চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত্যু ৩০০ ছাড়িয়েছে। এমন সময়ে চিকিৎসকদের একটি অংশ ডেঙ্গুর টিকা দেশে আনার জোরালো দাবি তুলেছেন। আলোচনার কেন্দ্রে আছে জাপানের ওষুধ প্রতিষ্ঠান তাকেদার তৈরি টিকা কিউডেঙ্গা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা টিকাটিকে মানসম্মত হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। ভারতসহ ৪৩টি দেশে এটি অনুমোদন পেয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই তালিকাভুক্তির অর্থ, সংস্থাটি টিকার মান, নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা যাচাই করেছে। জাতিসংঘের সংস্থাগুলো সাধারণত এমন তালিকাভুক্ত টিকাই কেনে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো অনুমোদন দেওয়া হয়নি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যেসব এলাকায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ বেশি, সেখানে ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সী শিশুদের এই টিকা দেওয়ার সুপারিশ করেছে। টিকাটি দুই ডোজের, তিন মাসের ব্যবধানে দিতে হয়। অধ্যাপক ফজলে রাব্বী চৌধুরী বড় পরিসরের ক্লিনিক্যাল পরীক্ষার ফলাফল উল্লেখ করে বলেছেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে এর কার্যকারিতা ৮০ শতাংশের বেশি। হাসপাতালে ভর্তির ঝুঁকি কমায় প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত। তিনি চান, দেশে অনুমোদনের পর্যালোচনা এখনই শুরু হোক। অধ্যাপক তাজুল ইসলাম এ বারী আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, স্থানীয় পরীক্ষা ছাড়াই বেসরকারিভাবে টিকা আমদানির সুযোগ দেওয়া উচিত। জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানও সরকার না কিনলে বেসরকারিভাবে আমদানির সুযোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
সরকার এখনো সতর্ক অবস্থানে, আর এর পেছনে যুক্তিও আছে। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী এম এ মুহিত বলেছেন, সরকার তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে চায়। তাঁর ভাষায়, টিকা আছে, তবে সেগুলো এখনো উন্নয়নের বিভিন্ন পর্যায়ে থাকা সম্ভাব্য টিকা। দামও একটি প্রশ্ন। ভারতে দুই ডোজের দাম ৬ হাজার থেকে ১২ হাজার রুপির মধ্যে হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দেশটিতে আগামী বছরের প্রথমার্ধে বাণিজ্যিকভাবে টিকাটি বাজারে আসার কথা। বাংলাদেশে বেসরকারিভাবে এলে দাম কত হবে এবং কারা কিনতে পারবেন, সেই প্রশ্নও উঠবে।
টিকা নিয়ে কয়েকটি বিষয় পরিষ্কার থাকা দরকার। প্রথমত, এটি ডেঙ্গুর ঝুঁকি কমায়, পুরোপুরি দূর করে না। তাই টিকা এলেও মশা নিয়ন্ত্রণ আর জমা পানি পরিষ্কারের কাজ চালিয়ে যেতে হবে। দ্বিতীয়ত, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশ নির্দিষ্ট বয়সের জন্য এবং বেশি সংক্রমণের এলাকার জন্য। সবার জন্য একই পরামর্শ নয়। তৃতীয়ত, দুই ডোজের মাঝে তিন মাসের ব্যবধান থাকায় এবারের মৌসুমে টিকা এলেও পূর্ণ সুরক্ষা পেতে সময় লাগবে। ফলে অনুমোদনের সিদ্ধান্ত এখন নিলে তার সুফল মিলবে মূলত আগামী বছরের বর্ষায়। চতুর্থত, অনুমোদনের আগে দেশের ওষুধ নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষকে টিকার নিরাপত্তা ও কার্যকারিতার তথ্য পর্যালোচনা করতে হবে। চিকিৎসকেরা সেই পর্যালোচনাই দ্রুত শুরু করার দাবি জানাচ্ছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে চলতি বছর ডেঙ্গু নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯৯ হাজার ২৭৫ জন। মারা গেছেন ৩০৩ জন। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টার হিসাবে মারা গেছেন চারজন, ভর্তি হয়েছেন ২ হাজার ১৯৩ জন, যা এ বছরের সর্বোচ্চ। এই সংখ্যা প্রতিবছর ফিরে আসা একটি সংকটের ছবি। সরকার যদি তথ্যপ্রমাণ চায়, তাহলে স্থানীয় পর্যালোচনা শুরু করাই প্রথম পদক্ষেপ। কারণ পর্যালোচনা শুরু না হলে আগামী মৌসুমেও আলোচনা আজকের জায়গাতেই আটকে থাকবে।












