যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে দীর্ঘদিনের রিপাবলিকান আধিপত্যের অবসান ঘটানোর সম্ভাবনা তৈরি করেছেন ডেমোক্র্যাটিক সিনেট প্রার্থী জেমস টালারিকো। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে তাঁর এগিয়ে থাকার ইঙ্গিত মিলেছে। শেষ পর্যন্ত তিনি জয়ী হলে ১৯৮৮ সালের পর প্রথমবারের মতো টেক্সাস থেকে কোনো ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হবেন। এতে আগামী বছর যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে কোন দল নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে, সেই হিসাবেও বড় পরিবর্তন আসতে পারে।
৩৭ বছর বয়সী টালারিকো এক বছর আগেও জাতীয় রাজনীতিতে খুব পরিচিত মুখ ছিলেন না। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যে তিনি টেক্সাসের রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছেন। দ্বিতীয় সর্বাধিক জনবহুল এই অঙ্গরাজ্যে তিন দশকের বেশি সময় ধরে কোনো ডেমোক্র্যাট প্রার্থী রাজ্যব্যাপী নির্বাচনে জয় পাননি।
এবারের নির্বাচন তাই শুধু একটি সিনেট আসনের লড়াই নয়। ডেমোক্র্যাটদের কাছে এটি দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ব্যর্থতা কাটিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ। অন্যদিকে রিপাবলিকানদের কাছে টেক্সাসের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার প্রশ্নটি দলীয় রাজনীতির ভবিষ্যতের সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে।
লাবকে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর জনসভায় ব্যাপক উপস্থিতি
টেক্সাসের লাবক শহরে টালারিকোর নির্বাচনী সমাবেশে মানুষের উপস্থিতি স্থানীয় রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। প্রায় আড়াই লাখ মানুষের এই শহরে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প বড় ব্যবধানে জয় পেয়েছিলেন। সেখানে একজন ডেমোক্র্যাট প্রার্থীর সমাবেশে প্রায় তিন হাজার মানুষ উপস্থিত হন। বাইরে মাইকে বক্তব্য শোনেন আরও প্রায় এক হাজার সমর্থক।
টালারিকো আগে শিক্ষকতা করতেন। খ্রিষ্টীয় ধর্মযাজক হওয়ার জন্যও পড়াশোনা করেছেন তিনি। প্রচারে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সংকট, রাজনীতিতে বড় অর্থের প্রভাব এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থানকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
তিনি বলেছেন, টেক্সাসের মানুষ পরিবর্তন চান। বিভাজনমূলক রাজনীতি ও চরমপন্থার পরিবর্তে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন।
নিজের প্রচারে টেক্সাসের স্থানীয় সংস্কৃতিকে বিশেষভাবে তুলে ধরছেন টালারিকো। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসছে রাজ্যের খাবার, সংগীত ও ইতিহাস। তিনি প্রায়ই উল্লেখ করেন, তাঁর পরিবারের শিকড় আট প্রজন্ম ধরে টেক্সাসে।
রিপাবলিকানদের মধ্যেও উদ্বেগ
টালারিকোর সমাবেশের কাছাকাছি সময়ে একই শহরে নির্বাচনী প্রচারে যান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটন। সেখানে ট্রাম্প সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আহ্বান জানান।
রিপাবলিকানদের উদ্বেগের বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছে দলের নেতাদের বক্তব্যেও। টেক্সাসের সিনেটর টেড ক্রুজ বলেছেন, অঙ্গরাজ্যটি হারানোর ঝুঁকি রয়েছে এবং ডেমোক্র্যাটরা ভোটার উপস্থিতির ক্ষেত্রে এগিয়ে যাচ্ছে।
রিপাবলিকানদের আশঙ্কা, টেক্সাসে ডেমোক্র্যাটদের একটি জয় শুধু সিনেটের আসন হারানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। এতে রাজ্যের অন্যান্য নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীদের অংশগ্রহণ ও তহবিল সংগ্রহ বাড়তে পারে। জর্জিয়া, নর্থ ক্যারোলাইনা ও ভার্জিনিয়ার মতো দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে ডেমোক্র্যাটদের রাজনৈতিক অগ্রগতির ধারাও টেক্সাসে প্রভাব ফেলতে পারে।
ট্রাম্প প্রশাসনের নীতিতে অসন্তোষ
টেক্সাসে রিপাবলিকানদের জন্য রাজনৈতিক পরিস্থিতি জটিল হওয়ার পেছনে জাতীয় ও স্থানীয় কয়েকটি বিষয় কাজ করছে।
জ্বালানিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উচ্চমূল্য নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষ রয়েছে। ট্রাম্পের শুল্কনীতি এবং ইরান যুদ্ধের প্রভাব নিয়েও সমালোচনা বাড়ছে। সাম্প্রতিক এক জনমত জরিপে ডেমোক্র্যাট, স্বতন্ত্র ও অনেক রিপাবলিকান ভোটার রাজনীতিতে বড় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ও ব্যক্তিস্বার্থসংশ্লিষ্ট রাজনীতিকদের প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
অভিবাসন নীতিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে। ২০২৪ সালের নির্বাচনে হিস্পানিক ভোটারদের একটি অংশ ট্রাম্পকে সমর্থন করেছিল। কিন্তু তাঁর প্রশাসনের অভিবাসনবিরোধী কঠোর পদক্ষেপ নিয়ে সেই জনগোষ্ঠীর মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে বিভিন্ন জরিপ ও সাম্প্রতিক বিশেষ নির্বাচনের ফলাফলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
টেক্সাসের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ হিস্পানিক। আগাম ভোটেও তাঁদের উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণ দেখা যাচ্ছে।
এ ছাড়া গ্রামীণ এলাকায় তথ্যপ্রযুক্তির বড় তথ্যকেন্দ্র নির্মাণ নিয়েও বিরোধ তৈরি হয়েছে। রিপাবলিকান নেতৃত্ব এসব প্রকল্পকে বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুযোগ হিসেবে তুলে ধরেছিল। কিন্তু পানি, বিদ্যুৎ ও স্থানীয় পরিবেশের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে সমালোচনা বাড়ছে। পরিস্থিতির মধ্যে গভর্নর গ্রেগ অ্যাবট অঙ্গরাজ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক নতুন অবকাঠামো নির্মাণে এক বছরের স্থগিতাদেশ ঘোষণা করেছেন।
প্যাক্সটনের অতীতও নির্বাচনে আলোচনায়
রিপাবলিকান প্রার্থী কেন প্যাক্সটনের রাজনৈতিক অতীতও নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ৬৩ বছর বয়সী প্যাক্সটন প্রাথমিক দলীয় নির্বাচনে দীর্ঘদিনের সিনেটর জন করনিনকে পরাজিত করে মনোনয়ন পান। ট্রাম্পের সমর্থনও তাঁর মনোনয়ন নিশ্চিত করতে ভূমিকা রেখেছিল।
তবে প্যাক্সটনের বিরুদ্ধে অতীতে একাধিক অভিযোগ ও তদন্ত ছিল। ২০১৫ সালে তাঁর বিরুদ্ধে সিকিউরিটিজ জালিয়াতির অভিযোগে ফেডারেল পর্যায়ে মামলা হয়েছিল, যা পরে প্রত্যাহার করা হয়। ২০২৩ সালে টেক্সাসের রিপাবলিকান-নিয়ন্ত্রিত প্রতিনিধি পরিষদ দুর্নীতি, ঘুষ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে তাঁকে অভিশংসন করেছিল। পরে অঙ্গরাজ্যের সিনেটে তিনি অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পান।
ট্রাম্প তখন প্যাক্সটনের পক্ষে অবস্থান নিয়ে রিপাবলিকান নেতাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেছিলেন। এসব ঘটনা দলের ভেতরেও প্যাক্সটনের বিরোধী তৈরি করেছে।
বিপুল অর্থের প্রচারযুদ্ধ
টেক্সাসের এই নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল সিনেট নির্বাচনে পরিণত হয়েছে। দুই পক্ষের প্রচার ও সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর ব্যয় ইতিমধ্যে ৫০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে।
টালারিকো নিজে নির্বাচনী তহবিল সংগ্রহে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছেন। তাঁর প্রচারাভিযানে অনুদানের পরিমাণ ১৪ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। অন্যদিকে বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অর্থায়ন এবং ট্রাম্পের সমর্থক রাজনৈতিক সংগঠনগুলো প্যাক্সটনের পক্ষে বিপুল অর্থ ব্যয় করছে।
মাস্কের কাছ থেকে এই নির্বাচনে ১৭ কোটি ডলারের বেশি অর্থ এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ট্রাম্পের রাজনৈতিক সংগঠন ম্যাগা ইনকরপোরেটেড ব্যয় করেছে আরও প্রায় চার কোটি ডলার।
রিপাবলিকানপন্থী বিজ্ঞাপনগুলোতে টালারিকোর অতীতের কিছু বক্তব্য তুলে ধরে তাঁকে আক্রমণ করা হচ্ছে। বিশেষ করে রূপান্তরকামী মানুষের অধিকার, শ্বেতাঙ্গ উগ্রবাদ এবং জীবাশ্ম জ্বালানি ও গরুর মাংসশিল্প নিয়ে তাঁর আগের মন্তব্যগুলো প্রচারের বিষয় হয়েছে। টালারিকো অবশ্য কিছু বক্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়েছেন এবং বলেছেন, তাঁর মন্তব্যের কয়েকটি ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
শেষ মুহূর্তে ফল বদলে যাওয়ার আশঙ্কা
তবে টালারিকোর এগিয়ে থাকার চিত্রকে নিশ্চিত জয়ের ইঙ্গিত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। অধিকাংশ জরিপে তাঁর ব্যবধান ভুলের সীমার কাছাকাছি। ২০১৮ সালে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী বেটো ওরুর্ক বিপুল অর্থ সংগ্রহ ও জাতীয় মনোযোগ পেয়েও টেড ক্রুজের কাছে মাত্র দুই শতাংশের কিছু বেশি ব্যবধানে হেরেছিলেন।
এবারও রিপাবলিকানদের শেষ মুহূর্তের প্রচার এবং ট্রাম্পের ধারাবাহিক নির্বাচনী সফর ভোটার উপস্থিতির হিসাব বদলে দিতে পারে। আগাম ভোটে ডেমোক্র্যাটদের সুবিধা থাকলেও নির্বাচনের দিন রিপাবলিকান ভোটারদের বড় উপস্থিতি সেই ব্যবধান কমিয়ে দিতে পারে।
টেক্সাসে ডেমোক্র্যাটদের দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার কারণে দলের সমর্থকদের মধ্যেও প্রত্যাশা ও সংশয় পাশাপাশি রয়েছে। কয়েক দশক ধরে পরিবর্তনের আশা দেখেও জয় না পাওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁদের সতর্ক করে রেখেছে।
তবু এবারের নির্বাচন নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে—টেক্সাস কি শেষ পর্যন্ত রিপাবলিকানদের দীর্ঘদিনের নিরাপদ রাজনৈতিক ঘাঁটি হিসেবেই থাকবে, নাকি অঙ্গরাজ্যটির নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন প্রতিযোগিতার সূচনা হবে?
টেক্সাস সিনেট নির্বাচন: রিপাবলিকান আধিপত্য ভাঙার চ্যালেঞ্জে ডেমোক্র্যাট জেমস টালারিকো।












