যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ এখন আর নিছক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া নয়। কংগ্রেসে আসন বাড়ানো কিংবা প্রতিপক্ষের শক্তি কমানোর কৌশল হিসেবে এটি দলীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হয়ে উঠেছে। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—দুই দলই নিজেদের সুবিধামতো নির্বাচনী মানচিত্র সাজাতে ব্যস্ত। কিন্তু এই কৌশলের একটি মৌলিক ঝুঁকি আছে: প্রতিপক্ষকে দুর্বল করতে গিয়ে নিজের ভোটের শক্তি এমনভাবে ছড়িয়ে দেওয়া, যাতে শেষ পর্যন্ত সুবিধা পেয়ে যায় প্রতিপক্ষই।
রাজনৈতিক বিজ্ঞানীরা প্রায় দুই দশক আগে এই আত্মঘাতী কৌশলের একটি নাম দিয়েছিলেন—‘ডামিম্যান্ডার’। এটি এমন এক ধরনের নির্বাচনী সীমানা পুনর্বিন্যাস, যা প্রথমে কোনো দলকে সুবিধা দিলেও সময়ের সঙ্গে উল্টো প্রতিদ্বন্দ্বী দলের পক্ষে কাজ করতে শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রের আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন সেই ঝুঁকি নতুন করে সামনে এনেছে। বিশেষ করে রিপাবলিকানদের সাম্প্রতিক মানচিত্র পরিবর্তন কতটা কার্যকর হয়েছে, তা যাচাইয়ের পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে এই নির্বাচন।
সীমানা বদলের কৌশল যখন নিজের বিরুদ্ধেই যায়
১৯৯০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাটরা নিজেদের নির্বাচনী অবস্থান ধরে রাখতে নতুনভাবে কংগ্রেসনাল আসনের সীমানা নির্ধারণ করেছিল। তখন ওই অঞ্চলে ভোটারদের রাজনৈতিক ঝোঁক ধীরে ধীরে রিপাবলিকানদের দিকে সরে যাচ্ছিল। ডেমোক্র্যাটদের লক্ষ্য ছিল, নিজেদের অবশিষ্ট ভোটের শক্তি বিভিন্ন আসনে ছড়িয়ে দিয়ে যত বেশি সম্ভব আসন ধরে রাখা।
কিন্তু ভোটের শক্তি অতিরিক্ত ছড়িয়ে দেওয়ার ফলে তাদের কৌশল উল্টো ফল দেয়। একটি আসনে বিপুল ব্যবধানে জেতার মতো ভোট অন্য আসনে ছড়িয়ে পড়লে সামগ্রিকভাবে বেশি আসন জেতার সুযোগ কমে যায়। রাজনৈতিক বিজ্ঞানী বার্নার্ড গ্রফম্যান ও থমাস ব্রুনেল এই সমস্যাকে লাইফবোটের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন: ধারণক্ষমতার বেশি মানুষ তুললে নৌকাটি ডুবে যেতে পারে, কিংবা ভারসাম্য হারিয়ে যাত্রীদেরই পানিতে ফেলে দিতে পারে।

১৯৯২ সালের নির্বাচনে অবশ্য ডেমোক্র্যাটদের পরিকল্পনা প্রথমে সফল মনে হয়েছিল। নর্থ ক্যারোলাইনা, সাউথ ক্যারোলাইনা ও জর্জিয়ায় দলটি ২৯টি আসনের মধ্যে ১৮টিতে জয় পেয়েছিল। কিন্তু দুই বছর পর পরিস্থিতি পাল্টে যায়। প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের প্রথম মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বড় উত্থান ঘটে। নিউট গিংরিচের নেতৃত্বে দলটি কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নেয়, আর ডেমোক্র্যাটদের ওই ১৮টি আসন কমে দাঁড়ায় ১০টিতে।
সাম্প্রতিক মানচিত্র পরিবর্তনের ঝুঁকি
এবারের পরিস্থিতি কিছুটা আলাদা। যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণত প্রতি দশ বছর পর আদমশুমারির ভিত্তিতে কংগ্রেসনাল আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু ২০২৫ ও ২০২৬ সালে যে পরিবর্তনগুলো হয়েছে, সেগুলো দশকভিত্তিক নিয়মিত প্রক্রিয়ার অংশ ছিল না। বরং রাজনৈতিক সুবিধা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে মধ্যবর্তী সময়েই অঙ্গরাজ্যগুলো নতুন মানচিত্র তৈরি করেছে।
এই প্রক্রিয়ার সূচনা টেক্সাসের রিপাবলিকানদের উদ্যোগে। নতুন মানচিত্রের মাধ্যমে দলটি পাঁচটি পর্যন্ত অতিরিক্ত আসনের সুবিধা পেতে পারে। এরপর অন্য অঙ্গরাজ্যগুলোও এতে যুক্ত হয়। ক্যালিফোর্নিয়ায় ডেমোক্র্যাটরা পাল্টা উদ্যোগ নেয়। দুই দলের কিছু প্রচেষ্টা আদালতে বাধার মুখে পড়লেও সামগ্রিকভাবে নতুন জাতীয় মানচিত্রে রিপাবলিকানরা প্রায় নয়টি আসনের নিট সুবিধা পেয়েছে।
এখন প্রশ্ন হলো, এই সুবিধা কি বাস্তবে টিকবে? নাকি অতিরিক্ত দলীয় সুবিধা নিশ্চিত করতে গিয়ে রিপাবলিকানরা এমন নির্বাচনী এলাকা তৈরি করেছে, যা রাজনৈতিক পরিস্থিতি বদলালে তাদের জন্যই বিপদ হয়ে উঠতে পারে?
ডামিম্যান্ডারের আশঙ্কা এবং নির্বাচনী বাস্তবতা
বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘ডামিম্যান্ডার’ তৈরির অনুকূল পরিবেশ বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ। এর পেছনে রয়েছে দুটি বিষয়—অত্যন্ত আগ্রাসী দলীয় সীমানা পুনর্বিন্যাস এবং এমন এক মধ্যবর্তী নির্বাচন, যেখানে প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা কম এবং অর্থনীতি নিয়েও ভোটারদের অসন্তোষ রয়েছে।
তবে নির্বাচনে রিপাবলিকানরা আসন হারালেই যে তাদের মানচিত্র ব্যর্থ হয়েছে, তা বলা যাবে না। প্রকৃত পরীক্ষা হলো, নতুন সীমানা না বদলালে দলটি যত আসন পেত, তার তুলনায় এখন কি আরও খারাপ অবস্থায় পড়ছে? অর্থাৎ, নির্বাচনী ফলের পাশাপাশি বিকল্প পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনাও জরুরি।
রিপাবলিকানদের নতুন মানচিত্র এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে ডেমোক্র্যাটদের জাতীয় ভোটের ব্যবধান ১০ থেকে ১২ শতাংশ পয়েন্টে না পৌঁছানো পর্যন্ত দলটি সুবিধা ধরে রাখতে পারে। রিয়েলক্লিয়ারপলিটিকসের সাম্প্রতিক গড় জরিপে ডেমোক্র্যাটদের এগিয়ে থাকার ব্যবধান আট শতাংশ পয়েন্টের কিছু বেশি। জরিপ মোটামুটি সঠিক হলে নতুন মানচিত্রের কারণে রিপাবলিকানদের সুবিধা থাকার কথা।
কার্নেগি মেলন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জনাথন সারভাসের মতে, প্রকৃত অর্থে ডামিম্যান্ডার হওয়ার সম্ভাবনা কম। ডেমোক্র্যাটদের এমন প্রত্যাশাকে তিনি অনেকটা রাজনৈতিক আশাবাদ হিসেবে দেখছেন। তাঁর যুক্তি, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন এখন এতটাই জাতীয় ইস্যুনির্ভর যে এক অঙ্গরাজ্যে ভোটের যে পরিবর্তন ঘটে, অন্য অঙ্গরাজ্যেও প্রায় একই প্রবণতা দেখা যায়।

জাতীয় ঢেউয়ের সামনে মানচিত্র কতটা কার্যকর?
এখানেই রিপাবলিকানদের কৌশলের সীমাবদ্ধতা। ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে বড় ধরনের জাতীয় ভোটের ঢেউ তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু টেক্সাস বা ফ্লোরিডার মতো নতুন করে সীমানা নির্ধারণ করা অঙ্গরাজ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। মিশিগান, পেনসিলভানিয়া, অ্যারিজোনা, আইওয়া, উইসকনসিন ও কলোরাডোর মতো যেসব অঙ্গরাজ্যে মানচিত্র বদলায়নি, সেখানকার প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসনও হাতছাড়া হতে পারে।
ফলে রিপাবলিকানরা নতুন মানচিত্রের কারণে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কি না, সেটি বোঝার আগেই তারা জাতীয় রাজনৈতিক পরিবর্তনের ধাক্কায় বহু আসন হারাতে পারে। সে ক্ষেত্রে সীমানা পুনর্বিন্যাসের কৌশল ব্যর্থ হয়েছে কি না, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও নির্বাচনের ফল বদলানোর ক্ষেত্রে এর ভূমিকা সীমিত হয়ে যেতে পারে।
এই নির্বাচনের তাৎপর্য তাই শুধু কোন দল কতটি আসন পেল, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং দলীয় স্বার্থে নির্বাচনী মানচিত্র কত দূর পর্যন্ত বদলানো যায় এবং জাতীয় রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের মুখে সেই কৌশল কতটা কার্যকর থাকে, সেটিই বড় পরীক্ষা। নির্বাচনী সীমানা দিয়ে প্রতিযোগিতার শর্ত কিছুটা বদলানো সম্ভব, কিন্তু ভোটারদের সামগ্রিক রাজনৈতিক মনোভাব নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। রিপাবলিকানদের সাম্প্রতিক উদ্যোগ সেই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।












