বিশ্বব্যবস্থায় দ্রুত পরিবর্তন, বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা এবং বাণিজ্যিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পররাষ্ট্রনীতির সাফল্য আর শুধু কূটনৈতিক সম্পর্কের সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। একটি দেশের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ কতটা নিরাপত্তা নিশ্চিত করছে, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ আনছে, নতুন বাজার খুলছে এবং নিজস্ব অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে—সেই হিসাব ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ভিয়েতনামের সাম্প্রতিক পররাষ্ট্রনীতিতে এই ধারণারই প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।
দেশটির কমিউনিস্ট পার্টি পররাষ্ট্রবিষয়ক কার্যক্রমকে জাতীয় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার পাশাপাশি নিয়মিত ও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করছে। এর পেছনে রয়েছে একটি বাস্তব উপলব্ধি: দেশের অভ্যন্তরে উন্নয়নের পরিবেশ তৈরি করাই যথেষ্ট নয়; আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিও অনুকূলে রাখতে হয়। বড় শক্তিগুলোর মধ্যে সম্পর্কের পরিবর্তন, বাণিজ্যনীতি কিংবা আঞ্চলিক নিরাপত্তার সংকট সরাসরি একটি দেশের বিনিয়োগ, রপ্তানি ও উন্নয়ন পরিকল্পনাকে প্রভাবিত করতে পারে।
এই বাস্তবতায় পররাষ্ট্রনীতির কাজ কেবল সংকট মোকাবিলা বা রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক রক্ষা করা নয়। বরং সম্ভাব্য ঝুঁকি আগেভাগে চিহ্নিত করা, সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ককে দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থে কাজে লাগানো। ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতা দেখায়, কূটনীতি ও অভ্যন্তরীণ উন্নয়নকে আলাদা করে দেখার সুযোগ ক্রমেই কমে আসছে।
সম্পর্কের গভীরতা মাপা হবে অর্থনৈতিক ফলাফলে
মালয়েশিয়ার সঙ্গে ভিয়েতনামের সম্পর্ক এই কৌশলের একটি উদাহরণ। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়ায় ১০ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেশি। ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে দেশ দুটি বিস্তৃত কৌশলগত অংশীদারত্বের আওতায় কাজ করছে।

তবে ভিয়েতনামের লক্ষ্য শুধু বিদ্যমান সম্পর্ক বজায় রাখা নয়। দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ২০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার পাশাপাশি ডিজিটাল অর্থনীতি, সবুজ অর্থনীতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে সহযোগিতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এখানে মূল বিষয়টি হলো, কূটনৈতিক সম্পর্কের মর্যাদা তখনই বাস্তব মূল্য পায়, যখন তা বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও উৎপাদনশীল সহযোগিতায় রূপ নেয়। রাজনৈতিক সদ্ভাব অর্থনৈতিক সুযোগ তৈরি করতে পারে, কিন্তু সেই সুযোগ কাজে লাগাতে প্রয়োজন সুস্পষ্ট লক্ষ্য ও কার্যকর উদ্যোগ।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কেও একই ধরনের বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করছে ভিয়েতনাম। দেশটি যুক্তরাষ্ট্রকে গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করে এবং পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে আলোচনা দ্রুত শেষ করার পক্ষে। একই সঙ্গে এমন বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ এড়ানোর আহ্বান জানায়, যা দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে সহযোগিতাও এই সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ভিয়েতনামের উন্নয়ন পরিকল্পনায় ডিজিটাল রূপান্তর, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য রয়েছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্ব শুধু বাজারে প্রবেশাধিকার নয়; উন্নত জ্ঞান ও প্রযুক্তির সঙ্গে সংযোগ তৈরির সুযোগও।
বিনিয়োগ চাই, তবে বাছাই করে
বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের ক্ষেত্রেও ভিয়েতনাম তার অগ্রাধিকার নতুনভাবে নির্ধারণ করছে। দেশটির লক্ষ্য এখন শুধু বেশি মূলধন আনা নয়, বরং এমন প্রকল্প নির্বাচন করা, যেগুলো প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াবে এবং স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে গভীর সংযোগ তৈরি করবে।
জার্মানির শিল্পপ্রতিষ্ঠান ল্যাপের ভিয়েতনামকে গুরুত্বপূর্ণ বাজার হিসেবে বিবেচনা করা এই প্রবণতার একটি উদাহরণ। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক তথ্যকেন্দ্র, স্বয়ংক্রিয় উৎপাদনব্যবস্থা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও স্মার্ট অবকাঠামোর চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে এ ধরনের শিল্পের সম্ভাবনাও বাড়ছে।
এই নীতির তাৎপর্য হলো, বিনিয়োগের পরিমাণের পাশাপাশি তার গুণগত মানও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রকল্প যদি স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থা, দক্ষ জনবল, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং দেশীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা না রাখে, তাহলে তার দীর্ঘমেয়াদি সুফল সীমিত হতে পারে। তাই বিদেশি বিনিয়োগকে জাতীয় উন্নয়নের প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার চেষ্টা ভিয়েতনামের অর্থনৈতিক কূটনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক।

প্রবাসীরা শুধু রেমিট্যান্সের উৎস নন
জাতীয় উন্নয়নের আরেকটি বড় সম্পদ হিসেবে ভিয়েতনাম বিদেশে বসবাসরত নাগরিকদের দেখছে। দেশটির ছয় কোটি পঞ্চাশ লাখের বেশি প্রবাসীর কাছ থেকে আসা অর্থের পরিমাণ ২০০৪ সালের ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ২০২৫ সালে ১৭ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। ১৯৯৩ সাল থেকে এ পর্যন্ত দেশে পাঠানো মোট অর্থের পরিমাণ ২৫০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও হিসাবটি এখনো পূর্ণাঙ্গ নয়।
তবে প্রবাসীদের অবদানকে শুধু রেমিট্যান্সে সীমাবদ্ধ রাখলে তাদের সম্ভাবনার বড় অংশ কাজে লাগানো যাবে না। বিদেশে থাকা বিজ্ঞানী, বিশেষজ্ঞ, উদ্যোক্তা, শিক্ষক ও তরুণ পেশাজীবীরা জ্ঞান, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংযোগ তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারেন।
এ জন্য প্রয়োজন এমন প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা, যা প্রবাসীদের শুধু দেশে ফিরে কাজ করার সুযোগ দেবে না; বিদেশে অবস্থান করেও দেশের উন্নয়নে অবদান রাখার পথ তৈরি করবে। বিদেশে অবস্থিত ভিয়েতনামের কূটনৈতিক মিশনগুলোকে এ ধরনের যোগাযোগের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ধারণা সেই লক্ষ্যেই গুরুত্বপূর্ণ।
এই অভিজ্ঞতা একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে আনে: বিদেশে ছড়িয়ে থাকা নাগরিকদের দক্ষতা ও নেটওয়ার্ককে কীভাবে জাতীয় সম্পদে পরিণত করা যায়? শুধু আর্থিক প্রণোদনা নয়, কার্যকর যোগাযোগ, গবেষণা সহযোগিতা এবং বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশও এর অংশ।
কূটনীতি পৌঁছাতে হবে স্থানীয় অর্থনীতিতে
পররাষ্ট্রনীতির সুফল সাধারণ মানুষ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছানোও জরুরি। থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম তাদের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার সুযোগ পেয়েছে। ভিয়েতনামের ক্যান থো শহরে এই সম্পর্কের বাস্তব রূপ দেখা যায় ব্যবসায়িক যোগাযোগ, বিনিয়োগ, বাণিজ্য, পর্যটন ও শিক্ষাক্ষেত্রে সহযোগিতার মধ্য দিয়ে।
২০২৫ সালে মেকং বদ্বীপের এই শহরে থাইল্যান্ডের বিনিয়োগ ছিল আনুমানিক ১১৯ দশমিক ২৫ মিলিয়ন ডলার। একই বছরের প্রথম ছয় মাসে ক্যান থো থেকে থাইল্যান্ডে প্রায় ১৩ দশমিক ৯ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছে এবং দেশটি থেকে আমদানি হয়েছে ৩ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলারের পণ্য।
এই পরিসংখ্যান দেখায়, পররাষ্ট্রনীতির বাস্তব মূল্যায়ন করতে হলে জাতীয় পর্যায়ের চুক্তির পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতে তার প্রভাবও দেখতে হবে। একটি আন্তর্জাতিক অংশীদারত্ব স্থানীয় উৎপাদকদের বাজারে প্রবেশের সুযোগ দিচ্ছে কি না, নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করছে কি না কিংবা ব্যবসার পরিসর বাড়াচ্ছে কি না—এসব প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।

আঞ্চলিক পর্যায়ে আসিয়ান ভিয়েতনামের জন্য আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। প্রায় ৮০০ মিলিয়ন মানুষের এই অঞ্চলে অর্থনৈতিক সহযোগিতা বাড়াতে পারলে দেশটি তার বাজার ও কৌশলগত সুযোগ সম্প্রসারণ করতে পারে। একই সঙ্গে আসিয়ানের ঐক্য ও সম্মিলিত সক্ষমতা বজায় রাখা বৃহত্তর আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
নিরাপত্তা ও উন্নয়নকে একসঙ্গে এগোতে হবে
অর্থনৈতিক সহযোগিতা বিস্তারের পাশাপাশি নিরাপত্তার প্রশ্নও উপেক্ষা করা যায় না। মালয়েশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও সমুদ্রপথে আইন প্রয়োগের সহযোগিতা, কম্বোডিয়ার সঙ্গে আন্তসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলার উদ্যোগ এবং দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে মতবিনিময়—এসবের মাধ্যমে ভিয়েতনাম নিরাপত্তা ও কূটনীতিকে একই কাঠামোর মধ্যে রাখার চেষ্টা করছে।
কম্বোডিয়ার সঙ্গে ২৫৮ দশমিক ৯৩৯ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তের ক্ষেত্রেও শুধু নিরাপত্তা বাহিনীর উপস্থিতি যথেষ্ট নয়। শান্তিপূর্ণ সীমান্ত বজায় রাখতে স্থানীয় মানুষের যোগাযোগ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, সুপ্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক এবং পারস্পরিক আস্থা প্রয়োজন। সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও সহযোগিতা বিস্তারকে পরস্পরের বিরোধী হিসেবে দেখার পরিবর্তে একে অপরের পরিপূরক করে তোলাই এখানে মূল লক্ষ্য।
ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, পররাষ্ট্রনীতি কোনো বিচ্ছিন্ন রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড নয়। এর কার্যকারিতা নির্ভর করে জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, স্থানীয় ব্যবসা এবং নাগরিকদের সক্ষমতার সঙ্গে কতটা সংযোগ তৈরি করা যাচ্ছে তার ওপর।
দেশটির ঘোষিত নীতিতে স্বাধীনতা, স্বনির্ভরতা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান, বহুপক্ষীয় সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বৈচিত্র্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই অবস্থান বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যে নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিসর ধরে রাখার প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা যায়।
শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক সাফল্য শুধু কতটি দেশের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে, তা দিয়ে নির্ধারিত হবে না। গুরুত্বপূর্ণ হলো, সেই সম্পর্ক দেশের নিরাপত্তা কতটা জোরদার করছে, অর্থনীতির জন্য কী সুযোগ তৈরি করছে এবং দীর্ঘমেয়াদে নিজস্ব সক্ষমতা কতটা বাড়াচ্ছে। ভিয়েতনামের কৌশল সেই বাস্তবতাই সামনে আনে: জাতীয় স্বার্থকে কেন্দ্র করে পরিচালিত পররাষ্ট্রনীতি তখনই কার্যকর হয়, যখন আন্তর্জাতিক আস্থাকে বাস্তব উন্নয়নের সম্পদে রূপান্তর করা যায়।












