১২:২৫ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বড় ক্লাসের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে শিক্ষার্থী, বদলাতে হবে শিক্ষার পদ্ধতি গ্যাস স্টেশনে বসল বিয়ের আসর, তিন পোশাকে চমকে দিলেন ড্রামার কনে ট্রাম্পের মানচিত্রে ‘মার্কিন’ আইসল্যান্ড, ক্ষুব্ধ রেইকিয়াভিক তলব করল মার্কিন রাষ্ট্রদূত এনভিডিয়া–হাগিং ফেস চুক্তিতে বদলে যেতে পারে প্রতিষ্ঠানের এআই কৌশল মেয়ের জন্মের স্মৃতি ধরে রাখতে টেলর সুইফটের প্রিয় গয়না-শিল্পীর অনন্য আংটি ১০–৩০ কাউন্ট সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বাতিল, আপত্তি বিজিএমইএ-বিকেএমইএর সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় সিলেটের চার প্রবাসীর মর্মান্তিক মৃত্যু মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি: মিসরের সামনে যোগ দেওয়ার চেয়েও বড় প্রশ্ন কাঁচা সবুজ টমেটো সংরক্ষণ করুন শীতের জন্য, সহজেই তৈরি করুন মজাদার আচার ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের যেকোনো প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করল মিসর

ডিজেল সংকটে বিপর্যস্ত উত্তরাঞ্চলের বোরো সেচ, উৎপাদন কমার শঙ্কা

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে তীব্র ডিজেল সংকট বোরো মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সেচ কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। এতে ধান উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং কৃষকদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ।

প্রায় ১৬টি জেলায়—রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নীলফামারী, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ—কৃষকরা জানিয়েছেন, জ্বালানির অভাবে তারা জমিতে সেচ দিতে পারছেন না। ফলে বোরো ধানের বিস্তীর্ণ ক্ষেত শুকিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

উৎপাদন মৌসুমে সংকটের প্রভাব
বোরো মৌসুমে পানি সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র, নলকূপ ও কৃষিযন্ত্র জ্বালানির অভাবে বন্ধ হয়ে থাকায় পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হচ্ছে।

কৃষকদের অভিযোগ, অনেক পেট্রোল পাম্পে ডিজেল নেই বা চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা হচ্ছে না। ফলে তারা বাধ্য হয়ে খোলা বাজার থেকে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০ থেকে ৮০ টাকা বেশি দিয়ে ডিজেল কিনছেন। এতে চাষের খরচ বেড়ে গিয়ে অনেকেই ঋণের চাপে পড়ছেন।

মাঠের বাস্তব চিত্র
রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার মধুপুর চরে গিয়ে দেখা গেছে, মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১০২ টাকা থেকে বেড়ে ১২০ টাকায় পৌঁছেছে। এতে সেচ খরচ বেড়ে গেছে অনেক।

লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার শিয়ালখোয়া গ্রামের এক কৃষক জানান, একাধিক পাম্পে খুঁজেও ডিজেল না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ২২০ টাকা লিটার দরে কিনতে হয়েছে। অন্যদিকে, আরেক কৃষক জানান, বাজারে কোথাও ডিজেল না পেয়ে তার বোরো জমি শুকিয়ে যাচ্ছে, এমনকি ২৫০ টাকা দিতেও প্রস্তুত ছিলেন, তবুও জ্বালানি পাননি।

সেচ খরচ বাড়ছে, চাপ বাড়ছে কৃষকের ওপর
সেচযন্ত্র পরিচালনাকারীরাও বলছেন, জ্বালানির অভাবে তারা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারছেন না। ফলে তারা সেচের চার্জ বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন, যা কৃষকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

পরিসংখ্যান ও নির্ভরতা
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের মোট ৯টি জেলায় প্রায় ৬ লাখ ৫২ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই অঞ্চলের প্রায় ২১ শতাংশ সেচনির্ভর জমি ডিজেলচালিত পাম্পের ওপর নির্ভরশীল। গভীর নলকূপ, অগভীর নলকূপ এবং লো-লিফট পাম্পের বড় একটি অংশই ডিজেলে চলে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, খাদ্য উৎপাদন সংকট এড়াতে কৃষি খাতে জ্বালানি সরবরাহকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপ ও আন্তর্জাতিক উত্তেজনার কারণে সরকার রেশনিং ব্যবস্থা চালু করলেও কৃষির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।

কৃষিবিদদের মতে, দেশের প্রধান খাদ্যশস্য বোরো ধান ব্যাপকভাবে সেচনির্ভর। এর ৬২ থেকে ৬৫ শতাংশ ক্ষেত ডিজেলচালিত সেচের ওপর নির্ভর করে। তাই এই সময়ে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত প্রয়োজন।

সরকারি অবস্থান ও উদ্যোগ
তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা এখনো ডিজেল সংকট বা অতিরিক্ত দামের বিষয়ে কোনো অভিযোগ পাননি এবং সেচ কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে বলে দাবি করেছেন।

অন্যদিকে, কৃষক সংগঠনের নেতারা সতর্ক করে বলেছেন, সংকট অব্যাহত থাকলে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসতে পারে এবং কৃষকরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার জরুরি ভিত্তিতে ডিজেল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে অর্থনৈতিক বিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটি দুটি প্রস্তাব নীতিগতভাবে অনুমোদন দিয়েছে।

উপসংহার
বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে। তাই দ্রুত ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করে কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো এখন সময়ের দাবি।

জনপ্রিয় সংবাদ

বড় ক্লাসের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে শিক্ষার্থী, বদলাতে হবে শিক্ষার পদ্ধতি

ডিজেল সংকটে বিপর্যস্ত উত্তরাঞ্চলের বোরো সেচ, উৎপাদন কমার শঙ্কা

০৬:৫০:৪১ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৯ মার্চ ২০২৬

বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে তীব্র ডিজেল সংকট বোরো মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সেচ কার্যক্রমকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। এতে ধান উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে এবং কৃষকদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ।

প্রায় ১৬টি জেলায়—রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, নীলফামারী, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ—কৃষকরা জানিয়েছেন, জ্বালানির অভাবে তারা জমিতে সেচ দিতে পারছেন না। ফলে বোরো ধানের বিস্তীর্ণ ক্ষেত শুকিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

উৎপাদন মৌসুমে সংকটের প্রভাব
বোরো মৌসুমে পানি সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ডিজেলচালিত সেচযন্ত্র, নলকূপ ও কৃষিযন্ত্র জ্বালানির অভাবে বন্ধ হয়ে থাকায় পরিস্থিতি ক্রমেই খারাপ হচ্ছে।

কৃষকদের অভিযোগ, অনেক পেট্রোল পাম্পে ডিজেল নেই বা চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করা হচ্ছে না। ফলে তারা বাধ্য হয়ে খোলা বাজার থেকে সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৫০ থেকে ৮০ টাকা বেশি দিয়ে ডিজেল কিনছেন। এতে চাষের খরচ বেড়ে গিয়ে অনেকেই ঋণের চাপে পড়ছেন।

মাঠের বাস্তব চিত্র
রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার মধুপুর চরে গিয়ে দেখা গেছে, মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১০২ টাকা থেকে বেড়ে ১২০ টাকায় পৌঁছেছে। এতে সেচ খরচ বেড়ে গেছে অনেক।

লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার শিয়ালখোয়া গ্রামের এক কৃষক জানান, একাধিক পাম্পে খুঁজেও ডিজেল না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ২২০ টাকা লিটার দরে কিনতে হয়েছে। অন্যদিকে, আরেক কৃষক জানান, বাজারে কোথাও ডিজেল না পেয়ে তার বোরো জমি শুকিয়ে যাচ্ছে, এমনকি ২৫০ টাকা দিতেও প্রস্তুত ছিলেন, তবুও জ্বালানি পাননি।

সেচ খরচ বাড়ছে, চাপ বাড়ছে কৃষকের ওপর
সেচযন্ত্র পরিচালনাকারীরাও বলছেন, জ্বালানির অভাবে তারা কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পারছেন না। ফলে তারা সেচের চার্জ বাড়াতে বাধ্য হচ্ছেন, যা কৃষকদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।

পরিসংখ্যান ও নির্ভরতা
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রংপুর ও রাজশাহী বিভাগের মোট ৯টি জেলায় প্রায় ৬ লাখ ৫২ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই অঞ্চলের প্রায় ২১ শতাংশ সেচনির্ভর জমি ডিজেলচালিত পাম্পের ওপর নির্ভরশীল। গভীর নলকূপ, অগভীর নলকূপ এবং লো-লিফট পাম্পের বড় একটি অংশই ডিজেলে চলে।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কতা
কৃষি অর্থনীতিবিদরা বলছেন, খাদ্য উৎপাদন সংকট এড়াতে কৃষি খাতে জ্বালানি সরবরাহকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে চাপ ও আন্তর্জাতিক উত্তেজনার কারণে সরকার রেশনিং ব্যবস্থা চালু করলেও কৃষির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি।

কৃষিবিদদের মতে, দেশের প্রধান খাদ্যশস্য বোরো ধান ব্যাপকভাবে সেচনির্ভর। এর ৬২ থেকে ৬৫ শতাংশ ক্ষেত ডিজেলচালিত সেচের ওপর নির্ভর করে। তাই এই সময়ে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত প্রয়োজন।

সরকারি অবস্থান ও উদ্যোগ
তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কিছু কর্মকর্তা জানিয়েছেন, তারা এখনো ডিজেল সংকট বা অতিরিক্ত দামের বিষয়ে কোনো অভিযোগ পাননি এবং সেচ কার্যক্রম স্বাভাবিক রয়েছে বলে দাবি করেছেন।

অন্যদিকে, কৃষক সংগঠনের নেতারা সতর্ক করে বলেছেন, সংকট অব্যাহত থাকলে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসতে পারে এবং কৃষকরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন।

এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার জরুরি ভিত্তিতে ডিজেল আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে অর্থনৈতিক বিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটি দুটি প্রস্তাব নীতিগতভাবে অনুমোদন দিয়েছে।

উপসংহার
বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে। তাই দ্রুত ডিজেল সরবরাহ নিশ্চিত করে কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো এখন সময়ের দাবি।