ঢাকা, কলকাতা ও করাচির অভিজাত আবাসিক এলাকার কোনো কোনো বাড়িতে দিনের পর দিন কাজ করে ছোট ছোট মেয়ে। কারও বয়স ১০, কারও ১২, আবার কারও বয়স ১৪ বছর। কারও দায়িত্ব শিশুর দেখাশোনা, কারও কাজ বাসন ধোয়া, ঘর মোছা, কাপড় পরিষ্কার করা কিংবা রান্নায় সাহায্য করা। দরিদ্র পরিবারের এসব শিশুকে অনেক সময় ভালো খাবার, পড়াশোনা ও নিরাপদ জীবনের আশ্বাস দিয়ে শহরে আনা হয়। কিন্তু তাদের কারও কারও জন্য সেই বাড়িই হয়ে ওঠে বন্দিদশা, নির্যাতন ও ভয়াবহ বঞ্চনার জায়গা।
বাইরে থেকে বাড়িগুলোকে স্বাভাবিক মনে হয়। সেখানে পরিবারের সদস্যরা থাকেন, অতিথি আসেন, দৈনন্দিন জীবন চলে। অথচ সেই বাড়ির ভেতরে কাজ করা শিশুটি পর্যাপ্ত খাবার পাচ্ছে কি না, তাকে মারধর করা হচ্ছে কি না, সে স্কুলে যেতে পারছে কি না কিংবা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছে কি না, তা অনেক সময় জানার সুযোগ থাকে না। বিশেষ করে শিশুটি নিয়োগকর্তার বাড়িতে থেকে কাজ করলে তার অসহায়ত্ব আরও বেড়ে যায়।
বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের বিভিন্ন ঘটনা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার গবেষণায় শিশু গৃহকর্মীদের এমন ঝুঁকির চিত্র উঠে এসেছে। ঢাকা, কলকাতা ও করাচির অভিজ্ঞতা দেখায়, দারিদ্র্য, শিশুশ্রম, দুর্বল নজরদারি এবং ব্যক্তিগত বাড়ির ভেতরে কর্মরত শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ঘাটতি কীভাবে তাদের জীবনকে বিপন্ন করে তুলতে পারে।
পশ্চিমবঙ্গে শিশু গৃহকর্মীদের নির্যাতনের চিত্র
শিশু গৃহকর্মীদের ওপর নির্যাতন নিয়ে ২০০৬ সালে পশ্চিমবঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা প্রকাশ করে সেভ দ্য চিলড্রেন। ছয়টি জেলায় চার বছর ধরে পরিচালিত ওই গবেষণায় শিশু গৃহকর্মীদের কাজের পরিবেশ ও নির্যাতনের অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করা হয়।
গবেষণায় অনিরাপদ কর্মপরিবেশ, পর্যাপ্ত খাবার না পাওয়া, মারধর, ইচ্ছাকৃতভাবে শরীর পুড়িয়ে দেওয়া এবং যৌন নির্যাতনের মতো গুরুতর অভিযোগের তথ্য উঠে আসে। গবেষণাটিতে পশ্চিমবঙ্গে ৫০ হাজারের বেশি শিশু গৃহকর্মে নিয়োজিত থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। তবে এই সংখ্যা গবেষণা প্রকাশের সময়কার তথ্য; বর্তমান পরিস্থিতির পরিসংখ্যান হিসেবে এটি বিবেচনা করা যাবে না।
গবেষণাটির গুরুত্ব শুধু নির্যাতনের ঘটনা তুলে ধরার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি দেখায়, শিশুদের কাজে নিয়োগের পর তাদের নিরাপত্তা, বিশ্রাম, খাবার ও শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত না করা হলে গৃহকর্মের পরিবেশ কীভাবে শোষণমূলক হয়ে উঠতে পারে।
গৃহকর্মের একটি বড় সমস্যা হলো, শিশুর কাজের জায়গাটি কোনো কারখানা বা প্রকাশ্য কর্মক্ষেত্র নয়, বরং ব্যক্তিগত বাড়ি। ফলে সেখানে নিয়মিত পরিদর্শন করা কঠিন। শিশুটি নির্যাতনের শিকার হলেও প্রতিবেশী, শিক্ষক কিংবা পরিবারের কাছে সেই তথ্য পৌঁছানোর সুযোগ সীমিত থাকতে পারে।
করাচিতে ১১ বছরের গৃহকর্মীর মৃত্যু
২০২৩ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানের করাচির গুলশান-ই-ইকবাল এলাকায় ১১ বছর বয়সী এক শিশু গৃহকর্মীর মৃত্যু হয়। শিশুটির নাম রফিক বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনাটি দেশটিতে শিশু গৃহকর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ সৃষ্টি করে।
পুলিশের বক্তব্য ও শিশুটির বাবার অভিযোগের ভিত্তিতে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়, রফিক ও তার তিন বড় ভাই একই বাড়িতে কাজ করত। তাদের বাবা মাকবুল মানথার আলী অভিযোগ করেন, তাঁর ছেলেদের মারধর করা হতো। তাঁর অভিযোগ অনুযায়ী, রফিককে উত্তপ্ত ধাতব চিমটা দিয়ে পোড়ানো হয়েছিল। এমনকি প্লাস দিয়ে তার নখ তুলে ফেলার অভিযোগও ওঠে।
রফিকের মৃত্যুর পর পুলিশ শিরিন আসাদ নামের এক নারীকে গ্রেপ্তার করে। শিশুটির মৃত্যুর ঘটনায় তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা এবং অন্যদের আহত করার অভিযোগে মামলা করা হয়।
ঘটনাটির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, একই বাড়িতে একাধিক শিশু কাজ করছিল। ফলে শুধু একজন শিশুর ওপর নির্যাতনের অভিযোগ নয়, একই কর্মপরিবেশে থাকা অন্য শিশুদের নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
তবে গ্রেপ্তার বা মামলা দায়ের হওয়া অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার সমান নয়। অভিযোগের চূড়ান্ত বিচারিক নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দোষী বলা যাবে না।
ঢাকায় ১০ বছরের গৃহকর্মীর রহস্যজনক মৃত্যু
করাচির ঘটনার কয়েক সপ্তাহ পর, ২০২৩ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকার মগবাজারে একটি হাসপাতালের সামনে রাখা হিমায়িত পণ্যবাহী গাড়ি থেকে ১০ বছর বয়সী এক শিশু গৃহকর্মীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ ও পরিবারের সদস্যদের সন্দেহ ছিল, শিশুটিকে নির্যাতন করে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, তার শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল। মরদেহটি গাড়িতে রাখা হয়েছিল এবং গোপনে দাফনের চেষ্টা হয়ে থাকতে পারে বলেও সন্দেহ প্রকাশ করা হয়।
শিশুটির বাবার করা হত্যা মামলার পর নিয়োগকর্তা ফারহাদ বাধন মৌকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তবে ঘটনার চূড়ান্ত বিচারিক ফলাফল সম্পর্কে হালনাগাদ নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া কাউকে আদালতে দোষী সাব্যস্ত বলা যাবে না।
এই ঘটনা দেখায়, শিশু গৃহকর্মীদের ঝুঁকি শুধু জীবিত অবস্থায় নির্যাতনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কোনো শিশুর মৃত্যু হলে কী ঘটেছিল, কখন তার মৃত্যু হয়েছে এবং এর জন্য কে দায়ী, তা নির্ধারণে নিরপেক্ষ তদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গুরগাঁওয়ে মাসের পর মাস নির্যাতনের অভিযোগ
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে ভারতের হরিয়ানার গুরগাঁওয়ে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরী গৃহকর্মীকে উদ্ধারের ঘটনা সামনে আসে। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, মেয়েটিকে একটি পরিবারের তিন বছর বয়সী শিশুর দেখাশোনার কাজে নিয়োগ করা হয়েছিল। প্রায় চার থেকে পাঁচ মাস ধরে সে নির্যাতনের শিকার হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে।
পুলিশ ও উদ্ধারকাজে যুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত তথ্যে বলা হয়, মেয়েটির শরীরে একাধিক ক্ষত ছিল। তাকে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয় এবং নিয়োগকর্তা দম্পতির বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
এ ঘটনায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে আসে। শিশুটিকে একটি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজে পাঠানো হয়েছিল বলে পুলিশ জানায়। অর্থাৎ, শুধু সরাসরি নিয়োগকর্তা নয়, শিশুদের কাজের জন্য সংগ্রহ ও সরবরাহকারী মধ্যস্থতাকারীদের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।
একই মাসে গুরগাঁওয়ে ঝাড়খণ্ড থেকে আসা ১৭ বছর বয়সী আরেক কিশোরীকে নির্যাতনের অভিযোগে উদ্ধারের খবর প্রকাশিত হয়। তার অভিযোগ অনুযায়ী, কয়েক মাস ধরে তাকে মারধর করা হয়েছিল এবং উত্তপ্ত ধাতু দিয়ে আঘাত করা হয়েছিল।
এই ঘটনাগুলো কলকাতার নয়। তবে পশ্চিমবঙ্গসহ ভারতের দরিদ্র অঞ্চল থেকে শিশুদের বড় শহরে গৃহকর্মে পাঠানোর বৃহত্তর বাস্তবতা বোঝার জন্য এগুলো প্রাসঙ্গিক। একই সঙ্গে এসব ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, শিশু গৃহকর্মের ঝুঁকি কোনো একটি শহর বা দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
সাভারে চুরির অভিযোগে ১০ বছরের শিশুকে নির্যাতন
২০২৪ সালের ১৩ জুলাই ঢাকার সাভারে ১০ বছর বয়সী এক শিশু গৃহকর্মীকে নির্যাতনের অভিযোগে এক চিকিৎসক ও তাঁর স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিশুটির শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন পাওয়া যায় এবং তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
শিশুটির মা কুলসুম বেগম ছিলেন পোশাকশ্রমিক। তাঁর অভিযোগ অনুযায়ী, মেয়েকে প্রায় এক বছর আগে কাজের জন্য নেওয়া হয়েছিল। প্রথম দিকে তাকে ভালোভাবে রাখা হলেও পরে চুরির অভিযোগ তুলে মারধর শুরু হয়।
শিশুটি সংবাদমাধ্যমকে জানায়, প্রথম দিকে নিয়োগকর্তারা তার সঙ্গে ভালো আচরণ করতেন। পরে চুরির অভিযোগে তাকে মারধর করা হতো। পুলিশ জানিয়েছিল, শিশুটির শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল। ধারালো বস্তু ও ভারী কিছু দিয়ে নির্যাতন করা হয়ে থাকতে পারে বলে চিকিৎসকদের সন্দেহ ছিল।
শিশুটির মায়ের করা মামলার ভিত্তিতে ওই দম্পতিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে পরবর্তী সময়ে পুলিশি তদন্ত ও বিচারিক কার্যক্রমের ফলাফল আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
এই ঘটনায় দরিদ্র পরিবারের বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একজন পোশাকশ্রমিক মা জীবিকার জন্য কাজ করেন, আর তাঁর শিশুকে অন্যের বাড়িতে রেখে আসতে হয়। কিন্তু কাজের জায়গায় শিশুটি নিরাপদ আছে কি না, তা নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে পরিবারের আর্থিক সংকট তাকে আরও ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিতে পারে।
বসুন্ধরায় ১৩ বছরের কল্পনার ওপর ভয়াবহ নির্যাতন
২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ১৩ বছর বয়সী গৃহকর্মী কল্পনার ওপর নির্যাতনের ঘটনা সামনে আসে। প্রকাশিত প্রতিবেদন ও বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের বক্তব্য অনুযায়ী, মেয়েটির শরীরের বিভিন্ন স্থানে পোড়ার ক্ষত ছিল। তার সামনের চারটি দাঁত ভেঙে বা উপড়ে ফেলার অভিযোগও ওঠে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কাজ করতে না পারা কিংবা ভুল করার অভিযোগে তাকে মারধর করা হতো। হেয়ার স্ট্রেইটনার দিয়ে শরীরে ছ্যাঁকা দেওয়ার অভিযোগও উঠে আসে। চিকিৎসার জন্য তাকে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকের সন্দেহ হলে বিষয়টি পুলিশ ও সাংবাদিকদের নজরে আসে। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ ঘটনাটি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং শিশুটির চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানায়।
এই ঘটনা থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ওঠে: শিশুর শরীরে গুরুতর আঘাত থাকার পরও কেন নির্যাতন দীর্ঘ সময় আড়ালে থাকতে পারে? কোনো শিশুকে যদি বাইরের মানুষের সঙ্গে কথা বলতে না দেওয়া হয়, তার আঘাত লুকিয়ে রাখা হয় কিংবা সে চাকরি হারানোর ভয়ে মুখ খুলতে না পারে, তাহলে নির্যাতনের খবর বাইরে পৌঁছাতে দেরি হতে পারে।
উত্তরায় ১১ বছরের শিশুর ওপর নির্যাতনের অভিযোগ
ঢাকার উত্তরায় সাবেক বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শফিকুর রহমানের পরিবারের বাসায় কাজ করা ১১ বছর বয়সী এক শিশুর ওপর নির্যাতনের অভিযোগ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নতুন করে আলোচনায় আসে।
মামলার অভিযোগ ও পুলিশের তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, শিশুটিকে ২০২৫ সালের জুনে ওই বাড়িতে কাজে নেওয়া হয়েছিল। তার বাবাকে বলা হয়েছিল, মেয়েটির ভবিষ্যৎ খরচসহ বিয়ের ব্যয় বহনে পরিবারটি সহায়তা করবে। শিশুটির বাবা ২০২৫ সালের নভেম্বরে শেষবার মেয়েকে সুস্থ অবস্থায় দেখেছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়। এরপর তাঁকে মেয়ের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি বলেও দাবি করা হয়।
২০২৬ সালের ৩১ জানুয়ারি শিশুটির পরিবারকে ফোন করে জানানো হয়, সে অসুস্থ। বাবা বাড়িতে গিয়ে মেয়ের শরীরে গুরুতর আঘাত দেখতে পান বলে অভিযোগ করেন। পরে তাকে গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
পুলিশের তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে শিশুটিকে গরম রান্নার খুন্তি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে পোড়ানো, লাঠি দিয়ে মারধর, চোখে মরিচের গুঁড়া দেওয়া, দাঁত ভেঙে দেওয়া এবং বাথরুমে আটকে রাখার অভিযোগের কথা বলা হয়। শিশুটির বাবার সঙ্গে দেখা করার সময় শরীরের আঘাত লুকাতে তাকে ঢিলেঢালা পোশাক পরিয়ে দেওয়ার অভিযোগও মামলার বিবরণে উঠে আসে।
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এ ঘটনায় শফিকুর রহমান, তাঁর স্ত্রী বীথি আক্তার এবং বাড়িতে কাজ করা আরও দুই নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। আদালত তাঁদের জামিন আবেদন নাকচ করে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন বলে সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। তবে তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়ার সর্বশেষ অবস্থা প্রকাশের আগে যাচাই করা প্রয়োজন।
এই ঘটনাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এতে শিশুটির সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ সীমিত হয়ে যাওয়ার অভিযোগ সামনে আসে। শিশুর শরীরে আঘাত থাকলেও যদি বাবা-মা নিয়মিত তার সঙ্গে দেখা করতে না পারেন, তাহলে নির্যাতন শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। শিশু গৃহকর্মীদের সুরক্ষায় তাই শুধু নিয়োগকর্তার আচরণ নয়, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং স্বাধীনভাবে অভিযোগ জানানোর সুযোগও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক গবেষণা কী বলছে
শিশু গৃহকর্মীদের নির্যাতনকে শুধু কয়েকটি বিচ্ছিন্ন অপরাধের সমষ্টি হিসেবে দেখলে সমস্যার গভীরতা বোঝা যায় না। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) বলছে, শিশুর বয়সের তুলনায় অতিরিক্ত কাজ, বিপজ্জনক পরিবেশ, শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন এবং শিক্ষার সুযোগ নষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি শিশুশ্রমের ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
আইএলওর শিশু গৃহশ্রমবিষয়ক ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, অন্যের বাড়িতে কাজ করা শিশুরা দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, পর্যাপ্ত খাবার ও বিশ্রামের অভাব, বিপজ্জনক যন্ত্রপাতির সংস্পর্শ, শারীরিক ও মৌখিক নির্যাতন এবং যৌন সহিংসতার ঝুঁকিতে থাকতে পারে। যারা নিয়োগকর্তার বাড়িতে থেকে কাজ করে, তাদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। কারণ তারা পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ, শিক্ষা, চিকিৎসা এবং স্বাভাবিক সামাজিক জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।
আইএলওর ২০১৯ সালের বাংলাদেশবিষয়ক গবেষণায় ঢাকার ৫০০ গৃহকর্মীর অভিজ্ঞতা বিশ্লেষণ করা হয়। তাঁদের মধ্যে ৩৭৫ জন নিয়োগকর্তার বাড়িতে থেকে কাজ করতেন এবং ১২৫ জন বাইরে থেকে কাজ করতেন। গবেষণাটি গৃহকর্মীদের কাজের পরিবেশ, অধিকার এবং কর্মক্ষেত্রে বিদ্যমান ঘাটতি বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটি শুধু শিশু গৃহকর্মীদের ওপর পরিচালিত গবেষণা নয়।
পাকিস্তানে শিশু গৃহশ্রম নিয়ে আইএলওর ২০২২ সালের গবেষণায় শিশুদের কাজে নিয়োগের কারণ, কাজের পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার ঝুঁকি এবং শিক্ষার ওপর প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়। গবেষণাটি সমস্যাটিকে আড়ালে থাকা শ্রমের একটি রূপ হিসেবে চিহ্নিত করে।
আইএলওর ২০২৪ সালের বৈশ্বিক হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে প্রায় ১৩ কোটি ৮০ লাখ শিশু শিশুশ্রমে যুক্ত ছিল। তাদের মধ্যে প্রায় ৫ কোটি ৪০ লাখ শিশু বিপজ্জনক কাজে নিয়োজিত ছিল। এই সংখ্যা সব ধরনের শিশুশ্রমের হিসাব, শুধু শিশু গৃহকর্মীর নয়। তাই এটি দিয়ে ঢাকা, কলকাতা বা করাচিতে শিশু গৃহকর্মীদের নির্যাতনের হার নির্ধারণ করা যাবে না।
কেন শিশু গৃহকর্মীরা বেশি ঝুঁকিতে
প্রথম কারণ দারিদ্র্য। দরিদ্র পরিবারের অনেক অভিভাবক মনে করেন, সন্তানকে শহরের কোনো পরিবারে কাজে দিলে অন্তত খাবার, থাকার জায়গা ও কিছু আয়ের ব্যবস্থা হবে। কেউ কেউ পড়াশোনার সুযোগ বা ভবিষ্যতে আর্থিক সহায়তার আশ্বাসও পান। কিন্তু এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা পালন করা হচ্ছে, তা যাচাই করার ব্যবস্থা সব ক্ষেত্রে থাকে না।
দ্বিতীয় কারণ, কাজের জায়গার বিচ্ছিন্নতা। শিশুটি যদি নিয়োগকর্তার বাড়িতে থাকে, তাহলে তার দৈনন্দিন জীবন নিয়োগকর্তার নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে। কখন ঘুমাবে, কী খাবে, কখন কাজ করবে কিংবা কার সঙ্গে কথা বলবে—এসব বিষয়েও তার স্বাধীনতা সীমিত হতে পারে।
তৃতীয় কারণ, বয়স ও ক্ষমতার পার্থক্য। একজন শিশু নিজের অধিকার সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন নাও হতে পারে। নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করলে কাজ হারানো, বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া কিংবা আরও নির্যাতনের শিকার হওয়ার ভয়ও তাকে চুপ থাকতে বাধ্য করতে পারে।
চতুর্থ কারণ, নজরদারির ঘাটতি। ব্যক্তিগত বাড়ির ভেতরে কী ঘটছে, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা কঠিন। প্রতিবেশীরা সন্দেহজনক কিছু দেখলেও সব সময় হস্তক্ষেপ করেন না। শিশুর পরিবার দূরে থাকলে সমস্যাটি শনাক্ত হতে আরও দেরি হয়।
পঞ্চম কারণ, শিক্ষার সুযোগ হারানো। শিশু গৃহকর্মে যুক্ত হলে অনেক সময় তার স্কুলে যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, বিশ্রামের অভাব এবং মানসিক চাপ তার স্বাভাবিক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে সে শুধু বর্তমানেই বঞ্চিত হয় না, ভবিষ্যতে ভালো কাজ পাওয়ার সুযোগও কমে যেতে পারে।
ঢাকা, কলকাতা ও করাচির মধ্যে মিল ও পার্থক্য
তিন শহরের ঘটনাগুলোতে কয়েকটি সাধারণ মিল রয়েছে। শিশুদের অনেককে দরিদ্র পরিবার থেকে কাজে নেওয়া হয়েছে। নির্যাতনের অভিযোগের মধ্যে রয়েছে মারধর, শরীর পুড়িয়ে দেওয়া, খাবার ও নিরাপত্তার অভাব এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগে বাধা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।
তবে শহর তিনটির আইন, শিশুশ্রমের বাস্তবতা, পুলিশি ব্যবস্থা এবং বিচারপ্রক্রিয়া এক নয়। কলকাতা নিয়ে পাওয়া গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাটি ২০০৬ সালের; অন্যদিকে ঢাকা ও করাচির কয়েকটি ঘটনা ২০২৩ থেকে ২০২৬ সালের। তাই এই তথ্য দিয়ে তিন শহরের মধ্যে কোনটিতে নির্যাতন বেশি, তা নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। এর জন্য একই পদ্ধতিতে সংগৃহীত সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান প্রয়োজন।
তবু ঘটনাগুলো একটি সাধারণ সত্য তুলে ধরে: শিশুকে অন্যের বাড়িতে কাজে পাঠানোর পর তার নিরাপত্তার দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। নিয়োগকর্তা, শিশুর পরিবার, স্থানীয় প্রশাসন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠান—সবারই ভূমিকা রয়েছে।
প্রতিরোধে কী করা প্রয়োজন
শিশু গৃহকর্মীদের নির্যাতন বন্ধ করতে প্রথমেই তাদের বয়স, কাজের পরিবেশ, কর্মঘণ্টা, খাবার, বিশ্রাম এবং শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। শিশুর বয়স ও কাজের ধরন অনুযায়ী আইনগত সীমা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা জরুরি। বিপজ্জনক কাজ, নির্যাতন কিংবা শোষণমূলক পরিস্থিতিতে কোনো শিশুকে রাখা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
দ্বিতীয়ত, শিশুদের নিয়োগের ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারী ও নিয়োগকর্তার পরিচয় এবং কাজের শর্ত যাচাইয়ের ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। শুধু মৌখিক প্রতিশ্রুতির ওপর নির্ভর করলে চলবে না। শিশুটি কোথায় থাকবে, কী কাজ করবে, তার পড়াশোনার ব্যবস্থা থাকবে কি না এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ কীভাবে বজায় থাকবে—এসব বিষয় পরিষ্কার থাকা প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, নির্যাতনের অভিযোগ জানানোর সহজ ও নিরাপদ ব্যবস্থা থাকতে হবে। শিশু নিজে, তার পরিবার, প্রতিবেশী কিংবা চিকিৎসক যেন দ্রুত সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে পারেন। গুরুতর আঘাত পাওয়া শিশুকে চিকিৎসা, নিরাপদ আশ্রয়, মানসিক সহায়তা ও শিক্ষায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
চতুর্থত, মামলার তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত এবং নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করা প্রয়োজন। শুধু গ্রেপ্তার নয়, অভিযোগের যথাযথ তদন্ত, আদালতে প্রমাণ উপস্থাপন এবং ভুক্তভোগীর দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসনও গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশে ২০১৫ সালের গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা রয়েছে। কিন্তু নীতিমালা থাকলেই নির্যাতন বন্ধ হয় না। বাস্তবে তা কতটা কার্যকর হচ্ছে, শিশুদের সুরক্ষা দিতে কী বাধা রয়েছে এবং অভিযোগের প্রতিকার কতটা পাওয়া যাচ্ছে—এসব নিয়মিত মূল্যায়ন করা দরকার।
ঘরের দরজা বন্ধ থাকলেও শিশুর অধিকার বন্ধ হতে পারে না
ঢাকা, কলকাতা ও করাচির ঘটনাগুলো দেখায়, শিশু গৃহকর্মীদের নির্যাতনকে শুধু নিয়োগকর্তার ব্যক্তিগত আচরণের সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে দারিদ্র্য, শিক্ষাবঞ্চনা, অনিরাপদ শ্রমব্যবস্থা এবং দুর্বল নজরদারি।
একটি শিশুকে কাজের জন্য অন্যের বাড়িতে পাঠানো মানে তার নিরাপত্তা ও মর্যাদার অধিকার অন্য কারও হাতে তুলে দেওয়া নয়। শিশুটির খাবার, বিশ্রাম, চিকিৎসা, শিক্ষা, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং নির্যাতন থেকে সুরক্ষার অধিকার অক্ষুণ্ণ থাকতে হবে।
যে বাড়িতে একটি শিশু কাজ করে, সেই বাড়ির দরজা বন্ধ থাকতে পারে। কিন্তু সেই দরজার আড়ালে শিশুটি নির্যাতনের শিকার হলে সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায় না। শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে নির্যাতনের ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি আগেই ঝুঁকি শনাক্ত করা, অভিযোগ জানানোর সুযোগ তৈরি করা এবং নিয়মিত নজরদারি নিশ্চিত করা জরুরি।
শিশু গৃহকর্মীদের সুরক্ষার প্রকৃত পরীক্ষা শুধু এই নয় যে, নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর তারা উদ্ধার পাচ্ছে কি না। বরং নির্যাতন শুরু হওয়ার আগেই তাদের নিরাপদ রাখার কার্যকর ব্যবস্থা রয়েছে কি না, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।












