এ বছর শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার বিচারক ও মানবাধিকার আইনজীবী নাভানেথেম নাভি পিল্লাই। ৯ অক্টোবর নরওয়ের নোবেল কমিটি এই ঘোষণা দেয়। গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের বিচারে তাঁর দীর্ঘ কাজকে স্বীকৃতি দিয়েছে কমিটি। বাংলাদেশের পাঠকের জন্য খবরটির একটি বিশেষ দিক আছে। পিল্লাই বর্তমানে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের বিচারক। নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত এই আদালতে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলার শুনানি চলছে।
পিল্লাইয়ের জন্ম ১৯৪০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে, তামিল বংশোদ্ভূত পরিবারে। কর্মজীবনের শুরুতে তিনি বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের কর্মীদের পক্ষে আদালতে লড়েছেন। পরে দক্ষিণ আফ্রিকার উচ্চ আদালতে প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী বিচারক হন। রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের সভাপতিত্ব করেছেন তিনি। ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ছিলেন জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার। জাতিসংঘের একটি তদন্ত কমিশনের প্রধান হিসেবে তিনি গাজায় গণহত্যার জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করা প্রতিবেদনেরও নেতৃত্ব দেন। তিনি শান্তিতে নোবেলজয়ী পঞ্চম দক্ষিণ আফ্রিকান। পুরস্কারের অর্থমূল্য ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা। ১০ ডিসেম্বর অসলোতে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর হাতে পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে।
রোহিঙ্গাদের পক্ষে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মামলাটি করেছিল পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া, ২০১৯ সালে। ২০১৭ সালে রাখাইনে সামরিক অভিযানের পর সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসেন। সেই ঘটনার জবাবদিহি চাওয়াই মামলার মূল লক্ষ্য। মিয়ানমার শুরু থেকেই গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। এ সপ্তাহেই ওই অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া মিন অং হ্লাইং প্রেসিডেন্ট হিসেবে মালয়েশিয়া সফর করেছেন। দেশটি থেকে ১০ হাজারের বেশি মিয়ানমারের নাগরিককে ইতিমধ্যে ফেরত পাঠানো হয়েছে। এমন সময়ে মামলার এক বিচারকের নোবেলপ্রাপ্তি আন্তর্জাতিক নজর আবার রোহিঙ্গা প্রশ্নের দিকে ফেরাতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, আদালতের রায় দেন পুরো বিচারকমণ্ডলী, কোনো একজন বিচারক নন।
পুরস্কার ঘোষণার পর রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও এসেছে। ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেয়। ইউরোপের দেশগুলো, কানাডা, জাপান ও জাতিসংঘ এই নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে আদালতের পাশে দাঁড়িয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁকে পুরস্কার না দেওয়ায় নরওয়ের সমালোচনা করেছেন। পিল্লাই নিজে বিষয়টি নিয়ে হালকা রসিকতা করেছেন, ট্রাম্পের সঙ্গে পুরস্কার ভাগ করে নেওয়ার কথা বলে। এসব প্রতিক্রিয়া দেখায়, আন্তর্জাতিক আদালত ও বিচারকদের কাজ এখন কতটা রাজনৈতিক চাপের মুখে। তবে তাঁর কাজের মূল বার্তা গুরুতর। যুদ্ধ আর নিপীড়নের অপরাধের বিচার আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমেই হতে হবে।
বাংলাদেশ সাত বছরের বেশি সময় ধরে দশ লাখের বেশি রোহিঙ্গার আশ্রয়দাতা। প্রত্যাবাসন এখনো অনিশ্চিত, আর আন্তর্জাতিক সহায়তা কমছে। কক্সবাজারের শিবিরে থাকা রোহিঙ্গাদের জন্য এই খবর অন্তত একটি বার্তা দেয়, তাঁদের মামলার কথা বিশ্ব ভুলে যায়নি। এই প্রেক্ষাপটে ঢাকার কূটনীতির জন্য পিল্লাইয়ের নোবেল একটি সুযোগ। ন্যায়বিচার ছাড়া স্থায়ী প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়, এই অবস্থান আন্তর্জাতিক মঞ্চে নতুন করে তুলে ধরা যায়। রুয়ান্ডার ট্রাইব্যুনাল থেকে রোহিঙ্গা মামলার বেঞ্চ পর্যন্ত পিল্লাইয়ের পথচলা মনে করিয়ে দেয়, গণহত্যার বিচার দীর্ঘ সময় নেয়, তবু থেমে থাকে না।












