সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের মধ্যে নতুন করে তীব্র হয়ে ওঠা সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এমন এক সংকট তৈরি করেছে, যার প্রভাব যুক্তরাষ্ট্র–ইরান যুদ্ধের বাইরেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১২ জন নিহত এবং ৩০৯ জন আহত হওয়ার ঘটনা উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে নতুন করে নাড়িয়ে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর ওপর এটিই ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা বলে উল্লেখ করেছে দ্য ম্যানিলা টাইমসের সম্পাদকীয়।
এই হামলার তাৎপর্য শুধু হতাহত কিংবা সৌদি আরবের নিরাপত্তাব্যবস্থার দুর্বলতায় সীমাবদ্ধ নয়। এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হচ্ছে, মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘদিনের সংঘাতগুলো এখন আরও গভীরভাবে পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ, ইরানের আঞ্চলিক প্রভাব, লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা এবং ওয়াশিংটনের সামরিক ভূমিকা, সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে।
যুদ্ধবিরতি ছিল, স্থায়ী সমাধান আসেনি
সৌদি আরব ও হুথিদের বিরোধের শিকড় ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ অস্থিতিশীলতা, সাম্প্রদায়িক ও গোত্রীয় বিভাজন এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিস্তৃত। উত্তর ইয়েমেনের সংখ্যালঘু শিয়া সম্প্রদায়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা হুথি আন্দোলন ২০১৪ সালে সরকারবিরোধী শক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়ে রাজধানী সানা দখল করে। ইরানের সঙ্গে হুথিদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক সৌদি নেতৃত্বের উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে দেয়।

২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে কয়েকটি আরব দেশ হুথিদের রাজধানী থেকে হটিয়ে সৌদি-সমর্থিত সরকারকে পুনর্বহালের লক্ষ্যে সামরিক অভিযান শুরু করে। অন্যদিকে, ইরান হুথিদের অস্ত্রসহ বিভিন্ন ধরনের সহায়তা দিয়ে পাশে দাঁড়ায়। ফলে ইয়েমেনের সংঘাত ক্রমে বৃহত্তর আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হয়ে ওঠে।
২০২২ সালের এপ্রিলে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় দুই পক্ষের মধ্যে দুই মাসের যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। পরে তা দুই দফা বাড়ানো হলেও সাত মাস পর মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। এরপর থেকে ইয়েমেনে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ ও স্থায়ী শান্তির মাঝামাঝি এক অস্থিতিশীল পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। ওমানের মধ্যস্থতায় পর্দার আড়ালে আলোচনা চললেও সংঘাতের মূল কারণগুলোর নিষ্পত্তি হয়নি।
এই অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, সাময়িক যুদ্ধবিরতি সহিংসতা কমাতে পারে, কিন্তু রাজনৈতিক সমঝোতার বিকল্প হতে পারে না। প্রতিপক্ষের নিরাপত্তা-উদ্বেগ, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা এবং ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা নিয়ে মতবিরোধ অমীমাংসিত থাকলে সংঘাত আবারও মাথাচাড়া দেওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।
লোহিত সাগর থেকে সৌদি ভূখণ্ডে সংঘাতের বিস্তার
২০২৩ সালে হুথিরা লোহিত সাগর দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা শুরু করলে সংঘাতের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। গোষ্ঠীটি এসব হামলাকে ইসরায়েলের আক্রমণের মুখে থাকা হামাস ও হিজবুল্লাহর প্রতি সংহতি প্রকাশের পদক্ষেপ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছিল। এতে ইয়েমেনের সংঘাত আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়ে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ পূর্ণমাত্রায় ছড়িয়ে পড়ার পর হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা সৌদি লক্ষ্যবস্তুর দিকে আরও তীব্র হয়। জবাবে সৌদি আরব সানা ও আশপাশের এলাকায় হুথিদের সামরিক ঘাঁটি এবং অস্ত্রের গুদামে বিমান হামলা চালায়। ফলে আগের অচলাবস্থা ভেঙে আবারও সরাসরি সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
এ পরিস্থিতি সৌদি আরবের জন্য দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে নিজেদের ভূখণ্ড ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষা করতে হচ্ছে; অন্যদিকে এমন এক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে, যার বিস্তার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে আরও বড় ধাক্কা দিতে পারে।

ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতার সীমা
সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তাকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সামরিক হস্তক্ষেপের আহ্বানে কতটা সাড়া দেবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
এর একটি সম্ভাব্য কারণ যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব রাজনৈতিক হিসাব। ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ চলতে থাকা রিপাবলিকান প্রার্থীদের জন্য রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। আরেকটি বিষয় হলো, ২০২৫ সালে হুথি নেতৃত্ব লোহিত সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজে হামলা না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল বলে সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করা হয়েছে। এই প্রতিশ্রুতিও ওয়াশিংটনের হিসাবকে প্রভাবিত করতে পারে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের অনাগ্রহের সম্ভাব্য কারণ যা-ই হোক, সৌদি আরবের জন্য মূল প্রশ্নটি আরও গভীর: মার্কিন সামরিক শক্তির ওপর দীর্ঘদিনের নির্ভরতা কি দেশটির নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট? ইরান ও হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ঠেকাতে বিদ্যমান প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরি সফল হয়নি। ফলে রিয়াদকে সামরিক প্রতিরোধের পাশাপাশি কূটনৈতিক বিকল্পও জোরদার করতে হচ্ছে।
আলোচনার পথ কি আবার খুলবে?
সৌদি আরবের হাতে কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার সুযোগ এখনো রয়েছে। উপসাগরীয় দেশগুলোকে নিয়ে ইরানের সঙ্গে যৌথ আলোচনার উদ্যোগে রিয়াদ ভূমিকা রাখতে পারে। ওমান ও কাতার তেহরানের সঙ্গে যোগাযোগের পথ বজায় রেখেছে; এসব যোগাযোগ বৃহত্তর আলোচনার ক্ষেত্র তৈরিতে সহায়ক হতে পারে।
২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের চুক্তি হয়েছিল। সে সময় উদ্যোগটিকে আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু ইরান গোপনে হুথিদের অস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে, সৌদি আরবের এমন অভিযোগের প্রেক্ষাপটে সমঝোতার স্থায়িত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়।
বর্তমান সংকটে ইরান নিজেই সৌদি আরব ও হুথিদের আলোচনার টেবিলে আনার প্রস্তাব দিয়েছে। তবে তেহরানের শর্ত, ইয়েমেনের ওপর সৌদি আরবের আকাশ ও নৌ অবরোধ আগে তুলে নিতে হবে। সৌদি আরবের অবস্থান হলো, হুথিদের লোহিত সাগর উপকূলের নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে হবে এবং সৌদি বিমানবন্দরে হামলা বন্ধ করতে হবে। এই পরস্পরবিরোধী শর্তই আলোচনার সবচেয়ে বড় বাধা।
অর্থাৎ, আলোচনার সম্ভাবনা থাকলেও দুই পক্ষের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত দাবিগুলো এমন পর্যায়ে রয়েছে যে, কোনো পক্ষই সহজে ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়। সমঝোতার জন্য প্রয়োজন এমন একটি কাঠামো, যেখানে হামলা বন্ধ, অবরোধ প্রত্যাহার এবং ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রশ্নগুলোকে একই আলোচনার আওতায় আনা যায়।

নতুন নিরাপত্তা জোটের তাৎপর্য
এই অচলাবস্থার মধ্যে সৌদি আরব তুরস্ক ও পাকিস্তানকে নিয়ে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির আওতায় একটি সম্মিলিত আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে বলে সম্পাদকীয়তে উল্লেখ করা হয়েছে। ন্যাটোর পঞ্চম অনুচ্ছেদের আদলে তৈরি এই ব্যবস্থার মূল ধারণা হলো, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।
এ ধরনের চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের প্রচলিত নিরাপত্তা-সমীকরণে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে। এত দিন সৌদি আরবের নিরাপত্তা পরিকল্পনায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখন তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো আঞ্চলিক শক্তিকে যুক্ত করে বিকল্প প্রতিরক্ষাকাঠামো তৈরির প্রচেষ্টা ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরতা কমানোর একটি পথ হতে পারে।
তবে নতুন জোট গঠন করলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না। এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে সদস্যদের রাজনৈতিক অগ্রাধিকার, পারস্পরিক আস্থা এবং বাস্তবে যৌথ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা কতটা কার্যকর করা যায়, তার ওপর। একই সঙ্গে এ ধরনের জোট আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা কমাবে, নাকি নতুন শক্তির মেরুকরণ তৈরি করবে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
সৌদি আরব ও হুথিদের সংঘাত তাই শুধু ইয়েমেনের যুদ্ধের নতুন অধ্যায় নয়। এটি এমন এক আঞ্চলিক ব্যবস্থার সংকট, যেখানে সামরিক শক্তি দিয়ে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখা সম্ভব হলেও স্থায়ী নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে অনিশ্চয়তা, ইরানের সঙ্গে অবিশ্বাস এবং লোহিত সাগরের নিরাপত্তা-ঝুঁকি সৌদি আরবকে নতুন কৌশল খুঁজতে বাধ্য করছে।
মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে হলে কেবল সামরিক পাল্টা হামলা কিংবা নতুন প্রতিরক্ষা জোটের ওপর নির্ভর করা যথেষ্ট হবে না। প্রয়োজন এমন রাজনৈতিক সমঝোতা, যা সৌদি আরবের নিরাপত্তা-উদ্বেগ, হুথিদের অবস্থান এবং ইয়েমেনের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎকে একই কাঠামোয় বিবেচনা করবে। অন্যথায়, অঞ্চলটি যুদ্ধ ও শান্তির মাঝামাঝি এমন এক অচলাবস্থায় আটকে থাকবে, যেখানে সংঘাত থামলেও তার পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা কখনোই দূর হবে না।












