রাশিয়া ও ইউক্রেন জানিয়েছে, দক্ষিণ ইউক্রেনের রুশ নিয়ন্ত্রণাধীন ওলেশকি শহরের আশপাশে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য মাইন অপসারণের কাজ শেষ হয়েছে। দীর্ঘদিন যুদ্ধের মধ্যে অবরুদ্ধ শহরটিতে এখন খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রী পৌঁছে দেওয়া এবং ইচ্ছুক বাসিন্দাদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ শুরুর পথ তৈরি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) দুই দেশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মানবিক সহায়তা বহর যাত্রা শুরুর জন্য প্রস্তুত। কয়েক সপ্তাহ ধরে এ কার্যক্রম আয়োজনের চেষ্টা চলছিল। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার সামরিক অভিযান শুরুর পরপরই শহরটি রুশ বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
মানবিক সংকট মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের স্ত্রী মেলানিয়া ট্রাম্পের ভূমিকারও প্রশংসা করেছে উভয় পক্ষ। সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো জানিয়েছে, তাঁর মধ্যস্থতায় ওলেশকিতে স্থানীয় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। শহরটি থেকে পালিয়ে আসা অন্তত একজন বাসিন্দা আগে জানিয়েছিলেন, সেখানে আটকে থাকা মানুষ অনাহারে মৃত্যুর আশঙ্কা করছেন।
রাশিয়ার মানবাধিকার কমিশনার ইয়ানা লান্ত্রাতোভা এবং ইউক্রেনের মানবাধিকার কমিশনার দিমিত্রো লুবিনেৎস প্রায় একই ভাষায় দেওয়া বিবৃতিতে জানান, মানবিক মিশনের জন্য প্রয়োজনীয় যাতায়াতপথের মাইন অপসারণ শেষ হয়েছে। সহায়তা বহর এখন রওনা হওয়ার জন্য প্রস্তুত।
পরিকল্পনা অনুযায়ী ইউক্রেনের ওলেশকিতে মানবিক সহায়তা বহরটি প্রথমে শহরের জেলা হাসপাতালে যাবে। এরপর যাঁরা শহর ছেড়ে যেতে চান, তাঁদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চলে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে। পরে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হবে।
ইউক্রেনের ওলেশকিতে মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের লক্ষ্য ২০২২ সাল থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন শহরটির ভয়াবহ মানবিক সংকট মোকাবিলা করা। একই সঙ্গে এটি রাশিয়া ও ইউক্রেনের কূটনৈতিক তৎপরতারও অংশ। দুই দেশই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে বোঝাতে চাইছে যে তারা তাঁর শান্তি উদ্যোগকে সমর্থন করছে। তবে এ সমর্থনের পেছনে দুই পক্ষের উদ্দেশ্য এক নয়।
লান্ত্রাতোভা জানিয়েছেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের একটি রক্ষণশীল সংবাদমাধ্যমের চার সাংবাদিককে সঙ্গে নিয়ে ওই এলাকায় যাচ্ছেন। তবে লুবিনেৎস তাঁর বিবৃতিতে নির্দিষ্ট কোনো সাংবাদিকের কথা উল্লেখ করেননি।
শান্তি প্রচেষ্টার কথা বললেন পুতিন
মস্কোয় আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেন, ইউক্রেনের ওলেশকিতে মানবিক সহায়তা হিসেবে বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার থেকে বেসামরিক মানুষের কাছে ত্রাণ পৌঁছানো শুরু হবে। এ কাজে যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের সহযোগিতার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
ইউক্রেনের মানবাধিকার কমিশনার লুবিনেৎস মানবিক কার্যক্রমে সময় ও মনোযোগ দেওয়ার জন্য মেলানিয়া ট্রাম্পকে বিশেষ ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে বাধা হিসেবে তুলে ধরেছেন। বিপরীতে রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের প্রশংসা করেছেন তিনি। বৃহস্পতিবার পুতিনও বলেছেন, ইউক্রেন সংকটের সম্ভাব্য শান্তিপূর্ণ সমাধান নিয়ে রাশিয়া কাজ করছে।
রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয়েই বেসামরিক মানুষকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করে। তবু ট্রেনসহ বিভিন্ন বেসামরিক অবকাঠামোয় হামলার ঘটনা বেড়েছে। ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত কমে আসায় এ ধরনের হামলা মোকাবিলা কঠিন হয়ে উঠেছে। রাশিয়ার ভেতরেও বেসামরিক মানুষের প্রাণহানি বেড়েছে।
দীর্ঘ বিরতির পর আগামী মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় রাশিয়া ও ইউক্রেনের শান্তি আলোচনা আবার শুরু হওয়ার কথা। তবে যুদ্ধ শেষ করার শর্ত নিয়ে দুই দেশের মধ্যে এখনো বড় মতপার্থক্য রয়েছে।
আগামী মাসে যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী আইনসভা নির্বাচন হলেও ফল যা-ই হোক, ট্রাম্পের হাতে আরও দুই বছর ক্ষমতা থাকবে। সংঘাতের গতিপথে তাঁর প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা সম্পর্কে মস্কো ও কিয়েভ, দুই পক্ষই সচেতন।
রাশিয়া আশা করছে, ট্রাম্প ইউক্রেনকে এমন একটি চুক্তিতে রাজি করাতে পারবেন, যেখানে রাশিয়ার অধিকাংশ শর্ত পূরণ হবে। এসব শর্তের মধ্যে রয়েছে পুরো দনবাস অঞ্চলের ওপর রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণ এবং ইউক্রেনের ন্যাটোতে যোগদানের পথ বন্ধ করা।
অন্যদিকে ইউক্রেন চায়, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় অব্যাহত থাকুক। একই সঙ্গে ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠান পরিচালিত যুদ্ধক্ষেত্রের যোগাযোগব্যবস্থা স্টারশিল্ডে পূর্ণ প্রবেশাধিকার এবং ইউরোপের অর্থায়নে কেনা মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম, বিশেষ করে প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থার সরবরাহও চালু থাকুক।
রোববার পর্যন্ত চলবে খেরসন অঞ্চলের যুদ্ধবিরতি
ওলেশকি এবং বৃহত্তর খেরসন অঞ্চলে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। অঞ্চলটি কয়েক বছর ধরে প্রায় প্রতিদিন ড্রোন ও গোলাবর্ষণের শিকার হচ্ছে। যুদ্ধের আগে শহরটির জনসংখ্যা ছিল প্রায় ২৪ হাজার। ধারণা করা হচ্ছে, এখন ধ্বংসস্তূপের মধ্যে মাত্র ১ হাজার ৫০০ মানুষ সেখানে থাকছেন। নিয়মিত গোলাবর্ষণের পাশাপাশি খাদ্য ও ওষুধের তীব্র সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে তাঁদের।
ইউক্রেন দীর্ঘদিন অভিযোগ করে আসছে, রাশিয়া শহরটিতে ত্রাণ ঢুকতে দিচ্ছে না এবং বাসিন্দাদের বের হওয়ার পথও বন্ধ রেখেছে। অন্যদিকে রাশিয়ার দাবি, সড়কগুলোতে ইউক্রেনের পুঁতে রাখা মাইন এবং ইউক্রেনীয় বাহিনীর গোলাবর্ষণের কারণে ত্রাণ সরবরাহ ও নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।
বৃহস্পতিবার দিনের মাঝামাঝি পর্যন্ত কোনো পক্ষই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ জানায়নি। যুদ্ধবিরতি রোববার পর্যন্ত বহাল থাকার কথা।
যেসব বাসিন্দা ইউক্রেন সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকায় ফিরতে চান, তাঁদের জন্য একটি বিশেষ পথ ঠিক করা হয়েছে। প্রথমে রুশ নিয়ন্ত্রিত ক্রিমিয়া হয়ে দক্ষিণ রাশিয়ায় যেতে হবে। সেখান থেকে উড়োজাহাজে বেলারুশে নেওয়া হবে তাঁদের। পরে বেলারুশ সীমান্ত পেরিয়ে ইউক্রেনে ঢোকার সুযোগ পাবেন তাঁরা।
তবে ইউক্রেনের ওলেশকিতে মানবিক সহায়তা উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলেও বৃহত্তর যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বড় কোনো পরিবর্তনের লক্ষণ নেই। সীমিত সময়ের যুদ্ধবিরতি ও ত্রাণ কার্যক্রম বেসামরিক মানুষের জন্য স্বস্তির সম্ভাবনা তৈরি করেছে। কিন্তু শান্তিচুক্তি নিয়ে গভীর মতপার্থক্য সংঘাতের অবসানকে এখনো অনিশ্চিত করে রেখেছে।












