেছে।
দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্রসহ আরও কয়েকটি দেশ অভিযোগ করেছে, উত্তর কোরিয়া রাশিয়াকে কামানের গোলা, গোলাবারুদ ও ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করছে। এর বিনিময়ে পিয়ংইয়ং অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা পাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা সংস্থার গত বছরের হিসাব অনুযায়ী, রাশিয়ায় প্রায় ১৫ হাজার উত্তর কোরীয় সেনা মোতায়েন করা হয়েছিল। তাদের মধ্যে প্রায় ২ হাজার নিহত হয়েছেন বলে ধারণা করা হয়।
রাশিয়ার সঙ্গে সামরিক সহযোগিতা উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন চাপ মোকাবিলায় সহায়তা করার পাশাপাশি দেশটির পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি আরও এগিয়ে নিতে সুযোগ করে দিয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
এদিকে গত মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সামরিক মহড়ার পরিসর কমিয়ে দেন। এটিকে কিম জং উনের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনরুজ্জীবিত করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হয়। তবে উত্তর কোরিয়া জানিয়েছে, এই পদক্ষেপ তাদের আলোচনায় ফিরিয়ে আনার জন্য যথেষ্ট নয়।
দুই উত্তর কোরীয় যুদ্ধবন্দীর দক্ষিণ কোরিয়ায় হস্তান্তরের তথ্য প্রকাশকে ঘিরে ইউক্রেন ও দক্ষিণ কোরিয়ার মধ্যে যে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে, তা একই সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে উত্তর কোরিয়ার ভূমিকা, রাশিয়া-পিয়ংইয়ং সম্পর্ক এবং কোরীয় উপদ্বীপের কূটনৈতিক সমীকরণকে নতুন করে সামনে এনেছে।












