একসময় গুগলকে শুধু একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখা হতো না; এটি ছিল সৃজনশীলতা, স্বাধীন চিন্তা, উদ্ভাবন ও কর্মীদের প্রতি আস্থার প্রতীক। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই গুগলই বদলে গেছে। প্রতিষ্ঠানের সাবেক কর্মী ক্লেয়ার স্ট্যাপলটনের নতুন স্মৃতিকথায় উঠে এসেছে সেই পরিবর্তনের ভেতরের গল্প।
যে গুগল কর্মীদের নিজের পরিবারের মতো ভাবত
২০০৭ সালে গুগলে যোগ দিয়েছিলেন ক্লেয়ার স্ট্যাপলটন। প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ বিভাগে কাজ করার সময় তাঁর রসিকতা ও কাব্যিক লেখার জন্য সহকর্মীরা তাঁকে ডাকতেন ‘গুগলের কবি’ নামে।
তাঁর বর্ণনায়, গুগলের পুরোনো সংস্কৃতিতে কর্মীদের শুধু দক্ষ কর্মী হিসেবে দেখা হতো না। তাঁদের সৃজনশীলতা, নতুন চিন্তা এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকেও প্রতিষ্ঠানের সাফল্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হতো।
কিন্তু প্রতিষ্ঠান যত বড় হয়েছে, সেই সংস্কৃতির সঙ্গে করপোরেট বাস্তবতার সংঘাতও তত বেড়েছে।
২০১৮ সালের সেই ঐতিহাসিক কর্মী বিক্ষোভ
২০১৮ সালে গুগলের প্রায় ২০ হাজার কর্মী যৌন হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্ত নির্বাহীদের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা ও আর্থিক সুবিধা দেওয়ার প্রতিবাদে কর্মবিরতিতে অংশ নেন। ক্লেয়ার স্ট্যাপলটন ছিলেন এই আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক।
স্ট্যাপলটনের মতে, ওই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছিল প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ব্যবস্থাপনার মানসিকতায়। কর্মীরা জবাবদিহি দাবি করলেও ব্যবস্থাপনা পরে কর্মীদের মতপ্রকাশ ও রাজনৈতিক বক্তব্যের ওপর নিয়ন্ত্রণ বাড়াতে শুরু করে।
তাঁর মতে, এতে কর্মীদের মধ্যে এক ধরনের ভয় ও হতাশার পরিবেশ তৈরি হয়। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কর্মীদের দীর্ঘদিনের আবেগগত সম্পর্কও দুর্বল হয়ে পড়ে।
‘মানুষই প্রতিষ্ঠানের প্রাণ’ থেকে বদলে গেল বার্তা
স্ট্যাপলটনের চোখে গুগলের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে কর্মীদের মূল্যায়নের জায়গায়।
একসময় প্রতিষ্ঠানটি কর্মীদের বিকশিত হওয়ার সুযোগ, সৃজনশীল স্বাধীনতা এবং ভালো কর্মপরিবেশ দেওয়ার কথা বলত। এখন অনেক কর্মীর মনে হচ্ছে, যেকোনো সময় তাঁদের জায়গা অন্য কেউ বা কোনো প্রযুক্তি নিয়ে নিতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কর্মীদের জায়গা দখল করবে কি না—এই প্রশ্নের চেয়েও স্ট্যাপলটনের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো, ব্যবস্থাপনা এই আশঙ্কাকে কীভাবে কাজে লাগাচ্ছে।
তাঁর মতে, কর্মীরা যখন মনে করেন তাঁদের প্রতিনিয়ত নিজেদের যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে, তখন প্রতিষ্ঠান স্বাভাবিকভাবেই বেশি ক্ষমতা অর্জন করে।
প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোই এখন ক্ষমতার কেন্দ্র
স্ট্যাপলটন মনে করেন, প্রযুক্তি শিল্পের শুরুতে যে আদর্শ ছিল তার সঙ্গে বর্তমান বাস্তবতার বড় পার্থক্য তৈরি হয়েছে।
একসময় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো কেন্দ্রীভূত ক্ষমতার বিরোধিতা করত এবং সমাজে পরিবর্তন আনার কথা বলত। কিন্তু আজ সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর অনেকগুলোই বিপুল অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষমতার অধিকারী।
গুগলের মতো প্রতিষ্ঠান এখন শুধু একটি ব্যবসা নয়; বিশ্বের যোগাযোগ, তথ্য ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ফলে প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ক্ষমতাও অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপ্রধানদের মতো প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে।
কর্মীদের হৃদয় জয় করার লড়াইয়ে পিছিয়ে গুগল?
স্ট্যাপলটনের মতে, গুগল এখনও প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিযোগিতায় অত্যন্ত শক্তিশালী। কিন্তু কর্মীদের আস্থা ও আনুগত্য ধরে রাখার জায়গায় প্রতিষ্ঠানটি আগের অবস্থানে নেই।
আগের মতো প্রতিষ্ঠানের ভেতরে পারিবারিক আবহ, নিয়মিত তথ্য ভাগাভাগি এবং কর্মীদের সঙ্গে ব্যবস্থাপনার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগও নাকি আর দেখা যায় না।
তিনি মনে করেন, গুগল একসময় কর্মীদের মন জয় করাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মনে করত। এখন প্রতিষ্ঠানের কাছে সেটি হয়তো আর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার নয়।
চাকরি আর জীবনের অর্থ এক নয়
গুগল ছাড়ার পর প্রযুক্তি খাতের কর্মীদের জন্য পরামর্শমূলক লেখা শুরু করেন স্ট্যাপলটন। সেখানে পাওয়া চিঠিগুলো তাঁকে নতুনভাবে ভাবিয়েছে।
তাঁর কাছে সবচেয়ে বিস্ময়কর ছিল—যেসব মানুষকে বাইরে থেকে সুখী ও সফল মনে হয়, তাঁদের অনেকেই ভেতরে ভেতরে একই ধরনের অর্থহীনতা ও অস্থিরতার সঙ্গে লড়ছেন।
একটি ভালো চাকরি জীবন চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ দিতে পারে। কিন্তু সেটি মানুষের সৃজনশীলতা, স্বপ্ন বা আত্মতৃপ্তির সব চাহিদা পূরণ করতে পারে না।
স্ট্যাপলটনের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উত্থান এই প্রশ্নকে আরও তীব্র করে তুলছে—মানুষ যদি কাজের জায়গায় নিজের অর্থ ও পরিচয় খুঁজে না পায়, তাহলে জীবনের কোন জায়গায় সেটি খুঁজবে?
‘গুগলের কবি’ থেকে ‘বার্ড’
স্ট্যাপলটনের গুগল-জীবনের সবচেয়ে মজার অধ্যায়গুলোর একটি হলো তাঁর ডাকনাম। প্রতিষ্ঠানে তিনি ‘গুগলের কবি’ নামে পরিচিত ছিলেন। কয়েক বছর পর গুগল তার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক কথোপকথনকারী ব্যবস্থার নাম দেয় ‘বার্ড’।
স্ট্যাপলটনের কাছে নামটি কেবল কাকতালীয় ঘটনা নয়; বরং এটি গুগলের পুরোনো সংস্কৃতির সঙ্গে মিলে যায়। সেই সংস্কৃতিতে ছিল কৌতুক, সৃজনশীলতা, অদ্ভুত চরিত্র, নতুন ধারণা এবং নিজেদের নিয়ে গল্প তৈরির প্রবণতা।
তবে তাঁর স্মৃতিকথার বড় প্রশ্নটি অন্য জায়গায়—যে প্রতিষ্ঠান একসময় কর্মীদের বলত তারা পরিবর্তনের অংশ, সেই প্রতিষ্ঠান কীভাবে এমন এক জায়গায় পৌঁছাল যেখানে কর্মীরাই নিজেদের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জবাবদিহির দাবি তুলতে বাধ্য হলো?
স্ট্যাপলটনের অভিজ্ঞতা দেখায়, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন শুধু প্রযুক্তিতে হয় না; সময়ের সঙ্গে বদলে যায় ক্ষমতা, কর্মী-ব্যবস্থাপনা সম্পর্ক এবং প্রতিষ্ঠানের নিজের সম্পর্কে তৈরি করা গল্পও।
গুগলের সাফল্য হয়তো এখনও অটুট। কিন্তু একসময় যে কর্মীসংস্কৃতি প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম পরিচয় ছিল, সেটি আগের জায়গায় আছে কি না—স্ট্যাপলটনের স্মৃতিকথা সেই প্রশ্নই নতুন করে সামনে এনেছে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















