ভারতের স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানির ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ তুলে নিতে আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে ঢাকা। নয়াদিল্লিতে দুই দিনের বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যবিষয়ক যৌথ কর্মদলের ১৬তম বৈঠকে এই দাবি তোলা হয়। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব আয়েশা আক্তারের নেতৃত্বে ১০ সদস্যের প্রতিনিধিদল এতে অংশ নেয়। বাংলাদেশি পাটপণ্য ও প্লাস্টিকের পাতলা ফিল্মের ওপর ভারতের অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক প্রত্যাহারের অনুরোধও জানানো হয়েছে।
সরকারি বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ আরও কয়েকটি বিষয় তুলেছে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পরও দক্ষিণ এশীয় মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আওতায় শুল্কসুবিধা অব্যাহত রাখার দাবি জানানো হয়েছে। পণ্যের মান সমন্বয় এবং ভারতীয় মান ব্যুরোর সনদ প্রক্রিয়া সহজ করার অনুরোধও এসেছে। ভারতের স্থল শুল্ক স্টেশনে অবকাঠামো উন্নয়ন, পণ্য খালাসে দ্রুততা এবং নেপাল ও ভুটানে পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল সহজ করার কথাও বলা হয়েছে। আখাউড়া-আগরতলা সংযোগ, রেল যোগাযোগ ও সীমান্ত হাট নিয়েও আলোচনা হয়েছে।
ভারতও নিজের দাবি তুলেছে। দেশটি কিছু স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে সুতা ও অন্যান্য পণ্য রপ্তানির ওপর থাকা বিধিনিষেধ সরানোর প্রস্তাব দিয়েছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলো থেকে বাংলাদেশে রপ্তানির বাধা কমানো এবং বহুমুখী পরিবহন সংযোগ বাড়ানোর কথাও বলেছে। দুই দেশের ব্যবসায়ী নেতাদের নিয়ে গঠিত প্রধান নির্বাহী ফোরাম সক্রিয় করার প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। দুই পক্ষই একমত হয়েছে যে স্থলবন্দর ও শুল্ক প্রক্রিয়া দক্ষ করে বাণিজ্যের সময় ও খরচ কমাতে হবে। তবে বৈঠকে কোনো বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে, এমন তথ্য বিজ্ঞপ্তিতে নেই।
বৈঠকটি এমন সময়ে হলো, যখন দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। ৯ অক্টোবর কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরায় রাজনৈতিক বিশ্লেষক ফয়সাল মাহমুদের একটি মতামত প্রকাশিত হয়। তাঁর যুক্তি, আম, ইলিশ, জামদানি ও শাড়ির মতো সাংস্কৃতিক কূটনীতি আলাপের পথ খোলা রেখেছে, কিন্তু কঠিন রাজনৈতিক প্রশ্নগুলোর সমাধান দিতে পারেনি। তিনি উল্লেখ করেছেন, ২০২৫ সালের জুলাইয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর জন্য ১ হাজার কেজি হাঁড়িভাঙা আম পাঠানো হয়েছিল। চলতি বছরের এপ্রিলে দিল্লিতে টাঙ্গাইল ও পাবনার ৩০০ তাঁতের শাড়ি ২৪ ঘণ্টায় বিক্রি হয়ে যায়। কিন্তু সীমান্ত ব্যবস্থাপনা, ট্রানজিট, অভিন্ন নদীর পানি আর বাণিজ্য ঘাটতির মতো বিষয় অমীমাংসিতই রয়ে গেছে। ভিসা সেবা স্থগিত হয়ে পরে আবার চালু হলেও ভিসার সংখ্যা ২০২৪ সালের আগের অবস্থায় ফেরেনি বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।
রপ্তানিকারকদের কাছে এই আলোচনার মানে খুব বাস্তব। স্থলপথ বন্ধ থাকলে পণ্য পাঠাতে হয় সমুদ্রবন্দর ঘুরে। তাতে সময় আর খরচ দুটোই বাড়ে, বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি রপ্তানিকারকদের। পাটপণ্যে অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক দেশের পুরোনো একটি শিল্পকে বড় একটি প্রতিবেশী বাজারে পিছিয়ে রেখেছে। দুই পক্ষই নিজের নিজের বিধিনিষেধ তোলার প্রস্তাব দিয়েছে, ফলে একটি পারস্পরিক সমঝোতার সুযোগ টেবিলে আছে। ভারতের সুতা রপ্তানির বাধা সরলে দেশের বস্ত্র ও পোশাক খাতের কাঁচামাল আনাও সহজ হতে পারে। পরের বৈঠকে স্থলবন্দরের তালিকা থেকে অন্তত একটি পণ্যের নাম বাদ পড়ে কি না, সেটিই হবে এই আলোচনার প্রথম পরীক্ষা।












