দীর্ঘ সামরিক উত্তেজনা ও কূটনৈতিক দূরত্বের পর ভারত ও চীন আবারও সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে হাঁটছে। দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠক, সরাসরি বিমান যোগাযোগ পুনরায় চালু এবং ভিসা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ—সবকিছুই একটি নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে। কিন্তু কূটনৈতিক সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করলেই অর্থনৈতিক বাস্তবতা বদলে যায় না। বরং সম্পর্ক উষ্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি পুরোনো প্রশ্ন আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে: চীনের ওপর ভারতের অর্থনৈতিক নির্ভরতা কি কমছে, নাকি নতুন রূপে আরও গভীর হচ্ছে?
গত মাসে নয়াদিল্লিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বৈঠক দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা দিয়েছে। ২০২০ সালে হিমালয় সীমান্তে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর যে অবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে উভয় পক্ষই আগ্রহ দেখাচ্ছে। গত বছর সামরিক অচলাবস্থা নিরসনের পর সীমান্ত পরিস্থিতিতেও কিছুটা স্থিতিশীলতা এসেছে।
কিন্তু রাজনৈতিক সমঝোতা আর অর্থনৈতিক ভারসাম্য এক বিষয় নয়।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে চীনের সঙ্গে ভারতের ব্যবধান এখনও বিপুল। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, ২০২৫ সালে বৈশ্বিক উৎপাদনমূল্যে চীনের অংশ ছিল ২৮ শতাংশ। ভারতের অংশ মাত্র ৩ শতাংশ। পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রেও চীন অনেক এগিয়ে—বিশ্বের মোট পণ্য রপ্তানিতে চীনের অংশ ১৬ দশমিক ৩ শতাংশ, যেখানে ভারতের অংশ ১ দশমিক ৭ শতাংশ।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগ বাণিজ্য ঘাটতি। ২০২৫ সালে চীনের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য ঘাটতি ছিল প্রায় ১১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। চলতি বছরের আগস্টেই ঘাটতি ৯১ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়। বর্তমান প্রবণতা অব্যাহত থাকলে গত বছরের রেকর্ডও ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে সমস্যাটিকে শুধু বাণিজ্য ঘাটতির হিসাব দিয়ে বোঝা যাবে না। ভারতের শিল্প উৎপাদনের একটি বড় অংশ এমন চীনা পণ্যের ওপর নির্ভরশীল, যেগুলো সরাসরি ভোক্তার হাতে যায় না; বরং দেশের নিজস্ব উৎপাদন ব্যবস্থায় কাঁচামাল, যন্ত্রাংশ বা মধ্যবর্তী উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
এখানেই ভারতের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক দ্বন্দ্ব।
চীন থেকে বৈদ্যুতিক ও বৈদ্যুতিন সরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি এবং রাসায়নিক আমদানি করে ভারতীয় শিল্প। ফলে দেশীয় উৎপাদন যত বাড়ে, কিছু ক্ষেত্রে চীনা উপকরণের চাহিদাও তত বাড়ে। অর্থাৎ চীনের ওপর নির্ভরতা কমাতে যে শিল্প সম্প্রসারণের কথা ভারত ভাবছে, সেই শিল্পেরই একটি অংশ বর্তমানে চীনা সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর দাঁড়িয়ে আছে।
স্মার্টফোন ও ওষুধ শিল্প এই বাস্তবতার স্পষ্ট উদাহরণ। ভারতে মোবাইল ফোন সংযোজন এবং ওষুধ উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় বহু উপাদান এখনও চীন থেকে আসে। ফলে ‘ভারতে তৈরি’ পণ্যের সাফল্য সবসময় ‘চীন থেকে স্বাধীন’ উৎপাদন ব্যবস্থার সমান নয়।
এই নির্ভরতার বিষয়টি কেবল বাণিজ্যিক নয়, কৌশলগতও। ২০২৫ সালের এপ্রিলে চীন সাতটি ভারী বিরল মৃত্তিকা উপাদান রপ্তানির ক্ষেত্রে লাইসেন্সের শর্ত আরোপ করলে ভারতের গাড়ি ও প্রতিরক্ষা শিল্পের দুর্বলতা প্রকাশ পায়। আধুনিক শিল্পে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করেই একটি দেশ অন্য দেশের উৎপাদন সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করতে পারে।
তবে ভারতের শিল্পগত দুর্বলতার সব দায় চীনের ওপর চাপানোও ভুল হবে। ভারতের নিজস্ব গবেষণা ও উদ্ভাবন খাতে বিনিয়োগও দীর্ঘদিন ধরে সীমিত। ২০২৪ সালে দেশটির গবেষণা ও উন্নয়ন ব্যয় মোট দেশজ উৎপাদনের মাত্র শূন্য দশমিক ৬৪ শতাংশ ছিল। এশিয়ার অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বী অর্থনীতির তুলনায় এই হার কম। বিশেষ করে বেসরকারি খাতের গবেষণা বিনিয়োগের ঘাটতি ভারতের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে দক্ষ জনবলের সংকট। উন্নত উৎপাদন ব্যবস্থা কেবল কারখানা ও পুঁজি দিয়ে গড়ে ওঠে না; প্রয়োজন প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ এবং নির্দিষ্ট শিল্পে অভিজ্ঞ কর্মী। ২০২৫ সালে ফক্সকনের ভারতীয় আইফোন কারখানা থেকে চীনা কর্মীদের প্রত্যাহারের ঘটনাও দেখিয়েছে, উচ্চপ্রযুক্তির উৎপাদনে ভারতের বিদেশি দক্ষ জনবলের ওপর নির্ভরতা এখনও পুরোপুরি কাটেনি।
নয়াদিল্লি অবশ্য এই বাস্তবতা বুঝতে পারছে এবং কিছু নীতিগত পরিবর্তনের পথে এগোচ্ছে।
সম্প্রতি চীনা কোম্পানিগুলোর ভারতে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ কিছুটা শিথিল করা হয়েছে। এখন চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো ভারতীয় কোম্পানিতে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ অংশীদারিত্ব নিতে পারবে। একই সঙ্গে পাঁচটি উচ্চপ্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ প্রস্তাব দ্রুত অনুমোদনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এসব বিনিয়োগকে এমন যৌথ উদ্যোগের কাঠামোয় থাকতে হবে, যেখানে ভারতীয় অংশীদারের মালিকানা সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকবে।
অর্থাৎ ভারত চীনা পুঁজি ও প্রযুক্তিকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করছে না। বরং নিজের শিল্প সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সীমিত ও নিয়ন্ত্রিত সহযোগিতা চাইছে।

এর কিছু ইতিবাচক ফলও দেখা যাচ্ছে। এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত চীনে ভারতের রপ্তানি ৪০ শতাংশ বেড়েছে। শিল্পযন্ত্র, গাড়ির যন্ত্রাংশ, মুদ্রিত সার্কিট বোর্ড, স্মার্টফোনসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক পণ্য এই বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।
কিন্তু এখানেও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। রপ্তানি বাড়লেই অর্থনৈতিক সম্পর্কের কাঠামো বদলে গেছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হবে না। ভারতের ইলেকট্রনিকস খাত এখনও উল্লেখযোগ্য মাত্রায় চীনা উপাদানের ওপর নির্ভরশীল। দেশটির সবচেয়ে সফল রপ্তানি খাত স্মার্টফোন উৎপাদনেও স্থানীয় উপাদানের ব্যবহার মাত্র ১৮ থেকে ২০ শতাংশ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও উচ্চপ্রযুক্তির যন্ত্রপাতির বৈশ্বিক চাহিদা বৃদ্ধির ফলে ভারতের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হচ্ছে। উত্তর-পূর্ব এশিয়ার প্রযুক্তি খাতের সম্প্রসারণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কিছু ভারতীয় প্রতিষ্ঠান চীনা প্রযুক্তি কোম্পানির সরবরাহ শৃঙ্খলে উপাদানভিত্তিক কাজ পাচ্ছে। কিন্তু এটিও একই সঙ্গে একটি বৈপরীত্য তৈরি করছে। ভারতীয় প্রতিষ্ঠান যত বেশি এই বাজারে যুক্ত হচ্ছে, তত বেশি তাদের চীনা সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত থাকার সম্ভাবনাও বাড়ছে।
তাহলে চীনের জন্য ভারত কী প্রস্তাব করছে?
নয়াদিল্লির সবচেয়ে বড় সম্পদ নিঃসন্দেহে বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার। এর সঙ্গে রয়েছে তরুণ ও তুলনামূলক কম খরচের শ্রমশক্তি। উৎপাদন বাড়াতে ভারত সরকার কর সুবিধা, উৎপাদনভিত্তিক প্রণোদনা এবং মূলধনী ভর্তুকির মতো বিভিন্ন সুবিধাও দিচ্ছে। তবু চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ভারতে হস্তান্তরে খুব বেশি আগ্রহী—এমন প্রমাণ এখনও নেই।
এর কারণও বোঝা কঠিন নয়। বৈদ্যুতিক গাড়ি, ব্যাটারি, সৌরশক্তি এবং উন্নত ইলেকট্রনিক সরঞ্জামের মতো খাতে চীন নিজের প্রযুক্তিগত সক্ষমতাকে কৌশলগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে। দেশটির শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ধরে রাখার জন্য চাপ দেওয়ার প্রবণতা সেই অবস্থানই প্রকাশ করে।
অর্থাৎ ভারত যদি চীনা বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি চায়, তাকে শুধু বাজার ও সস্তা শ্রমের সুবিধা দেখালেই হবে না। এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য ভারতে উৎপাদন করা লাভজনক হবে, কিন্তু একই সঙ্গে ভারতীয় প্রতিষ্ঠানও প্রযুক্তি, দক্ষতা ও স্থানীয় সরবরাহব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ পাবে।
এর ওপর রয়েছে সীমান্তের অমীমাংসিত প্রশ্নও।
হিমালয়ে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ কিলোমিটার দীর্ঘ বিতর্কিত সীমান্ত দুই দেশের সম্পর্কের ওপর দীর্ঘ ছায়া ফেলে রেখেছে। সামরিক উত্তেজনা কমাতে ধাপে ধাপে স্থিতিশীলতার কৌশল নেওয়া হয়েছে এবং আগস্টে বেইজিংয়ে দুই দেশের কূটনীতিকরা একটি ন্যায্য, যুক্তিসংগত ও পারস্পরিকভাবে গ্রহণযোগ্য সমাধানের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু সীমান্ত বিরোধের স্থায়ী সমাধান এখনও দূরে বলেই মনে হচ্ছে।

ফলে ভারত-চীন সম্পর্কের সামনে এখন একটি দ্বৈত বাস্তবতা। রাজনৈতিক নেতৃত্ব সম্পর্ক উন্নয়নের সুযোগ তৈরি করতে চাইছে, অন্যদিকে অর্থনীতি এখনও গভীর অসমতার মধ্যে আটকে আছে। দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করা সম্ভব হলেও সেটিকে ভারসাম্যপূর্ণ করা অনেক কঠিন কাজ।
ভারতের জন্য লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু চীন থেকে আমদানি কমানো নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, চীনের সঙ্গে নতুন করে তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক যোগাযোগকে নিজের শিল্প ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে ব্যবহার করা। কোন উপাদান দেশে তৈরি করা যায়, কোন প্রযুক্তি নিজস্বভাবে উন্নয়ন করা সম্ভব, কীভাবে দক্ষ জনবল তৈরি করা যায় এবং কীভাবে গবেষণায় বিনিয়োগ বাড়ানো যায়—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে।
চীনের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করে ভারত নিজের অর্থনৈতিক শক্তি বাড়াতে পারবে না। আবার অতিরিক্ত নির্ভরতার ওপর ভিত্তি করে দীর্ঘমেয়াদি কৌশলও টেকসই হবে না। প্রয়োজন এমন একটি মধ্যপন্থা, যেখানে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ চলবে, কিন্তু সেই সম্পর্ক ধীরে ধীরে ভারতের নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা ও প্রযুক্তিগত স্বাধীনতার ভিত্তি শক্ত করবে।
ভারত-চীন সম্পর্কের উষ্ণতা তাই কেবল কূটনৈতিক সৌজন্যের পরীক্ষা নয়। এটি ভারতের শিল্পনীতি, প্রযুক্তি সক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক কৌশলেরও পরীক্ষা। সেই পরীক্ষায় ভারত কতটা সফল হবে, তার ওপরই নির্ভর করবে দুই দেশের নতুন সম্পর্ক সত্যিই ভারসাম্যপূর্ণ অংশীদারত্বে রূপ নেয় কি না।












