মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানি সেপ্টেম্বরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মার্চে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেওয়ার পর যে সরবরাহ সংকট তৈরি হয়েছিল, তাতে কিছুটা গতি ফিরেছে। কিন্তু তেল সরবরাহ বাড়লেও বিশ্ববাজারে ব্যারেলপ্রতি দাম এখনো যুদ্ধ শুরুর আগের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে পেট্রল ও ডিজেলের বাড়তি দাম বিশ্বজুড়ে ভোক্তাদের ওপর চাপ তৈরি করছে।
হরমুজ প্রণালিতে বাড়ছে তেল পরিবহন
তেলবাহী জাহাজের চলাচল পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন হয়েছে। পাশাপাশি পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলো পাইপলাইন ও এমন বন্দর ব্যবহার করে প্রতিদিন আরও প্রায় ৬০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করেছে, যেগুলো হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে চলে।
যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি ও অন্যান্য রুট মিলিয়ে অঞ্চলটি থেকে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৯০ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল বের হতো। তবে জাহাজের গতিবিধি নির্ভুলভাবে অনুসরণ করা কঠিন হওয়ায় বিভিন্ন পর্যবেক্ষক প্রতিষ্ঠানের হিসাবের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
ট্যাংকারট্র্যাকার্স ডটকমের হিসাবে, সেপ্টেম্বরে প্রণালিটি দিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৭৪ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল গেছে। তবে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্বালানি নীতি বিশেষজ্ঞ ড্যানিয়েল স্টার্নঅফ সতর্ক করেছেন, কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের হিসাবকে এককভাবে নির্ভরযোগ্য ধরে নেওয়া ঠিক নয়। তারপরও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্যই সেপ্টেম্বরে তেল প্রবাহ বাড়ার বিষয়টি নিশ্চিত করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নিরাপত্তায় বাড়ছে জাহাজ চলাচল
হরমুজ প্রণালিতে ইরানের হামলা অব্যাহত থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর জাহাজ নিরাপত্তা কার্যক্রম বড় রপ্তানিকারক দেশগুলোর তেল পরিবহন বাড়াতে সহায়তা করেছে বলে মনে করছেন কয়েকজন বিশ্লেষক।
নটর ডেম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইউজিন গোলজের মতে, জাহাজ পরিবহনকারীদের আস্থা ধীরে ধীরে বাড়ছে। এর ফলে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো বড় রপ্তানিকারক দেশগুলো আরও বেশি তেল বাজারে পাঠাতে পারছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, তাঁর প্রশাসনের কর্মকর্তারা এবং সামরিক কর্মকর্তারা কয়েক সপ্তাহ ধরে দাবি করে আসছেন, হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত এবং তেলবাহী জাহাজ সেখানে চলাচল করছে।
তবে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার মহাসচিব আরসেনিও ডমিঙ্গেজের বক্তব্য হলো, প্রণালিটি এখনো নিরাপদ নৌপথে পরিণত হয়নি। সংস্থাটির হিসাবে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ৮৫টি জাহাজে হামলা হয়েছে এবং ২৪ জন নাবিক নিহত হয়েছেন।
রপ্তানি বাড়লেও কেন কমছে না তেলের দাম
মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল সরবরাহ বাড়লেও বৈশ্বিক বাজারে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ এখনো কম। পিকারিং এনার্জি পার্টনার্সের প্রধান বিনিয়োগ কর্মকর্তা ড্যান পিকারিং বলেন, বাজার এখনো সংকুচিত অবস্থায় রয়েছে।
কেপলারের হিসাবে, সেপ্টেম্বরে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন ১ কোটি ব্যারেল তেল গেলেও যুদ্ধের আগে এই পথে প্রতিদিন প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহন হতো। অর্থাৎ সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে ঘুরে দাঁড়ালেও তা এখনো আগের স্বাভাবিক মাত্রায় পৌঁছায়নি।
আগস্টে ভর্টেক্সার হিসাবে হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৬৪ লাখ ব্যারেল তেল গেছে। কেপলার ও ট্যাংকারট্র্যাকার্সের হিসাব ছিল যথাক্রমে ৫৯ লাখ ও ৫৫ লাখ ব্যারেল। এসব সংখ্যা যুদ্ধের শুরুর দিকের প্রবাহের তুলনায় বেশি হলেও যুদ্ধপূর্ব মাত্রার অর্ধেকেরও কম ছিল।
কেপলারের পণ্যবাজার গবেষণা পরিচালক ম্যাট স্মিথ বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলোর অপরিশোধিত তেল রপ্তানি যুদ্ধপূর্ব মাত্রার প্রায় ৮৫ শতাংশে পৌঁছেছে। কিন্তু পরিস্থিতিকে এখনো স্বাভাবিক বলা যাচ্ছে না। উৎপাদন আরও বাড়াতে হবে এবং শোধনাগারগুলোকেও পুরোপুরি সচল করতে হবে। হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের নিরাপত্তা ঝুঁকি পুরোপুরি দূর না হওয়া পর্যন্ত এই স্বাভাবিকতা ফিরবে না।
আবারও সরবরাহ কমার ঝুঁকি
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, ইরান চাইলে তেলবাহী জাহাজ এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা বাড়াতে পারে। এমন হলে বৈশ্বিক বাজারে তেল সরবরাহ আবার কমে যেতে পারে এবং দাম আরও বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
চলতি মাসে হামলার পর সৌদি আরবের হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে যাওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ পাইপলাইন বন্ধ হয়ে যায়। রাইস বিশ্ববিদ্যালয়ের বেকার ইনস্টিটিউটের মধ্যপ্রাচ্য জ্বালানি বিশেষজ্ঞ জিম ক্রেনের মতে, ইরানের হাতে উত্তেজনা বাড়ানোর নানা সুযোগ রয়েছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহনের পরিমাণ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর দেওয়া হিসাব নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। সেন্ট্রাল কমান্ডের দাবি, গত কয়েক মাসে প্রণালি দিয়ে ১০০ কোটি ব্যারেল তেল পরিবহন হয়েছে। তবে কয়েকজন মার্কিন আইনপ্রণেতা ও গোয়েন্দা বিশ্লেষক এই হিসাবের পদ্ধতি ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র টিম হকিন্স অবশ্য বলেছেন, গত দুই সপ্তাহে প্রতিদিন ১ কোটি ৩০ লাখের বেশি ব্যারেল তেল প্রণালি দিয়ে গেছে। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরও সামরিক বাহিনীর দেওয়া হিসাবের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
তেলবাহী জাহাজের গতিবিধি নির্ধারণ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে, কারণ অনেক জাহাজ ইরানের নজর এড়াতে হরমুজ প্রণালিতে প্রবেশের সময় নিজেদের সংকেত পাঠানোর যন্ত্র বন্ধ করে দেয়। ফলে কেপলার, ভর্টেক্সা ও ট্যাংকারট্র্যাকার্স স্যাটেলাইট ছবি, প্রণালির বাইরে পাওয়া সংকেত এবং অন্যান্য তথ্য মিলিয়ে পরিবহনের পরিমাণ অনুমান করে। একটি বড় তেলবাহী জাহাজে প্রায় ২০ লাখ ব্যারেল তেল বহন করা যায়।
মধ্যপ্রাচ্য থেকে তেল রপ্তানি বাড়ার ফলে বাজারে সরবরাহের কিছুটা উন্নতি হলেও যুদ্ধের প্রভাব পুরোপুরি কাটেনি। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, উৎপাদন ও শোধনাগারের স্বাভাবিক কার্যক্রম এবং সম্ভাব্য নতুন হামলার ঝুঁকি—সবকিছুই এখনো বৈশ্বিক তেলবাজারের ওপর প্রভাব ফেলছে।












