সুদানের যুদ্ধের দিকে তাকালে প্রথমেই যে দৃশ্যগুলো চোখে পড়ে, সেগুলো মানবিক বিপর্যয়ের। লাখো মানুষ বাস্তুচ্যুত, খাদ্যসংকট তীব্র, রোগ ছড়িয়ে পড়ছে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়েছে। কিন্তু এই ভয়াবহতার পেছনে আরও একটি বাস্তবতা কাজ করছে—যুদ্ধ এখন আর কেবল রাজনৈতিক বা সামরিক সংঘাত নয়। এটি এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় রূপ নিয়েছে, যেখানে সহিংসতা নিজেই সম্পদ তৈরি করছে।
এই দিকটি না বুঝলে সুদানের যুদ্ধ কেন এত দীর্ঘ হচ্ছে, তার উত্তরও অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
২০২৩ সালের এপ্রিলে সুদানের সশস্ত্র বাহিনী ও র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের সংঘাত শুরুর পেছনে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও সম্পদের নিয়ন্ত্রণের প্রতিযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর সেই প্রতিযোগিতা আরও বিস্তৃত হয়েছে। সোনা, চোরাচালান, অনানুষ্ঠানিক কর, সম্পদ দখল, বাণিজ্যপথ এবং সরবরাহব্যবস্থার ওপর নিয়ন্ত্রণ এখন সংঘাতের অর্থনৈতিক ভিত্তি তৈরি করছে।
যুদ্ধ যখন আয়ের উৎস হয়ে ওঠে
সুদানে সামরিক ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের অর্থনৈতিক ভূমিকা যুদ্ধ শুরুর আগের বিষয়। দীর্ঘদিন ধরেই এসব প্রতিষ্ঠান ব্যবসা, প্রাকৃতিক সম্পদ, জমি, অবকাঠামো, কৃষি ও কৌশলগত অর্থনৈতিক খাতে প্রভাব বিস্তার করেছে। ২০১৯ সালে ওমর আল-বশির ক্ষমতাচ্যুত হলেও এই অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কগুলো পুরোপুরি ভেঙে যায়নি। বরং বিভিন্ন ক্ষমতাকেন্দ্র নিজেদের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার পাশাপাশি তা বাড়ানোর চেষ্টা করেছে।
দক্ষিণ সুদান স্বাধীন হওয়ার পর সুদান তার তেল আয়ের বড় অংশ হারায়। এর পর সোনা হয়ে ওঠে দেশটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি পণ্যের একটি। খনি থেকে শুরু করে পরিবহনপথ, বাণিজ্য ও রপ্তানি চ্যানেল—সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ অর্থনৈতিক শক্তির পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রভাবের উৎস হয়ে ওঠে।
যুদ্ধ সেই প্রবণতাকে আরও তীব্র করেছে। রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো বিভিন্ন অঞ্চলে নিজেদের রাজস্বব্যবস্থা তৈরি করার সুযোগ পেয়েছে। কোনো ভূখণ্ডের গুরুত্ব এখন শুধু সামরিক অবস্থানের কারণে নয়; সেটি কতটা অর্থনৈতিক আয় দিতে পারে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
একটি সীমান্তপথ মানে চোরাচালানের সুযোগ। একটি বাজার মানে অর্থ আদায়ের সুযোগ। একটি খনিজসমৃদ্ধ অঞ্চল মানে সম্পদের ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ। একটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক মানে পণ্য পরিবহনের ওপর কর বা চাঁদা বসানোর সুযোগ।
এই বাস্তবতায় যুদ্ধ নিজেই অর্থনৈতিকভাবে টেকসই হয়ে উঠতে পারে।
চেকপোস্ট থেকে গড়ে ওঠা বিকল্প অর্থনীতি
সুদানের বিভিন্ন অঞ্চলে সড়ক, সীমান্ত, বাজার ও পরিবহনকেন্দ্র ঘিরে অনানুষ্ঠানিক অর্থ আদায়ের ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। ব্যবসায়ী, কৃষক, পরিবহনকারী এমনকি সাধারণ মানুষকেও একাধিক জায়গায় অর্থ দিতে হয়। এই অর্থ রাষ্ট্রীয় রাজস্বে জমা না হয়ে সংঘাতসংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কের হাতে চলে যায়।
এর রাজনৈতিক প্রভাবও গভীর। রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব যত দুর্বল হয়, স্থানীয় সশস্ত্র শক্তির আর্থিক ক্ষমতা তত বাড়ে। ফলে ভূখণ্ডের বিভাজন শুধু রাজনৈতিক বা সামরিক বাস্তবতা থাকে না; এটি অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্গেও যুক্ত হয়ে যায়।
শান্তি তাই কিছু মানুষের জন্য যুদ্ধের চেয়ে বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে।
এই জায়গাটিই শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলোর একটি। যদি যুদ্ধের মাধ্যমে অর্থ উপার্জনের পথ খোলা থাকে, তাহলে কেবল যুদ্ধবিরতির আহ্বান কিংবা সামরিক চাপ দীর্ঘস্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে পারে না।
সোনার পেছনে বৈশ্বিক অর্থনীতি
সুদানের যুদ্ধ অর্থনীতির কেন্দ্রে রয়েছে সোনা। কিন্তু সোনাকে আলাদা করে দেখলে পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। পশুসম্পদ, কৃষিপণ্য, জ্বালানি, পরিবহন এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক পণ্যও সংঘাতের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার অংশ হয়ে উঠেছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সীমান্তপারের বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক। সুদানের যুদ্ধ অর্থনীতি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংযুক্ত। সোনা, জ্বালানি, পশুসম্পদ ও অস্ত্র বিভিন্ন সীমান্তপথ দিয়ে চলাচল করতে পারে। এসব কার্যক্রমের সঙ্গে ব্যবসায়ী, অর্থদাতা, পরিবহনকারী এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক স্বার্থ যুক্ত হয়ে পড়তে পারে।
ফলে সংঘাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত নয়—এমন কিছু পক্ষও অস্থিতিশীলতা থেকে বস্তুগত সুবিধা পেতে পারে। এটাই যুদ্ধ অর্থনীতির সবচেয়ে বিপজ্জনক বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি। যুদ্ধের ধ্বংস যত বাড়ে, সমাজের উৎপাদনশীল অর্থনীতি তত সংকুচিত হয়; কিন্তু সংঘাত থেকে লাভবান হওয়ার নেটওয়ার্কগুলো একই সময়ে টিকে থাকতে পারে।
মানুষ দরিদ্র হয়, যুদ্ধের ব্যবসা বাড়ে।
শান্তি আলোচনায় অর্থনীতিকে কেন্দ্রে আনতে হবে
সুদানে শান্তি প্রতিষ্ঠার ভবিষ্যৎ উদ্যোগে তাই শুধু কে রাষ্ট্রক্ষমতা ভাগ করবে, তা যথেষ্ট নয়। প্রশ্ন হতে হবে—কে সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করবে? সামরিক মালিকানাধীন ব্যবসার ভবিষ্যৎ কী? কৌশলগত খনিজ ও অন্যান্য সম্পদের রাজস্ব কীভাবে ব্যবহৃত হবে? যুদ্ধের সময়ে দখল করা সম্পদের কী হবে? রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে পুনর্গঠিত হবে?
এসব প্রশ্ন বাদ দিয়ে রাজনৈতিক সমঝোতা করা হলে সংঘাতের মূল অর্থনৈতিক কারণগুলো অক্ষত থাকতে পারে। ফলে একটি যুদ্ধবিরতি স্থায়ী শান্তির পরিবর্তে সাময়িক বিরতিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
একই সঙ্গে সংঘাতের অর্থায়ন বন্ধ করতে নিষেধাজ্ঞার কাঠামোকেও আরও লক্ষ্যভিত্তিক করতে হবে। শুধু ব্যক্তিকে শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে যে ব্যবসায়িক নেটওয়ার্কগুলো সংঘাতের অর্থ জোগায়, সেগুলো শনাক্ত করা জরুরি। সোনা রপ্তানি, অস্ত্র সংগ্রহ, অর্থপাচার, সম্পদ স্থানান্তর ও চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত ব্যবস্থাগুলোকে লক্ষ্য করতে হবে।
তবে এর সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতাও রয়েছে। এমন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা নেওয়া যাবে না, যার বোঝা সাধারণ সুদানিদের ওপর গিয়ে পড়ে। অতীতের ব্যাপক নিষেধাজ্ঞার অভিজ্ঞতা এখানে সতর্কতার কারণ।
আন্তর্জাতিক বাজারের দায়ও আছে
সুদানের সোনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজারের স্বচ্ছতা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো সোনা কোথা থেকে এসেছে, তার উৎস কী এবং সংঘাতের সঙ্গে তার সম্পর্ক রয়েছে কি না—এসব তথ্য যাচাইয়ের ব্যবস্থা শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
কারণ সংঘাতপূর্ণ পরিবেশ থেকে উৎপাদিত সোনা যদি আন্তর্জাতিক বাজারে পর্যাপ্ত যাচাই ছাড়াই প্রবেশ করতে পারে, তাহলে বৈশ্বিক চাহিদা পরোক্ষভাবে যুদ্ধ অর্থনীতিকে অর্থ জোগাতে পারে।
এখানে শুধু সুদানের সরকারের দায়িত্ব নেই। সরকার, সোনা পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠান, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যকেন্দ্র—সব পক্ষেরই সরবরাহশৃঙ্খলে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ভূমিকা রয়েছে।
সীমান্তের বাস্তবতাও উপেক্ষা করা যাবে না। সুদানের যুদ্ধ অর্থনীতি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে যুক্ত। ফলে চোরাচালান বন্ধ, সীমান্ত ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা এবং সন্দেহজনক আর্থিক প্রবাহ পর্যবেক্ষণের জন্য আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রয়োজন। কিন্তু এ কাজ সহজ নয়। কারণ যুদ্ধকালীন বাণিজ্য থেকে কিছু প্রতিবেশী অর্থনৈতিক সুবিধা পেতে পারে।
যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই পুনর্গঠনের প্রস্তুতি
সুদানের যুদ্ধ শেষ হলে পুনর্গঠনের জন্য বিপুল আন্তর্জাতিক অর্থ আসার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু সেই অর্থ কীভাবে ব্যবহৃত হবে, তা যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সিদ্ধান্ত নিলে অনেক দেরি হয়ে যেতে পারে।
যে নেটওয়ার্কগুলো যুদ্ধ থেকে লাভ করেছে, তারা পুনর্গঠনের অর্থ ও বিনিয়োগ থেকেও সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। তাই শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক সহায়তার সঙ্গে স্বচ্ছতা, বেসামরিক তদারকি, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও জবাবদিহি যুক্ত করতে হবে।
আর এই পুনর্গঠনের আলোচনায় সুদানের বেসামরিক সমাজকে কেন্দ্রে রাখতে হবে। শ্রমিক সংগঠন, পেশাজীবী প্রতিষ্ঠান, নাগরিক সমাজ, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও স্বাধীন অর্থনৈতিক শক্তিগুলোর অংশগ্রহণ ছাড়া জাতীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনায় নতুন বৈধতা তৈরি করা কঠিন হবে।
সুদানের যুদ্ধ তাই কেবল বন্দুকের লড়াই নয়। এটি সম্পদ নিয়ন্ত্রণের লড়াই, রাজস্বের লড়াই এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতার লড়াই। যতদিন সোনা, চোরাচালান, অনানুষ্ঠানিক কর, সামরিক ব্যবসা ও সীমান্তপারের বাণিজ্য সংঘাতকে অর্থ জোগানোর সুযোগ তৈরি করবে, ততদিন যুদ্ধ থামানোর রাজনৈতিক উদ্যোগও কঠিন থাকবে।
সত্যিকারের শান্তির অর্থ শুধু অস্ত্রবিরতি নয়। শান্তির অর্থ হলো এমন একটি অর্থনৈতিক কাঠামো তৈরি করা, যেখানে যুদ্ধের তুলনায় শান্তি বেশি কার্যকর ও লাভজনক পথ হয়ে ওঠে।
সুদানের মানুষ এমন একটি রাষ্ট্র পাওয়ার অধিকার রাখে, যেখানে জাতীয় সম্পদ জনগণের কল্যাণে ব্যবহৃত হবে, সশস্ত্র গোষ্ঠীর শক্তি বাড়াতে নয়। যুদ্ধের অর্থনৈতিক ভিত্তি অক্ষত রেখে শান্তির রাজনৈতিক কাঠামো নির্মাণ করলে সেই শান্তি ভঙ্গুরই থেকে যাবে।
সুদানের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন তাই যুদ্ধ কীভাবে থামবে, তার পাশাপাশি—যুদ্ধকে লাভজনক করে তোলা অর্থনীতিকে কীভাবে ভাঙা হবে।












