গাজায় যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যে হাজারো মানুষ নিখোঁজ। কেউ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছেন কি না, কেউ হামলায় নিহত হয়েছেন কি না, আবার কেউ ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে আটক হয়েছেন কি না—কোনোটিই নিশ্চিতভাবে জানতে পারছেন না তাঁদের স্বজনেরা। প্রিয়জনের জীবিত-মৃত্যুর অনিশ্চয়তায় দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে পরিবারগুলোকে।
গাজা শহরের আংশিক ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়িতে বসে মাজদিয়া আল মাধুন তাঁর মুঠোফোনে ছেলের ভিডিও দেখান। ভিডিওতে দেখা যায়, আহমেদ আল মাধুন একটি বিড়ালছানাকে জড়িয়ে ধরে আছে। আনন্দে জিহ্বা বের করে চিৎকার করে হাসছে সে। আরেকটি ভিডিওতে দেখা যায়, সে সুইমিং পুলে ঝাঁপ দিয়ে উঠে হাসিমুখে তাকিয়ে আছে।
মাজদিয়ার ভাষায়, আহমেদ ছিল এমন এক তরুণ, যে কঠিন সময়ের মধ্যেও জীবনকে ভালোবাসত। তার হাসি ছিল প্রাণবন্ত, আর সবার সঙ্গে ছিল বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক।
কিন্তু সেই আহমেদই এখন নিখোঁজ।
দোকানে যাওয়ার পর আর ফেরেনি আহমেদ
ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত ২১ বছর বয়সী আহমেদ ২০২৫ সালের মে মাসে স্থানীয় একটি দোকানে যাওয়ার পর নিখোঁজ হয়ে যায়। তখন গাজায় ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে তীব্র যুদ্ধ চলছিল। সেদিন ওই এলাকায় ইসরায়েলি হামলাও হয়েছিল।
মাজদিয়ার আশঙ্কা, তাঁর ছেলে হয়তো হামলায় নিহত হয়েছে। কিন্তু তিনি নিশ্চিত নন।

ছেলের পরিণতি সম্পর্কে অনিশ্চয়তাই তাঁকে সবচেয়ে বেশি কষ্ট দিচ্ছে। তিনি বলেন, ছেলে জীবিত থাকুক কিংবা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে মৃত থাকুক—যেভাবেই হোক, সত্যটি জানতে পারলেই তাঁর মনে শান্তি ফিরবে।
আহমেদের মতো গাজার আরও অসংখ্য পরিবারের একই অবস্থা।
ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকতে পারেন হাজারো মানুষ
ইসরায়েল সামরিক অভিযান শুরুর পর গাজায় ৭৩ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন বলে হামাস-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে গত বছরের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও প্রায় ১ হাজার ২০০ জন নিহত হয়েছেন বলে ওই হিসাব জানায়।
তবে প্রকৃত মৃতের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। কারণ ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা মরদেহগুলো এই হিসাবের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত নয়। ফলে নিখোঁজদের বড় একটি অংশ এখনো মৃতের সরকারি তালিকায়ও নেই।
আন্তর্জাতিক রেড ক্রস জানিয়েছে, ধ্বংসস্তূপের মধ্যে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া মানুষদের সন্ধানে তাদের কাছে ৫ হাজারের বেশি অনুরোধ এসেছে। গাজার বেসামরিক প্রতিরক্ষা সংস্থার ধারণা, নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা ৮ হাজারেরও বেশি।
প্রতিদিনই ধ্বংসস্তূপ থেকে মরদেহ উদ্ধার হচ্ছে।
চলতি মাসের শুরুতেও গাজা শহরে শতাধিক মানুষের গণদাফন হয়েছে। ২০২৩ সালে ইসরায়েলি হামলায় নিহত এসব মানুষের দেহাবশেষ সম্প্রতি উদ্ধার ও শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে।
কিন্তু ধ্বংসের ব্যাপকতা এবং ভারী যন্ত্রপাতির সংকটে মরদেহ উদ্ধারের কাজ অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন পড়ে থাকার কারণে মরদেহ শনাক্ত করাও কঠিন। এর সঙ্গে গাজায় শনাক্তকরণে প্রয়োজনীয় বংশগত নমুনা পরীক্ষার সুযোগের ঘাটতিও রয়েছে।
নিখোঁজরা কি ইসরায়েলি কারাগারে?

আহমেদের পরিবার যেমন তাঁর মৃত্যুর আশঙ্কা করছে, তেমনি আরেকটি ভয়ও তাদের তাড়া করছে—তাকে হয়তো ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনী আটক করেছে।
প্রায় তিন বছরের যুদ্ধে গাজা থেকে প্রায় ৭ হাজার ফিলিস্তিনিকে আটক করা হয়েছে বলে ইসরায়েলভিত্তিক একটি নির্যাতনবিরোধী মানবাধিকার সংগঠনের তথ্য। তাঁদের মধ্যে ৫ হাজারের বেশি মানুষকে পরে কোনো অভিযোগ ছাড়াই ছেড়ে দেওয়া হয়েছে বলে সংগঠনটি জানিয়েছে।
চলতি মাসেও প্রায় ১ হাজার ৩০০ গাজাবাসীকে কোনো অভিযোগ বা বিচার ছাড়াই ইসরায়েলি কারাগারে আটক রাখা হয়েছে বলে ইসরায়েলি মানবাধিকার সংগঠন হামোকেড জানিয়েছে। তবে ইসরায়েলি সামরিক বাহিনীর সরাসরি নিয়ন্ত্রণে থাকা আটক ব্যক্তিরা এই সংখ্যার বাইরে থাকতে পারেন।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রেই আটক ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের গ্রেপ্তার বা আটকের খবর কিংবা তাঁদের অবস্থান জানানো হয়নি। ফলে পরিবারগুলোকে বেসরকারি মানবাধিকার সংগঠন ও আইনজীবীদের সহায়তায় স্বজনদের খুঁজতে হচ্ছে।
ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ অতীতে জানিয়েছে, যুদ্ধকালীন নিরাপত্তার কারণে দীর্ঘ সময় ধরে আটক রাখা হচ্ছে এবং নির্বিচারে আটকের অভিযোগ তারা প্রত্যাখ্যান করেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি ছবিতে নতুন আশার আলো
গাজা শহরের সাবরা এলাকার বাসিন্দা আয়দা আল দ্রিমলি ২০২৪ সাল থেকে তাঁর ছেলে মাহমুদের সন্ধান করছেন।
আয়দার ভাষায়, মাহমুদ ছিলেন শান্ত, ভদ্র ও সবার প্রিয় এক তরুণ। নিখোঁজ হওয়ার পর পরিবার ধারণা করেছিল, ইসরায়েলি হামলায় হয়তো তিনি নিহত হয়েছেন।
তাঁর বাবা বিভিন্ন হাসপাতালে গিয়ে মরদেহগুলো দেখতেন। কিন্তু ছেলের মরদেহ দেখার মতো মানসিক শক্তি আয়দার ছিল না।
এরপর চলতি গ্রীষ্মে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি ছড়িয়ে পড়ে। ছবিতে দেখা যায়, দুই ইসরায়েলি সেনা একজন ফিলিস্তিনি বন্দির পাশে দাঁড়িয়ে আছে। ওই বন্দির চোখ বাঁধা এবং হাত-পা বাঁধা ছিল।
ছবিটি দেখে আয়দার মনে হয়েছে, ওই ব্যক্তি তাঁর ছেলে মাহমুদ।
তিনি বলেন, কপাল, মুখ, নাক, বসার ভঙ্গি, মুখ বন্ধ করার ধরন, হাত ও পায়ের গড়ন—সবকিছুই তাঁর ছেলের সঙ্গে মিলে যায়।
তবে একটি মাত্র ছবি দেখে তিনিও নিশ্চিত হতে পারছেন না।
ছবিটি দেখে প্রথমে তিনি স্বস্তি পেয়েছিলেন, কারণ হয়তো ছেলে জীবিত আছে—এমন একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু একই সঙ্গে ছবিতে ছেলেকে ওই অবস্থায় দেখে তাঁর হৃদয় ভেঙে যায়। তাঁর কাছে দৃশ্যটি ছিল অত্যন্ত অপমানজনক ও বেদনাদায়ক।
পরিবারের দাবি, তাঁদের ছেলেরা কোনো গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত নন
আল দ্রিমলি ও আল মাধুন—দুই পরিবারই জানিয়েছে, তাঁদের ছেলে হামাস বা গাজার অন্য কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।
দুই তরুণের বিষয়ে ইসরায়েলি কারা কর্তৃপক্ষের কাছে জানতে চাওয়া হলে তারা জানায়, তাঁদের কাউকেই আটক রাখার কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই।
ইসরায়েলি সামরিক কর্তৃপক্ষের কাছেও একই প্রশ্ন করা হয়েছিল। সামরিক বাহিনীই কিছু আটককেন্দ্র ও কারাগার পরিচালনা করে। তবে তারা এ বিষয়ে কোনো উত্তর দেয়নি।
ইসরায়েল আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের, যার মধ্যে বিদেশি সংবাদমাধ্যমও রয়েছে, গাজায় স্বাধীনভাবে প্রবেশের অনুমতি দেয় না।
আল দ্রিমলি পরিবার আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের কাছে মাহমুদকে খুঁজে বের করার আবেদন জানিয়েছে। কিন্তু ইসরায়েল রেড ক্রসকে তাদের কারাগারের নথিতে প্রবেশের সুযোগ দেয় না।
‘জীবিত না মৃত—না জানাটাই সবচেয়ে কঠিন’
ইসরায়েলি আইনজীবী তাল স্টেইনার ফিলিস্তিনিদের মধ্যে যারা ইসরায়েলের হাতে আটক হয়ে থাকতে পারেন, তাঁদের সন্ধানে কাজ করেন। তাঁর মতে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের পর পরিস্থিতি আমূল বদলে গেছে।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক রেড ক্রসকে কারাগার পরিদর্শনের সুযোগ না দেওয়া এবং ইসরায়েলের হাতে আটক ব্যক্তিদের পূর্ণ তালিকা রেড ক্রসের কাছেও না থাকার কারণে প্রতিটি নিখোঁজ ব্যক্তিকে আলাদাভাবে খুঁজতে হচ্ছে। পরিবারের প্রতিটি অনুরোধ ধরে একেকজনের সন্ধান করতে হচ্ছে। এতে নিখোঁজদের খুঁজে বের করার কাজ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
তাঁর মতে, পরিবারগুলোর জন্য সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক বিষয় হলো—তারা জানে না তাদের স্বজন বেঁচে আছেন, নাকি মারা গেছেন।
এই অনিশ্চয়তা যেন একটি খোলা ক্ষতের মতো, যা কখনো শুকায় না। স্বজন জীবিত না মৃত—কোনোটিই নিশ্চিতভাবে না জানার কারণে পরিবারগুলো মানসিকভাবে শান্তি পায় না।
গত কয়েক বছরে সম্ভাব্য ফিলিস্তিনি বন্দিদের খুঁজে বের করার প্রক্রিয়াও আরও কঠিন হয়েছে বলে তিনি জানান।
যারা জানেন না তাঁদের পরিবারের সদস্য কোথায়, তাঁদের জন্য এই অনিশ্চয়তা আরও গভীর মানসিক যন্ত্রণা তৈরি করছে। মাসের পর মাস, এমনকি বছরের পর বছরও এই কষ্ট বয়ে বেড়াতে হচ্ছে তাঁদের।
গাজায় তাই ধ্বংসস্তূপ সরানোর পাশাপাশি চলছে আরেকটি নীরব অনুসন্ধান—নিখোঁজ স্বজনদের খোঁজ। কোনো পরিবার অপেক্ষা করছে মরদেহ শনাক্ত হওয়ার জন্য, কোনো পরিবার খুঁজছে জীবিত একজন বন্দিকে। আর অনেক পরিবার এখনো জানেই না, তাদের প্রিয়জনের ভাগ্যে আসলে কী ঘটেছে।
গাজার যুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে তাই শুধু ঘরবাড়ি নয়, হারিয়ে গেছে অসংখ্য পরিবারের নিশ্চিত ভবিষ্যৎও। প্রিয়জনের পরিণতি জানার অপেক্ষাই এখন তাদের কাছে সবচেয়ে দীর্ঘ ও নির্মম পরীক্ষা।
মাজদিয়া আল মাধুনের মতো মায়েরা তাই এখনো অপেক্ষায়—হয়তো একদিন দরজায় কড়া নাড়বে তাদের হারিয়ে যাওয়া সন্তান, অথবা অন্তত মিলবে এমন কোনো খবর, যা দীর্ঘ অনিশ্চয়তার অবসান ঘটাবে।
গাজায় নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা, ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকা মরদেহ এবং আটক ব্যক্তিদের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্যের ঘাটতি এই মানবিক সংকটকে আরও গভীর করে তুলেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















