দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার গাড়ির বাজারে চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতাদের ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা মোকাবিলায় নতুন কৌশল নিয়েছে জাপানের টয়োটা মোটর। থাইল্যান্ডে গাড়ি কেনার জন্য কম মাসিক কিস্তির বিশেষ অর্থায়ন সুবিধা চালু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। এর মাধ্যমে গাড়ির প্রাথমিক আর্থিক চাপ কমিয়ে ক্রেতাদের ধরে রাখা এবং সস্তা চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চাইছে টয়োটা।
জাপানে প্রচলিত এই অর্থায়ন পদ্ধতিতে চুক্তির মেয়াদ শেষে গাড়ির সম্ভাব্য পুনর্বিক্রয়মূল্য আগেই নির্ধারণ করা হয়। ফলে ক্রেতাকে পুরো গাড়ির দাম পরিশোধের পরিবর্তে নির্ধারিত পুনর্বিক্রয়মূল্য বাদ দিয়ে বাকি অর্থ কিস্তিতে দিতে হয়। প্রচলিত গাড়িঋণের তুলনায় এতে মাসিক কিস্তি কম হতে পারে।
কম কিস্তিতে গাড়ি কেনার সুযোগ
‘জানকুরে’ নামে পরিচিত এই পদ্ধতিতে সাধারণত তিন থেকে পাঁচ বছরের চুক্তি করা হয়। চুক্তির শেষে গাড়িটির সম্ভাব্য মূল্যকে অবশিষ্ট মূল্য হিসেবে নির্ধারণ করা থাকে। উদাহরণ হিসেবে, পাঁচ বছরের চুক্তিতে গাড়ির অবশিষ্ট মূল্য ৩০ শতাংশ এবং সুদের হার ৪ শতাংশ হলে প্রচলিত ঋণের তুলনায় মাসিক কিস্তি প্রায় ৩০ শতাংশ কম হতে পারে।
চুক্তির মেয়াদ শেষে ক্রেতার সামনে তিনটি বিকল্প থাকবে—গাড়ি ফেরত দেওয়া, নতুন গাড়ির সঙ্গে বিনিময় করা অথবা নির্ধারিত অবশিষ্ট মূল্য দিয়ে গাড়িটি কিনে নেওয়া।
টয়োটা গত আগস্টে থাইল্যান্ডে এই সুবিধা চালু করে। দেশজুড়ে প্রতিষ্ঠানটির প্রায় সব বিক্রয়কেন্দ্রে এ অর্থায়ন ব্যবস্থা পাওয়া যাচ্ছে। সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার মতো কয়েকটি বাজারে সীমিত পরিসরে একই ধরনের সুবিধা চালু থাকলেও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম গাড়ির বাজার থাইল্যান্ডে এটি টয়োটার প্রথম বড় পরিসরের উদ্যোগ।
চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির বাড়তি প্রতিযোগিতা
প্রায় পাঁচ দশক ধরে থাইল্যান্ডের গাড়ির বাজারে সবচেয়ে বড় অংশীদার টয়োটা। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তুলনামূলক কম দামের চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি বাজারে দ্রুত জায়গা করে নিচ্ছে। সরকারি ভর্তুকি এবং চীনে উৎপাদিত উদ্বৃত্ত গাড়ির সরবরাহ এই প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।
কেপিএমজি কনসাল্টিংয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত থাইল্যান্ডে যাত্রীবাহী গাড়ি বিক্রি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৫ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজারে পৌঁছেছে। এ সময়ে মোট বিক্রির রেকর্ড ৩১ শতাংশ ছিল বৈদ্যুতিক গাড়ি, যা এক বছর আগের তুলনায় প্রায় ১৪ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি।
চীনের বিওয়াইডি ধারাবাহিকভাবে নতুন মডেল বাজারে আনছে। প্রতিষ্ঠানটির অ্যাটো ৩ বৈদ্যুতিক এসইউভির দাম প্রায় ৬ লাখ ৭০ হাজার থাই বাত বা ১৯ হাজার ৯০০ ডলার। বিপরীতে টয়োটার ইয়ারিস ক্রস এসইউভির দাম প্রায় ৮ লাখ ২০ হাজার বাত। অর্থাৎ বিওয়াইডির গাড়িটি প্রায় ২০ শতাংশ সস্তা। ২০২৫ সালে থাইল্যান্ডে গাড়ি বিক্রিতে টয়োটা ও হোন্ডার পর তৃতীয় অবস্থানে ছিল বিওয়াইডি।
জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের তথ্য বলছে, থাইল্যান্ডে নিবন্ধিত গাড়ির বাজারে চীনা নির্মাতাদের অংশ ২০২১ সালের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়ে ২০২৬ সালে ২৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে টয়োটাসহ জাপানি ব্র্যান্ডগুলোর সম্মিলিত অংশ প্রায় ২১ শতাংশীয় পয়েন্ট কমে ৬৪ শতাংশে নেমেছে।
গাড়ি বিক্রির বাইরেও আয় বাড়ানোর লক্ষ্য
টয়োটার নতুন অর্থায়ন কর্মসূচি শুধু বিক্রি বাড়ানোর কৌশল নয়; ব্যবহৃত গাড়ি ও আর্থিক সেবা থেকে আয় বাড়ানোর পরিকল্পনারও অংশ। ২০৩০ অর্থবছরের মধ্যে এসব মূল্যভিত্তিক ব্যবসা থেকে আয় ৪০ শতাংশ বাড়িয়ে ৩ ট্রিলিয়ন ইয়েনে নেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
থাইল্যান্ডে ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহৃত গাড়ি কেনাবেচা প্রচলিত হওয়ায় অনেক সময় গাড়ির ন্যায্য পুনর্বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ কঠিন হয়। চুক্তির শুরুতেই অবশিষ্ট মূল্য নির্ধারণের মাধ্যমে এ বাজারে স্বচ্ছতা বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করছে টয়োটা। পাশাপাশি ব্যবহৃত টয়োটা গাড়ির পুনর্বিক্রয়মূল্য সম্পর্কে ক্রেতাদের আস্থা বাড়লেও ব্র্যান্ডটির প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান শক্তিশালী হতে পারে।
চীনা প্রতিদ্বন্দ্বীদের চাপে অন্য জাপানি নির্মাতারাও থাইল্যান্ডে কৌশল বদলাচ্ছে। সুজুকি ২০২৪ সালে দেশটিতে স্থানীয় উৎপাদন বন্ধের ঘোষণা দিয়ে কারখানাটি ফোর্ডের কাছে বিক্রি করে। হোন্ডা দুটি কারখানার উৎপাদন একীভূত করে সক্ষমতা কমিয়েছে। নিসানও দুটি কারখানার একটিতে উৎপাদন বন্ধ করে অন্যটিতে কার্যক্রম কেন্দ্রীভূত করেছে।
গ্লোবালডেটার পূর্বাভাস অনুযায়ী, থাইল্যান্ডে নতুন গাড়ির বার্ষিক বিক্রি ২০৩৮ সালের মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে ৯ লাখ ৫০ হাজারে পৌঁছাতে পারে। বাজারের এই সম্ভাবনা ধরে রাখতে টয়োটার সামনে এখন বড় চ্যালেঞ্জ—কম দামের চীনা গাড়ির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে ক্রেতাদের আস্থা ও বাজারের অংশীদারত্ব ধরে রাখা।












