যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কায় ইউকন নদী ও এর উপনদীগুলোতে চিনুক স্যামনের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। হাজার হাজার বছর ধরে এই মাছের ওপর নির্ভর করে জীবনযাপন করা আদিবাসী কইউকন জনগোষ্ঠী এখন খাদ্যসংকট, বাড়তি জীবনযাত্রার ব্যয় এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। মাছের সংখ্যা পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে মাছ ধরায় দীর্ঘমেয়াদি নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলেও তা নদীতীরবর্তী জনপদগুলোর জীবনযাত্রাকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
আলাস্কার দুর্গম অভ্যন্তরীণ অঞ্চলের হুস্লিয়া গ্রামের বাসিন্দা ওয়েস্টলি হেনরির কাছে নদী শুধু জীবিকার উৎস নয়, পারিবারিক স্মৃতি ও ঐতিহ্যের অংশ। একসময় নদীর তীরে গ্রীষ্মকালজুড়ে মাছ ধরার অসংখ্য শিবির ছিল। পরিবারের সদস্যরা মাছ কাটতেন, শুকাতেন এবং শীতের জন্য সংরক্ষণ করতেন। এখন সেই শিবিরগুলোর বেশির ভাগই হারিয়ে গেছে। নদীর তীরে পড়ে থাকা পুরোনো কাঠামো ও ছেঁড়া ত্রিপল যেন বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া জীবনধারার চিহ্ন।
মাছের সংকটে খাদ্য ও জীবিকার চাপ
ইউকন নদী অববাহিকায় চিনুকসহ বিভিন্ন প্রজাতির স্যামনের সংখ্যা ১৯৯০-এর দশক থেকে কমতে শুরু করে। ২০২০-এর দশকে তা রেকর্ড নিম্নস্তরে পৌঁছায়। একসময় স্থানীয় পরিবারগুলো গ্রীষ্মের অল্প কয়েক দিনের মাছ ধরার মধ্য দিয়েই পুরো শীতের খাদ্য সংগ্রহ করতে পারত। এখন সেই নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।
আলাস্কার অভ্যন্তরীণ অঞ্চলে প্রায় ১২ হাজার মানুষ বসবাস করেন, যাঁদের ৮০ শতাংশের বেশি আদিবাসী। ইউকন ও কইউকন নদীর আশপাশে বসবাসকারী প্রায় ২ হাজার ৩০০ কইউকন মানুষের খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাত্রার সঙ্গে স্যামন গভীরভাবে জড়িত। মাছের অভাবে অনেক পরিবারকে ব্যয়বহুল হিমায়িত গরু ও মুরগির মাংস কিনতে হচ্ছে। দুর্গম গ্রামে নৌপথে বা উড়োজাহাজে পণ্য পরিবহনের খরচ বেশি হওয়ায় খাদ্যের দামও বেড়ে যায়। স্থানীয়রা এখনো মুজ, ক্যারিবু ও অন্যান্য বন্য প্রাণী শিকার করে খাদ্যের চাহিদা মেটানোর চেষ্টা করেন।
শুধু মানুষের খাবার নয়, হুস্লিয়ার বিখ্যাত কুকুরের দল চালানোর ক্ষেত্রেও মাছের সংকট প্রভাব ফেলেছে। আগে স্থানীয়রা প্রচুর চাম স্যামন ধরে কুকুরের খাবার হিসেবে ব্যবহার করতেন। এখন বিকল্প খাবার সংগ্রহ করাও ব্যয়সাপেক্ষ।
মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা, সংস্কৃতির ওপর আঘাত
২০২৪ সালে আলাস্কা ও কানাডা ইউকন নদী এবং এর উপনদীগুলোতে চিনুক স্যামন ধরা সাত বছরের জন্য বন্ধ রাখতে সম্মত হয়। মাছটির পূর্ণ জীবনচক্র ধরে সংখ্যা পুনরুদ্ধারের সুযোগ দেওয়াই এই সিদ্ধান্তের লক্ষ্য। অন্যান্য প্রজাতির স্যামন ধরার ক্ষেত্রেও বিধিনিষেধ রয়েছে।
মৎস্যবিজ্ঞানী এরিক শোয়েন এই পরিস্থিতিকে আলাস্কা ও কানাডার আদিবাসীদের জন্য মানবিক সংকট হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তাঁর মতে, ১২ হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে নদী অববাহিকার মানুষের জীবন স্যামনের সঙ্গে যুক্ত। একটি প্রজন্ম যদি সন্তানদের মাছ ধরার কৌশল শেখাতে না পারে, তবে ক্ষতি শুধু খাদ্য বা প্রোটিনের ঘাটতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; হারিয়ে যায় জ্ঞান, পারিবারিক বন্ধন ও সাংস্কৃতিক পরিচয়।
স্থানীয় কর্মী জাজমিন ভেন্টের মতে, এই পরিবর্তন মদ ও মাদকাসক্তি, ডায়াবেটিস এবং আত্মহত্যার মতো সামাজিক ও স্বাস্থ্যগত সমস্যার সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে।
সংকটের পেছনে একাধিক কারণ
বিশেষজ্ঞরা স্যামনের সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে বেরিং সাগরে বাণিজ্যিক মাছ ধরা, খামারে উৎপাদিত মাছের সঙ্গে বুনো স্যামনের খাদ্য নিয়ে প্রতিযোগিতা, সমুদ্র ও নদীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি, উষ্ণ পানির সঙ্গে সম্পর্কিত পরজীবীর আক্রমণ এবং নদীর তলদেশ থেকে খনিজ উত্তোলন।
বেরিং সাগরে পোলক মাছ ধরার সময় জালে অনিচ্ছাকৃতভাবে চিনুক স্যামনও ধরা পড়ে। এই অনিচ্ছাকৃত আহরণ মোট মাছের এক শতাংশেরও কম হলেও শিল্পের বিশাল আকারের কারণে এর প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে স্থানীয়দের আশঙ্কা। তাঁদের প্রশ্ন, সমুদ্রে বাণিজ্যিক জাহাজের জালে হাজার হাজার স্যামন মারা পড়তে পারে, অথচ নদীর পাশে বসবাসকারী পরিবারগুলো নিজেদের ঐতিহ্যগত খাদ্যের জন্য মাছ ধরলে আইনি ঝুঁকিতে পড়বে কেন?
একদল বিজ্ঞানী, আদিবাসী নেতা ও নীতিবিশেষজ্ঞ প্রস্তাব দিয়েছেন, পোলক মাছ ধরার শিল্পের অনুমোদিত অনিচ্ছাকৃত স্যামন আহরণের একটি অংশ কমিয়ে নদীতীরবর্তী গ্রামগুলোর জন্য সীমিত পরিমাণে মাছ ধরার সুযোগ দেওয়া হোক।
নতুন সড়ক নিয়েও উদ্বেগ
২০২৫ সালের অক্টোবরে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আলাস্কার অভ্যন্তরীণ খনিজসমৃদ্ধ অঞ্চলকে ডাল্টন মহাসড়কের সঙ্গে যুক্ত করতে প্রস্তাবিত ৩৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ অ্যাম্বলার সড়ক প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার অনুমোদন দেন। সড়কটি হুস্লিয়ার উত্তরের বন্যপ্রকৃতির মধ্য দিয়ে যাওয়ার কথা। এতে কারিবু হরিণের চলাচলের পথ এবং হাজার হাজার জলধারা অতিক্রম করতে হবে।
পরিবেশবিদ ও স্থানীয় কর্মীদের আশঙ্কা, সড়ক নির্মাণের ধুলা থেকে দূষিত পদার্থ নদীতে মিশতে পারে, সেতু এলাকায় বড় ধরনের দুর্ঘটনায় দূষণ ছড়াতে পারে এবং সড়কের কালভার্টে কাঠ বা পলি জমে স্যামনের চলাচল বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তবে স্থানীয়দের মধ্যে প্রকল্পটি নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কেউ পরিবেশের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন, আবার কেউ কর্মসংস্থান ও পরিবহন ব্যয় কমার সম্ভাবনা দেখছেন।
কিছু আশার লক্ষণও রয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শিফিশের প্রাচুর্য বেড়েছে এবং স্থানীয় জেলেরা বড় আকারের পাইক মাছ ধরেছেন। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা তরুণ স্যামনের আবাসস্থল উন্নয়নে কাজ করছে। ব্রিস্টল উপসাগর থেকে ধরা সকাই স্যামনও উড়োজাহাজে করে এসব গ্রামে পাঠানো হচ্ছে। কিন্তু স্থানীয়দের কাছে তা একসময় নিজের নদী থেকে পাওয়া চিনুক স্যামনের বিকল্প নয়।












