হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে জলবিদ্যুৎকে জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প হিসেবে দ্রুত বাড়ানো হচ্ছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হিমালয়ের বরফঢাকা ও উচ্চভূমির অঞ্চলগুলো ক্রমেই অস্থিতিশীল হয়ে ওঠায় এই খাতের ক্ষয়ক্ষতি ও বীমা ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে আকস্মিক বন্যা, হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা, ভূমিধস ও তুষারধস এখন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোর জন্য বড় আর্থিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নেপালের পরিস্থিতি এ ঝুঁকির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। দেশটিতে গত পাঁচ বছরের মধ্যে চার বছরই জলবিদ্যুৎ খাতে বীমা দাবির পরিমাণ বীমা প্রিমিয়ামের চেয়ে বেশি ছিল। ফলে নতুন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিনিয়োগের পাশাপাশি এসব প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ু ঝুঁকি কীভাবে হিসাব করা হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
ভারত, ভুটান ও চীনও জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমাতে জলবিদ্যুতের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। তবে আগস্টে নেপাল-তিব্বত সীমান্ত এলাকায় ভয়াবহ বন্যায় এক ধাক্কায় নেপালের চালু থাকা জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ৪০০ মেগাওয়াটের বেশি সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। বিজ্ঞানীদের প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, ওই বন্যার পরিবেশ তৈরিতে জলবায়ু পরিবর্তনেরও ভূমিকা ছিল।
পর্বত ও নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞ অরুণ শ্রেষ্ঠার মতে, হিমালয়ের বিভিন্ন সীমান্ত ও নদী অববাহিকায় বারবার ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা কোথায় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প তৈরি করা হবে এবং কীভাবে সেগুলো নির্মাণ করা হবে—দুই বিষয়েই নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তা তৈরি করেছে।
গত পাঁচ বছরে আকস্মিক বন্যা এবং হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যায় ভারতে নির্মাণাধীন ও চালু থাকা জলবিদ্যুৎ অবকাঠামোর অন্তত ১৭ হাজার কোটি রুপির সমপরিমাণ ক্ষতি হয়েছে। আর নেপাল-তিব্বত সীমান্তের সাম্প্রতিক বন্যায় নেপালের জলবিদ্যুৎ খাতে ক্ষতির প্রাথমিক হিসাব প্রায় ২ হাজার কোটি নেপালি রুপি।

বন্যা বা অন্য দুর্যোগের পর দ্রুত বীমা দাবি নিষ্পত্তি করা গেলে ক্ষতিগ্রস্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র দ্রুত সচল করা সম্ভব। কিন্তু নেপাল ইন্স্যুরেন্স অথরিটির তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে জলবিদ্যুৎ খাতে করা মোট ১ হাজার ১৪৫ কোটি নেপালি রুপির বীমা দাবির প্রায় অর্ধেক এখনো নিষ্পত্তি হয়নি।
অবশ্য কোনো দাবি দীর্ঘদিন ঝুলে থাকা মানেই তা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে—এমন নয়। বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ জটিল হওয়া কিংবা ক্ষতির প্রকৃতি যাচাই করতে সময় লাগার কারণেও নিষ্পত্তিতে দেরি হতে পারে।
নেপালের ওরিয়েন্টাল ইন্স্যুরেন্সের শাখা প্রধান টোটন চক্রবর্তী বলেন, পুনর্বীমার ব্যবস্থা যথেষ্ট না থাকলেও বীমা দাবি নিষ্পত্তিতে দেরি হতে পারে। পুনর্বীমার মাধ্যমে বীমা কোম্পানিগুলো বড় ধরনের দুর্যোগের ক্ষতির একটি অংশ অন্য বীমা প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করে নিজেদের আর্থিক ঝুঁকি কমায়।
তবে নেপালের বীমা বাজার তুলনামূলকভাবে নতুন হওয়ায় বড় ধরনের ঝুঁকি নিজেদের কাছে ধরে রাখার সক্ষমতা সীমিত। ফলে দেশটির বীমা কোম্পানিগুলো আন্তর্জাতিক পুনর্বীমা বাজারের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল।
ইউনাইটেড আজোদ ইন্স্যুরেন্সের ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী রেনা রিজালের মতে, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য পুনর্বীমা সুবিধা পাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এর পেছনে ঘন ঘন ও একই ধরনের এলাকায় বড় ক্ষয়ক্ষতি, জলবায়ু ঝুঁকি বৃদ্ধি এবং পর্যাপ্ত তথ্যের স্বচ্ছতার ঘাটতি ভূমিকা রাখছে।
নেপাল ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে অবস্থিত। পাশাপাশি দেশটি হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা, সাধারণ বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকিতেও রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোর ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা ও ঘনত্ব বিবেচনায় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বীমা প্রিমিয়ামও নতুন করে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নেপালে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বীমা পলিসির সংখ্যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কমেছে। একই সময়ে শুরুতে দ্রুত বাড়ার পর মোট বীমাকৃত সম্পদের মূল্যও অনেকটা স্থির হয়ে গেছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, প্রকল্প বাড়লেও ঝুঁকি ও বীমা ব্যয়ের বাস্তবতা বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
শুধু বীমা নয়, প্রকল্পের নকশা ও অবস্থান নির্ধারণ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগে যেখানে একটি নির্দিষ্ট দুর্যোগের ঝুঁকি আলাদাভাবে বিবেচনা করা হতো, এখন বন্যা, ভূমিধস, ভূমিকম্প, হিমবাহের পরিবর্তনসহ একাধিক ঝুঁকি একই সঙ্গে এবং একটির সঙ্গে আরেকটির সম্ভাব্য প্রভাব মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

জলসম্পদ বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে জলবায়ু-সহনশীল নকশা, নিরাপদ অবস্থান নির্বাচন, বিকল্প প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ এবং প্রয়োজন হলে এমন কিছু কাঠামো রাখা দরকার, যেগুলো বড় দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মূল স্থাপনাকে রক্ষা করতে পারে।
কাঠমান্ডুভিত্তিক অবকাঠামো পরামর্শক প্রতিষ্ঠান জেড কনসাল্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিকেশ প্রধানাং বলেন, নদীর উজানে জলবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করলে অনেক ক্ষেত্রে ভালো আর্থিক ফল পাওয়া যেতে পারে। তবে এতে দুর্যোগের ঝুঁকিও বেড়ে যায়। তুলনামূলকভাবে ভাটির দিকে প্রকল্প স্থাপন ব্যয়বহুল হলেও ঝুঁকি কম হতে পারে।
সমস্যা হলো, হিমালয় অঞ্চলে অপেক্ষাকৃত উপযুক্ত ভাটির অনেক জায়গা ইতোমধ্যেই ব্যবহৃত হয়ে গেছে। ফলে নতুন প্রকল্পগুলো ক্রমেই নদীর উৎস ও উজানের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। কম খরচে বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের চাপের কারণে কিছু ক্ষেত্রে প্রকল্পের অবস্থান নিয়ে প্রয়োজনীয় বিস্তারিত গবেষণাও যথাযথভাবে করা হচ্ছে না বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
নেপালে প্রায় দুই দশক ধরে বিদ্যুতের ট্যারিফ উল্লেখযোগ্যভাবে অপরিবর্তিত থাকায় জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বাজেটও অনেক ক্ষেত্রে সীমিত থাকে। এতে ঝুঁকি কমাতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের সুযোগ সংকুচিত হতে পারে।
নেপালে জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ঝুঁকি মূল্যায়নের কিছু নিয়ম থাকলেও স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যাচাই করা একটি পূর্ণাঙ্গ পদ্ধতি এবং তার কার্যকর প্রয়োগ এখনো যথেষ্ট নয় বলে বিশেষজ্ঞদের মত।
আন্তর্জাতিক অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পগুলো সাধারণত তুলনামূলকভাবে কঠোর নিরাপত্তা ও প্রকৌশল মান অনুসরণ করে। কারণ ঋণদাতারা এসব মান পূরণের ওপর গুরুত্ব দেন। কিন্তু অনেক দেশীয় বেসরকারি প্রকল্পে সেই মাত্রার মান বজায় রাখা হয় না। বিশেষজ্ঞদের মতে, ২০২১, ২০২৩ ও ২০২৪ সালের বড় ক্ষয়ক্ষতির ক্ষেত্রে এই পার্থক্য একটি কারণ হতে পারে।
এদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে হিমালয়ের তাপমাত্রা বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হারে বাড়ছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে। এর ফলে পারমাফ্রস্ট ও হিমবাহ গলছে, তুষারের আচ্ছাদন কমছে এবং পাহাড়ি পরিবেশের স্থিতিশীলতাও বদলাচ্ছে।

এ কারণে শুধু অতীতের নদীর পানিপ্রবাহের তথ্যের ওপর নির্ভর করে ঝুঁকি নির্ধারণ যথেষ্ট নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের বিভিন্ন সম্ভাব্য প্রভাব, ভূমিকম্পের ঝুঁকি, হিমবাহের পরিবর্তন এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সতর্কীকরণ ব্যবস্থার তথ্যও নিয়মিত ঝুঁকি মূল্যায়নে যুক্ত করার প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।
জম্মু ও কাশ্মীরে ১ হাজার মেগাওয়াটের পাকাল দুল জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে ঝুঁকি কমানোর জন্য বিদ্যুৎকেন্দ্রের মূল কমপ্লেক্স, শ্যাফট ও সুইচইয়ার্ডের একটি বড় অংশ ভূগর্ভে নির্মাণ করা হচ্ছে। এতে প্রকৌশলগত জটিলতা ও ব্যয় বাড়লেও নিরাপত্তার দিকটি গুরুত্ব পেয়েছে।
তবে প্রকল্পের অবস্থান ও নকশায় সতর্কতা বাড়ালেও হিমালয়ের মতো দ্রুত পরিবর্তনশীল ও ভূতাত্ত্বিকভাবে অস্থিতিশীল অঞ্চলে পুরোপুরি দুর্যোগমুক্ত অবকাঠামোর নিশ্চয়তা দেওয়া কঠিন। নদীর তীর এড়িয়ে চলা, ভাটির জনবসতি বিবেচনায় রাখা, নদীর স্বাভাবিক পরিবেশ ও পলি প্রবাহ এবং নদীনির্ভর মানুষের জীবিকার ওপর প্রভাব হিসাব করার পরও অনিশ্চয়তা থেকে যায়।
ফলে হিমালয়ের জলবিদ্যুৎ সম্প্রসারণকে শুধু পরিচ্ছন্ন বা কম-কার্বন বিদ্যুৎ উৎপাদনের দৃষ্টিতে দেখলে হবে না। প্রকল্পের অবস্থান, প্রকৌশল নকশা, বীমা ও পুনর্বীমা, স্থানীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা এবং ভবিষ্যতের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব—সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনায় নেওয়াই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে।












