গণতন্ত্র নিখুঁত কোনো শাসনব্যবস্থা নয়। নির্বাচনে জনতুষ্টিবাদী, ক্ষমতালোভী কিংবা অযোগ্য নেতারাও জয়ী হন। অনেক সময় স্বল্পমেয়াদি রাজনৈতিক সুবিধা জাতীয় স্বার্থকে ছাপিয়ে যায়। তবু গণতন্ত্রের দুর্বলতা নিয়ে যতই প্রশ্ন থাকুক, ব্রাজিল ও সার্বিয়ার সাম্প্রতিক নির্বাচন মনে করিয়ে দিয়েছে, শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা পরিবর্তনের সুযোগ নিজেই এক বিরাট অর্জন। বিশেষ করে যেসব দেশের ইতিহাসে সামরিক অভ্যুত্থান, রাজনৈতিক হত্যা ও দমন-পীড়নের দীর্ঘ ছায়া রয়েছে, সেখানে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদল শুধু রাজনৈতিক ঘটনা নয়, গণতান্ত্রিক অগ্রগতিরও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
গণতন্ত্র টিকে থাকবে কি না, এ প্রশ্ন নতুন নয়। প্রাচীন এথেন্সে নাগরিকেরা হাত তুলে আইন নির্ধারণ করার সময় থেকেই এই শাসনব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে বিতর্ক চলে আসছে। তবে আধুনিক বিশ্বে গণতন্ত্রের সংকটের ধরন আরও জটিল হয়েছে। অর্থনৈতিক স্থবিরতা, বিদেশি হস্তক্ষেপ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ষড়যন্ত্রতত্ত্ব মানুষের রাজনৈতিক আস্থাকে দুর্বল করছে। এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে এমন এক জনতুষ্টিবাদ, যা নির্বাচনে জয়কে সীমাহীন ক্ষমতা ভোগের অনুমতিপত্র হিসেবে দেখতে চায়।
এই পরিস্থিতিতে সাম্প্রতিক তিনটি গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের অভিজ্ঞতা তাৎপর্যপূর্ণ। ইসরায়েলে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোটের অবস্থান শক্তিশালী হলেও রাজনৈতিক অচলাবস্থার অবসান নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। অন্যদিকে ব্রাজিলে ৮১ বছর বয়সী লুলা দা সিলভা ফ্লাভিও বলসোনারোকে হারিয়ে রেকর্ড চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। সার্বিয়ায় দীর্ঘদিনের জাতীয়তাবাদী প্রেসিডেন্ট আলেকসান্দার ভুচিচকে পরাজিত করেছে দুর্নীতিবিরোধী ছাত্রদের নেতৃত্বাধীন স্টুডেন্ট লিস্ট। এই দুই দেশের ফলাফল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ উভয়ের ইতিহাসেই গণতান্ত্রিক রাজনীতির ওপর কর্তৃত্ববাদী শক্তির প্রবল চাপ রয়েছে।

ব্রাজিলের রাজনীতিতে কর্তৃত্ববাদের দীর্ঘ ছায়া
ব্রাজিলের বর্তমান গণতন্ত্রের ইতিহাস তুলনামূলকভাবে সাম্প্রতিক। ১৯৬৪ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত দেশটি সামরিক একনায়কতন্ত্রের অধীনে ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনপুষ্ট ওই শাসনামলে প্রায় ৫০০ মানুষকে গুম করা হয় এবং হাজার হাজার মানুষ নির্যাতনের শিকার হন। এই অতীত কেবল ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়; দেশটির রাজনীতিতে সামরিক শাসনের প্রতি সহানুভূতি এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি অবিশ্বাস বোঝার ক্ষেত্রেও তা গুরুত্বপূর্ণ।
সাবেক প্রেসিডেন্ট জইর বলসোনারো সামরিক শাসনামলের প্রতি তাঁর সমর্থন কখনো গোপন করেননি। ওই সময়কে তিনি গৌরবময় অধ্যায় হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। তাঁর মন্তব্যের ভয়াবহতা বোঝা যায়, যখন দেখা যায়, নির্যাতন করা হলেও মানুষ হত্যা করা হয়নি—এমন বক্তব্য দিয়েও তিনি সেই শাসনব্যবস্থার সমালোচনা করার চেষ্টা করেছেন।
বলসোনারো নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এলেও গণতান্ত্রিক নিয়মের প্রতি তাঁর অঙ্গীকার নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ছিল। ২০২২ সালে নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর তাঁর বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থানের উদ্যোগ নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। ব্রাসিলিয়ায় তাঁর সমর্থকদের সহিংস তৎপরতাও সেই সংকটকে আরও স্পষ্ট করে। শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা ধরে রাখার সেই প্রচেষ্টা সফল হয়নি। বলসোনারো বর্তমানে গৃহবন্দি অবস্থায় ২৭ বছরের কারাদণ্ড ভোগ করছেন। তাঁর ছেলে ফ্লাভিও নিজের পরাজয়ের পর ফ্লোরিডায় চলে গিয়ে নিজেকে ব্রাজিলের প্রকৃত নেতা হিসেবে দাবি করেছেন। এই আচরণ দেখায়, নির্বাচনে অংশ নেওয়া আর গণতান্ত্রিক রীতিনীতি মেনে নেওয়া এক বিষয় নয়।
ব্রাজিলের সংকটকে শুধু সাম্প্রতিক জনতুষ্টিবাদের উত্থান দিয়ে ব্যাখ্যা করাও যথেষ্ট নয়। দেশটির ইতিহাসে দাসপ্রথা, বৈষম্য ও রাজনৈতিক সহিংসতার গভীর প্রভাব রয়েছে। গেতুলিও ভার্গাসের উত্থান তার একটি উদাহরণ। ১৯৩০ সালে সশস্ত্র অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে তিনি ব্যক্তিকেন্দ্রিক একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন, প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করেন এবং বিরোধীদের কারাবন্দি করেন। তাঁর রাজনৈতিক জীবন শেষ হয় ১৯৫৪ সালে আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে। অর্থাৎ ব্রাজিলের রাজনীতিতে কর্তৃত্ববাদী ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা কোনো সাম্প্রতিক বিচ্যুতি নয়; এর শিকড় অনেক গভীরে।
সার্বিয়ার পরিবর্তন: ইতিহাসের সঙ্গে বিচ্ছেদ?

সার্বিয়ার রাজনৈতিক ইতিহাসও কম রক্তাক্ত নয়। ১৯৯০-এর দশকে যুগোস্লাভিয়ার ভাঙন এবং বলকান যুদ্ধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলেন জাতীয়তাবাদী নেতা স্লোবোদান মিলোসেভিচ। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ, জাতীয় দুর্ভোগের বয়ানকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোর আড়ালে কর্তৃত্ববাদী শাসন শক্তিশালী করার প্রবণতায় তিনি পরবর্তী সময়ের বহু জনতুষ্টিবাদী নেতার পূর্বসূরি হয়ে ওঠেন।
২০০০ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজয়ের পর মিলোসেভিচ ফলাফল বদলে ক্ষমতায় টিকে থাকার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু ব্যাপক গণবিক্ষোভের মুখে তাঁর পতন ঘটে। সাম্প্রতিক নির্বাচনে ভুচিচও পরাজয়ের পর একই ধরনের পথ অনুসরণের কথা ভেবেছিলেন বলে বিভিন্ন সূত্রের বরাতে জানা গেছে। শেষ পর্যন্ত পরাজয়ের ব্যাপকতা উপলব্ধি করে তিনি ক্ষমতা ছাড়ার বাস্তবতা মেনে নেন। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্রের অগ্রগতি শুধু কে নির্বাচনে জিতল, তা দিয়ে বিচার করা যায় না; পরাজিত পক্ষ ক্ষমতা ছাড়তে রাজি কি না, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সার্বিয়ার বর্তমান পরিবর্তনের তাৎপর্য বুঝতে হলে আরও পেছনে তাকাতে হয়। ১৯০৩ সালের মে মাসে দেশটির সেনাবাহিনীর জাতীয়তাবাদী কর্মকর্তারা রাজা আলেকজান্ডার প্রথম ও তাঁর স্ত্রী দ্রাগাকে হত্যা করে। রাজপ্রাসাদে ঘণ্টার পর ঘণ্টা খোঁজাখুঁজির পর তাঁদের একটি আলমারিতে লুকিয়ে থাকা অবস্থায় পাওয়া যায়। এরপর রাজা-রানিকে গুলি করে হত্যা করা হয় এবং তাঁদের মরদেহ বিকৃত করা হয়। এই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সার্বিয়ার রাজবংশের পরিবর্তন ঘটে, যার প্রভাব বলকান অঞ্চলের রাজনীতিতে সুদূরপ্রসারী হয়েছিল। ওই ষড়যন্ত্রে যুক্ত কয়েকজন পরবর্তী সময়ে ব্ল্যাক হ্যান্ড নামের গোপন জাতীয়তাবাদী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন। সংগঠনটি ১৯১৪ সালে অস্ট্রিয়ার আর্চডিউক ফ্রাঞ্জ ফার্দিনান্দ হত্যার পরিকল্পনার সঙ্গেও জড়িত ছিল।
এই ইতিহাসের পাশে দাঁড় করালে নির্বাচনের মাধ্যমে সার্বিয়ায় ক্ষমতার পরিবর্তনকে নিছক দলীয় পালাবদল মনে হয় না। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার নিষ্পত্তি যখন ব্যালটের মাধ্যমে হয়, তখন তা সহিংসতার ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার থেকে বেরিয়ে আসার সম্ভাবনাও তৈরি করে।
গণতন্ত্রের দুর্বলতা, বিকল্পের ভয়াবহতা

গণতন্ত্রকে আদর্শায়িত করার কারণ নেই। নির্বাচনী ব্যবস্থা প্রায়ই এমন নেতাদের ক্ষমতায় নিয়ে আসে, যাঁরা মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেন, ব্যক্তিগত স্বার্থকে প্রাধান্য দেন কিংবা রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজন উপেক্ষা করেন। ভোটের হিসাব অনেক সময় জাতীয় নীতির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে গণতন্ত্রের ভেতরেই হতাশা ও অসন্তোষ জমা হয়, যা কর্তৃত্ববাদী নেতাদের জন্য সুযোগ তৈরি করে।
কিন্তু গণতন্ত্রের এই ব্যর্থতা থেকে একনায়কতন্ত্রের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয় না। বরং ইতিহাস দেখায়, নির্বাচনে পরাজয় মেনে নেওয়ার বদলে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরার প্রবণতা যখন রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন বিরোধীদের অধিকার, নাগরিক স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা ক্রমেই বিপন্ন হয়ে পড়ে। একবার ক্ষমতা ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হলে শান্তিপূর্ণ পরিবর্তনের পথ সংকুচিত হয়, আর রাজনৈতিক সংঘাতের মূল্য দিতে হয় পুরো সমাজকে।
ব্রাজিল ও সার্বিয়ার সাম্প্রতিক নির্বাচন তাই গণতন্ত্রের সব সমস্যার সমাধান নয়। নির্বাচনে জয়ী হওয়া মানেই শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন কিংবা রাজনৈতিক সহনশীলতা নিশ্চিত হওয়া নয়। এসব অর্জন ধরে রাখতে হলে ক্ষমতাসীনদের জবাবদিহি এবং বিরোধীদের অধিকার রক্ষা করতে হয়। তবে ক্ষমতার পালাবদল যদি সহিংসতা ছাড়াই সম্ভব হয়, সেটিকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই।
গণতন্ত্রের প্রকৃত মূল্য বোঝা যায় তার বিকল্পগুলোর দিকে তাকালে। যে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ক্ষমতার ভাগ্য নির্ধারণ হয় সামরিক ষড়যন্ত্র, রাজপ্রাসাদের হত্যাকাণ্ড কিংবা বিরোধীদের দমনের মাধ্যমে, সেখানে নির্বাচনের অনিশ্চয়তাও তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য। গণতন্ত্র হয়তো সবচেয়ে নিখুঁত ব্যবস্থা নয়, কিন্তু তার ব্যর্থতা সংশোধনের সুযোগ রয়েছে—আর সেই সুযোগটিই তাকে কর্তৃত্ববাদের চেয়ে মৌলিকভাবে আলাদা করে।













