রবিবার, ২৬ মে ২০২৪, ০৩:২৯ পূর্বাহ্ন

দিবারাত্রির কাব্য: মানিক বন্দোপধ্যায় ( ৫৯ তম কিস্তি )

  • Update Time : সোমবার, ৬ মে, ২০২৪, ১২.০০ পিএম
রবীন্দ্রনাথ পরবর্তী সময়ে বাংলা সাহিত্যে আরেকটি নতুন যুগ সৃষ্টি হয়েছিলো। ভাষাকে মানুষের মুখের ভাষার কাছে নিয়ে আসা নয়, সাহিত্যে’র বিষয়ও হয়েছিলো অনেক বিস্তৃত। সাহিত্যে উঠে এসেছিলো পরিবর্তিত মন ও সমাজের নানান প্রাঙ্গন। সময়ের পথ ধরে সে যুগটি এখন নিকট অতীত। আর সে সাহিত্যও চিরায়ত সাহিত্য। দূর অতীত ও নিকট অতীতের সকল চিরায়ত সাহিত্য মানুষকে সব সময়ই পরিপূর্ণ মানুষ হতে সাহায্য করে। চিরায়ত সাহিত্যকে জানা ছাড়া বাস্তবে মানুষ তার নিজেকে সম্পূর্ণ জানতে পারে না।

সারাক্ষণের চিরায়ত সাহিত্য বিভাগে এবারে থাকছে মানিক বন্দোপধ্যায়ের দিবারাত্রির কাব্য।

দিবারাত্রির কাব্যে’র ভূমিকায় মানিক বন্দোপধ্যায় নিজেই যা লিখেছিলেন …..

দিবারাত্রির কাব্য আমার একুশ বছর বয়সের রচনা। শুধু প্রেমকে ভিত্তি করে বই লেখার সাহস ওই বয়সেই থাকে। কয়েক বছর তাকে তোলা ছিল। অনেক পরিবর্তন করে গত বছর বঙ্গশ্রীতে প্রকাশ করি।

দিবারাত্রির কাব্য পড়তে বসে যদি কখনো মনে হয় বইখানা খাপছাড়া, অস্বাভাবিক,- তখন মনে রাখতে হবে এটি গল্পও নয় উপন্যাসও নয়, রূপক কাহিনী। রূপকের এ একটা নূতন রূপ। একটু চিন্তা করলেই বোঝা যাবে বাস্তব জগতের সঙ্গে সম্পর্ক দিয়ে সীমাবদ্ধ করে নিলে মানুষের কতগুলি অনুভূতি যা দাঁড়ায়, সেইগুলিকেই মানুষের রূপ দেওয়া হয়েছে। চরিত্রগুলি কেউ মানুষ নয়, মানুষের Projection-মানুষের এক এক টুকরো মানসিক অংশ।

দিবা রাত্রির কাব্য

মানিক বন্দোপাধ্যায়

 

আজ রান্না হয়নি। কিন্তু সেজন্য হেরম্বের আহারের কোন ত্রুটি হল না। ফল, দুধ এবং বাসি মিষ্টির অভাব আশ্রমে কখনো হয় না, ভাতের চেয়ে এ সব আহার্যের মর্যাদাই এখানে বেশী, মালতীর স্থায়ী ব্যবস্থা করা আছে। আনন্দ প্রথমে কিছু খেতে চাইল না। কিন্তু হেরম্ব তার ক্ষুধার সঙ্গে তার মানসিক বিপর্যয়ের একটা সম্পর্ক স্থাপনের চেষ্টা করায় রাগ করে একরাশ খাবার নিয়ে সে খেতে বসল।

হেরম্ব বলল, ‘সব খাবে?’

‘খাব।’

‘তোমার সুমতি দেখে খুশী হলাম, আনন্দ!’

সে চিত হয়ে শুয়ে চোখ বোজা মাত্র আনন্দ সব খাবার নিয়ে বাইরে ফেলে মুখ হাত ধুয়ে এল। হেরম্বের বালিশের পাশে এলাচ লবঙ্গ ছিল, একটি এলাচ ভেঙে অর্ধেক দানা সে হেরম্বের মুখে গুঁজে দিল। বাকিগুলি নিজের মুখে দিয়ে বলল, ‘আমি শুতে যাই?’

হেরম্ব চোখ মেলে বলল, ‘যাও।’

যেতে চাওয়া এবং যেতে বলা তাদের আজ উচ্চারিত শব্দগুলির মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে রইল।

হেরম্ব ভেবেছিল আজ বুঝি তার সহজে ঘুম আসবে। অবসন্নতা অল্পক্ষণের মধ্যেই গভীর তন্দ্রায় ডুবে যাবে। দেহমনের শিথিল কিন্তু কোথায় ঘুম? কোথায় এই সকাতর জাগরণের অবসান? ঘরের কমানো আলোর মতো স্তিমিত চেতনা একভাবে বজায় থেকে যায়, বাড়েও না কমেও না। হেরম্ব উঠে বাইরে গেল। মালতী আজ তার নিজের ঘর ছেড়ে অনাথের ঘরে আশ্রয় নিয়েছে, মালতীর ঘরে শিকল তোলা। আনন্দই বোধহয় সন্ধ্যার সময় এ ঘরে একটি প্রদীপ জ্বেলে দিয়েছিল, জানালা দিয়ে হেরম্বের চোখ পড়ল তেল নিঃশেষ হয়ে প্রদীপের বুকে দপদপ করে সলতে পুড়ছে। নিজের ঘর থেকে লণ্ঠন এনে হেরম্ব চোরের মতো শিকল খুলে মালতীর ঘরে ঢুকল। আলমারিতে ছিল মালতীর কারণের ভাণ্ডার, কিন্তু সবই সে প্রায় আজ অনাথের ঘরে সঙ্গে নিয়ে গেছে। খুঁজে খুঁজে কাশীর একটি কাজকরা ছোট কালোরঙের মাটির পাত্রে হেরম্ব অল্প একটু কারণ পেল। তাই এক নিশ্বাসে পান করে আবার চুপি চুপি ঘরের শিকল তুলে নিজের ঘরে ফিরে গেল।

কিন্তু মালতীর কারণে নেশা আছে, নিদ্রা নেই। হেরম্বের অবসাদ একটু কমল, ঘুম এল না। বিছানায় বসে জানালা দিয়ে সে বাইরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল।

এমন সময় শোনা গেল মালতীর ডাক। হেরম্ব এবং আনন্দ দু’জনের নাম ধরে সে ফাটিয়ে চিৎকার করছে।

দু’জনে তারা প্রায় একসঙ্গেই মালতীর ঘরে প্রবেশ করল। অনাথের প্রায় আসবাবশূন্য পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ঘরখানা মালতী এক বেলাতেই নোংরা করে ফেলেছে। সমস্ত মেঝেতে কাদামাখা পায়ের শুকনো ছাপ, এক কোণে অভুক্ত আহার্য এখানে-ওখানে ফলের খোসা ও আমের আঁটি। একটি মাটির পাত্র ভেঙে কারণের স্রোত নর্দমা পর্যন্ত গিয়েছিল, এখনো সেখানে খানিকটা জমা হয়ে আছে। ঘরে তীব্র গন্ধ।

কিন্তু মালতীকে দেখেই বোঝা গেল বেশী কারণ সে খায়নি। তার দৃষ্টি

অনেকটা স্বাভাবিক, কথাও স্পার।

বলল, ‘একা, আামার ভয় করছে, তেরছ।’

হেরম্ব বিজ্ঞাসা করল, ‘কিসের ভর।’

মালতী বলল, ‘তা জানিনে, হেরখ, ভয়ে আমার হৃৎকম্প হচ্ছিল। তোমরা এ ঘরে শোও।’

হেরম্ব অবাক হয়ে বলল, ‘তার মানে?’

মালতী বলল, ‘মানে আবার কি, মানে? বলছি আমার ভয় করছে, একা থাকতে পারব না, আবার মানে কিসের? ঝাঁটা এনে ঘরটা একটু ঝাঁট দিয়ে বিছানা পাত, আনন্দ।’

 

দিবারাত্রির কাব্য: মানিক বন্দোপধ্যায় ( ৫৮ তম কিস্তি )

দিবারাত্রির কাব্য: মানিক বন্দোপধ্যায় ( ৫৮ তম কিস্তি )

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

kjhdf73kjhykjhuhf
© All rights reserved © 2024