কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই কর্মসংস্থানে কী ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে, ভারত এখন তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষাগার। তথ্যপ্রযুক্তি, ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া আউটসোর্সিং এবং বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের বৈশ্বিক সক্ষমতা কেন্দ্র মিলিয়ে দেশটিতে প্রায় ৬০ লাখ মানুষ কাজ করেন। ফলে এআইয়ের দ্রুত বিস্তার ভারতের জন্য একই সঙ্গে বড় সম্ভাবনা এবং বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে। প্রশ্ন হলো, নিয়মিত ও পুনরাবৃত্তিমূলক কাজনির্ভর ভারতের বিশাল তথ্যপ্রযুক্তি কর্মসংস্থান কি প্রযুক্তির এই পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারবে?
সরকারি শ্রমবাজারের পরিসংখ্যান এআইয়ের কারণে চাকরির পরিবর্তন পুরোপুরি ধরতে পারছে না। তাই ২০২২ সাল থেকে এশিয়ার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের এআই-সম্পর্কিত নিয়োগ ও ছাঁটাই নিয়ে ৬৯টি প্রকাশ্য ঘোষণা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ভারতের প্রতিষ্ঠানগুলোই ছিল সবচেয়ে বেশি প্রতিনিধিত্বশীল। মোট ঘোষণার ৩০ শতাংশ এবং নিয়োগ-ছাঁটাইয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ ভারতের সঙ্গে সম্পর্কিত।
সংখ্যার আড়ালে বৈষম্যপূর্ণ প্রভাব

প্রথম দেখায় পরিস্থিতি ভারতের জন্য খুব একটা খারাপ নয়। এআই-সম্পর্কিত নিয়োগ হয়েছে ৮৩ হাজার ১০০টি, বিপরীতে ৩১ হাজার ৯২১ জনের চাকরি ছাঁটাই হয়েছে। অর্থাৎ নিট হিসাবে ৫১ হাজার ১৭৯টি চাকরি বেড়েছে। কিন্তু এই হিসাব শ্রমবাজারের ভেতরের বৈষম্যকে আড়াল করছে।
এআইয়ের প্রভাব সব কর্মীর ওপর সমানভাবে পড়ছে না। আর্থিক পরিষেবা ও প্রযুক্তি খাত ছাঁটাইয়ের ক্ষেত্রে প্রায় সমান ভূমিকা রেখেছে। অন্যদিকে নতুন নিয়োগের বড় অংশ এসেছে প্রযুক্তি খাত থেকে। প্রযুক্তির বাইরে অন্যান্য খাতে এআই-নির্ভর নতুন কর্মসংস্থান এখনো খুব সীমিত।
ব্যাংকিং খাতে হিসাব পুনর্মিলন, তথ্য সংরক্ষণ, নিয়ম পরিপালন এবং গ্রাহকসেবার মতো নিয়মিত কাজ এআই ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রতিস্থাপিত হচ্ছে। প্রযুক্তি খাতে আবার জুনিয়র পর্যায়ের মান যাচাই ও প্রাথমিক প্রোগ্রামিংয়ের মতো কাজের চাহিদা কমছে। বিপরীতে তথ্য শ্রেণিবিন্যাস ও এআই প্রশিক্ষণের মতো নতুন কাজ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু এসব কাজের কিছু অংশ ভবিষ্যতে আরও উন্নত মডেল দিয়েও করা সম্ভব হতে পারে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, চাকরি হারানোর পুরো চিত্র প্রচলিত পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে না। এক্সফেনোর হিসাব অনুযায়ী, ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি খাতে নিট নিয়োগ ২০২২ অর্থবছরের প্রায় ৬ লাখ থেকে ২০২৬ অর্থবছরে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজারে নেমে এসেছে। অনেক প্রতিষ্ঠান কর্মীদের গণহারে ছাঁটাই না করে নতুন নিয়োগ বন্ধ করে দিয়েছে। ফলে তরুণ ও নতুন স্নাতকদের জন্য কর্মসংস্থানের দরজা সংকুচিত হয়েছে, যা প্রচলিত ছাঁটাইয়ের পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না।
তরুণদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
শ্রমবাজারে এই পরিবর্তনের সবচেয়ে স্পষ্ট প্রভাব দেখা যাচ্ছে অভিজ্ঞতা ও বয়সের দিক থেকে। ভারতের ৬৫১টি তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের ওপর করা এক জরিপে দেখা গেছে, ৫৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠান প্রাথমিক পর্যায়ের নিয়োগ কমিয়েছে। সিনিয়র পর্যায়ে একই কথা বলেছে মাত্র ১৪ শতাংশ প্রতিষ্ঠান।

দক্ষিণ কোরিয়ার অভিজ্ঞতাও একই ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। ব্যাংক অব কোরিয়ার একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত তিন বছরে দেশটিতে তরুণ কর্মসংস্থান ২ লাখ ১১ হাজার কমেছে, বিপরীতে ৫০-এর কোঠায় থাকা কর্মীদের কর্মসংস্থান বেড়েছে ২ লাখ ৯ হাজার। নিয়মিত কাজের স্বয়ংক্রিয়ীকরণে তরুণ কর্মীরা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও অভিজ্ঞ কর্মীদের ব্যবসায়িক প্রেক্ষাপট বোঝার সক্ষমতা তাদের চাহিদা ধরে রেখেছে।
ভারতের জন্য এখানেই মূল ঝুঁকি। এআই হয়তো মোট চাকরির সংখ্যা তাৎক্ষণিকভাবে কমিয়ে দিচ্ছে না, কিন্তু চাকরিতে প্রবেশের প্রথম ধাপটি কঠিন করে তুলছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি দক্ষতা অর্জনের সুযোগ, আয় এবং ক্যারিয়ার অগ্রগতির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
এআইয়ের দ্বিতীয় পর্যায়ের সুযোগ
তবে এখানেই গল্প শেষ নয়। এখন পর্যন্ত এআই-সম্পর্কিত যে চাকরিগুলো তৈরি হয়েছে, সেগুলোর বড় অংশ সরাসরি প্রযুক্তি খাতের। এআই ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হলে এর পরোক্ষ অর্থনৈতিক প্রভাব আরও ব্যাপক হতে পারে। নতুন ব্যবসা, নতুন পণ্য এবং আগে অর্থনৈতিকভাবে সম্ভব ছিল না এমন সেবার বাজার তৈরি হলে কর্মসংস্থানের পরিধিও বাড়তে পারে।
ভারতের সামনে অন্তত তিনটি বড় সুযোগ রয়েছে।
প্রথমত, বিশ্বব্যাপী এআই প্রয়োগে ভারত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। ভারতীয় তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নত এআই মডেল ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে সেতু হিসেবে কাজ করতে পারে।
দ্বিতীয়ত, দেশের নিজস্ব বাজারে এআইয়ের ব্যবহার বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। কৃষিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক পরামর্শ, ড্রোন পরিচালনা ও বুদ্ধিমান সেচব্যবস্থা; শিক্ষায় স্থানীয় ভাষার উপকরণ; স্বাস্থ্যসেবায় রোগ নির্ণয় ও বহুভাষিক প্রযুক্তি; আর্থিক খাতে গ্রাহক পরিচয় যাচাই ও জালিয়াতি শনাক্তকরণ—এসব ক্ষেত্রে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে।

তৃতীয়ত, এআই ছোট ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান এবং নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রাথমিক ব্যয় কমাতে পারে। এতে গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা বা স্থানীয় ভাষার শিক্ষার মতো আগে সীমিত বাজারের ক্ষেত্রেও ব্যবসা তৈরি হওয়ার সুযোগ বাড়বে।
নীতিনির্ধারণে সময় ফুরিয়ে আসছে
তবে এই সম্ভাবনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাস্তবে পরিণত হবে না। ভারতের নীতিনির্ধারকদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত শ্রমবাজারে এআইয়ের প্রভাব দ্রুত শনাক্ত করার ব্যবস্থা তৈরি করা। নিয়োগ ও ছাঁটাইয়ের পাশাপাশি নতুন নিয়োগ বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রবণতাকেও নজরদারিতে আনতে হবে।
নতুন কর্মীদের জন্য এআইভিত্তিক শিক্ষানবিশ কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে, যেখানে তারা প্রযুক্তির ব্যবহার শেখার পাশাপাশি নিজ নিজ পেশাগত দক্ষতা উন্নত করবে। মধ্যপর্যায়ের কর্মীদের পুনঃদক্ষতা অর্জনে আর্থিক সহায়তা এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রশিক্ষণ ব্যয়ের একটি অংশ ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থাও প্রয়োজন।

একই সঙ্গে নির্ভরযোগ্য বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট, কম্পিউটিং অবকাঠামো, ডিজিটাল দক্ষতা এবং স্থানীয় ভাষাভিত্তিক এআই প্রযুক্তির বিস্তার নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা ব্যবস্থাকেও পরিবর্তিত বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে হবে—বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম থেকে শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং পেশাগত শিক্ষায় এআই ব্যবহারের প্রস্তুতি—সবকিছুর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
ভারতের সামনে তাই মূল প্রশ্ন এআই চাকরি নষ্ট করবে কি না—তা নয়। প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের প্রথম ধাক্কায় যারা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, তাদের নতুন অর্থনীতির সুযোগে প্রবেশের পথ তৈরি করা যাবে কি না—সেটিই বড় প্রশ্ন। এআই যদি কেবল অভিজ্ঞ ও উচ্চদক্ষ কর্মীদের আয় বাড়ায়, তাহলে শ্রমবাজারে বিভাজন আরও গভীর হতে পারে। কিন্তু দক্ষতা, অবকাঠামো ও নীতিগত প্রস্তুতি একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া গেলে আজকের চাকরির সংকটই ভবিষ্যতের নতুন কর্মসংস্থানের ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তাই এখনই। এআইয়ের পরিবর্তন কয়েক বছরের অপেক্ষা করছে না; শ্রমবাজারে এর প্রভাব ইতোমধ্যে পড়তে শুরু করেছে।












