গাজা যুদ্ধ ঘিরে তীব্র রাজনৈতিক ও মানবিক বিতর্কের মধ্যেই উয়েফা নেশন্স লিগের ম্যাচে ইসরায়েলকে ৩-০ গোলে হারিয়েছে আয়ারল্যান্ড। তবে ম্যাচটির ফলের চেয়েও বেশি আলোচনায় এসেছে মাঠের পরিবেশ এবং আইরিশ খেলোয়াড়দের প্রতীকী প্রতিবাদ।
রোববার হাঙ্গেরির দেব্রেসেনের প্রায় ফাঁকা স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে আয়ারল্যান্ডের খেলোয়াড়েরা গাজা সংঘাতে নিহত সব মানুষের স্মরণে কালো বাহুবন্ধনী পরে মাঠে নামেন। ইসরায়েলের জাতীয় সংগীত বাজানোর সময় তারা মাথা নত করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। ম্যাচ শুরুর আগে দুই দল ঐতিহ্যবাহী করমর্দন করেনি, এমনকি একে অপরের সঙ্গে স্মারক পতাকাও বিনিময় করেনি।
খেলার শুরু থেকেই অবশ্য আয়ারল্যান্ডের আধিপত্য ছিল স্পষ্ট। ১৪ মিনিটে ট্রয় প্যারট গোল করে দলকে এগিয়ে দেন। গোলের পর তিনি দুই হাত দিয়ে হৃদয়ের আকৃতি তৈরি করেন। ২৫ মিনিটে জ্যাক ময়লান আয়ারল্যান্ডের তৃতীয় গোলটি করেন এবং গোল উদযাপনের সময় দলের জার্সির ব্যাজ ও কালো বাহুবন্ধনীতে চুমু দেন।
ম্যাচের এই প্রতীকী মুহূর্তগুলো ইসরায়েলি সরকারের তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। ইসরায়েলের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিদিওন সার আয়ারল্যান্ডের খেলোয়াড়দের আচরণকে সমালোচনা করে বলেন, আয়ারল্যান্ড ‘ইতিহাসের ভুল পাশে’ অবস্থান করছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া দীর্ঘ এক পোস্টে সার আয়ারল্যান্ডের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন অবস্থানের প্রসঙ্গও তোলেন। তিনি ১৯৩৯ সালে জার্মানির ব্রেমেনে ম্যাচের আগে আইরিশ দলের নাৎসি স্যালুট দেওয়ার ঘটনা এবং যুদ্ধের সময় আয়ারল্যান্ডের নিরপেক্ষতার কথা উল্লেখ করেন। অ্যাডলফ হিটলারের মৃত্যুর পর তৎকালীন আইরিশ প্রধানমন্ত্রী ইমন ডি ভ্যালেরার জার্মান প্রতিনিধির কাছে শোকবার্তা পাঠানোর ঘটনাও তিনি তুলে ধরেন।
সার লেখেন, প্রায় ৯০ বছর পরও আয়ারল্যান্ডের ‘ইতিহাসের ভুল পাশে থাকার’ প্রবণতা বদলায়নি।
ম্যাচটি আদৌ অনুষ্ঠিত হবে কি না, তা নিয়েও সপ্তাহের শুরুতে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। আয়ারল্যান্ডে ম্যাচটি বয়কট করার চাপ ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত আইরিশ খেলোয়াড়েরা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় ম্যাচটি খেলার সিদ্ধান্ত নেন।
শুধু গোলরক্ষক গ্যাভিন বাজুনু ম্যাচটি থেকে নিজেকে সরিয়ে নেন। তিনি বলেন, নিরপরাধ মানুষ হত্যার কারণে এই ম্যাচ কিংবা ৪ অক্টোবর সার্বিয়ায় অনুষ্ঠেয় ফিরতি ম্যাচ—কোনোটিতেই অংশ নেওয়া তার কাছে সঠিক মনে হবে না।
ম্যাচে দর্শকের উপস্থিতিও ছিল অত্যন্ত সীমিত। আইরিশ ফুটবল ফেডারেশন নিজ দেশের সমর্থকদের জন্য কোনো টিকিট সংরক্ষণ করেনি। দেশটির সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম আরটিই ম্যাচটি ধারাভাষ্য ছাড়াই সম্প্রচার করার কথা জানিয়েছিল।
স্টেডিয়ামের বাইরে ও ভেতরে অবশ্য রাজনৈতিক বার্তা দেখা গেছে। এক ইসরায়েলি সমর্থকের টি-শার্টে একটি কিউআর কোডের সঙ্গে আইরিশ কোচ হেইমির হালগ্রিমসনের বক্তব্যকে উদ্ধৃত করে লেখা ছিল—‘এটি গণহত্যা’।
ইসরায়েলের পতাকা জড়িয়ে থাকা ৩১ বছর বয়সী সফটওয়্যার উন্নয়ন শিক্ষক মল মাইকেল এএফপিকে বলেন, খেলাধুলা মানুষের জন্য, রাজনীতির জন্য নয়। রাজনৈতিক কারণে আইরিশ দর্শকদের ম্যাচ থেকে দূরে রাখার সিদ্ধান্তকে তিনি ‘বোকামি’ বলে মন্তব্য করেন।
ফিলিস্তিন ইস্যুতে আয়ারল্যান্ডের অবস্থান দীর্ঘদিন ধরেই তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট। দেশটির ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থানের সঙ্গে ব্রিটিশ শাসনের অধীনে নিজেদের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার যোগসূত্রও প্রায়ই টানা হয়। ২০২৪ সালে স্পেন ও নরওয়ের সঙ্গে আয়ারল্যান্ড আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়। গাজা সংঘাত নিয়েও ডাবলিন একাধিকবার ইসরায়েলের সমালোচনা করেছে।
অন্যদিকে, গাজায় ইসরায়েলের সামরিক কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে বর্ণনা করার অভিযোগ ইসরায়েল জোরালোভাবে প্রত্যাখ্যান করে আসছে।
ফলে দেব্রেসেনে অনুষ্ঠিত এই ম্যাচটি শুধু নেশন্স লিগের একটি ফুটবল ম্যাচেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। মাঠে আয়ারল্যান্ডের কালো বাহুবন্ধনী, জাতীয় সংগীতের সময় মাথা নত করে দাঁড়ানো এবং ম্যাচের আগে আনুষ্ঠানিকতা এড়িয়ে যাওয়া—সব মিলিয়ে গাজা যুদ্ধ নিয়ে ক্রীড়াঙ্গনে চলমান রাজনৈতিক ও মানবিক বিতর্কেরও প্রতিফলন হয়ে উঠেছে। আর শেষ পর্যন্ত ৩-০ ব্যবধানের জয় সেই প্রতীকী বার্তাকে আরও দৃশ্যমান করে তুলেছে।










