০৬:০৭ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
তীব্র হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান হামলা, ৯৭ ডলারের কাছাকাছি তেলের দাম নেপালের জেন-জি আন্দোলনের এক বছর: বদলেছে সরকার, বদলায়নি আহতদের জীবন ১৮৮ কর্মকর্তার বদলিতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান ইরান যুদ্ধের সমীকরণ বদলে আঞ্চলিক পর্যায়ে নিয়ে গেছে: সেনা উপপ্রধান সার দিতে দেরি, ডিলারের গুদাম ভেঙে শতাধিক বস্তা সার লুট আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রজ্ঞাপনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট গর্ভনিরোধক সরবরাহ স্বাভাবিক হবে ২-৩ মাসের মধ্যে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী হামে মৃত্যু ৯৯৭, গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৩ শিশুর মৃত্যু ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় ৪ মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১ হাজার ৩১৪ জন পাবনায় বিএনপি নেতাকে গুলি করে কুপিয়ে হত্যা

ইরান যুদ্ধের জ্বালানি সংকট: আসল ধাক্কা এখনো সামনে

  • রন বুসো
  • ০৪:০০:২৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬
  • 34

ইরান যুদ্ধের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক প্রভাব হয়তো এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়নি। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহে বড় ধাক্কা এলেও আন্তর্জাতিক তেলবাজার নানা বিকল্প পথ ব্যবহার করে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে। কিন্তু তেল শোধনাগার শিল্পের সামনে সেই সুযোগ অনেক কম। ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম কিছুটা কমলেও ডিজেল ও পেট্রোলের বাজারে চাপ কমেনি। বরং এই ব্যবধানই ইঙ্গিত দিচ্ছে, জ্বালানি মূল্যস্ফীতির ধাক্কা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

২০ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর সময়ের তুলনায় ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম এখন প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি, ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের কাছাকাছি। তবে যুদ্ধকালীন সর্বোচ্চ ১১৮ ডলার থেকে তা অনেকটাই নেমেছে। বিপরীতে ইউরোপে ডিজেলের দাম বেড়েছে ৭০ শতাংশের বেশি এবং যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম বেড়েছে প্রায় ৬০ শতাংশ।

এর পেছনে মূল কারণ শোধনাগার সক্ষমতার সংকট। মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় ৯৬ লাখ ব্যারেল দৈনিক শোধনক্ষমতার এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি যুদ্ধের কারণে অচল হয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় জ্বালানি রপ্তানিও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের অপরিশোধিত তেলের ঘাটতি এশিয়ার অনেক শোধনাগারকে উৎপাদন কমাতে বাধ্য করেছে।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় ইউক্রেনের ধারাবাহিক হামলা। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাশিয়ার শোধনাগার উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ কমে ৪০ লাখ ব্যারেলের নিচে নেমেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে মস্কো জুলাইয়ে ডিজেল রপ্তানিও নিষিদ্ধ করেছে।

ফলে বিশ্বের প্রধান বাজারগুলোতে ডিজেল পরিশোধনের মুনাফা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। ইউরোপে ডিজেল ক্র্যাক ফেব্রুয়ারির তুলনায় তিন গুণেরও বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৫ ডলারের ওপরে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেল মার্জিন ১৪০ শতাংশের বেশি বেড়ে চলতি সপ্তাহে রেকর্ড ১০০ ডলারে পৌঁছেছে।

Drive slower, work from home and ditch the tie: the world responds to Iran war fuel crisis

মজুদের শেষ নিরাপত্তা বেষ্টনীও ক্ষয়ে যাচ্ছে

যুদ্ধের আগে গড়ে তোলা জ্বালানি মজুত এতদিন বাজারকে কিছুটা সুরক্ষা দিয়েছে। কিন্তু সেই অতিরিক্ত মজুত এখন দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। মার্চ থেকে জুলাইয়ের মধ্যে বৈশ্বিক তেল মজুত দৈনিক ৩৫ লাখ ব্যারেল হারে কমেছে, যা বিশ্বব্যাপী তেলের চাহিদার ৩ শতাংশেরও বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে বছরের এই সময়ের তুলনায় ডিজেল মজুত তিন দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।

এ অবস্থায় প্রশ্ন শুধু তেলের দাম কত হবে, তা নয়। বড় প্রশ্ন হলো—বিশ্বের শোধনাগারগুলো ঘাটতি পূরণের মতো পর্যাপ্ত জ্বালানি তৈরি করতে পারবে কি না।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হিসাবে, দ্বিতীয় প্রান্তিকে এক বছর আগের তুলনায় বিশ্বব্যাপী শোধনাগারগুলোর উৎপাদন দৈনিক ৫১ লাখ ব্যারেল কমেছে। উচ্চমূল্যের কারণে চাহিদাও কমেছে, কিন্তু সেই পতন সরবরাহ ঘাটতি পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়। দ্বিতীয় প্রান্তিকে পরিশোধিত জ্বালানির চাহিদা কমেছে প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল দৈনিক—অর্থাৎ সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে এক মিলিয়ন ব্যারেলের বেশি ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

তৃতীয় প্রান্তিকে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। শোধনাগার উৎপাদন এক বছর আগের তুলনায় দৈনিক ৪১ লাখ ব্যারেল কম থাকার পূর্বাভাস রয়েছে, যেখানে চাহিদা কমার সম্ভাবনা প্রায় ২৪ লাখ ব্যারেল। অর্থাৎ জ্বালানি সরবরাহ যে গতিতে সংকুচিত হচ্ছে, চাহিদা সেই গতিতে কমছে না।

হরমুজ প্রণালিতে 'ব্ল্যাকমেইল' বন্ধ করে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করার আহ্বান কাতারের

হরমুজ খুললেও দ্রুত স্বস্তি নাও আসতে পারে

ধরা যাক, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সমঝোতা হলো এবং হরমুজ প্রণালি আবার পুরোপুরি খুলে গেল। এতে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত কমতে পারে। কিন্তু পেট্রোল ও ডিজেলের বাজারে একই গতিতে স্বস্তি আসবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

কারণ যুদ্ধের সময় উপসাগরীয় অঞ্চলের ২০টির বেশি শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেকগুলোর মেরামতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হবে। কম্প্রেসর, হিট এক্সচেঞ্জার ও বিশেষায়িত অনুঘটকের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতির সরবরাহ যুদ্ধের আগেই দীর্ঘসূত্রতায় ছিল। যুদ্ধ শেষে তাই উৎপাদন দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা সীমিত।

এ ক্ষেত্রে চীনের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শোধনাগার শিল্প যুদ্ধের সময় উৎপাদন কমিয়েছে এবং জ্বালানি রপ্তানিও সীমিত করেছে। চীন কীভাবে বাজারে ফিরবে, সেটি বৈশ্বিক সরবরাহ পরিস্থিতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

একই সঙ্গে উচ্চ জ্বালানি বিল ভোক্তা ও ব্যবসার ব্যয় কমিয়ে দিতে পারে। এতে চাহিদা প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুত কমার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী জ্বালানি মজুত আবার পূরণ করার প্রয়োজনীয়তা শোধনাগারগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে। ফলে কয়েক বছর ধরেই শোধন সক্ষমতার চাহিদা উঁচু থাকতে পারে।

জ্বালানি মূল্যস্ফীতি অর্থনীতিতে নতুন ঝুঁকি

এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো জ্বালানি সংকটের প্রভাব শুধু পাম্পের দামে সীমাবদ্ধ না থাকা। পরিবহন থেকে উৎপাদন, কৃষি থেকে পণ্য সরবরাহ—অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি স্তরেই জ্বালানি খরচ গুরুত্বপূর্ণ। তাই ডিজেল ও পেট্রোলের দীর্ঘস্থায়ী মূল্যবৃদ্ধি সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে আবারও উসকে দিতে পারে।

ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে জুলাইয়ে ভোক্তা মূল্য এক বছর আগের তুলনায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। এর পেছনে জ্বালানি ব্যয় ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে এবং পেট্রোলের দাম বেড়েছে ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ। ইউরো অঞ্চলেও মূল্যস্ফীতি ২ দশমিক ৯ শতাংশে উঠেছে, যেখানে জ্বালানি ব্যয় বেড়েছে ১০ শতাংশ। জাপানের জুলাইয়ের উৎপাদক মূল্যসূচকও বেড়েছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ।

রেশনিং পদ্ধতিতে জ্বালানি তেল বিক্রি, কোন গাড়িতে মিলছে কত লিটার?

বাজারের অনেক বিশ্লেষক এখনো ধরে নিচ্ছেন, জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি সাময়িক এবং তা মূল মূল্যস্ফীতিতে বড় ধরনের স্থায়ী প্রভাব ফেলবে না। কিন্তু পরিশোধিত জ্বালানির ঘাটতি যদি বর্তমান তথ্যের মতোই গভীর হয়, তাহলে সেই ধারণা অতিরিক্ত আশাবাদী হতে পারে।

বিশেষ করে ইউরোপ ও এশিয়ায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের দামও বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও জ্বালানি ব্যয়ের চাপ থেকে মুক্ত নয়। ফলে বছরের শেষ নাগাদ মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাসের ঝুঁকি এখন ঊর্ধ্বমুখী।

ইরান যুদ্ধের প্রায় ছয় মাস পর বিশ্ব অর্থনীতি এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে বাজারের নিরাপত্তা বেষ্টনী ধীরে ধীরে ক্ষয়ে গেছে। মজুত কমেছে, শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বিকল্প সরবরাহের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। অপরিশোধিত তেলের বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হলেও জ্বালানি উৎপাদনের সংকট এখনো কাটেনি।

এ কারণেই ইরান যুদ্ধের জ্বালানি সংকটকে শুধু তেলের দামের গল্প হিসেবে দেখা ভুল হবে। প্রকৃত ঝুঁকি হলো—জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি দীর্ঘায়িত হলে তা পরিবহন, উৎপাদন, ভোক্তা ব্যয় এবং শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিকে নতুন করে চাপে ফেলতে পারে।

অর্থাৎ যুদ্ধের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ধাক্কা হয়তো ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে, কিন্তু তার পূর্ণ প্রভাব এখনো সামনে।

জনপ্রিয় সংবাদ

তীব্র হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান হামলা, ৯৭ ডলারের কাছাকাছি তেলের দাম

ইরান যুদ্ধের জ্বালানি সংকট: আসল ধাক্কা এখনো সামনে

০৪:০০:২৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৩ অগাস্ট ২০২৬

ইরান যুদ্ধের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক প্রভাব হয়তো এখনো পুরোপুরি দৃশ্যমান হয়নি। যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্য থেকে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহে বড় ধাক্কা এলেও আন্তর্জাতিক তেলবাজার নানা বিকল্প পথ ব্যবহার করে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে। কিন্তু তেল শোধনাগার শিল্পের সামনে সেই সুযোগ অনেক কম। ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম কিছুটা কমলেও ডিজেল ও পেট্রোলের বাজারে চাপ কমেনি। বরং এই ব্যবধানই ইঙ্গিত দিচ্ছে, জ্বালানি মূল্যস্ফীতির ধাক্কা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।

২০ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর সময়ের তুলনায় ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম এখন প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি, ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলারের কাছাকাছি। তবে যুদ্ধকালীন সর্বোচ্চ ১১৮ ডলার থেকে তা অনেকটাই নেমেছে। বিপরীতে ইউরোপে ডিজেলের দাম বেড়েছে ৭০ শতাংশের বেশি এবং যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের দাম বেড়েছে প্রায় ৬০ শতাংশ।

এর পেছনে মূল কারণ শোধনাগার সক্ষমতার সংকট। মধ্যপ্রাচ্যের প্রায় ৯৬ লাখ ব্যারেল দৈনিক শোধনক্ষমতার এক-পঞ্চমাংশেরও বেশি যুদ্ধের কারণে অচল হয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় জ্বালানি রপ্তানিও বাধাগ্রস্ত হয়েছে। উপসাগরীয় অঞ্চলের অপরিশোধিত তেলের ঘাটতি এশিয়ার অনেক শোধনাগারকে উৎপাদন কমাতে বাধ্য করেছে।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে রাশিয়ার জ্বালানি অবকাঠামোয় ইউক্রেনের ধারাবাহিক হামলা। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে রাশিয়ার শোধনাগার উৎপাদন প্রায় ৩০ শতাংশ কমে ৪০ লাখ ব্যারেলের নিচে নেমেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে মস্কো জুলাইয়ে ডিজেল রপ্তানিও নিষিদ্ধ করেছে।

ফলে বিশ্বের প্রধান বাজারগুলোতে ডিজেল পরিশোধনের মুনাফা অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। ইউরোপে ডিজেল ক্র্যাক ফেব্রুয়ারির তুলনায় তিন গুণেরও বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৫ ডলারের ওপরে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রে ডিজেল মার্জিন ১৪০ শতাংশের বেশি বেড়ে চলতি সপ্তাহে রেকর্ড ১০০ ডলারে পৌঁছেছে।

Drive slower, work from home and ditch the tie: the world responds to Iran war fuel crisis

মজুদের শেষ নিরাপত্তা বেষ্টনীও ক্ষয়ে যাচ্ছে

যুদ্ধের আগে গড়ে তোলা জ্বালানি মজুত এতদিন বাজারকে কিছুটা সুরক্ষা দিয়েছে। কিন্তু সেই অতিরিক্ত মজুত এখন দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। মার্চ থেকে জুলাইয়ের মধ্যে বৈশ্বিক তেল মজুত দৈনিক ৩৫ লাখ ব্যারেল হারে কমেছে, যা বিশ্বব্যাপী তেলের চাহিদার ৩ শতাংশেরও বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে বছরের এই সময়ের তুলনায় ডিজেল মজুত তিন দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে।

এ অবস্থায় প্রশ্ন শুধু তেলের দাম কত হবে, তা নয়। বড় প্রশ্ন হলো—বিশ্বের শোধনাগারগুলো ঘাটতি পূরণের মতো পর্যাপ্ত জ্বালানি তৈরি করতে পারবে কি না।

আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার হিসাবে, দ্বিতীয় প্রান্তিকে এক বছর আগের তুলনায় বিশ্বব্যাপী শোধনাগারগুলোর উৎপাদন দৈনিক ৫১ লাখ ব্যারেল কমেছে। উচ্চমূল্যের কারণে চাহিদাও কমেছে, কিন্তু সেই পতন সরবরাহ ঘাটতি পূরণের জন্য যথেষ্ট নয়। দ্বিতীয় প্রান্তিকে পরিশোধিত জ্বালানির চাহিদা কমেছে প্রায় ৪০ লাখ ব্যারেল দৈনিক—অর্থাৎ সরবরাহ ও চাহিদার মধ্যে এক মিলিয়ন ব্যারেলের বেশি ঘাটতি তৈরি হয়েছে।

তৃতীয় প্রান্তিকে পরিস্থিতি আরও কঠিন হতে পারে। শোধনাগার উৎপাদন এক বছর আগের তুলনায় দৈনিক ৪১ লাখ ব্যারেল কম থাকার পূর্বাভাস রয়েছে, যেখানে চাহিদা কমার সম্ভাবনা প্রায় ২৪ লাখ ব্যারেল। অর্থাৎ জ্বালানি সরবরাহ যে গতিতে সংকুচিত হচ্ছে, চাহিদা সেই গতিতে কমছে না।

হরমুজ প্রণালিতে 'ব্ল্যাকমেইল' বন্ধ করে নৌ চলাচল স্বাভাবিক করার আহ্বান কাতারের

হরমুজ খুললেও দ্রুত স্বস্তি নাও আসতে পারে

ধরা যাক, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সমঝোতা হলো এবং হরমুজ প্রণালি আবার পুরোপুরি খুলে গেল। এতে অপরিশোধিত তেলের দাম দ্রুত কমতে পারে। কিন্তু পেট্রোল ও ডিজেলের বাজারে একই গতিতে স্বস্তি আসবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

কারণ যুদ্ধের সময় উপসাগরীয় অঞ্চলের ২০টির বেশি শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেকগুলোর মেরামতে দীর্ঘ সময় প্রয়োজন হবে। কম্প্রেসর, হিট এক্সচেঞ্জার ও বিশেষায়িত অনুঘটকের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতির সরবরাহ যুদ্ধের আগেই দীর্ঘসূত্রতায় ছিল। যুদ্ধ শেষে তাই উৎপাদন দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা সীমিত।

এ ক্ষেত্রে চীনের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম শোধনাগার শিল্প যুদ্ধের সময় উৎপাদন কমিয়েছে এবং জ্বালানি রপ্তানিও সীমিত করেছে। চীন কীভাবে বাজারে ফিরবে, সেটি বৈশ্বিক সরবরাহ পরিস্থিতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।

একই সঙ্গে উচ্চ জ্বালানি বিল ভোক্তা ও ব্যবসার ব্যয় কমিয়ে দিতে পারে। এতে চাহিদা প্রত্যাশার চেয়েও দ্রুত কমার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু বিশ্বব্যাপী জ্বালানি মজুত আবার পূরণ করার প্রয়োজনীয়তা শোধনাগারগুলোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করবে। ফলে কয়েক বছর ধরেই শোধন সক্ষমতার চাহিদা উঁচু থাকতে পারে।

জ্বালানি মূল্যস্ফীতি অর্থনীতিতে নতুন ঝুঁকি

এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো জ্বালানি সংকটের প্রভাব শুধু পাম্পের দামে সীমাবদ্ধ না থাকা। পরিবহন থেকে উৎপাদন, কৃষি থেকে পণ্য সরবরাহ—অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি স্তরেই জ্বালানি খরচ গুরুত্বপূর্ণ। তাই ডিজেল ও পেট্রোলের দীর্ঘস্থায়ী মূল্যবৃদ্ধি সামগ্রিক মূল্যস্ফীতিকে আবারও উসকে দিতে পারে।

ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে জুলাইয়ে ভোক্তা মূল্য এক বছর আগের তুলনায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ বেড়েছে। এর পেছনে জ্বালানি ব্যয় ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ বেড়েছে এবং পেট্রোলের দাম বেড়েছে ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ। ইউরো অঞ্চলেও মূল্যস্ফীতি ২ দশমিক ৯ শতাংশে উঠেছে, যেখানে জ্বালানি ব্যয় বেড়েছে ১০ শতাংশ। জাপানের জুলাইয়ের উৎপাদক মূল্যসূচকও বেড়েছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ।

রেশনিং পদ্ধতিতে জ্বালানি তেল বিক্রি, কোন গাড়িতে মিলছে কত লিটার?

বাজারের অনেক বিশ্লেষক এখনো ধরে নিচ্ছেন, জ্বালানির এই মূল্যবৃদ্ধি সাময়িক এবং তা মূল মূল্যস্ফীতিতে বড় ধরনের স্থায়ী প্রভাব ফেলবে না। কিন্তু পরিশোধিত জ্বালানির ঘাটতি যদি বর্তমান তথ্যের মতোই গভীর হয়, তাহলে সেই ধারণা অতিরিক্ত আশাবাদী হতে পারে।

বিশেষ করে ইউরোপ ও এশিয়ায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের দামও বেড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রও জ্বালানি ব্যয়ের চাপ থেকে মুক্ত নয়। ফলে বছরের শেষ নাগাদ মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাসের ঝুঁকি এখন ঊর্ধ্বমুখী।

ইরান যুদ্ধের প্রায় ছয় মাস পর বিশ্ব অর্থনীতি এমন এক পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে বাজারের নিরাপত্তা বেষ্টনী ধীরে ধীরে ক্ষয়ে গেছে। মজুত কমেছে, শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বিকল্প সরবরাহের সুযোগ সংকুচিত হয়েছে। অপরিশোধিত তেলের বাজার কিছুটা স্থিতিশীল হলেও জ্বালানি উৎপাদনের সংকট এখনো কাটেনি।

এ কারণেই ইরান যুদ্ধের জ্বালানি সংকটকে শুধু তেলের দামের গল্প হিসেবে দেখা ভুল হবে। প্রকৃত ঝুঁকি হলো—জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি দীর্ঘায়িত হলে তা পরিবহন, উৎপাদন, ভোক্তা ব্যয় এবং শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতিকে নতুন করে চাপে ফেলতে পারে।

অর্থাৎ যুদ্ধের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ধাক্কা হয়তো ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে, কিন্তু তার পূর্ণ প্রভাব এখনো সামনে।