ছয় বছর বয়সে বক্সিংয়ে হাতেখড়ি। কিশোর বয়সেই একের পর এক জাতীয় শিরোপা। বিখ্যাত কোচ ব্রেন্ডন ইংলের চোখে তিনি ছিলেন কিংবদন্তি প্রিন্স নাসিম হামেদের চেয়েও সম্ভাবনাময়। সংবাদপত্র, বই, আলোকচিত্রী ও চলচ্চিত্র নির্মাতাদের ক্যামেরা—সবই যেন ঘিরে ধরেছিল তাঁকে।
তখন তাঁর নাম ড্যানিয়েল টিসডেল। ব্রিটিশ বক্সিংয়ে তাঁকে বলা হচ্ছিল ‘পরবর্তী প্রিন্স নাসিম’। কিন্তু যে ক্যারিয়ার থেকে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার গল্প তৈরি হওয়ার কথা ছিল, শেষ পর্যন্ত সেটি থেমে যায় মাত্র পাঁচটি পেশাদার লড়াইয়ের পর।
টিসডেলের গল্প তাই শুধু একজন প্রতিভাবান বক্সারের ব্যর্থতার গল্প নয়। এটি অতিরিক্ত প্রত্যাশা, অস্থির ব্যবস্থাপনা, ভুল পরামর্শ, ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েন এবং একজন তরুণ প্রতিভার চারপাশে তৈরি হওয়া অতিরিক্ত প্রচারের গল্পও।
ছোট বয়সেই নজর কাড়েন
টিসডেল ছয় বছর বয়সে বক্সিং শুরু করেন। খুব অল্প বয়সেই তাঁর প্রতিভা নজরে পড়ে বিখ্যাত কোচ ব্রেন্ডন ইংলের। ইংলের শেফিল্ডের জিম থেকেই উঠে এসেছিলেন প্রিন্স নাসিম হামেদসহ একাধিক বিশ্বমানের বক্সার।
টিসডেলকে ছোটবেলা থেকেই গড়ে তুলছিলেন ইংল। তাঁর প্রতিভা নিয়ে কোচ এতটাই আশাবাদী ছিলেন যে ১৯৯৭ সালে আলোকচিত্রী সাইমন রবার্টস যখন প্রিন্স নাসিমের ছবি তুলতে জিমে গিয়েছিলেন, তখন ইংল তাঁকে নাসিমের বদলে কোণের দিকে থাকা এক কিশোরের ছবি তুলতে বলেন।
সেই কিশোরই ছিলেন টিসডেল।
রবার্টসের ভাষ্য অনুযায়ী, ইংল তাঁকে বলেছিলেন—এই ছেলেটি একদিন নাসিমের চেয়েও বড় হতে পারে।
এরপর রবার্টস টিসডেলের ক্যারিয়ার অনুসরণ করতে শুরু করেন। অন্যদিকে চলচ্চিত্র নির্মাতা স্টুয়ার্ট মিচেলও তাঁকে নিয়ে তথ্যচিত্র তৈরির কাজ শুরু করেন। সেই তথ্যচিত্রের ধারণাটিই ছিল—‘পরবর্তী প্রিন্স নাসিম কে?’
নাসিমের সঙ্গে তুলনা
টিসডেলের প্রতিভা নিয়ে তখন শুধু প্রচারই হচ্ছিল না, তাঁর পারফরম্যান্সও ছিল নজরকাড়া। তিনি ধারাবাহিকভাবে জাতীয় পর্যায়ের শিরোপা জিতছিলেন। সাবেক সতীর্থ আমের খান তাঁকে অসাধারণ প্রতিভাবান হিসেবে স্মরণ করেছেন।
টিসডেলের ফুটওয়ার্ক আরও উন্নত করতে বক্সিংয়ের পাশাপাশি ব্যালে ও জিমন্যাস্টিকসও শেখানো হয়েছিল। তাঁর নিজের ভাষায়, তিনি ছিলেন সহজে শেখানো যায় এমন একজন বক্সার, মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পারতেন, দেখতে আকর্ষণীয় ছিলেন এবং বক্সিংও জানতেন।
সব মিলিয়ে তাঁকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল তারকা হওয়ার একটি পূর্ণাঙ্গ ছবি।
প্রিন্স নাসিম হামেদ তখন বক্সিংয়ের পাশাপাশি গণমাধ্যমেও বিশাল তারকা। তাঁর জনপ্রিয়তা ইংলের জিমের অন্য বক্সারদের ওপরও আলো ফেলেছিল। টিসডেল সেই আলোয় খুব দ্রুত সামনে চলে আসেন।
নাসিম-ইংল বিচ্ছেদ এবং টিসডেলের পথ বদল
১৯৯৮ সালে প্রিন্স নাসিম ও ব্রেন্ডন ইংলের বিচ্ছেদ বক্সিং জগতে বড় ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। টিসডেলের মতে, এর পর ইংলের মনোযোগ নতুন প্রজন্মের বক্সারদের কাছ থেকে কিছুটা সরে যায়।
টিসডেলও শেষ পর্যন্ত ইংলের জিম ছেড়ে দেন। তিনি তিনবারের বিশ্ব শিরোপার চ্যালেঞ্জার হেরল ‘বোম্বার’ গ্রাহামের সঙ্গে কাজ শুরু করেন।
তাঁর বাবা ছেলের ক্যারিয়ারকে এগিয়ে নিতে নিজের জীবন ও কাজের বড় অংশ ত্যাগ করেছিলেন। টিসডেলের উত্থানের সঙ্গে যুক্ত হন এমন এক ব্যবসায়ীও, যার আগে বক্সিংয়ে কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না, কিন্তু টিসডেলের সম্ভাবনায় বিনিয়োগ করার আগ্রহ ছিল।
গ্রাহামের সঙ্গে নতুনভাবে কাজ করাকে টিসডেল তখন ‘স্বস্তির বাতাস’ হিসেবে দেখেছিলেন। কিন্তু তাঁর চারপাশে ধীরে ধীরে এমন অনেক মানুষ জড়ো হতে থাকেন, যাদের প্রত্যেকেরই তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজস্ব আগ্রহ ছিল।
আলোকচিত্রী রবার্টসের ভাষায়, অনেকেই টিসডেলকে ঘিরে নিজেদের সুযোগ খুঁজছিলেন।
‘সবাই আমার একটা অংশ চাইছিল’
টিসডেল নিজেই তাঁর সেই সময়ের পরিস্থিতিকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, তিনি যেন এমন এক আকর্ষণে পরিণত হয়েছিলেন, যেখানে সবাই তাঁর কাছ থেকে কিছু পেতে চাইছিল।
তিনি ছিলেন তরুণ, প্রতিভাবান এবং ইতিমধ্যে জাতীয় সংবাদমাধ্যমের আলোচনায়। ফলে তাঁর চারপাশে প্রশিক্ষক, ব্যবস্থাপক ও প্রচারকদের পরিবর্তন হতে থাকে।
রবার্টসের মতে, টিসডেলকে অনেক সময় এমন একজন সম্ভাবনাময় বক্সার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল, যাকে হারাতে পারলে অন্য কোনো বক্সার নিজের অবস্থান শক্ত করতে পারত।
এই অস্থিরতাই ধীরে ধীরে তাঁর ক্যারিয়ারের ওপর প্রভাব ফেলতে থাকে।
পেশাদার ক্যারিয়ারের শুরুতেই ধাক্কা
টিসডেলের পেশাদার অভিষেকও স্বাভাবিক ছিল না। দর্শকদের মধ্যে দাঙ্গার কারণে তাঁর প্রথম লড়াই বাতিল হয়ে যায়। পরের বছর একটি লড়াইয়ের আগে তিনি মৃত্যুর হুমকিও পান।
যদিও সেই লড়াই তিনি জিতেছিলেন, শুরু থেকেই তাঁর পেশাদার ক্যারিয়ারের চারপাশে তৈরি হতে থাকে নানা অস্বাভাবিক পরিস্থিতি।
পাঁচ বছর ধরে টিসডেলকে অনুসরণ করার পর মিচেলের তথ্যচিত্রের কাজও শেষ পর্যন্ত থেমে যায়। সম্প্রচারকরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলায় প্রকল্পটি আর এগোয়নি।
মিচেলের নিজেরও একপর্যায়ে মনে হয়েছিল, টিসডেলের ক্যারিয়ার যে দিকে যাওয়ার কথা ছিল, সেটি আর সেদিকে যাচ্ছে না।
প্রতিভার সঙ্গে মনোযোগও হারিয়ে গেল
টিসডেলের ব্যক্তিগত জীবনও তাঁর বক্সিং ক্যারিয়ার থেকে মনোযোগ সরিয়ে নেয়। নিজের ক্যারিয়ারের দিকে ফিরে তাকিয়ে তিনি স্বীকার করেছেন, নারীদের প্রতি তাঁর আগ্রহ তাঁর অন্যতম দুর্বলতা হয়ে উঠেছিল।
তিনি বলেন, একসময় তিনি নিজের সেই তীক্ষ্ণতা ও মনোযোগ হারিয়ে ফেলেছিলেন, যা শীর্ষ পর্যায়ের বক্সিংয়ে প্রয়োজন।
ততদিনে ‘পরবর্তী প্রিন্স নাসিম’ হওয়ার প্রত্যাশা তাঁর ওপর আরও বড় চাপ তৈরি করেছিল। ছোটবেলায় যে অতিরিক্ত প্রশংসা তাঁকে সামনে নিয়ে এসেছিল, পেশাদার পর্যায়ে সেটিই যেন বড় প্রত্যাশায় পরিণত হয়।
মাত্র পাঁচটি পেশাদার লড়াই
২০০৫ সালে লাইট-হেভিওয়েট বিভাগে একটি লড়াইয়ে প্রথম রাউন্ডেই থেমে যান টিসডেল। সেটিই ছিল তাঁর প্রথম পেশাদার পরাজয়। এরপর তিনি বক্সিং ছেড়ে দেন।
পাঁচ বছর পর, ২০১০ সালে তিনি আবার ফিরে আসেন। পুরোনো কোচ ব্রেন্ডন ইংলের সঙ্গে পুনর্মিলন হয়। ফিরে এসে একটি লড়াইও জেতেন তিনি।
কিন্তু এরপর আর এগোননি।
টিসডেলের পেশাদার ক্যারিয়ার শেষ হয় সাত বছরে মাত্র পাঁচটি লড়াইয়ের পর।
তাঁর নিজের হিসাব ছিল আরও কঠিন। তিনি মনে করতেন, ২৭ বছর বয়সে তাঁর বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়ে শিরোপা রক্ষা করার কথা ছিল।
কিন্তু বাস্তবে সেই জায়গায় তিনি কখনো পৌঁছাতে পারেননি।
তবু নিজের অতীতকে অস্বীকার করেন না
টিসডেলের ক্যারিয়ারের দিকে তাকালে ভুল ব্যবস্থাপনা, অস্থিরতা, নানা মানুষের হস্তক্ষেপ এবং ব্যক্তিগত জীবনের নানা বিষয় সামনে আসে। তাঁর আলোকচিত্রী রবার্টসের মতে, টিসডেলের সম্ভাবনা পূর্ণতা না পাওয়ার পেছনে দুর্ভাগ্যজনক নানা পরিস্থিতি কাজ করেছে। তাঁর ভাষায়, অনেক ভুল পরামর্শ ছিল এবং অনেক মানুষ তাঁর কাছ থেকে কিছু পাওয়ার চেষ্টা করেছিল।
তবে টিসডেল নিজের অতীতকে ব্যর্থতা হিসেবে দেখেন না।
বক্সিং তাঁকে কী দিয়েছে—সেই প্রশ্নে তাঁর উত্তর বরং ভিন্ন।
আজ তিনি সম্পূর্ণ অন্য একটি পেশায় কাজ করছেন—সহায়তা কর্মী হিসেবে। তাঁর কাছে এই কাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো স্থিরতা।
একসময় যাঁকে ঘিরে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন দেখা হয়েছিল, সেই টিসডেল এখন খ্যাতির বদলে স্থিতিশীল জীবনকেই বেশি গুরুত্ব দেন।
তাঁর ভাষায়, তিনি যে জীবন পেয়েছেন, সেটিই তাঁকে আজকের মানুষ হিসেবে তৈরি করেছে। একসময় যে পরিচিতি ও খ্যাতির কথা কল্পনা করা হয়েছিল, তা আর আসেনি। কিন্তু নিজের জীবনের বর্তমান অবস্থান নিয়ে তাঁর কোনো আফসোস নেই।
প্রিন্স নাসিম হামেদের উত্তরসূরি হিসেবে যাত্রা শুরু করা ড্যানিয়েল টিসডেলের গল্প শেষ পর্যন্ত বিশ্বচ্যাম্পিয়নের মুকুটে গিয়ে থামেনি। বরং এটি হয়ে উঠেছে এমন এক প্রতিভার গল্প, যার সম্ভাবনা ছিল অনেক দূর যাওয়ার, কিন্তু ক্যারিয়ারের পথে একের পর এক অস্থিরতা সেই সম্ভাবনাকে পূর্ণ হতে দেয়নি।












