এলডিসি থেকে উত্তরণের জন্য বাংলাদেশ আরও তিন বছর সময় পেয়েছে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশকেও এই বাড়তি সময় দিয়েছে। আগের সূচি অনুযায়ী ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে যেত। এখন প্রস্তুতির সময় চলবে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত। সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে এই সিদ্ধান্ত হয়েছে। রপ্তানিকারক, ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকদের জন্য এটি স্বস্তির খবর। এলডিসি মানে স্বল্পোন্নত দেশ। জাতিসংঘ মাথাপিছু আয়, মানবসম্পদ ও অর্থনৈতিক ঝুঁকির তিনটি মানদণ্ডে দেশগুলোকে এই তালিকায় রাখে বা সেখান থেকে বের করে। বাংলাদেশ ২০১৮ সালে প্রথমবার তিনটি মানদণ্ডই পূরণ করে। এরপর থেকেই উত্তরণের প্রস্তুতি নিয়ে দেশে বিতর্ক চলছিল, বিশেষ করে ব্যবসায়ীরা আরও সময় চাইছিলেন।
সরকার ফেব্রুয়ারিতে জাতিসংঘের কাছে বাড়তি সময় চেয়ে আবেদন করে। আবেদনে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা, বাণিজ্যব্যবস্থার পরিবর্তন এবং জ্বালানি ও সরবরাহ ব্যবস্থার ঝুঁকির কথা তুলে ধরা হয়। জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটি আবেদনটি ইতিবাচকভাবে বিবেচনার সুপারিশ করে। এরপর অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ সাধারণ পরিষদকে বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বলে। এর আগে কোভিডের কারণে বাংলাদেশ আরও দুই বছর বাড়তি সময় পেয়েছিল। নেপালও একই সময় পেয়েছে।
এই সময় বিনা শর্তে দেওয়া হয়নি। সাধারণ পরিষদ বলেছে, ব্যতিক্রম হিসেবে এই সুযোগ দেওয়া হলো। বাংলাদেশকে সংস্কার এগিয়ে নিতে হবে এবং মসৃণ উত্তরণের জন্য নিজস্ব কৌশল বাস্তবায়ন করতে হবে। সাধারণ পরিষদ আন্তর্জাতিক সহযোগীদের সহায়তার কথাও বলেছে। প্রতিবছর উন্নয়ন নীতি কমিটির কাছে অগ্রগতির প্রতিবেদন দিতে হবে। উত্তরণের পর বাণিজ্যসুবিধা কতটা থাকবে, তা নির্ভর করবে প্রতিটি উন্নয়ন সহযোগী ও বাজারের নিজস্ব নিয়মের ওপর।
বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি রপ্তানির। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও জাপানের মতো বড় বাজারে এখন শুল্কমুক্ত বা কম শুল্কে পণ্য পাঠানো যায়। উত্তরণের পর এসব সুবিধা কমলে পোশাকের দামে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হতে পারে। তাই এলডিসি থেকে উত্তরণ পিছিয়ে যাওয়ায় কারখানা মালিক থেকে শ্রমিক পর্যন্ত অনেকে কিছুটা নিশ্বাস ফেলার সুযোগ পাবেন। তবে এটি সমস্যার সমাধান নয়, প্রস্তুতির জন্য বাড়তি সময় মাত্র।
এই সময় কীভাবে কাজে লাগবে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন। বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেছেন, এই সময়ে অবকাঠামো ও লজিস্টিকসের উন্নতি করতে হবে এবং প্রয়োজনে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির পথে হাঁটতে হবে। সিপিডির বিশিষ্ট ফেলো ফাহমিদা খাতুন বলেছেন, বাণিজ্য, রাজস্ব আদায়, ব্যাংকিং ও অবকাঠামোয় কার্যকর সংস্কার দরকার। তাঁর পরামর্শ, সময়সীমা ঠিক করে একটি সংস্কার পরিকল্পনা নিতে হবে এবং প্রতি ছয় মাসে তা পর্যালোচনা করে প্রকাশ করতে হবে। বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী মোস্তফা আবিদ খান বলেছেন, আগের মতো চললে অনেক সুবিধা হারাতে হবে। তাঁর কথায়, বাড়তি সময়কে সংস্কারের কাজে লাগাতেই হবে। এলডিসি থেকে উত্তরণ নিয়ে সামনের তিন বছরের পথ তাই এখন সংস্কারের গতির ওপরই নির্ভর করছে।












