টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি বাংলাদেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও কারুশিল্পের এক অনন্য পরিচয়। প্রায় দেড়শ বছরের ইতিহাস বুকে ধারণ করে এই শিল্প আজও টিকে আছে আধুনিক যন্ত্রের দাপটের মধ্যেও। দক্ষ কারিগরের নিপুণ হাতের বুনন, বৈচিত্র্যময় নকশা, আরামদায়ক কাপড় ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের কারণে দেশ-বিদেশের ক্রেতাদের কাছে টাঙ্গাইলের হাতে বোনা শাড়ির আলাদা কদর রয়েছে। সফট সিল্ক, সুতি, জামদানি, রেশম, দোতারিসহ নানা ধরনের শাড়ি এ অঞ্চলের তাঁতশিল্পকে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচিতি।
তবে দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য ও আন্তর্জাতিক বাজারে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও নানা সংকটে পড়েছেন টাঙ্গাইলের তাঁতিরা। কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি, শ্রমের তুলনায় কম মজুরি, মূলধনের অভাব, বাজারে বিক্রি কমে যাওয়া এবং পাওয়ারলুমে তৈরি শাড়ির সঙ্গে প্রতিযোগিতা তাঁদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। পরিস্থিতির কারণে অনেক তাঁতি বংশপরম্পরায় চলে আসা পেশা ছেড়ে অন্য কাজে যুক্ত হচ্ছেন। ফলে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
টাঙ্গাইলের মানুষের কাছে তাঁতের শাড়ি কেবল একটি পোশাক নয়, এটি তাঁদের ইতিহাস ও গর্বের অংশ। স্থানীয়ভাবে প্রচলিত প্রবাদ—‘নদী-চর খাল-বিল গজারির বন, টাঙ্গাইল শাড়ি তার গর্বের ধন।’ আবার অনেকে বলেন, ‘চমচম, টমটম ও শাড়ি—এই তিনে টাঙ্গাইল বাড়ি।’ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাঁতের খটখট শব্দের সঙ্গে বেড়ে ওঠা কারিগরেরা তাঁদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আজও তৈরি করছেন ঐতিহ্যের এই শাড়ি।
দেড়শ বছরের ঐতিহ্য যেভাবে ছড়িয়ে পড়েছে
টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্পের ইতিহাস থেকে জানা যায়, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে এ অঞ্চলে তাঁতশিল্পের প্রসার ঘটে। বসাক সম্প্রদায়ের মানুষকে টাঙ্গাইলের আদি তাঁতিদের মধ্যে অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁদের আদি নিবাস ছিল ঢাকা ও ধামরাই এলাকায়। পরবর্তী সময়ে তাঁতশিল্প টাঙ্গাইলের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে এ অঞ্চলের অর্থনীতি ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে।
টাঙ্গাইলের শাড়ির নকশা ও বুননে বৈচিত্র্য আনার ক্ষেত্রে বহু কারিগর গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। তাঁদের মধ্যে বাজিতপুরের আনন্দ মোহন বসাক ও সীতানাথ বসাক, চন্ডী গ্রামের নীল কমল বসাক, মন্টু, নলসুন্দা গ্রামের হরেন্দ্র বসাক এবং পাথরাইলের রঘুনাথ বসাক, আনন্দ, গোবিন্দ, সুকুমার বসাক ও খুশি মোহন বসাকের নাম উল্লেখযোগ্য।
তাঁতশিল্পের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা জানান, টাঙ্গাইলের শাড়ি তৈরির পদ্ধতি অন্যান্য অনেক শাড়ির তুলনায় আলাদা। এই শাড়ির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ধরে রাখতে প্রয়োজন দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, কারিগরি জ্ঞান ও নিখুঁত হাতের কাজ। এখানে একজন তাঁতির শুধু বুনন জানলেই চলে না, নকশা, সুতার ব্যবহার ও কাপড়ের মান সম্পর্কেও থাকতে হয় গভীর ধারণা। তাই এই পেশায় দক্ষ কারিগরদের অনেকেই নিজেদের শিল্পী হিসেবে গড়ে তুলেছেন।
চার গ্রামের তাঁতপল্লিতে চলছে শাড়ি বোনার কাজ
টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার পাথরাইল, চন্ডী, বাজিতপুর ও পুটিয়াজানি গ্রাম ঐতিহ্যবাহী তাঁতের শাড়ি তৈরির জন্য পরিচিত। এসব গ্রামের তাঁতপল্লিতে তৈরি হয় সুতি জামদানি, সফট সিল্ক, ধানসিঁড়ি, বালুচরি, গ্যাসসিল্ক, স্বর্ণকাতান, দোতারি, চোষা ও রেশমসহ নানা ধরনের শাড়ি। এসব শাড়ি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারে সরবরাহ করা হয়।
পাথরাইলের তাঁতপল্লিতে গেলে এখনও শোনা যায় তাঁতের পরিচিত খটখট শব্দ। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কারিগরেরা ব্যস্ত থাকেন শাড়ি বোনার কাজে। কেউ সুতা প্রস্তুত করেন, কেউ তাঁতে বসে নকশা অনুযায়ী কাপড় বোনেন। অনেক পরিবারের বাড়িতেই রয়েছে তাঁত, আর এই কাজের ওপর নির্ভর করেই চলে তাঁদের সংসার।
শাড়ি ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, টাঙ্গাইলে প্রায় ১০ হাজার তাঁতি কাপড় বোনার সঙ্গে যুক্ত। অধিকাংশ বাড়িতে পাঁচটি করে তাঁত রয়েছে। কোনো কোনো বাড়িতে ছয়টি, আবার কোথাও ১০টি পর্যন্ত তাঁত বসানো হয়েছে। এসব তাঁতকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে স্থানীয় কর্মসংস্থান ও ব্যবসার একটি বড় ক্ষেত্র।
তবে তাঁতপল্লির কর্মচাঞ্চল্যের আড়ালে রয়েছে শ্রমিকদের নানা সংকট। দীর্ঘ সময় কাজ করেও অনেক তাঁতি তাঁদের শ্রমের উপযুক্ত পারিশ্রমিক পাচ্ছেন না। নতুন প্রজন্মের অনেকে এই পেশায় আগ্রহ হারাচ্ছেন। ফলে ঐতিহ্যবাহী বুননশিল্পে দক্ষ শ্রমিকের সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
দীর্ঘ সময়ের শ্রম, কিন্তু মজুরি কম
একটি শাড়ি তৈরি করতে তার মান, নকশা ও বুননের জটিলতা অনুযায়ী সাত দিন থেকে এক মাস পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। বিশেষ নকশার কিছু শাড়ি তৈরি করতে দুই থেকে ছয় মাসও প্রয়োজন হয়। অথচ দীর্ঘ সময় ধরে পরিশ্রম করার পরও তাঁতশ্রমিকদের আয় অনেক ক্ষেত্রে সংসারের প্রয়োজন মেটানোর জন্য যথেষ্ট হচ্ছে না।
তাঁতশ্রমিক আনোয়ার হোসেন জানান, আগে তিনি সপ্তাহে তিনটি শাড়ি তৈরি করতে পারতেন, এখন সপ্তাহে চারটি শাড়ি তৈরি করছেন। তারপরও মজুরি কম থাকায় সংসার চালাতে কষ্ট হচ্ছে। তাঁর ভাষ্য, ধান কাটার কাজে এক দিনের মজুরি ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত পাওয়া যায়। কিন্তু তাঁতশ্রমিকেরা তাঁদের শ্রমের তুলনায় সেই ধরনের পারিশ্রমিক পান না। মজুরি বাড়ানো হলে পরিবার নিয়ে কিছুটা ভালোভাবে চলতে পারতেন বলে মনে করেন তিনি।
আরেক তাঁতশ্রমিক নারায়ণ চন্দ্র ২৩ বছর ধরে এই পেশায় যুক্ত। তিনি জানান, প্রতি পিস শাড়ি তৈরির জন্য তাঁকে ৬০০ টাকা মজুরি দেওয়া হয়। সপ্তাহে পাঁচটি শাড়ি তৈরি করলেও সেই আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাঁর মতে, আগের মতো তাঁতপল্লিতে কাজের ব্যস্ততা ও ব্যবসার পরিবেশ নেই। তারপরও বাপ-দাদার পেশার প্রতি টান থেকে তিনি কাজটি ধরে রেখেছেন।
তাঁতশ্রমিকদের এমন অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, এই শিল্পের ভবিষ্যৎ শুধু শাড়ির চাহিদার ওপর নির্ভর করছে না; বরং কারিগরদের ন্যায্য মজুরি, কাজের পরিবেশ ও জীবিকার নিরাপত্তাও গুরুত্বপূর্ণ। শ্রমের যথাযথ মূল্য নিশ্চিত করা না গেলে নতুন প্রজন্মকে এই পেশায় ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।
কাঁচামালের দাম বাড়ায় কমছে ব্যবসায়ীদের মুনাফা
টাঙ্গাইলের শাড়ি তৈরিতে ব্যবহৃত সুতা ও অন্যান্য কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচও বেড়েছে। শাড়ি বিক্রেতাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, কয়েক বছর আগে একটি শাড়ি তৈরিতে যেখানে প্রায় ৫০০ টাকা খরচ হতো, এখন সেখানে ৬০০ টাকার বেশি ব্যয় হচ্ছে। কিন্তু কাঁচামালের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শাড়ির বিক্রয়মূল্য বাড়ানো সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এতে তাঁদের মুনাফা কমেছে।
অন্যদিকে ক্রেতাদের কাছেও টাঙ্গাইলের শাড়ির মানের সুনাম রয়েছে। অনেকের মতে, মান ও নকশার তুলনায় এসব শাড়ির দাম এখনও বেশ কিছু বিকল্পের চেয়ে সাশ্রয়ী। তবে আগের তুলনায় দাম বেড়ে যাওয়ায় নিয়মিত শাড়ি কেনার প্রবণতা কমেছে। ঈদ, পয়লা বৈশাখ ও দুর্গাপূজার মতো উৎসবকে কেন্দ্র করেই এখন অনেক ক্রেতা শাড়ি কেনেন।
ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। শাড়ির ধরন, সুতার মান, নকশা ও বুননের জটিলতার ওপর দাম নির্ভর করে। উৎসবের সময় বিক্রি বাড়লেও বছরের অন্যান্য সময়ে চাহিদা কম থাকায় ব্যবসায়ীদের পক্ষে উৎপাদন ও বিপণনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন হচ্ছে।
এর পাশাপাশি পাওয়ারলুমে তৈরি শাড়ির সঙ্গে প্রতিযোগিতাও বাড়ছে। যন্ত্রে তুলনামূলক দ্রুত বেশি কাপড় উৎপাদন করা সম্ভব হওয়ায় বাজারে এসব শাড়ির সরবরাহ বেশি। অন্যদিকে হাতে বোনা শাড়ি তৈরিতে সময় ও শ্রম বেশি লাগে। ফলে দাম ও উৎপাদনের গতির ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় অনেক সময় পিছিয়ে পড়ছেন ঐতিহ্যবাহী তাঁতিরা।
বিদেশের বাজারে টাঙ্গাইলের শাড়ির সম্ভাবনা
দেশের বাজারে চাহিদা কমলেও বিদেশে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। শাড়ি নকশাকার ও ব্যবসায়ী নীল কমল বসাক জানান, নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও ঐতিহ্যবাহী শাড়ির মান ধরে রাখতে নতুন নকশা ও বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা চলছে। তাঁর মতে, দেশের বাজারে চাহিদা কমে যাওয়ায় উৎপাদন ও বিক্রি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, সৌদি আরব এবং ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির চাহিদা রয়েছে।
তিনি মনে করেন, সরকারি সহায়তা পাওয়া গেলে বিশ্বের আরও বিভিন্ন দেশে এই শাড়ি রপ্তানির সুযোগ তৈরি হতে পারে। এতে একদিকে যেমন তাঁতশিল্পের প্রসার ঘটবে, অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনাও বাড়বে। তবে দেশের বাজারে ব্যবসার পরিস্থিতি দীর্ঘদিন খারাপ থাকলে এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
বিদেশের বাজারে সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে শুধু শাড়ির নকশা ও মান উন্নত করলেই হবে না; পণ্যের পরিচিতি বাড়ানো, আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে পৌঁছানো, নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং রপ্তানির উপযোগী বিপণনব্যবস্থা গড়ে তোলাও প্রয়োজন। পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী হাতে বোনা শাড়ি ও যন্ত্রে তৈরি কাপড়ের বৈশিষ্ট্য ক্রেতাদের কাছে স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে।
বছরে প্রায় ২০০ কোটি টাকার ব্যবসা
টাঙ্গাইল জেলা শাড়ি ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি রঘুনাথ বসাক জানান, স্বাভাবিক সময়ে টাঙ্গাইলের শাড়িকে ঘিরে বছরে প্রায় ২০০ কোটি টাকার ব্যবসা হয়। তবে নানা কারণে গত কয়েক বছরে এই ব্যবসার গতি কমেছে। বিশেষ করে করোনা মহামারির সময় থেকে ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন বলে জানান তিনি।
ঈদ, নববর্ষ ও দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে বিভিন্ন ধরনের শাড়ি তৈরি করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে সিল্ক, জামদানি, সফট সিল্ক, দোতারি, রেশম ও তসর। শাড়ির ধরন ও মান অনুযায়ী বিক্রয়মূল্যেও রয়েছে বড় পার্থক্য।
রঘুনাথ বসাকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সিল্ক শাড়ির দাম সাড়ে তিন হাজার থেকে ১৪ হাজার টাকা পর্যন্ত। নেট জুট শাড়ির দাম প্রায় সাড়ে ১০ হাজার টাকা, বাহার শাড়ির দাম সাড়ে ১৬ হাজার টাকা, কটন জুট শাড়ির দাম আড়াই হাজার টাকা এবং টিস্যু সিল্ক শাড়ির দাম প্রায় সাড়ে চার হাজার টাকা।
তিনি জানান, মূলধনের সংকট, প্রয়োজনীয় উপকরণ সংগ্রহে সমস্যা, নকশা ও প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা, দক্ষতার অভাব এবং বিপণনের দুর্বলতাসহ বিভিন্ন সমস্যার মুখে পড়ছেন তাঁতি ও ব্যবসায়ীরা। এসব বাধা দূর করা না গেলে শিল্পটির সম্ভাবনা পুরোপুরি কাজে লাগানো কঠিন হবে।
করটিয়া হাটে আসেন দেশের বিভিন্ন এলাকার পাইকার
টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির অন্যতম বড় বাজার করটিয়া হাট। প্রতি মঙ্গলবার এই হাটে তাঁতজাত পণ্য কেনাবেচা হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে পাইকার ও ব্যবসায়ীরা এখানে আসেন। তাঁতিদের কাছ থেকে সরাসরি বিভিন্ন নকশার শাড়ি ও কাপড় কিনে তাঁরা নিজ নিজ এলাকার বাজারে নিয়ে যান।
করটিয়া হাট শুধু শাড়ি কেনাবেচার জায়গা নয়, এটি টাঙ্গাইলের তাঁতশিল্পের সরবরাহব্যবস্থারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। উৎপাদক ও পাইকারদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ থাকায় এখান থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তাঁতের পণ্য ছড়িয়ে পড়ে। তবে বাজারে চাহিদা কমে গেলে তার প্রভাব পড়ে তাঁতি, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও পাইকার—সব পক্ষের ওপর।
তাঁতশিল্প রক্ষায় সরকারি সহায়তার আশ্বাস
টাঙ্গাইলের জেলা প্রশাসক শরীফা হক জানান, ইতিহাস ও ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির প্রচার ও প্রসারে জেলা প্রশাসন কাজ করছে। ইতোমধ্যে টাঙ্গাইল জেলা কারাগারে বন্দিদের প্রশিক্ষণের জন্য তাঁত বুননের যন্ত্র স্থাপন করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য হলো, প্রশিক্ষণ নিয়ে মুক্তির পর তাঁরা যেন তাঁতভিত্তিক কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে পারেন।
জেলা প্রশাসক আশা প্রকাশ করেন, ঐতিহ্যবাহী হাতে বোনা টাঙ্গাইলের শাড়ি একসময় বিশ্ববাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করবে এবং নিজস্ব মর্যাদা নিয়ে টিকে থাকবে।
তবে শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শুধু প্রচার বা প্রশিক্ষণই যথেষ্ট নয়। তাঁতিদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, মানসম্মত কাঁচামাল সংগ্রহের সুযোগ, ন্যায্য মজুরি, আধুনিক নকশা ও প্রযুক্তি বিষয়ে প্রশিক্ষণ এবং বাজার সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিদেশে পণ্য পাঠানোর প্রক্রিয়া সহজ করা গেলে তাঁতশিল্পের সঙ্গে যুক্ত পরিবারগুলোর আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।
টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ি তার নকশা, বুনন ও ঐতিহ্যের কারণে আজও স্বতন্ত্র। কিন্তু এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার মূল শক্তি যাঁরা—সেই তাঁতিদের জীবিকা যদি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তাহলে ঐতিহ্য ধরে রাখাও কঠিন হবে। তাই হাতে বোনা শাড়ির দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি কারিগরদের দক্ষতা, শ্রমের মর্যাদা ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। সঠিক সহায়তা ও পরিকল্পনা পাওয়া গেলে টাঙ্গাইলের এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প নতুন প্রজন্মের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের রপ্তানি সম্ভাবনা বাড়াতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।












