দেশজুড়ে সড়ক দুর্ঘটনায় আগস্ট মাসে অন্তত ৪৮১ জন নিহত এবং ৬৬৪ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ৬১ জন নারী ও ৫৮ জন শিশু। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের (আরএসএফ) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
আরএসএফ জানিয়েছে, জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ের বিভিন্ন সংবাদপত্র, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ইলেকট্রনিক মিডিয়া এবং নিজস্ব সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।
মোট দুর্ঘটনার বড় অংশ আঞ্চলিক সড়কে
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আগস্টে মোট দুর্ঘটনার মধ্যে ১৬৩টি বা ৩১ দশমিক ৭৭ শতাংশ জাতীয় মহাসড়কে ঘটেছে। আঞ্চলিক সড়কে ঘটেছে ২১৭টি, যা মোট দুর্ঘটনার ৪২ দশমিক ৩০ শতাংশ। এ ছাড়া গ্রামীণ সড়কে ৬২টি এবং শহরের সড়কে ৭১টি দুর্ঘটনা ঘটেছে।
মোট ১৮৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ১৭৬ জন নিহত হয়েছেন। মোট মৃত্যুর ৩৬ দশমিক ৫৯ শতাংশ এবং মোট দুর্ঘটনার ৩৫ দশমিক ৬৭ শতাংশই মোটরসাইকেল সংশ্লিষ্ট।

নিহতের তালিকায় সবচেয়ে বেশি মোটরসাইকেল আরোহী
যানবাহনভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি নিহত হয়েছেন মোটরসাইকেল আরোহী—১৭৬ জন। এরপর তিন চাকার যানবাহনের যাত্রী ৭৮ জন, ট্রাকসহ ভারী যানবাহনের যাত্রী ৫১ জন এবং বাসযাত্রী ৩৭ জন নিহত হয়েছেন।
ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান, পিকআপ, ট্রাক্টর, ট্রলি, লরি, ডাম্প ট্রাক, তেলবাহী ট্যাংকার ও ১৪ চাকার লরিসহ ভারী যানবাহন ২৮ দশমিক ৫৭ শতাংশ দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল। মোটরসাইকেল ২৫ দশমিক ৯০ শতাংশ, বাস ১৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ এবং তিন চাকার যান ১৪ দশমিক ৯৫ শতাংশ দুর্ঘটনায় জড়িত ছিল।
স্থানীয়ভাবে তৈরি নসিমন, ভটভটি ও মাহিন্দ্রায় যাতায়াতকারী ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে। রিকশা ও সাইকেল আরোহীদের মধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন আরও পাঁচজন। নিহতদের মধ্যে ৬১ জন শিক্ষার্থীও রয়েছেন।
ঢাকা বিভাগে দুর্ঘটনা বেশি
বিভাগগুলোর মধ্যে ঢাকায় সবচেয়ে বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে। আগস্টে এ বিভাগে ১৭২টি দুর্ঘটনায় ১৪৪ জন নিহত হয়েছেন। বিপরীতে বরিশাল বিভাগে দুর্ঘটনা সবচেয়ে কম—১৫টি ঘটনায় ১৪ জনের মৃত্যু হয়েছে।
জেলাভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি ৩৭ জন নিহত হয়েছেন বগুড়ায়। রাজধানী ঢাকায় আগস্টে ৪৮টি সড়ক দুর্ঘটনায় ২৩ জন নিহত এবং ৫৪ জন আহত হয়েছেন।
সড়ক দুর্ঘটনার পাশাপাশি আগস্টে সাতটি নৌদুর্ঘটনায় ছয়জন নিহত ও নয়জন আহত হয়েছেন। একই সময়ে রেলপথে ৩৪টি দুর্ঘটনায় ২৭ জন নিহত এবং ২৩ জন আহত হয়েছেন।

প্রতিদিনের মৃত্যুহার বেড়েছে
আরএসএফের হিসাবে, আগস্টে সড়ক দুর্ঘটনায় দৈনিক গড় মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ দশমিক ৫১ জনে। জুলাইয়ে এ সংখ্যা ছিল ১৩ দশমিক ৪১। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে মৃত্যুর হার ১৫ দশমিক ৬৫ শতাংশ বেড়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অতিরিক্ত গতি এবং যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানো অধিকাংশ দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। এ পরিস্থিতিতে প্রযুক্তিনির্ভর গতি নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এবং চালকদের জন্য সচেতনতামূলক ও মোটিভেশনাল প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংস্থাটি।
আরএসএফের সুপারিশ
ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন ও সড়ক, বেপরোয়া চালনা, অদক্ষ ও শারীরিক-মানসিকভাবে অনুপযুক্ত চালক, অনির্ধারিত কর্মঘণ্টা ও মজুরি, মহাসড়কে ধীরগতির যান চলাচল, তরুণদের ঝুঁকিপূর্ণ মোটরসাইকেল চালনা, ট্রাফিক আইন অমান্য, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, বিআরটিএর সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজিকেও দুর্ঘটনার বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে আরএসএফ।
সংস্থাটি জাতীয় সড়ক নিরাপত্তা কাউন্সিল পুনর্গঠন করে বিআরটিএ, বিআরটিসি ও ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষকে (ডিটিসিএ) এর তত্ত্বাবধানে আনার সুপারিশ করেছে। পাশাপাশি পুরোনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ যানবাহন সরানো, আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তির বাধ্যতামূলক ব্যবহার, পেশাদার চালকদের প্রশিক্ষণ ও কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং ধীরগতির যানবাহনের জন্য সার্ভিস লেনসহ নিরাপদ সড়ক নকশার পরামর্শ দিয়েছে।
রেলক্রসিংয়ে গেটকিপার নিয়োগ, সড়ক নিরাপত্তা সচেতনতায় জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ বাড়ানো এবং সড়ক, রেল ও নৌপথকে সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আনারও সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















