ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের হামলায় সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন ৩০৯ জন। শনিবারের এই হামলায় নিহতদের মধ্যে দুই বাংলাদেশিও রয়েছেন। ইরান-সমর্থিত হুথি গোষ্ঠী সৌদি আরবের বিরুদ্ধে তাদের হামলা জোরদার করার মধ্যে এ ঘটনা ঘটল।
চলতি সপ্তাহে এটি ছিল রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তৃতীয় হামলা। এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র সৌদি আরবের ওপর এটিকে অন্যতম প্রাণঘাতী হামলা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ রোববার জানায়, নিহত ১২ জনের মধ্যে চারজন সৌদি নাগরিক। এ ছাড়া বাংলাদেশ, যুক্তরাষ্ট্র, মিসর, জর্ডান, সিরিয়া, ফিলিস্তিন ও সুদানের একজন করে এবং আরও একজন বাংলাদেশিসহ মোট দুই বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন। হামলায় আহত হয়েছেন ৩০৯ জন।
বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ, সব ফ্লাইট অন্যত্র সরানো

হামলার সময় বিমানবন্দরে থাকা এক যাত্রী বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে জানান, তিনি বাইরে আকাশে একটি বস্তুকে উড়ে যেতে দেখেন। এর কিছুক্ষণ পরই যাত্রা শুরুর একটি ফটকের কাছে ছাদের অংশ ধসে পড়ে। আরেক যাত্রী জানান, বিস্ফোরণের শব্দ শোনার পর তিনি মাটিতে বেশ কয়েকজনকে আহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন।
হামলার পর রিয়াদের সব ফ্লাইট অন্য বিমানবন্দরে সরিয়ে নেওয়া হয়। সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয় বিমানবন্দরের কার্যক্রম। প্রায় ৮০ লাখ মানুষের বসবাসের এই রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ বিমান যোগাযোগব্যবস্থা বিঘ্নিত হওয়ায় যাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, স্পেন ও কানাডাসহ কয়েকটি দেশ তাদের নাগরিকদের রিয়াদ বিমানবন্দর ব্যবহার না করার বিষয়ে সতর্ক করেছে।
হামলায় গুরুতর আহত ব্যক্তিদের অ্যাম্বুলেন্স ও হেলিকপ্টারে করে হাসপাতালে নেওয়া হয়। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে।
বিমানবন্দর বন্ধের দাবি হুথিদের
সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন যৌথ বাহিনীর কমান্ড হামলার জন্য হুথিদের দায়ী করেছে। হামলায় বিমানবন্দরের যাত্রী টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং যাত্রী ও বিমানবন্দরের কর্মীদের প্রাণহানি ঘটেছে।
হামলার পর হুথিদের গণমাধ্যম কার্যালয়ের প্রধান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে দাবি করেন, গোষ্ঠীটি রিয়াদ বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সৌদি আকাশসীমা ব্যবহার না করার জন্য বিমান সংস্থাগুলোকেও সতর্ক করেছে হুথিরা। ইয়েমেনে সোমবার থেকে তাদের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযান শুরু হওয়ার পর সৌদি আকাশসীমাকে সামরিক অভিযানের এলাকা বলেও ঘোষণা করেছে গোষ্ঠীটি।
চলতি সপ্তাহে বিমানবন্দরে এর আগের দুটি হামলায় চারজন নিহত হয়েছিলেন। ওই হামলাগুলোতে সৌদি আরবের একটি বাণিজ্যিক বিমানও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে বলে রয়টার্স জানিয়েছে।
সৌদি আরবের পাশে দাঁড়াবে কি যুক্তরাষ্ট্র?

হামলার পর সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে কথা বলার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
শনিবার জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ট্রাম্প বলেন, তিনি ঘটনাটিকে ভয়াবহ বলে মনে করেন।
হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের সামরিক অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র অংশ নেবে কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, তারা বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন। তাঁর ভাষায়, সাম্প্রতিক হামলার খবর তারা মাত্রই পেয়েছেন এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও নিশ্চিত করেছেন, নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে একজন মার্কিন নাগরিক রয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেন, এটি নিরীহ বেসামরিক মানুষের জীবনের প্রতি চরম অবজ্ঞার পরিচয় দেয়।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসও হামলার নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বেসামরিক মানুষ ও বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর হামলা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন।

ইয়েমেনের সংঘাত আবার তীব্র হচ্ছে
ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ চলতি গ্রীষ্মে আবারও জোরালো হয়ে ওঠে। গত মাসে সংঘাতের তীব্রতা আরও বেড়েছে। কয়েক বছর ধরে তুলনামূলক শান্ত পরিস্থিতি বজায় থাকার পর দেশটিতে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রায় ১১ বছর ধরে সৌদি আরব সামরিক শক্তি ও কূটনৈতিক তৎপরতার মাধ্যমে নিজেদের দক্ষিণ সীমান্তসংলগ্ন এই সংঘাত নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করছে। প্রথমদিকে হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে জড়ালেও পরে তাদের সঙ্গে শান্তি আলোচনা শুরু করে রিয়াদ। একই সঙ্গে হুথিদের প্রধান সমর্থক ইরানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের উদ্যোগও নেয় সৌদি আরব।
তবে এসব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও ইয়েমেনের সংঘাত সৌদি আরবের জন্য নতুন নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করেছে বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
গত বছরের শেষ দিকে ইয়েমেনের একটি প্রতিদ্বন্দ্বী সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমর্থন দেওয়াকে কেন্দ্র করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সৌদি আরবের দীর্ঘদিনের অংশীদারত্বে টানাপোড়েন দেখা দেয়। পাশাপাশি প্রয়োজনের সময় ট্রাম্প প্রশাসন সৌদি আরবকে কতটা সমর্থন দেবে, সে বিষয়ে রিয়াদের হিসাবেও ভুল ছিল বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। হুথিদের বিরুদ্ধে লড়াইরত বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীকে সমন্বিত করতেও সৌদি আরবকে সমস্যায় পড়তে হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে ইয়েমেনে নিজেদের মিত্রদের সহায়তা দিয়ে আবারও হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযান জোরদার করছে রিয়াদ। ‘ইয়েমেনস ডন’ বা ‘ইয়েমেনের ভোর’ নামের এই অভিযানের লক্ষ্য হুথিদের সামরিক শক্তি মোকাবিলা করা।
রিয়াদ বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলা সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। একই সঙ্গে ইয়েমেনের সংঘাত আরও বিস্তৃত হলে তা আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।












