জাপানের গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান হোন্ডা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে নতুন কৌশল নিতে যাচ্ছে। ২০২৮ সাল নাগাদ মিতসুবিশি মোটরসের তৈরি থাইল্যান্ডে উৎপাদিত ট্রাইটন পিকআপ ট্রাক নিজেদের ব্র্যান্ডের নামে বিক্রি করার পরিকল্পনা করছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রায় তিন দশক পর অন্য একটি গাড়ি নির্মাতার কাছ থেকে গাড়ি নিয়ে নিজেদের ব্র্যান্ডে বিক্রির পথে ফিরছে হোন্ডা।
চীনা গাড়ি নির্মাতাদের ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতার মুখে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। হোন্ডা, নিসান মোটর ও মিতসুবিশি মোটরসের মধ্যে ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা চলছে। নিসানের আংশিক মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান মিতসুবিশি মোটরসের সঙ্গে এই সমঝোতা হোন্ডার গাড়ির সম্ভার বাড়ানোর পাশাপাশি উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করতে পারে।
মিতসুবিশির ট্রাইটন কেন হোন্ডার আগ্রহের কেন্দ্রে
মিতসুবিশি মোটরসের ট্রাইটন একটি শক্তিশালী পিকআপ ট্রাক হিসেবে পরিচিত। ২০২৫ সালে বিশ্ববাজারে মডেলটির বিক্রি ছিল প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার ইউনিট। মইয়ের মতো শক্ত কাঠামোর ওপর যাত্রীকক্ষ বসিয়ে তৈরি এই গাড়ি বেশি মাল বহন, টানার সক্ষমতা এবং দুর্গম পথে চলাচলের উপযোগিতার জন্য পরিচিত।
অন্যদিকে, হোন্ডার পিকআপ গাড়ির কাঠামো মূলত যাত্রীবাহী গাড়ির প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। প্রতিষ্ঠানটি নিজস্বভাবে মই-আকৃতির শক্ত কাঠামোভিত্তিক পিকআপ তৈরি করে না। ফলে মিতসুবিশির তৈরি ট্রাইটন নিজেদের ব্র্যান্ডে বিক্রি করতে পারলে হোন্ডাকে নতুন করে পিকআপের নকশা ও উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে না।
গাড়ির মূল কাঠামো ও প্রযুক্তি অপরিবর্তিত রেখে অন্য প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ডের নামে বিক্রি করার এই পদ্ধতিকে বলা হয় রিব্র্যান্ডিং বা রিব্যাজিং। গাড়ি নির্মাতারা সাধারণত নিজেদের মডেল তালিকায় ঘাটতি পূরণ, নতুন বাজারে প্রবেশ কিংবা উন্নয়ন ব্যয় কমানোর জন্য এ কৌশল ব্যবহার করে।
জাপানের গাড়ি শিল্পে এমন সহযোগিতা নতুন নয়। নিসান ও মিতসুবিশি একে অপরের জন্য গাড়ি সরবরাহ করেছে। টয়োটাও সুজুকি ও নিজের সহযোগী প্রতিষ্ঠান দাইহাৎসুর তৈরি কিছু গাড়ি নিজেদের ব্র্যান্ডে বিক্রি করে। তবে জেনারেল মোটরসের সঙ্গে যৌথভাবে তৈরি গাড়ির বাইরে হোন্ডা সর্বশেষ ১৯৯০-এর দশকে ইসুজু মোটরসের কাছ থেকে একটি স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিকল সংগ্রহ করেছিল।
চীনা গাড়ির চাপে কমছে জাপানি প্রতিষ্ঠানের বাজার
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া দীর্ঘদিন ধরে জাপানি গাড়ি নির্মাতাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাজার। থাইল্যান্ড ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশে কয়েক দশক ধরে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত বাজার হিস্যা প্রায় ৯০ শতাংশ ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই আধিপত্য কমেছে। বর্তমানে এসব বাজারে তাদের সম্মিলিত হিস্যা প্রায় ৭০ থেকে ৮০ শতাংশে নেমে এসেছে।
এর অন্যতম কারণ চীনা গাড়ি নির্মাতাদের দ্রুত অগ্রগতি। বিওয়াইডির মতো প্রতিষ্ঠান বৈদ্যুতিক গাড়ি নিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছে। প্রযুক্তি, নতুন মডেল এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা জাপানি নির্মাতাদের ওপর নতুন চাপ তৈরি করেছে।
হোন্ডার বিক্রির পরিসংখ্যানেও এ চাপের ইঙ্গিত রয়েছে। ২০২৬ সালের প্রথম আট মাসে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় প্রতিষ্ঠানটির মোট গাড়ি বিক্রি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২০ শতাংশ কমে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার ইউনিটে দাঁড়িয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে নতুন গাড়ি তৈরি করতে বিপুল অর্থ ব্যয় না করে অন্য প্রতিষ্ঠানের তৈরি মডেল নিজেদের ব্র্যান্ডে বিক্রি করার সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছে হোন্ডা। বিশেষ করে পিকআপের মতো নির্দিষ্ট শ্রেণির গাড়িতে এ কৌশল কার্যকর হতে পারে।
পিকআপে এখনো চীনা প্রতিযোগিতা তুলনামূলক কম
বৈদ্যুতিক গাড়ির বাজার দ্রুত বাড়লেও পিকআপ ট্রাকের ক্ষেত্রে পরিবর্তন তুলনামূলক ধীর। এ ধরনের গাড়িতে বেশি মাল বহন, ভারী কিছু টেনে নেওয়া এবং কঠিন রাস্তায় চলাচলের সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ। এসব চাহিদা পূরণে শক্তিশালী কাঠামো ও উপযুক্ত প্রযুক্তি দরকার হওয়ায় পিকআপের বৈদ্যুতিক সংস্করণ তৈরি করা যাত্রীবাহী গাড়ির তুলনায় বেশি চ্যালেঞ্জিং।
ফলে পিকআপের বাজারে চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতাদের প্রতিযোগিতা এখনো যাত্রীবাহী গাড়ির মতো তীব্র নয়। হোন্ডা এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে নিজেদের পিকআপের সম্ভার বাড়াতে চায়। মিতসুবিশির বিদ্যমান প্রযুক্তি ও উৎপাদনব্যবস্থা ব্যবহার করতে পারলে নতুন মডেল উন্নয়নের খরচও কমানো সম্ভব হবে।
মিতসুবিশির কারখানাও পাবে সুবিধা
সম্ভাব্য চুক্তি শুধু হোন্ডার জন্য নয়, মিতসুবিশি মোটরসের জন্যও লাভজনক হতে পারে। থাইল্যান্ডে প্রতিষ্ঠানটির একটি কারখানার বার্ষিক উৎপাদনক্ষমতা প্রায় ৩ লাখ ৮৬ হাজার গাড়ি। অথচ ২০২৫ সালে ওই কারখানায় উৎপাদিত গাড়ির সংখ্যা ছিল মাত্র ১ লাখ ৭০ হাজারের কিছু বেশি।
অর্থাৎ, কারখানাটির উল্লেখযোগ্য উৎপাদনক্ষমতা অব্যবহৃত রয়েছে। হোন্ডার জন্য ট্রাইটন তৈরি করতে পারলে কারখানার ব্যবহার বাড়বে এবং উৎপাদনব্যবস্থার দক্ষতা উন্নত করার সুযোগ তৈরি হবে।
নাকানিশি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তাকাকি নাকানিশির মতে, হোন্ডা ও মিতসুবিশি একে অপরের দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারে। হোন্ডা যেখানে নিজস্ব পিকআপ প্রযুক্তির ঘাটতি পূরণ করতে চাইছে, সেখানে মিতসুবিশি নিজেদের উৎপাদনক্ষমতা আরও ভালোভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ পাবে।
ভবিষ্যতে প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়িতেও সহযোগিতা
মিতসুবিশি মোটরস দীর্ঘদিন ধরে দুর্গম পথে চলার উপযোগী গাড়ি এবং প্লাগ-ইন হাইব্রিড প্রযুক্তির উন্নয়নে গুরুত্ব দিয়ে আসছে। প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়িতে ব্যাটারির পাশাপাশি জ্বালানিচালিত ইঞ্জিনও থাকে। বাইরের বিদ্যুৎ উৎস থেকে ব্যাটারি চার্জ করা যায় বলে এ ধরনের গাড়ি স্বল্প দূরত্বে বৈদ্যুতিক শক্তিতে চলতে পারে।
হোন্ডা জাপানে নিজস্বভাবে প্লাগ-ইন হাইব্রিড গাড়ি তৈরি করে না। তাই মিতসুবিশির কাছ থেকে এ ধরনের গাড়ি সংগ্রহের বিষয়টিও বিবেচনা করতে পারে প্রতিষ্ঠানটি। বাস্তবায়িত হলে দুই কোম্পানির সহযোগিতা শুধু পিকআপে সীমাবদ্ধ না থেকে আরও বিস্তৃত হতে পারে।
জাপানি গাড়ি শিল্পে সহযোগিতা বাড়ছে
হোন্ডা, নিসান ও মিতসুবিশির মধ্যে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা একপর্যায়ে স্থবির হয়ে পড়েছিল। তবে চীনা গাড়ি নির্মাতাদের দ্রুত উত্থান জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আবারও একসঙ্গে কাজ করার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
২০২৬ সালের আগস্টে হোন্ডা ও নিসান সফটওয়্যারনির্ভর গাড়ির প্রযুক্তি নিয়ে যৌথভাবে কাজ করার চুক্তিতে পৌঁছায়। এ ধরনের গাড়িতে সফটওয়্যার হালনাগাদের মাধ্যমে বিভিন্ন সুবিধা ও কার্যকারিতা উন্নত করা যায়। আধুনিক গাড়িতে এ প্রযুক্তির গুরুত্ব বাড়ছে, আর তা উন্নয়নে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন হচ্ছে।
দীর্ঘদিন নিজেদের প্রযুক্তি ও পণ্য উন্নয়নে আলাদা পথে চলা হোন্ডার জন্য অন্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত তাই কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, ২০২৮ সালের মধ্যে মিতসুবিশির ট্রাইটন হোন্ডার ব্র্যান্ডে বাজারে আসে কি না এবং এ উদ্যোগ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় জাপানি গাড়ি নির্মাতাদের প্রতিযোগিতায় কতটা প্রভাব ফেলে।












