মোবাইল ফোন আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন দেশের কিশোরীদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ। পড়াশোনা, বন্ধুত্ব আর বিনোদনের অনেকটাই চলে পর্দায়। কিন্তু সেই পর্দা থেকে আসা হয়রানি তাদের মনে কতটা গভীর ক্ষত তৈরি করছে, তার একটি হিসাব দিয়েছে নতুন এক গবেষণা। আইসিডিডিআরবির মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য বিভাগ এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগের গবেষকেরা এটি করেছেন। তাঁরা দেখেছেন, অনলাইনে হয়রানির শিকার কিশোরীদের মধ্যে গুরুতর বিষণ্নতার হার অন্যদের তুলনায় প্রায় চার গুণ। আজ বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসে তথ্যটি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
গবেষণাটি করা হয়েছে বাংলাদেশ কিশোর-কিশোরী স্বাস্থ্য ও কল্যাণ জরিপ ২০১৯-২০ এর তথ্য ব্যবহার করে। এতে দেশের সব অঞ্চলের প্রতিনিধিত্বকারী ৪ হাজার ৯৮৪ জন কিশোরী অংশ নেয়। তাদের ৮ শতাংশ জানিয়েছে, আগের এক বছরে তারা অনলাইনে হয়রানির শিকার হয়েছে। পুরো দলের মধ্যে গুরুতর বিষণ্নতায় ভুগছিল ১২ শতাংশ। কিন্তু যারা হয়রানির শিকার হয়েছে, তাদের মধ্যে এই হার ৩১ শতাংশ। হয়রানি যত বেশিবার হয়েছে, ঝুঁকিও তত বেড়েছে। এক বা দুবার হয়রানির শিকারদের মধ্যে বিষণ্নতার হার ছিল ২৩ দশমিক ২ শতাংশ। পাঁচবার বা তার বেশি হয়রানির শিকারদের মধ্যে তা ৩৮ দশমিক ২ শতাংশে পৌঁছেছে। বয়স, শিক্ষা, বৈবাহিক অবস্থা, আর্থিক অবস্থা ও ফেসবুক ব্যবহারের মতো বিষয় হিসাবে নেওয়ার পরও সম্পর্কটি স্পষ্ট থেকেছে। গবেষণাটি ২০২৫ সালের আগস্টে আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থা স্প্রিংগার নেচারে প্রকাশিত হয়।
অঞ্চলভেদে চিত্রও আলাদা। বরিশালে অনলাইনে হয়রানির হার সবচেয়ে বেশি, ১২ দশমিক ৯ শতাংশ। এরপর রংপুরে ১০ দশমিক ৭ এবং ময়মনসিংহে ৯ দশমিক ৬ শতাংশ। সিলেটে এই হার সবচেয়ে কম, ৩ দশমিক ৭ শতাংশ। হয়রানিকারী কারা, সেই তথ্যও উদ্বেগজনক। দুই ক্ষেত্রেই সবচেয়ে বেশি এসেছে অপরিচিত মানুষের কাছ থেকে। অবিবাহিত কিশোরীদের ক্ষেত্রে বন্ধু বা সহপাঠীর নামও এসেছে বারবার। বিবাহিত বা আগে বিবাহিত কিশোরীদের ৬ দশমিক ৬ শতাংশ জানিয়েছে, তারা স্বামী বা শ্বশুরবাড়ির লোকজনের কাছ থেকে অনলাইনে হয়রানির শিকার হয়েছে। অর্থাৎ ঝুঁকি শুধু অচেনা জগৎ থেকে আসে না, আসে ঘরের ভেতর থেকেও।
অভিভাবকদের জন্য এই গবেষণার বার্তা স্পষ্ট। ফোন কেড়ে নেওয়া সমাধান নয়, তাতে সন্তান আরও চুপ হয়ে যেতে পারে। বরং সে অনলাইনে কী দেখছে, কার সঙ্গে কথা বলছে, তা নিয়ে সহজ আলাপের সম্পর্ক গড়ে তোলা জরুরি। হঠাৎ চুপ হয়ে যাওয়া, ফোন দেখলেই অস্বস্তি, ঘুম কমে যাওয়া বা স্কুলে যেতে না চাওয়া হতে পারে সতর্কসংকেত। হয়রানির প্রমাণ হিসেবে বার্তা ও ছবির স্ক্রিনশট রেখে দেওয়া উচিত। প্রয়োজনে পুলিশের সাইবার সহায়তা সেবায় অভিযোগ করা যায়। মন খারাপ দীর্ঘ হলে মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে দেরি করা ঠিক নয়। কেউ তাৎক্ষণিক বিপদে থাকলে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করতে হবে।
গবেষণার তথ্য সংগ্রহ হয়েছিল পাঁচ বছরের বেশি আগে। এর মধ্যে দেশে স্মার্টফোন আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার আরও বেড়েছে। তাই আজকের প্রকৃত চিত্র এর চেয়ে ভালো হওয়ার সম্ভাবনা কম। স্কুলের পাঠ্যক্রমে ডিজিটাল নিরাপত্তা আর মানসিক স্বাস্থ্যকে একসঙ্গে জায়গা দেওয়ার প্রয়োজন তাই আরও জোরালো হয়েছে। পাঁচবার বা তার বেশি হয়রানির শিকার কিশোরীদের প্রতি পাঁচজনে প্রায় দুজন যে গুরুতর বিষণ্নতায় ভুগছে, সেই সংখ্যাই বলে দেয় প্রথম অভিযোগটি গুরুত্ব দিয়ে শোনা কতটা জরুরি।












