মধ্যপ্রাচ্যে জাহাজ চলাচলের ওপর হামলা বেড়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনের গতি কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়েছে। একই সময়ে ডিজেলের তীব্র সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জ্বালানি সরবরাহের চাপ ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা মিলিয়ে তেলের বাজারে অস্থিরতা বাড়ছে।
১০ অক্টোবর প্রকাশিত তেলবাজারবিষয়ক সাপ্তাহিক বিশ্লেষণ ‘অয়েল কনটেক্সট উইকলি’ অনুযায়ী, সপ্তাহজুড়ে ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি প্রায় ২ ডলার বেড়ে ১০৪ ডলারের ওপরে উঠেছে। তবে এই সামান্য নিট বৃদ্ধির আড়ালে সপ্তাহজুড়ে দামের ওঠানামা ছিল প্রায় ১০ ডলার। কূটনৈতিক অগ্রগতির আশা, যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেলের মজুত থেকে সরবরাহ বাড়ানোর আলোচনা, মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে সম্ভাব্য হামলা নিয়ে গুঞ্জন এবং ট্রাম্পের হামলা না চালানোর প্রতিশ্রুতি—সব মিলিয়ে বাজার বারবার দিক পরিবর্তন করেছে।
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কমছে
বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে তেল পরিবহনের প্রবাহ কিছুটা বেড়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে জাহাজে হামলার মাত্রা বাড়ায় সেই অগ্রগতিতে ছেদ পড়েছে। বিশ্লেষণটির মতে, যুদ্ধ শুরুর পর ইরানের জাহাজ চলাচলে হামলার তীব্রতা এখন সবচেয়ে বেশি পর্যায়ে পৌঁছেছে।
জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে শুধু সরবরাহের পরিমাণই নয়, পরিবহন ব্যয়ও বাড়ে। তেলবাজারে বর্তমানে ট্যাংকারের ভাড়া দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট বা ডব্লিউটিআই তেলের বাজার ব্রেন্ট ও দুবাই তেলের তুলনায় দুর্বল হয়ে পড়েছে। বাজারে নিকটবর্তী সময়ে সরবরাহের সংকট থাকলেও বিভিন্ন অঞ্চলে দাম ও সরবরাহ পরিস্থিতির পার্থক্য স্পষ্ট হচ্ছে।
ডিজেল সংকটে চাপে হোয়াইট হাউস
অপরিশোধিত তেলের পাশাপাশি পরিশোধিত জ্বালানির বাজারেও চাপ বাড়ছে। বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ডিজেলের সরবরাহসংকট বিশেষভাবে তীব্র। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন সংকট মোকাবিলায় বিভিন্ন পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর মধ্যে সাধারণত কৃষিকাজের বাইরে নির্দিষ্ট যন্ত্রপাতিতে ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত রঙিন ডিজেলের ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার উদ্যোগ রয়েছে।
রাশিয়ার সঙ্গে ডিজেল সরবরাহসংক্রান্ত সমঝোতা জ্বালানির দাম কমানোর রাজনৈতিক চাপের মধ্যেই এসেছে। তবে বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, রাশিয়ার শোধনাগারগুলো স্বাভাবিক অবস্থায় থাকলে যে পরিমাণ ডিজেল রপ্তানি করে, নতুন ব্যবস্থায় সরবরাহ তার তুলনায় কম হতে পারে। ফলে এই সিদ্ধান্তে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানির দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।
মজুত ও বাজারের লেনদেনে মিশ্র চিত্র
যুক্তরাষ্ট্রে অপরিশোধিত তেলের মজুত আবার কমতে শুরু করেছে। ইউরোপের আমস্টারডাম-রটারডাম-অ্যান্টওয়ার্প অঞ্চলেও মজুত উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। এতে সাম্প্রতিক মজুত বৃদ্ধির বড় অংশ মুছে গেছে এবং মজুতের পরিমাণ মৌসুমি সীমার নিচের দিকে নেমে এসেছে।
অন্যদিকে, তেলের ভবিষ্যৎ সরবরাহের চুক্তিতে ব্রেন্ট ও দুবাইয়ের দাম তুলনামূলক শক্তিশালী থাকলেও ডব্লিউটিআইয়ের নিকটবর্তী সরবরাহের মূল্যভিত্তিক সুবিধা গত দুই মাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে। বাজারের এই পার্থক্যের পেছনে ট্যাংকার ভাড়া বৃদ্ধি এবং যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত তেলের মজুতসংক্রান্ত কিছু প্রভাব রয়েছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাজারের আরেকটি লক্ষণীয় দিক হলো, তেলের দামের ভবিষ্যৎ দিক নিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমছে। গত সপ্তাহে বড় বিনিয়োগকারীরা তেলে তাঁদের ক্রয় ও বিক্রয়—দুই ধরনের অবস্থানই কমিয়েছেন। এতে বোঝা যাচ্ছে, বাজারের ভবিষ্যৎ গতিপথ নিয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত নেওয়া কঠিন হয়ে উঠেছে।
চীনের রপ্তানিও গুরুত্বপূর্ণ
মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ পরিস্থিতির পাশাপাশি চীনের পরিশোধিত জ্বালানি রপ্তানিও বাজারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। জ্বালানি পরিবহন ব্যাহত হওয়া, ডিজেলের সংকট এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সম্মিলিত প্রভাব আগামী দিনগুলোতে তেলের দাম ও সরবরাহের গতিপথ নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজারের প্রধান অনিশ্চয়তা শুধু তেলের উৎপাদন নয়; বরং নিরাপদে পরিবহন, পরিশোধিত জ্বালানির প্রাপ্যতা এবং বড় অর্থনীতিগুলোর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত। হরমুজ প্রণালিতে হামলা অব্যাহত থাকলে সরবরাহের চাপ আরও বাড়তে পারে, আর ডিজেল সংকট মোকাবিলায় নেওয়া পদক্ষেপের কার্যকারিতাও নির্ভর করবে বাস্তবে কতটা জ্বালানি বাজারে পৌঁছায় তার ওপর।












