শনিবার, ১৮ মে ২০২৪, ১০:৪৩ অপরাহ্ন

বাড়ি ফেরা

  • Update Time : রবিবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২৪, ৮.৩০ এএম
শাকিল আহম্মেদ
হাচিওজি, টোকিও
সুপ্রিয় সুমাত্রা,
আগামী এপ্রিল ২০২১ সালে তুমি চৌদ্দ বছর পূর্ণ করছ। চেরি ফুলের সাদা মেঘালয় জাপানে তোমার জন্ম। তোমাকে যখন প্রথম আমি কোলে তুলে নিলাম তখন আমার মনে হলো, জীবনে অনেক শিশুদের কোলে নিয়েছি। নির্দিষ্ট সময়ের পরে তাদের বাবা-মায়ের কোলে ফেরতও দিয়েছি। কিন্তু এই শিশুটি আমার কোলে সারাজীবন থাকবে। আমার অস্তিত্বের সাথে সেঁটে থাকবে। কেউ কেড়ে নিতে পারবে না। কিন্তু ভাগ্যদেবতা তখন হয়তো বিপরীত হাসি হেসেছিল। এখন তোমার মা ও ছোট বোনসহ তুমি জাপানে থাক। আর আমি থাকি সাতসমুদ্র তেরো নদীর এপারে। বাংলাদেশে।
জাপান খুবই সুন্দর একটি দেশ। এখানকার মানুষগুলো আরো সুন্দর। এই দেশে অনেকে প্রবাসী ও বিদেশি হিসেবে জীবনযাপন করলেও আমার কাছে পরবাস মনে হতো। আমার পক্ষে সারাজীবন কোথাও অতিথি হয়ে থাকা সম্ভব নয়। সুকুৰা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতিতে পিএইচ.ডি শেষে গবেষক হিসেবে কাজ করে, প্রায় এগারো বছর পর আমি বাংলাদেশে ফিরে এসেছি। প্রিয় ঢাকা শহর এখন আমার নিত্যদিনের সঙ্গী। জানি, এই শহরকে তথ্যপ্রমাণ দিয়ে আবাসের অযোগ্য বলে বাতিল করা যাবে। কিন্তু অন্য কোনো শহর আমার চিন্তার বিকাশ ও প্রকাশে ঢাকাকে অতিক্রম করতে পারবে না। তাছাড়া বাংলাদেশ ক্রমশই সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বড় হচ্ছে। চারদিকের এই বিস্তারের উৎসবে আমি সঙ্গে থাকতে চেয়েছি। তাই আমি বাড়ি ফেরার সিদ্ধান্ত নিই।
তুমি হয়তো ভাববে, আব্বুজির দৃষ্টিভঙ্গি জাতীয়তাবাদী ও বাংলাদেশের প্রতি পক্ষপাতিত্বমূলক। সেটা আমি জানি বলেই সাবধানী হয়ে কথা বলব। তাই হৃদয়ের পাশাপাশি মস্তিষ্ককে গুরুত্ব দিয়ে লিখব। তবে হৃদয়ের সাথে যদি মস্তিষ্কের বিরোধ হয় তাহলে আমি বরাবরই হৃদয়কে জিতিয়ে দিতে চাই। কেননা আমি মনে করি, মস্তিষ্ক একটি যৌক্তিক যন্ত্র, যা লাভের কথা বলে, কিন্তু আসলে দেখায় লোভ। অন্যদিকে হৃদয় কিছুটা ছিঁচকাঁদুনে হলেও শেষ পর্যন্ত বর্বরতার বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে দাঁড়ায়, যা আধুনিক অতিসভ্যতাকে অতিক্রম করে একটি মানবিক জায়গায় মানুষকে পৌছে দিতে পারে।
 মানুষ কেন বাড়ি ফেরে? তোমাকে লেখা এই চিঠিগুলোর মধ্যে আমি উত্তরটি দেয়ার চেষ্টা করব। এর সম্ভাব্য উত্তর দু-ভাবে প্রকাশ করা যেতে পারে। প্রথমত, মানুষ ব্যক্তিগত অর্থনৈতিক উন্নয়ন চায়। তার এই মস্তিষ্কজাত চিন্তার সাথে সমাজ, রাষ্ট্র ও বাজারের সক্ষমতাও জড়িত। দ্বিতীয়ত, মানুষ চিন্তাশীল প্রাণী হিসেবে অতীত অভিজ্ঞতাগুলো কাজে লাগাতে চায়। স্বদেশ এই চিন্তার বিকাশে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মানুষের কাছে তাই তার বাড়ি দিকনির্দেশক এক হৃদয়কম্পাস। মোটাদাগের বিচারে অর্থনৈতিক ও চিন্তাজগতের স্বপ্নের কারণে মানুষ বাড়ি ফিরতে উৎসাহিত হয়। তাই বাড়ি ফেরার সিদ্ধান্ত যেন মস্তিষ্ক ও হৃদয়জাত একটি লক্ষ যা মমতা দিয়ে একটি গন্তব্যে পৌঁছাতে চায়।
একটি সরলরৈখিক সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যেতে পারে যে, বাংলাদেশে ঝকঝকে গাড়ি, তেলতেলে রাস্তা ও তুলতুলে বিছানা নেই। কিন্তু এই দেশে রয়েছে অপার এক সম্ভাবনা। অবশ্য সম্ভাবনাগুলো এরই মধ্যে বাস্তবতায় রূপান্তরিত হচ্ছে। রাজনৈতিকভাবে খুবই সংবেদনশীল মানুষগুলো বাংলাদেশকে ১৯৪৭ সালের পর থেকে আন্দোলন, সংগ্রাম ও যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতার দিকে নিয়ে গেছে। তারপর ১৯৭১ সালের পর থেকে বাংলাদেশ সামাজিক বিষয়গুলোতে যা অর্জন করেছে তা বিশ্বকে তাক লাগিয়েছে। এখন বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নে আরো বেশি মনোযোগী। শুধু মস্তিষ্কের ওপর ভরসা করে এই অবস্থানে পৌঁছানো দুষ্কর। সীমাহীন হৃদয়ানুভূতি না থাকলে এই রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।
তোমাকে আগামী কয়েকটি চিঠিতে আমার বাড়ি ফেরার ভাবনার কথা লিখে জানাব। প্রথমেই আমি লিখব সামাজিক পুঁজির গুরুত্ব, যা একজন মানুষের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তারপর বাংলাদেশের অসামান্য বিকাশের গতি নিয়ে লিখব, যা আমার কাছে বিশাল এক বিস্ময় মনে হয়েছে। এভাবে বাংলাদেশে আসার সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে মস্তিষ্ক ও হৃদয়ের যোগ হলো। বাড়ি ফেরা তো হলো। কিন্তু এসে কী দেখলাম? সমাজ, রাষ্ট্র ও বাণিজ্যিক সাফল্যের সাথে ব্যক্তির একটি বিচ্ছিন্নতা তৈরি হচ্ছে। সবার শেষে আমি তোমাকে জানাব বাড়ি ফেরা এক অসম্পূর্ণ যাত্রা, যা প্রাপ্তি ও ঝুঁকিতে ভরপুর। তবে এই লেখাগুলো মূলত আমার প্রজন্মের সময়কে ধারণ করেছে। বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রজন্মের বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণকারীদের জন্য বাড়ি ফেরার যুক্তিগুলো প্রযোজ্য নাও হতে পারে।
শুভেচ্ছান্তে,
তোমার আব্বুজি
মগবাজার, ঢাকা
১ জানুয়ারি ২০২১
দুই.
হাচিওজি, টোকিও
সুপ্রিয় সুমাত্রা,
গত বছর নভেম্বরে তোমার দাদাজি, দাদু ও আমি কোভিতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হই। তোমার দাদাজি মারা গেলেন, কিন্তু দাদু ও আমি বাসায় ফিরলাম। দাদাজির মৃত্যুতে তোমার মন অনেক খারাপ হলো। বিমান যোগাযোগ বন্ধ ছিল বলে তুমি জাপান থেকে বাংলাদেশে আসতে পারনি। তোমার দাদু এখনো আকাশে বিমান দেখলেই ভাবে, তুমি আসছ। পঙ্গু যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে আমিও প্রায় এক বছর ধরে তোমাদের দেখতে জাপানে আসতে পারি না। কী অদ্ভুত পৃথিবীতে আমরা এখন বসবাস করি। বিশ্বায়ন নিয়ে অতি বাড়াবাড়ির খেসারত আমাদের এখন দিতে হচ্ছে। বিশ্বসংসার তৈরি করতে গিয়ে আমরা ছোট ছোট সংসার ভেঙে ফেলছি। মানুষ শারীরিক আরামের কারণে মানসিক বিশালত্বকে পরিহার করছে। মানুষ এখন একা, বিচ্ছিন্ন ও পরিত্যক্ত।
অথচ দেখো, মানুষ ততদিনই শক্তিশালী থাকে যতদিন সে যুথবদ্ধ হয়ে জীবনযাপন করে। ঐক্যবদ্ধ হয়ে আদিম মানুষ বিরূপ প্রকৃতির বিরুদ্ধে প্রতিযোগিতা করেছে। আর বর্তমানে আগ্রাসী সমাজ, রাষ্ট্র ও বাণিজ্যিক স্বার্থের বিরুদ্ধে মানুষ সংগ্রাম করছে। যূথবদ্ধ হয়ে থাকার মধ্যেই মানুষ সামাজিক পুঁজির জন্ম দেয়।
তোমাকে একটা তত্ত্বের কথা বলি। চারপাশের অভিজ্ঞতার সাথে আশা করি তুমি মেলাতে পারবে। আমার প্রিয় একজন ফরাসি সমাজতাত্ত্বিকের নাম পিয়ার বন্ধু। তিনি অন্তত চার ধরনের পুঁজির কথা বলেছেন আর্থিক, মানবিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক। এক. ধরো একজন মানুষ অনেক টাকাকড়ি ও সম্পদের মালিক, তাকে আমরা আর্থিক পুঁজিতে সমৃদ্ধ বলতে পারি। দুই, বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া শেষে ডিগ্রি পেয়েছে এমন একজনকে আমরা বলতে পারি জ্ঞান ও দক্ষতার অর্থে তার মানবিক পুঁজি আছে। তিন, একজন মানুষ গ্রামে না থেকে একটি শহরে থাকে। তাহলে শহরের মানুষের তৈরি কর্মকাণ্ডের আধিক্য ও উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে তার সাংস্কৃতিক পুঁজি বেশি হবে। সবশেষে, চার, একজন মানুষের সমাজের অনেকের সাথে বন্ধুত্ব আছে। বন্ধুত্বকে সে কর্ষণ করে চাষবাস করতে পারে। আমরা বলতে পারি তার সামাজিক পুঁজি আছে। কারো যদি আর্থিক, মানবিক ও সাংস্কৃতিক পুঁজি কমও থাকে তাহলে সে শুধু সামাজিক পুঁজি দিয়ে নিজেকে নিরাপদ রাখতে পারবে। নিচে তোমাকে একটি কাল্পনিক উদাহরণ দিই। ধরো, স্কুলে তুমি বন্ধুদের সাথে খেলাধুলা করো, তোমার পড়াশোনার শেষে অমনোযোগী ছাত্র ও ছাত্রীদের সাহায্য করো এবং স্কুল চালাতে তোমার শিক্ষকদের সহযোগিতা করো। অথচ তোমার এক বন্ধু খুবই একা একা থাকে। কাউকে সাহায্য করে না কিংবা কারো সাহায্য নেয়ও না। আর স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার দিনে তো স্কুলেই আসে না। এখন প্রশ্ন হলো, তোমাদের মধ্যে দুজনই যদি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ো তাহলে কে বেশি বন্ধুদের সেবা পাবে? আমার ধারণা, তোমার পাশের একাকী বন্ধুর তুলনায় তুমিই বেশি সেবা পাবে। কেননা তোমার সামাজিক পুঁজি বেশি। এভাবে এই সামাজিক পুঁজি ব্যবহার করে তুমি কাজকর্ম, চাকরি-বাকরি কিংবা ব্যবসা-বাণিজ্যে সফল হতে পার। শুধু ব্যক্তি নয়, একটি রাষ্ট্রও সামাজিক পুঁজি দিয়ে উপকৃত হতে পারে। আমেরিকার রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট পাটনাম ইতালিতে গবেষণা করে বের করলেন, সামাজিক পুঁজি গণতন্ত্রায়নে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করে।
ব্যক্তির উদ্যোগের পাশাপাশি ধর্ম, ভাষা ও দীর্ঘমেয়াদি আবাসনের কারণে মাতৃভূমিতে সামাজিক পুঁজি ব্যবহারটা সহজতর হয়। কিন্তু বিদেশ বিভূঁইয়ে এই ধরনের পুঁজি সীমিতাকারে কার্যকর থাকে। জাপানে পরবাসী জীবনের সময় আমি দেখেছি, বাঙালিরা বৃহত্তর জাপানিদের সাথে সামাজিকভাবে মেলামেশা করতো না। খুবই বিচ্ছিন্ন হয়ে থার্টিফার্স্ট নাইট, একুশে ফেব্রুয়ারি, পহেলা বৈশাখ, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস ও দুটো ঈদের উৎসব শুধুমাত্র বাঙালিদের মধ্যে পালন করত। আমেরিকা, ইংল্যান্ড, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, আরব দেশসহ বিভিন্ন দেশে প্রবাসী বাঙালিরা বিদেশি মূলধারার সমাজের সাথে মেশে না। তারা এক-একটি বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। ফলে বিদেশে তারা সামাজিকভাবে পরিপূর্ণতা নিয়ে বিকশিত হতে পারে না। অথচ প্রবাসী বাঙালিদের সামাজিক পুঁজি স্বদেশে অব্যবহৃত অবস্থায় অবহেলায় পড়ে থাকে।
নিবেদনে,
তোমার আব্বুজি
মগবাজার, ঢাকা
৭ জানুয়ারি ২০২১
তিন.
হাচিওজি, টোকিও
সুপ্রিয় সুমাত্রা,
জাপানের সুকুবা শহরে তোমার জন্ম। এটা টোকিও শহরের একটু বাইরে। যেমন ধরো ঢাকা থেকে সাভার। সুকুবা শহরটি সমতল। শহরের পশ্চিমে একটি বড় পাহাড় আছে, যা পুরো এলাকাটিকে মুরুব্বির মতো পাহারা দেয়। সুকুবাকে নিয়ে গর্ব করার মতো ওই পাহাড়টাই ছিল। তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে, প্রবাসী বাঙালিদের সঙ্গে সুকুবা পাহাড়ের পাদদেশে ও আশেপাশের অনেক জায়গায় আমরা বার-বি-কিউ পার্টি করতাম। প্রতিবছরই হেমন্তে ও বসন্তে এই ধরনের পার্টিগুলো আমাদের উষ্ণ করে রাখত। ছেলেগুলো ধর্মালোচনা ও বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়ে ব্যস্ত, অন্যদিকে মেয়েদের আলোচনার বিষয়বস্তু অনির্ধারিত ও বিস্তৃত। কিন্তু সবার আলোচনার কেন্দ্র বাংলাদেশ। বিদেশে তারা একটি পরাবাস্তব জীবনযাপন করত। বিদেশের সাথে পেট ও মস্তিষ্কের যোগাযোগ থাকলেও হৃদয়ের কোনো সম্পর্ক ছিল না। দেহ বিদেশে কিন্তু স্মৃতির আর্দ্রতা দিয়ে ভেজা মন বাংলাদেশে।
বাড়ি ফেরা যদি একটি গল্প হয়ে থাকে, তাহলে ঠিক আগের পর্বে বাড়ি ত্যাগের একটি সূচনা নিশ্চয়ই আছে। বাড়ি ত্যাগের সপক্ষে শক্তিশালী একটি যুক্তি আছে, যা মানুষ বাস্তবতার কারণে মেনে নিয়েছিল। উদ্বেগ ও স্বপ্ন নিয়ে সে বাড়ি থেকে বেরিয়েছে, কিন্তু চোখে তার বিচ্ছেদের পানি।
গত নব্বইয়ের দশকে তোমার বড় ও সেজ চাচ্চু যখন আমেরিকাতে গেল তখন আমরা ভাড়া করা বাসে ঢাকা এয়ারপোর্টে তাদের বিদায় জানাতে গেলাম। বাসভর্তি মানুষের উপচে পড়া জলজ আবেগ। প্রায় চিরবিদায়ের মতো শোকাভিভূত আমরা। তখনো জানি না জীবনের গতি কোনদিকে প্রবাহিত। পরে বুঝলাম, নিরাপদ জীবনের হাতছানিতে তারা সারাজীবনের জন্য সাড়া দিল। সেই থেকে তোমার চাচ্চুরা প্রায় সিকি শতাব্দী ধরে আমেরিকায় প্রবাসী।
নৌকাডুবি হলে মানুষ যেমন করে চতুর্দিকে লাফিয়ে-ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করে তেমনি করে স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশ থেকে অনেক বাঙালি বিদেশে পারি দিলেন। প্রধানত অর্থনৈতিক কারণে তারা বিদেশে চলে গেলেন। তার সঙ্গে আরো যুক্ত হলো উন্নত শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা ও ব্যক্তিস্বাধীনতা। এখন দেশের প্রায় এক কোটি লোক বিদেশে থাকে। অর্থাৎ, প্রতি সতেরোজনের মধ্যে একজন প্রবাসী। দেশ যখন ১৯৭১ সালে স্বাধীন হয় তখনো উন্নত বিশ্বে অবস্থানকারী অনেক প্রবাসী নিশ্চিত হতে পারেননি আদৌ বাংলাদেশ টিকবে কি না। বিশেষ করে আমেরিকা, ইংল্যান্ড, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় অবস্থানকারী প্রবাসী বাঙালিরা বাংলাদেশে ফেরত আসার কথা চিন্তা করলেও যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে ছেলেমেয়েদের ইংরেজি শিক্ষার ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন। তার সঙ্গে যুক্ত হয় অর্থনৈতিক অনিরাপত্তা, যা ছিল দেশত্যাগের প্রাথমিক কারণ।
সত্তর ও আশির দশকে বাংলাদেশ দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও অশিক্ষায় পশ্চাৎপদ ছিল, যা মানুষকে অনেকটুকু অনিরাপদ করে তোলে। ফলে তারা প্রবাসী হয়ে ভাগ্য ফেরাতে চায়। এখানেও শ্রেণীবিভাজন। উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা প্রবাস জীবনের জন্য মূলত বেছে নেয় ইউরোপ, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও কানাডা। আর নিম্নবিত্তরা স্থান পায় আরবের ঊষর ভূমিতে। এই আরব দেশগুলো থেকেই প্রবাসী বাঙালিরা বৈদেশিক মুদ্রার মূল স্রোতটি দেশে পাঠিয়ে থাকে। বাংলাদেশের কৃষকরা ও তাদের সন্তানরা বাংলাদেশকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। কৃষকরা ফসল ফলায় বলেই আমরা খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং কম দামে খেতে পারি। অন্যদিকে কৃষকের সন্তানরা বিদেশ থেকে বৈদেশিক মুদ্রা পাঠায় এবং দেশে গার্মেন্টস রপ্তানিতে কাজ করে। ফলে আমরা বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ নিয়ে গর্ব করে হাসি। নিম্নবিত্তরা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের কাছে তেমন কিছুই পায়নি, বরং দিয়েছে অনেক বেশি।
অন্যদিকে অনেক উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সব সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করে চিরতরে বিদেশে চলে গেছে। মাত্র দশ টাকার প্রতীকী বেতনে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র বা ছাত্রী পড়াশোনা শেষে বিদেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করে। দেশে আর কোনোদিন ফিরবে না। তাই পৈতৃক সম্পত্তি বিক্রি করে অনেকে বিদেশে বাড়িঘর কিনেছে। তাদের পেছনে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের সমস্ত বিনিয়োগ ব্যর্থ হয়েছে। যদিও তারা দাবি করে, বাংলাদেশ তাদের কিছুই দেয়নি।
ভূত দেখার মতো ভয় পেয়ে সবাই বাংলাদেশকে ছেড়ে চলে যায়নি। প্রত্যয়দীপ্ত হয়ে কেউ কেউ বাড়ি ফিরেছেন প্রথম প্রহরে। যারা ফিরেছেন তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ব্র্যাকের প্রতিষ্ঠাতা ফজলে হাসান আবেদ। তিনি বিদেশে মোটা বেতনের চাকরি ছেড়ে বাংলাদেশে এলেন। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের অনিশ্চয়তার মধ্যে তিনি সম্ভাবনা দেখলেন। তিনি পরিশ্রম ও মেধা দিয়ে ব্র্যাক নির্মাণ করলেন। এখন ব্র্যাক পৃথিবীর অন্যতম বড় বেসরকারি সাহায্য সংস্থা বা এনজিও।
গত প্রায় পঞ্চাশ বছরে সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলোর সম্মিলিত প্রয়াসে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ঘটেছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশিদের আয়ু ছিল ৪৬ বছর। ২০২১ সালে আয়ু বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২ বছর। ২০১৯ সালে শিশুমৃত্যুর হার প্রতি হাজারে ৩১ জন। ২০২১ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি পার হয় এমন শিশুর সংখ্যা ৯৮ শতাংশ। ২০১৯ সালে বিশ্বে দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির মধ্যম বাংলাদেশ সপ্তম স্থান অর্জন করেছে এবং তার জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৮.১ শতাংশ। লিঙ্গবৈষম্যের সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান পৃথিবীতে পঞ্চাশতম, যা তাকে আমেরিকা, চীন ও জাপান থেকেও এগিয়ে রেখেছে। উল্লেখ্য বাংলাদেশ অনেকগুলো আর্থ-সামাজিক সূচকে ভারত ও পাকিস্তান থেকে এগিয়ে আছে। এই সমস্ত অর্জন উন্নয়ন পণ্ডিতদের মধ্যে একটি জটিল ধন্ধের জন্ম দিয়েছে। তারা প্রশ্ন করছে, সুশাসনের ক্ষেত্রে কম নাম্বার পাওয়া বাংলাদেশ কীভাবে চোখ ধাঁধানো সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন করতে পেরেছে?
এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর আমরা এখনো জানি না। তবে কতগুলো সম্ভাবনার কথা বলতে পারি। রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা, সামাজিক বোঝাপড়া ও অর্থনৈতিক সামর্থ্যকে বাংলাদেশের উন্নয়নের কারণ হিসেবে দেখা যেতে পারে। প্রথমত, রাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থান ছিল সামাজিক উন্নয়নের পক্ষে। কম খরচে প্রাথমিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় রাষ্ট্রের ভূমিকা আছে। দ্বিতীয়ত, সামাজিক সংগঠনগুলোর উন্নয়নের পক্ষে নিরলস প্রচারণা কাজে লেগেছে। বিশেষ করে এনজিওগুলো নীতিপ্রণেতাদের বোঝাতে সক্ষম হয়েছে নারীদের সমান অংশগ্রহণ গুরুত্বপূর্ণ। আর বাংলাদেশ রাষ্ট্র সামাজিক বিনিয়োগের মাধ্যমে নারী-পুরুষের সমতার ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা পালন করেছে। তৃতীয়ত, বেসরকারি খাতের অনেক অনেক সমালোচনা থাকার পরও তারা বাজারের বিস্তৃতি ঘটাতে পেরেছে। ফলে সাধারণ মানুষ এখন আরো বেশি করে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত।
অর্থনীতিবিদ, শিক্ষাবিদ ও সাবেক আমলা আকবর আলি খান একবার বলেছিলেন, অষ্টাদশ শতাব্দীতে শিল্প বিপ্লবের পর ব্রিটিশরা যে-গতিতে অর্থনৈতিক উন্নয়ন করেছিল, অল্প সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের গতি তার চাইতেও বেশি। কিন্তু ব্রিটিশরা প্রতিষ্ঠান তৈরিতে যেমন দক্ষ ছিল আমরা নিদারুণভাবে এই বিষয়ে উদাসীন। পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণে আমাদের শিথিলতা প্রাতিষ্ঠানিক অদক্ষতার একটি স্মারক। উন্নয়নের নামে বাংলাদেশের যে-পরিমাণ পরিবেশের ক্ষতি আমরা করছি, তা মাতালের পিচ্ছিল পথে যাত্রার মতো ঝুঁকিপূর্ণ। যেখানে মাথা ও পা একসাথে বেসামাল।
সুমাত্রা, তোমাদের প্রজন্ম নিশ্চয়ই একদিন পরিবেশ নিয়ে আমাদের ভুলগুলোকে অন্যায় হিসেবে চিহ্নিত করবে। তোমরা ভাববে, আমরা অনেক লোভী ছিলাম। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা না ভেবে আমরা শুধু আমাদের বর্তমান ভোগ আর লালসার কথা ভেবেছিলাম। আমরা সেই কাণ্ডজ্ঞানহীন জুয়াড়ি, যারা এক রাতে জুয়ার টেবিলে সমস্ত সঞ্চয় খুইয়ে সকালে ভিখারি হয়ে শূন্যহাতে চলে গেছি।
ধন্যবাদ,
তোমার আব্বুজি
মগবাজার, ঢাকা
১৩ জানুয়ারি ২০২১
চার.
হাচিওজি, টোকিও
সুপ্রিয় সুমাত্রা,
এক ফোঁটা পানি যেমন সারা পৃথিবীতে ঘুরে বেড়ায় তেমনি মানুষের ভাগ্য একেক সময় এক একটি মহাদেশে উপস্থিত হয়। শিল্প বিপ্লবের পর ইউরোপ ও আমেরিকার অসাধারণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটে। এশিয়া, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকা ছিল তাদের কর্ষিত ভূমি। আর মাদ্রিদ, লন্ডন, প্যারিস ও নিউইয়র্কের মতো শহরগুলোতে সেই ফসল উঠল। এমনকি ইউরোপ ও আমেরিকার অনেক সাধারণ রাস্তায় উপনিবেশ থেকে আসা সেই বিত্তবৈভব উপচে গড়িয়ে পড়ল।
ভাগ্যদেবতা প্রেম করে কিন্তু সংসার করে না। সে মিশরীয়দের কাছে এসেছিল, সময় কাটিয়েছে ভারতে ও চীনে, আবার মুক্তহস্তে অনেক আড়ম্বর উপহার দেয়ার পরও গ্রিক, রোমান ও পারসিয়ানদের কাছে স্থায়ীভাবে বসবাস করেনি। যে ইউরোপ ও আমেরিকা একবার সমৃদ্ধির বন্যায় ভেসেছিল তা এখন ভাটার কাদায় বিগতযৌবন। বিশেষ করে কোভিড অতিমারির পরে এই দুর্দশা এখন বাস্তব। উন্নত বিশ্বে স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা পর্যুদস্ত। বেকারত্ব বেড়েছে অসহনীয় মাত্রায়। নেলসন ম্যান্ডেলা একবার বলেছিলেন, একজন কালো যদি গরিব হয় তা দুঃখজনক; কিন্তু একজন সাদা যদি গরিব হয় তাহলে সেটা ট্র্যাজেডি। এই ট্র্যাজিক বিষয়টি মানতে পারছে না বলেই ইউরোপ ও আমেরিকায় সাদারা অসন্তুষ্ট। বর্ণবাদী অন্ধ জাতীয়তাবাদের পুনর্জন্ম হচ্ছে। মানুষ যখন অর্থনীতিতে ব্যর্থ হয় তখন অযৌক্তিক সস্তা রাজনৈতিক আচরণ করে নিজেকে শাস্তি দেয়। গত শতাব্দীর তিরিশের দশকে ইউরোপ ও আমেরিকায় যে-অর্থনৈতিক মন্দা হয় তাতে অন্ধ জাতীয়তাবাদের জন্ম হয়। আর তার করুণ পরিণতি দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ।
সুমাত্রা, তুমি এখন আমাকে প্রশ্ন করতে পার- ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়ায় বাঙালিরা এখন স্থায়ীভাবে বসবাস করতে যাবে কি? আমি মনে করি এই দেশগুলো মেথোডলজিক্যালি বা পদ্ধতিগতভাবে অনেক বিজ্ঞানমনস্ক ও উন্নত। মানবসভ্যতায় এই বিষয়ে তাদের বিশাল অবদান আছে। ফলে শিক্ষার জন্য এসব দেশে যাওয়া যেতে পারে। কিন্তু অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির জন্য সেখানে যাওয়ার যৌক্তিকতা নেই। কেননা উন্নত বিশ্ব তো নিজেরাই নিজেদের বেকারত্ব দূর করতে পারছে না। সেখানে আমরা গিয়ে ভিড় বাড়ানোর কোনো মানে হয় না। বিদেশ এখন বিদেশিদের ভার বহন করতে অক্ষম। উন্নত বিশ্বে বিদেশিরা এখন অপ্রয়োজনীয় ও অতিরিক্ত।
অথচ চেয়ে দেখো, চীন, ভারত, ভিয়েতনাম ও বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রগুলো দ্রুতগতিতে চিতাবাঘের ক্ষিপ্রতা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এখানে নতুন আলোর বন্যা। বন্দরগুলোতে প্রতিদিনই নতুন নতুন জাহাজ এসে ভিড়ছে। এই উন্নয়ন সাম্প্রতিক কোনো ঘটনা নয়। কেননা এই দেশগুলো একসময় উন্নত ছিল। তাই তাদের বর্তমান উন্নয়নকে রিইমারজেন্স বা পুনরুত্থান বলা হয়। যেমন, সপ্তদশ শতাব্দীর মোগল আমলে বিশ্বের প্রায় বারো শতাংশ জিডিপি অবদান রাখত বাংলাদেশ। ঔপনিবেশিক শাসন তাকে ভূপতিত করেছিল ঠিকই কিন্তু এখন অদম্য সামাজিক ইচ্ছা, রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও উদ্যোক্তাদের সাহসী বিনিয়োগের কারণে বাংলাদেশ নতুন করে উড্ডীয়মান।
বাঙালিরা একসময়ে দেশত্যাগ করে বিদেশে গিয়েছিল মূলত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কারণে। কিন্তু সেই আরাধ্য গন্তব্যগুলো এখন ক্ষয়িষ্ণু। রোগা পায়ে হেঁটে ক্লান্ত পশুর মতো আহত হয়ে পড়ে আছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে দুর্বার গতিতে। এদেশ অর্থনীতিতে কতগুলো শক্তি অর্জন করেছে। কোভিড পরবর্তী অর্থনৈতিক ক্ষতি এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে ভালোভাবে কাটিয়ে উঠতে পারছে। কোভিডের সময়ে অর্থাৎ ২০২০ সালে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৩.৮ শতাংশ। এই সময়ে চীনের প্রবৃদ্ধি ১.৯ শতাংশ, ভিয়েতনামের ১.৬ শতাংশ ও ভারতের ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি-১০.৩ শতাংশ।
সুমাত্রা, তুমি আবারো আমাকে প্রশ্ন করতে পার এই নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এখন বাঙালিরা বাড়ি ফিরে আসবে কি না? এই প্রশ্নের উত্তর অনেক সহজ না। কেননা, তাতে অর্থনৈতিক কারণ ছাড়াও ইগো যুক্ত আছে। মধ্যবয়সী ও বৃদ্ধরা বাড়ি ফেরাটা একটা পরাজয় মনে করতে পারে। তবে আমার মনে হয়েছে পিয়ার বর্জুর আর্থিক, মানবিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পুঁজির কার্যকর ব্যবহার করার জন্য বাংলাদেশ একটি চমৎকার জায়গা হতে পারে। তাছাড়া মস্তিষ্ক ও হৃদয়ের মধ্যে একটি ভারসাম্য তৈরি করতে পারে এই পুঁজিগুলো। তবে এটা বলা যেতে পারে, অর্থনৈতিক কারণেই বাঙালিরা একদিন বাড়ি ছেড়েছিল। আবার অর্থনৈতিক কারণেই বাঙালিরা হয়তো আবার বাড়ি ফিরে আসবে। পুরনো গৃহত্যাগীরা যদি বাড়ি ফিরে নাও আসে তাহলেও নতুন গৃহত্যাগীর সংখ্যা কমে যাবে। আমার মনে হয় বাঙালির আত্মবিশ্বাসী নতুন প্রজন্ম প্যারিসের লুভ মিউজিয়াম, লন্ডনের ব্রিটিশ মিউজিয়াম কিংবা নিউইয়র্কের মেট্রোপলিটান মিউজিয়াম অব আর্টে বিয়ে আপ্লুত হয়ে হারিয়ে যাবে না। মোনালিসার পাশে দাঁড়িয়ে নিজের কৃতজ চিত্তের ছবি তুলে মানসিক দৈন্যকে প্রকটভাবে প্রকাশ করবে না। বরং, নতুন কিছু নির্মাণের জন্য চিতার উজ্জ্বল চোখে সব দেখে ক্ষিপ্রতা নিয়ে বাড়ি ফিরবে। তারপর তারা বাংলাদেশের জল-কাদা-মাটি-ইতিহাস-ঐতিহ্য-সংস্কৃতি দিয়ে মৌলিক বির তৈরি করবে।
উর্দু ও ফার্সি ভাষার সুফি কবি আমির খসরুর একটি কবিতা দিয়ে আজকের চিঠি শেষ করছি।
‘আগার ফেরদৌস বাররুয়ে জামিনান্ত, ও হামিনাস্ত, ও হামিনান্ত, ও হামিনাস্ত।’
‘বেহেস্তকে যদি মাটিতে বপন করা যেত, তবে তা এখানেই, এখানেই, এখানেই।’
জয়তু, তোমার আব্বুজি মগবাজার, ঢাকা ২০ জানুয়ারি ২০২১
পাঁচ.
হাচিওজি, টোকিও
সুপ্রিয় সুমাত্রা,
তুমি হয়তো লক্ষ করেছ, প্রবাসীদের বাংলাদেশ ছাড়ার পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে আমি অর্থকে উল্লেখ করেছি। মানুষের সেই সিদ্ধান্তের পেছনে জোরালো যুক্তি ছিল। কেননা বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর নিরাপত্তাহীনতা মানুষকে পেয়ে বসেছিল। এই অস্থিতিশীলতা কিছুদিন আগে পর্যন্ত ছিল। কিন্তু এখন এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। আমাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পেশিগুলো আস্তে আস্তে শক্তিশালী হচ্ছে। বাড়ি ছাড়ার পেছনে যদি অর্থনীতি প্রধান কারণ হয়ে থাকে তবে মানুষ বাড়ি ফিরবে ঠিক একই কারণে। কিন্তু এর বিপদ আমরা জানি। কেননা অনিয়ন্ত্রিত বাজারের জৌলুসের কাছে মানুষ পরাজিত হয়। তাই হৃদয়কে যুক্ত করে আর্থিক, মানবিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পুঁজির বিকাশের কথা বলেছি।
বাংলাদেশে বাড়ি ফেরার আলামত এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। প্রযুক্তি বিষয়ে শিক্ষিত তরুণরা বাংলাদেশে ফিরে চাকরি না করে উদ্যোক্তা হচ্ছে। কে ভেবেছিল নিরক্ষর এই জাতি প্রযুক্তিতে এভাবে এগিয়ে যাবে? ক্ষুদ্র কৃষক রুগ্‌ণ পাতার ছবি মোবাইলে তুলে কৃষিবিদের কাছে পাঠিয়ে সার ও কীটনাশক বিষয়ে পরামর্শ নেয়। আঙুলের স্পর্শে মোবাইলে কৃষিপণ্যের দাম আড়ত থেকে জানে। আদার ব্যাপারী সত্যিই জাহাজের খবর রাখে। শিক্ষিত তরুণরা যত বেশি কৃষি ও সেবা খাতে আসছে ততই প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। তথ্যপ্রযুক্তিতে অভিজ্ঞ তরুণ উদ্যোক্তারা এই আগ্রহকে কাজে লাগিয়ে বিশাল এক আর্থ-সামাজিক বিপ্লব ঘটিয়ে দিচ্ছে।
একটি তরুণ জনগোষ্ঠী পেয়ে বাংলাদেশি প্রাইভেট সেক্টর ফুঁসছে, সমাজ উদ্যমে এগিয়ে চলছে এবং রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করছে। চারদিকে নতুন কিছুর আয়োজন চলছে। ক্ষুধার ভয়কে পেছনে ফেলে বাড়ি ফেরার দল মস্তিষ্ক ও হৃদয়কে এক করে বাসনায় বাসর সাজাচ্ছে। ক্ষমতাবানরা যদি সমাজের সাথে সমৃদ্ধি ভাগ করে নেয়, তাহলেই বাংলাদেশে বাড়ি ফেরার দল সাহসী হবে।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের কারণে ক্ষমতাবানদের হাতে সমৃদ্ধি কেন্দ্রীভূত হয়ে সামাজিক বৈষম্য বাড়তে পারে। অল্প কয়েকটা লোক রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে কাগজে- কলমে রাষ্ট্র ধনী হতে পারে কিন্তু বাস্তবে মানুষ গরিব থেকে যায়। রাষ্ট্র ধনী কিন্তু মানুষ গরিব। আমেরিকা এই ভুলটা করেছে বলে তাদের দেশে সামাজিক সংকট ও অস্থিরতা বেড়েছে। বাংলাদেশের জন্য এই ভয়টা থেকেই যায়। কেননা আমাদের উন্নয়নের মডেল আমেরিকা থেকে আমদানিকৃত, যা রাবার স্ট্যাম্প হিসেবে বেধড়কভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
তবুও মানুষ আগামীর জন্য বাঁচে। আশা নিয়েই বাংলাদেশকে দেখতে চাই। বাংলাদেশ যখনই বিপদে পড়েছে, তখনই মানুষ রাস্তায় নেমে সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আবর্জনাগুলো পরিষ্কার করেছে। বিদ্যুতের দাবিতে কানসাটের আন্দোলন, যুদ্ধাপরাধীদের বিরুদ্ধে শাহবাগ আন্দোলন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ভ্যাটবিরোধী আন্দোলন, সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে কোটাবিরোধী আন্দোলন ও নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে ছাত্ররা বুঝিয়ে দিয়েছে, তাদের ধমনিতে মুক্তিযোদ্ধাদের উষ্ণ রক্ত। তরুণরা উন্নয়ন চায় কিন্তু ভোক্তা হয়ে বন্দি হতে চায় না। কেননা তারা জানে ভোক্তার তুলনায় নাগরিক হওয়া বেশি সম্মানজনক।
আমার অবিচলতা দেশ হিসেবেন প্রজন্মের প্রতি যারা বাংলাদেশকে একটি প্রণতান্ত্রিক ও উন্নত দেশ হিসেবে এগিয়ে নিয়ে যাবে। তুমি বাংলাদেশকে একটি মিছিলে হয়তো একদিন যোগ দেবে। আবার, একজন স্বাধীন জানুনা পরিবর্তনের হয়তো অন্য কোনো পথও বেছে নিতে পার। সে-বিষয়ে আনুষয় হিসেবে তুমি থাকবে।
সুমাত্রা, গত এক বছরে তুমি কতটুকু লম্বা হয়েছ তা ইন্টারনেটে ভিডিও কলের মাধ্যমে বুঝতে পারি না। যন্ত্র অনেক কিছুই দিতে পেরেছে কিন্তু এখনো স্পর্শ দিয়ে আবেগ প্রকাশের ক্ষমতা মানুষকে দিতে পারেনি। সেই অভাব আমি প্রতিদিন অনুভব করি। বিমান যোগাযোগ স্বাভাবিক হলে আশা করি আমরা দ্রুত একসাথে হতে পারব। তারপর তোমার বোন ও তুমি লাল-নীল রঙের প্রজাপতি হয়ে আমার চারপাশে ঘুরে বেড়াবে। আর প্রজাপতিগুলোকে আমার পিঠে বসিয়ে বিশাল পৌরাণিক পাখি হয়ে আমি আকাশে উড়াল দেব।
তোমার ছোট বোনটার চশমার পাওয়ার আবার বেড়েছে। ওকে বেশি সময় ধরে স্ক্রিনে চোখ রাখতে দিও না। তোমার মায়ের মাথাব্যথাটা মাঝে মাঝে অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে, তখন তুমি বরাবরের মতো তাকে সাহায্য কোরো।
পাশ্চাত্যের মতো জ্ঞান ও তর্ক দিয়ে আমাদের দেশ অধিকার দাবি করে না। বরং, দায়িত্ব ও কর্তব্যকে প্রাচ্য বেশি গুরুত্ব দেয়। প্রাচ্য শূন্য দুটো হাত বাড়িয়ে দিয়ে প্রজাবানের মতো বলে, যদি তোমার কোনো কাজে লাগি তাহলে ধন্য হবে আমার মানবজীবন। সুমাত্রা, তুমি জ্ঞানের তুলনায় প্রজ্ঞাকে বেশি গুরুত্ব দিও।
ইতি
তোমার আব্বুজি
মগবাজার, ঢাকা
২৭ জানুয়ারি ২০২১
লেখক পরিচিতি: শাকিল আহম্মেদ,শিক্ষক ও গবেষক। তিনি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে সরকার ও রাজনীতি বিভাগে শিক্ষকতা করেন। তাছাড়া নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইতিহাস পড়ান। তাঁর গবেষণার মূল বিষয় সিভিল সোসাইটি। সাহিত্য ও আলোকচিত্র বিষয়ে তিনি একজন আগ্রহী শিক্ষার্থী।

Please Share This Post in Your Social Media

More News Of This Category

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

kjhdf73kjhykjhuhf
© All rights reserved © 2024