০৪:৩৪ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
তীব্র হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান হামলা, ৯৭ ডলারের কাছাকাছি তেলের দাম নেপালের জেন-জি আন্দোলনের এক বছর: বদলেছে সরকার, বদলায়নি আহতদের জীবন ১৮৮ কর্মকর্তার বদলিতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান ইরান যুদ্ধের সমীকরণ বদলে আঞ্চলিক পর্যায়ে নিয়ে গেছে: সেনা উপপ্রধান সার দিতে দেরি, ডিলারের গুদাম ভেঙে শতাধিক বস্তা সার লুট আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রজ্ঞাপনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট গর্ভনিরোধক সরবরাহ স্বাভাবিক হবে ২-৩ মাসের মধ্যে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী হামে মৃত্যু ৯৯৭, গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৩ শিশুর মৃত্যু ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় ৪ মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১ হাজার ৩১৪ জন পাবনায় বিএনপি নেতাকে গুলি করে কুপিয়ে হত্যা

অন্ধকারের মধ্যেও আলোর খোঁজ: জ্বালানি সংকটে কিউবার মানুষের লড়াই থামছে না

বছরের পর বছর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, সীমিত জ্বালানি সরবরাহ এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে জর্জরিত কিউবা নতুন করে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। বিদ্যুৎ বিভ্রাট এখন অনেক অঞ্চলের মানুষের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা। কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা, আবার কোথাও দিনের বড় অংশজুড়েই থাকে বিদ্যুৎহীনতা। জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে পরিবহন, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, ক্ষুদ্র ব্যবসা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও।

তবু এই সংকটের মাঝেও থেমে নেই কিউবার মানুষ। সীমিত সম্পদ, স্বল্প আয় এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মধ্যেও তারা প্রতিদিন নতুন উপায় খুঁজে নিচ্ছেন—কীভাবে জীবনকে সচল রাখা যায়, কীভাবে অন্ধকারের মধ্যেও আলো জ্বালিয়ে রাখা যায়।

সংকটের অভিঘাতে বদলে গেছে প্রতিদিনের জীবন

বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক পরিবার খাবার সংরক্ষণে সমস্যায় পড়ছে। ফ্রিজ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে দুধ, মাংস, ফলমূলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য। পানির পাম্প বন্ধ থাকায় কোথাও কোথাও মানুষকে দূর থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। রান্নার গ্যাসের ঘাটতি দেখা দিলে অনেকেই কাঠ বা বিকল্প জ্বালানির আশ্রয় নিচ্ছেন।

শহরের গণপরিবহনও জ্বালানির অভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কর্মস্থলে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে হাজারো মানুষের জন্য। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ও বিক্রিও কমে যাচ্ছে।

সংকটই শিখিয়েছে নতুন পথ

কিউবার বহু মানুষ এখন বিকল্প শক্তির উৎস ব্যবহারে আগের চেয়ে অনেক বেশি আগ্রহী। ছাদের ওপর ছোট সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা, চার্জযোগ্য ব্যাটারি, বিদ্যুৎ-সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি এবং বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল ধীরে ধীরে শহর ও গ্রামে ছড়িয়ে পড়ছে।

অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৌরশক্তির মাধ্যমে দোকান, ক্যাফে কিংবা ছোট রেস্তোরাঁ চালু রাখার চেষ্টা করছেন। এতে বিদ্যুৎ না থাকলেও ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হচ্ছে না। কিছু পরিবার নিজেদের ব্যাটারি প্রতিবেশীদের সঙ্গেও ভাগাভাগি করে ব্যবহার করছে—যাতে অন্তত শিশু, বয়স্ক বা অসুস্থ সদস্যদের প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করা যায়।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে দেশ

বিশ্বজুড়ে যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ছে, তখন কিউবার জন্যও সৌরশক্তি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হয়ে উঠছে। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও বিভিন্ন এলাকায় নতুন সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। যদিও এসব প্রকল্প এখনো দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার তুলনায় অনেক ছোট, তবু ভবিষ্যতের জন্য এগুলোকে সম্ভাবনার নতুন ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কিউবাকে সৌর ও বায়ুশক্তির মতো নবায়নযোগ্য উৎসে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ অবকাঠামোর আধুনিকায়নও জরুরি।

The power goes out in Cuba, leaving hospitals dark and highways deserted

বৈষম্যের চিত্রও স্পষ্ট

সংকটের আরেকটি বাস্তবতা হলো সামাজিক বৈষম্য। যেসব পরিবারের বিদেশে আত্মীয়স্বজন রয়েছেন, তারা তুলনামূলক সহজে সৌর প্যানেল, ব্যাটারি কিংবা বৈদ্যুতিক যানবাহন কিনতে পারছেন। অন্যদিকে নিম্ন আয়ের অসংখ্য পরিবার এখনো দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন অবস্থায় দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিকল্প প্রযুক্তির বিস্তার ইতিবাচক হলেও তা সবার নাগালে পৌঁছাতে না পারলে বৈষম্য আরও বাড়তে পারে।

মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি অভিযোজন

কিউবার ইতিহাসে অর্থনৈতিক সংকট নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও দেশটির মানুষ নিজেদের বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। বর্তমান সংকটেও সেই মানসিকতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

কেউ পুরোনো যন্ত্রপাতি নতুনভাবে ব্যবহার করছেন, কেউ শক্তি সাশ্রয়ের নতুন কৌশল গ্রহণ করছেন, আবার কেউ ছোট পরিসরে নবায়নযোগ্য শক্তির ওপর নির্ভর করে পরিবার কিংবা ব্যবসা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। সীমিত সম্পদের মধ্যেও এই অভিযোজন ক্ষমতাই অনেকের কাছে কিউবার সবচেয়ে বড় শক্তি।

সামনে কী অপেক্ষা করছে?

অর্থনীতিবিদদের মতে, কিউবার ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ওপর। একই সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং বিদ্যুৎ অবকাঠামো উন্নত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

জ্বালানি সংকট এখনো শেষ হয়নি। তবে প্রতিকূল বাস্তবতার মধ্যেও কিউবার মানুষ যে উদ্ভাবনী শক্তি, ধৈর্য এবং সংগ্রামের মাধ্যমে প্রতিদিন নতুন করে পথ খুঁজে নিচ্ছেন, সেটিই এই সময়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বাস্তবতা।

জনপ্রিয় সংবাদ

তীব্র হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান হামলা, ৯৭ ডলারের কাছাকাছি তেলের দাম

অন্ধকারের মধ্যেও আলোর খোঁজ: জ্বালানি সংকটে কিউবার মানুষের লড়াই থামছে না

০৭:০০:৪৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩ অগাস্ট ২০২৬

বছরের পর বছর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, সীমিত জ্বালানি সরবরাহ এবং বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে জর্জরিত কিউবা নতুন করে এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। বিদ্যুৎ বিভ্রাট এখন অনেক অঞ্চলের মানুষের নিত্যদিনের অভিজ্ঞতা। কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা, আবার কোথাও দিনের বড় অংশজুড়েই থাকে বিদ্যুৎহীনতা। জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে পরিবহন, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা, ক্ষুদ্র ব্যবসা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও।

তবু এই সংকটের মাঝেও থেমে নেই কিউবার মানুষ। সীমিত সম্পদ, স্বল্প আয় এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মধ্যেও তারা প্রতিদিন নতুন উপায় খুঁজে নিচ্ছেন—কীভাবে জীবনকে সচল রাখা যায়, কীভাবে অন্ধকারের মধ্যেও আলো জ্বালিয়ে রাখা যায়।

সংকটের অভিঘাতে বদলে গেছে প্রতিদিনের জীবন

বিদ্যুৎ না থাকায় অনেক পরিবার খাবার সংরক্ষণে সমস্যায় পড়ছে। ফ্রিজ দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে দুধ, মাংস, ফলমূলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্য। পানির পাম্প বন্ধ থাকায় কোথাও কোথাও মানুষকে দূর থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। রান্নার গ্যাসের ঘাটতি দেখা দিলে অনেকেই কাঠ বা বিকল্প জ্বালানির আশ্রয় নিচ্ছেন।

শহরের গণপরিবহনও জ্বালানির অভাবে ব্যাহত হচ্ছে। কর্মস্থলে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে হাজারো মানুষের জন্য। বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে ছোট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর উৎপাদন ও বিক্রিও কমে যাচ্ছে।

সংকটই শিখিয়েছে নতুন পথ

কিউবার বহু মানুষ এখন বিকল্প শক্তির উৎস ব্যবহারে আগের চেয়ে অনেক বেশি আগ্রহী। ছাদের ওপর ছোট সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা, চার্জযোগ্য ব্যাটারি, বিদ্যুৎ-সাশ্রয়ী যন্ত্রপাতি এবং বৈদ্যুতিক মোটরসাইকেল ধীরে ধীরে শহর ও গ্রামে ছড়িয়ে পড়ছে।

অনেক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সৌরশক্তির মাধ্যমে দোকান, ক্যাফে কিংবা ছোট রেস্তোরাঁ চালু রাখার চেষ্টা করছেন। এতে বিদ্যুৎ না থাকলেও ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ রাখতে হচ্ছে না। কিছু পরিবার নিজেদের ব্যাটারি প্রতিবেশীদের সঙ্গেও ভাগাভাগি করে ব্যবহার করছে—যাতে অন্তত শিশু, বয়স্ক বা অসুস্থ সদস্যদের প্রয়োজনীয় সুবিধা নিশ্চিত করা যায়।

নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে দেশ

বিশ্বজুড়ে যখন নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ছে, তখন কিউবার জন্যও সৌরশক্তি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হয়ে উঠছে। সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও বিভিন্ন এলাকায় নতুন সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। যদিও এসব প্রকল্প এখনো দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার তুলনায় অনেক ছোট, তবু ভবিষ্যতের জন্য এগুলোকে সম্ভাবনার নতুন ভিত্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কিউবাকে সৌর ও বায়ুশক্তির মতো নবায়নযোগ্য উৎসে আরও বেশি বিনিয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ অবকাঠামোর আধুনিকায়নও জরুরি।

The power goes out in Cuba, leaving hospitals dark and highways deserted

বৈষম্যের চিত্রও স্পষ্ট

সংকটের আরেকটি বাস্তবতা হলো সামাজিক বৈষম্য। যেসব পরিবারের বিদেশে আত্মীয়স্বজন রয়েছেন, তারা তুলনামূলক সহজে সৌর প্যানেল, ব্যাটারি কিংবা বৈদ্যুতিক যানবাহন কিনতে পারছেন। অন্যদিকে নিম্ন আয়ের অসংখ্য পরিবার এখনো দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন অবস্থায় দিন কাটাতে বাধ্য হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিকল্প প্রযুক্তির বিস্তার ইতিবাচক হলেও তা সবার নাগালে পৌঁছাতে না পারলে বৈষম্য আরও বাড়তে পারে।

মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি অভিযোজন

কিউবার ইতিহাসে অর্থনৈতিক সংকট নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেও দেশটির মানুষ নিজেদের বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। বর্তমান সংকটেও সেই মানসিকতার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

কেউ পুরোনো যন্ত্রপাতি নতুনভাবে ব্যবহার করছেন, কেউ শক্তি সাশ্রয়ের নতুন কৌশল গ্রহণ করছেন, আবার কেউ ছোট পরিসরে নবায়নযোগ্য শক্তির ওপর নির্ভর করে পরিবার কিংবা ব্যবসা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। সীমিত সম্পদের মধ্যেও এই অভিযোজন ক্ষমতাই অনেকের কাছে কিউবার সবচেয়ে বড় শক্তি।

সামনে কী অপেক্ষা করছে?

অর্থনীতিবিদদের মতে, কিউবার ভবিষ্যৎ অনেকটাই নির্ভর করবে জ্বালানি সরবরাহের স্থিতিশীলতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ওপর। একই সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং বিদ্যুৎ অবকাঠামো উন্নত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

জ্বালানি সংকট এখনো শেষ হয়নি। তবে প্রতিকূল বাস্তবতার মধ্যেও কিউবার মানুষ যে উদ্ভাবনী শক্তি, ধৈর্য এবং সংগ্রামের মাধ্যমে প্রতিদিন নতুন করে পথ খুঁজে নিচ্ছেন, সেটিই এই সময়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বাস্তবতা।