রাত ১টা বাজতেই হালদারের অ্যালার্ম বেজে ওঠে। ৩৪ বছর বয়সী এই বাংলাদেশি ব্যাংক কর্মকর্তা ঘুম থেকে উঠে রান্নাঘরের দিকে যান। কাজের জন্য নয়, পরিবারের জন্য রান্না করতে। ঢাকায় চলমান জ্বালানি সংকট এতটাই তীব্র যে, পাইপলাইনের গ্যাসের চাপ রান্নার জন্য যথেষ্ট থাকে মূলত গভীর রাতেই।
প্রায় চার কোটি মানুষের শহর ঢাকায় জ্বালানি সংকট দৈনন্দিন জীবনকে স্থবির করে দিচ্ছে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের জন্য সন্ধ্যার পরপরই অনেক সরকারি ও জনসাধারণের ব্যবহৃত স্থান অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। মানুষকে এখন বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সরবরাহের সঙ্গে নিজেদের জীবনযাত্রার সময়সূচি মিলিয়ে নিতে হচ্ছে।
হালদার বলেন, “সরকারের কাছে আমি অসাধারণ কিছু চাই না। চুলা জ্বালালে গ্যাস পেতে চাই, বাতি জ্বালালে বিদ্যুৎ পেতে চাই, কল খুললে পরিষ্কার পানি পেতে চাই। এগুলো কোনো বিলাসিতা নয়।”
“কিছু কিছু রাতে তিন ঘণ্টা ঘুমাই, কখনো তারও কম। এরপরও আমাকে মা হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে হয়, সংসার সামলাতে হয় এবং অফিসে পুরো দিন কাজ করতে হয়—যেন সবকিছু স্বাভাবিক।”
যুদ্ধের প্রভাব ও আমদানিনির্ভরতার সংকট
বাংলাদেশে চলমান জ্বালানি সংকটের পেছনে আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির বড় ভূমিকা রয়েছে। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ এবং হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মধ্যপ্রাচ্য থেকে গুরুত্বপূর্ণ গ্যাস সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা। দেশে নিজস্বভাবে পর্যাপ্ত জ্বালানি উৎপাদন হয় না। ফলে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসা গ্যাসের ওপর ব্যাপক নির্ভরতা তৈরি হয়েছে।
ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এই যুদ্ধ শুরু হয়। এর আগে ২০২৪ সালের আন্দোলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা ওই সরকার রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনার অভিযোগের মুখে ছিল।
অন্তর্বর্তী সরকারের পর নতুন সরকার দেশের জন্য নতুন পথ তৈরির দায়িত্ব নেয়। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের অল্প সময়ের মধ্যেই আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংকট নতুন চাপ তৈরি করে।
জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য সরকার দোকান, বাজার ও বিপণিকেন্দ্র রাত ৮টার মধ্যে বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে, যা আগের অনুমোদিত সময়ের চেয়ে এক ঘণ্টা কম। আলোকিত বিজ্ঞাপনও সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ করতে বলা হয়েছে। হাসপাতাল, ওষুধের দোকান, খাদ্যপণ্য বিক্রির প্রতিষ্ঠান ও জরুরি সেবার ক্ষেত্রে অবশ্য ছাড় দেওয়া হয়েছে।
অন্ধকারে ঢাকা বাংলাদেশ
গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও কঠিন। আগস্টে বাংলাদেশের কিছু এলাকায় মানুষ দিনে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎবিহীন ছিলেন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সংকটের সবচেয়ে খারাপ সময়ে জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ ঘাটতি ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গিয়েছিল।
তবে পরিবর্তনটি সবচেয়ে স্পষ্ট ঢাকায়। মোহাম্মদপুর, কারওয়ান বাজার ও ধানমন্ডির মতো অফিস, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দোকানে পরিপূর্ণ এলাকাগুলোর দীর্ঘ সড়ক এখন সন্ধ্যার পর অস্বাভাবিক অন্ধকার হয়ে যায়।
সংকটের কারণে নগরবাসীকে প্রতিদিন নানা হিসাব করতে হচ্ছে—কখন গ্যাসের চাপ বাড়বে, গরম ও আর্দ্রতার মধ্যে কতক্ষণ পাখা চালানো যাবে, আর পেট্রল পাম্পে জ্বালানির লাইনে কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে।
জ্বালানি সংকটের কারণে পরিবহন ব্যবস্থাতেও চাপ বেড়েছে। ঢাকায় পেট্রল পাম্পে দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে এবং জ্বালানির ঘাটতিতে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে।
বাড়ছে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা
জ্বালানি সংকটের প্রভাব এখন খাদ্যনিরাপত্তাতেও পড়ছে। বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশনের হিসাবে, বছরের শেষ কয়েক মাসে বাংলাদেশে খাদ্যনিরাপত্তাহীন মানুষের সংখ্যা আরও প্রায় ৩০ লাখ বাড়তে পারে।
গ্রীষ্মকালের ১ কোটি ৫৩ লাখ মানুষের হিসাবের তুলনায় এই সংখ্যা প্রায় ১৮ শতাংশ বেশি।
ঢাকার কেন্দ্রীয় এলাকা মোহাম্মদপুরে বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের একটি কর্মশালা চালান ৫০ বছর বয়সী আহমেদ। তিনি শুধু নিজের শেষ নাম প্রকাশ করতে চান। তুলনামূলক কম ভাড়ার কারণে তিনি ঢাকার উপকণ্ঠ কেরানীগঞ্জে থাকেন।
বছরের পর বছর যে যাতায়াত তিনি স্বাভাবিকভাবে করে এসেছেন, এখন সেটিই তার কাছে আতঙ্কের বিষয় হয়ে উঠেছে। দোকান বন্ধ করার পর পরিবহন পাওয়া কঠিন ও ব্যয়বহুল হয়ে যায়। অন্ধকার রাস্তায় ছিনতাইয়ের শঙ্কাও থাকে।
আহমেদ বলেন, “দোকান বন্ধ করার সময় এরই মধ্যে অন্ধকার হয়ে যায়। এরপর বাড়ি ফেরার পুরো পথ ভাবতে থাকি—কেউ আমাকে থামাবে কি না, ছিনতাই করবে কি না, ফোন ও টাকা নিয়ে যাবে কি না।”
“কখনো মনে হয় দেশ ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাই। কিন্তু আমার বয়স ৫০। যাওয়ার মতো প্রয়োজনীয় টাকা নেই। তাই ভাবি, আবার মনে হয় আমার যাওয়ার কোনো জায়গাই নেই।”
চাহিদার তুলনায় গ্যাসের ঘাটতি
বাংলাদেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ১০ কোটি ৭০ লাখ থেকে ১১ কোটি ৩০ লাখ ঘনমিটার। বিপরীতে সরবরাহ রয়েছে প্রায় ৭ কোটি ৪০ লাখ ঘনমিটার।
অর্থাৎ চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে।
বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহের প্রায় অর্ধেক মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের কারণে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের আমদানিতে বড় ধাক্কা লেগেছে। জুলাই থেকে আগস্টের মধ্যে এই গ্যাস আমদানি ৮৩ শতাংশ কমে যায়।
এর ওপর ২১ জুলাইয়ের অগ্নিকাণ্ডে বাংলাদেশের দুটি ভাসমান তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস টার্মিনালের একটি অচল হয়ে যায়। ফলে সংকট আরও তীব্র হয়।
গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতির কারণে কারখানাগুলোকে ব্যয়বহুল জেনারেটর চালাতে হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমিয়েছে, আবার কিছু কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধও হয়ে গেছে। এর প্রভাব পড়ছে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয়ের ওপর।
শিল্প ও কৃষিতেও চাপ
ঢাকার নীতি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণা পরিচালক খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, সাম্প্রতিক সরবরাহ বিঘ্ন বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের দুর্বলতাগুলোকে আরও স্পষ্ট করেছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, সরকারি পরিষেবা ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের দুর্বলতার সঙ্গে নতুন সংকট যুক্ত হওয়ায় পরিবারগুলোর পাশাপাশি বস্ত্র, সিরামিক, কাচ ও ইস্পাতশিল্প, পরিবহন, কৃষি, মৎস্য এবং সাধারণ ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মোয়াজ্জেম বলেন, জ্বালানি সংকটের কারণে বাংলাদেশের প্রায় সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডই স্বাভাবিক সক্ষমতার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম মাত্রায় চলছে।
কৃষিতেও এর প্রভাব পড়ছে। জ্বালানি সংকটে কৃষকেরা সেচের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারছেন না। ফলে পুকুরের পাশে বসানো জেনারেটর চালানোর মতো জ্বালানি না থাকায় ধানের জমি শুকিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাজারের হিসাবেই সংকটের বাস্তবতা
ঢাকার কৃষিবাজারে ৪১ বছর বয়সী আলেয়া বেগম চা ও পথের খাবারের ছোট একটি দোকান চালান। এটিই তার পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস। এই আয় দিয়ে ছেলের পড়াশোনার খরচ চলে। মেয়ের বিয়ের জন্যও তিনি কিছু অর্থ জমাচ্ছিলেন।
কিন্তু সবজির দাম বেড়ে যাওয়ায় পরিবারের খাবার জোগাতে গিয়ে তাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
আলেয়া বলেন, “আগে খুব বেশি টাকা খরচ না করেই একটি ব্যাগে সবজি ভরে ফেলতে পারতাম। এখন এক ব্যাগ টাকা খরচ করেও ব্যাগটা ভরতে পারি না।”
তিনি মাছ ও মাংস কেনা কমিয়ে দিয়েছেন। ডিম কেনার ক্ষেত্রেও এখন তাকে দুবার ভাবতে হয়।
বিদ্যুৎ ঘাটতি কত মেগাওয়াট, সরকার উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া অর্থনৈতিক সংকট কতটা, কিংবা বিদেশের যুদ্ধের কারণে পরিস্থিতি কতটা খারাপ হয়েছে—এসব পরিসংখ্যান ও বিতর্ক তার কাছে মুখ্য নয়।
তার কাছে সংকটের বাস্তবতা ধরা পড়ে বাজারে।
আলেয়া বলেন, “সরকার অনেক কথা বলতে পারে, কিন্তু আমরা বাজারের দিকে তাকাই। দাম যদি না কমে এবং আমাদের জীবন যদি সহজ না হয়, তাহলে কীভাবে বুঝব যে কিছু পরিবর্তন হয়েছে?”
“আমার বড় কোনো প্রতিশ্রুতি দরকার নেই। আমি শুধু চাই বাজারে গিয়ে পরিবারের খাবার কিনতে, বাড়ি ফিরতে এবং আগামীকাল কীভাবে চলব, সেটা নিয়ে দুশ্চিন্তা না করতে।”












