যুক্তরাজ্যে একের পর এক ভয়াবহ দাবানল, তীব্র তাপপ্রবাহ, খরা এবং হাজারো মানুষের মৃত্যুর মধ্যেই জলবায়ু সংকট মোকাবিলার উদ্যোগকে ‘অহংকারপূর্ণ’ বলে মন্তব্য করে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন সংস্কারবাদী দলের উপনেতা রিচার্ড টাইস। তাঁর মন্তব্যের পর চিকিৎসক, নার্স, পরিবেশকর্মী ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
টাইস সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন থামানোর চেষ্টা করার চেয়ে এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। তাঁর দাবি, কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনার নীতি জলবায়ু পরিবর্তন বন্ধ করতে পারবে—এমন কোনো প্রমাণ নেই।
তিনি বলেন, জলবায়ু সব সময়ই পরিবর্তিত হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। তাই এই পরিবর্তন পুরোপুরি থামানো সম্ভব বলে মনে করা অহংকারের শামিল। বরং উষ্ণ আবহাওয়ার কিছু সম্ভাব্য সুবিধা উপভোগ করার কথাও বলেন তিনি।
‘গরম একটু বাড়লে উপভোগ করুন’
টাইসের সবচেয়ে বেশি সমালোচিত মন্তব্যগুলোর একটি ছিল ইংল্যান্ডের মদ উৎপাদন নিয়ে। তিনি বলেন, আবহাওয়া কিছুটা উষ্ণ হলে তা উপভোগ করা উচিত। এর ফলে ইংল্যান্ডের আঙুর ভালো হলে এবং মদ ও ফেনাযুক্ত মদের মান আরও উন্নত হলে সেটিকে ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তাঁর এই বক্তব্যের পরপরই রাজনৈতিক মহল ও জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়।
শ্রমিক দলের চেয়ার ব্রিজেট ফিলিপসন বলেন, টাইসের মন্তব্য বাস্তব পরিস্থিতির প্রতি সম্পূর্ণ সংবেদনহীন। তাঁর ভাষায়, যখন যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় দাবানল ছড়িয়ে পড়ছে, খরার কারণে পানি ও খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে, তখন এ ধরনের মন্তব্য তাঁর বিচারবোধ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
তাপপ্রবাহে প্রায় তিন হাজার মানুষের মৃত্যু
এবারের গ্রীষ্ম যুক্তরাজ্যের জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করেছে। কয়েক দফায় তাপমাত্রা ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে উঠেছে। এর ফলে হাজারো মানুষের মৃত্যু, বিপুলসংখ্যক মানুষের হাসপাতালে যাওয়া এবং অর্থনীতিতে প্রায় ৪০০ কোটি পাউন্ডের ক্ষতি হয়েছে।
সরকারের হিসাব অনুযায়ী, মে ও জুন মাসের তাপপ্রবাহে উচ্চ তাপমাত্রার কারণে ২ হাজার ৮৭৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত পুরো গ্রীষ্মে উচ্চ তাপমাত্রাজনিত মৃত্যুর সংখ্যার তুলনায় এটি প্রায় দ্বিগুণ।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বয়স্ক মানুষ আগের ধারণার তুলনায় কম তাপমাত্রাতেই অতিরিক্ত গরমের ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। চিকিৎসাকর্মীরাও বলছেন, প্রচণ্ড গরমের কারণে অসুস্থ মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় হাসপাতালগুলোতে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
‘জলবায়ু পরিবর্তন জনস্বাস্থ্যের জরুরি সংকট’
যুক্তরাজ্যের নার্সদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন টাইসের বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব উপভোগ করার পরামর্শ তাদের দেওয়া উচিত, যারা ৩৬ ডিগ্রি তাপমাত্রার হাসপাতালে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন—অথবা প্রতিদিন হাসপাতালের করিডরে অপেক্ষা করা সেই হাজারো রোগীকে, যাদের মধ্যে অতিরিক্ত গরমের কারণে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ছেন বয়স্ক ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষ।
সংগঠনটি বলেছে, জলবায়ু পরিবর্তন এখন জনস্বাস্থ্যের এমন এক জরুরি সংকট, যা ক্রমেই ভয়াবহ হচ্ছে। তাই শুধু নিঃসরণ কমানো নয়, হাসপাতাল ও পরিচর্যাকেন্দ্রগুলোকে তাপপ্রবাহ মোকাবিলার উপযোগী করে তোলাও জরুরি।
সোয়ানসি বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য গবেষক সাইমন উইলিয়ামসও টাইসের মন্তব্য নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর মতে, জলবায়ু পরিবর্তন ও এর প্রভাব নিয়ে একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তির কাছ থেকে বিভ্রান্তিকর বক্তব্য আসা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।
তিনি বলেন, বিশেষ করে বয়স্ক মানুষের শরীর সময়ের সঙ্গে অতিরিক্ত তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা হারায়। ফলে তাপমাত্রার মাত্র কয়েক ডিগ্রির পরিবর্তনও তাদের স্বাস্থ্যে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
বয়স্কদের অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনও সাম্প্রতিক গবেষণার ফলকে উদ্বেগজনক বলে বর্ণনা করেছে। তাদের মতে, অতিরিক্ত তাপ বয়স্ক জনগোষ্ঠীর জন্য বাস্তব ও গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে—এ বিষয়ে আর অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
দাবানলে বিপর্যস্ত যুক্তরাজ্য
শুধু তাপপ্রবাহ নয়, দাবানলও এবার যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ডার্বিশায়ার, মিডল্যান্ডস, ওয়েলস এবং উত্তর আয়ারল্যান্ডে দমকলকর্মীদের একের পর এক আগুনের মোকাবিলা করতে হয়েছে।
কৃষকরাও এবার কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি। জাতীয় কৃষক সংগঠন জানিয়েছে, এবারের ফসলের মৌসুম তাদের দেখা সবচেয়ে খারাপ সময়গুলোর একটি হতে পারে।
জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে দাবানলের ক্রমবর্ধমান বিস্তারের সম্পর্কও উঠে এসেছে। সাম্প্রতিক ‘আগুনের ঢেউ’ যুক্তরাজ্যে এ ধরনের সবচেয়ে ব্যাপক পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। ভেজা শীতের পর দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ ভূমিকে শুকিয়ে দেওয়ায় আগুন ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি আরও বেড়েছে।
শূন্য নিঃসরণ নীতি নিয়ে সংস্কারবাদী দলের অবস্থান
সংস্কারবাদী দল দীর্ঘদিন ধরে ২০৫০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনার সরকারি অঙ্গীকার বাতিলের দাবি জানিয়ে আসছে। ক্ষমতায় গেলে পরিবেশবান্ধব বিভিন্ন ভর্তুকি বন্ধ করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে দলটি।
দলটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে জীবাশ্ম জ্বালানি শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছ থেকে কোটি কোটি পাউন্ড অনুদান পাওয়ার বিষয়টিও রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এর মধ্যে ধনকুবের ক্রিস্টোফার হারবোর্নের দেওয়া ৫০ লাখ পাউন্ডের অনুদান বিশেষভাবে আলোচিত। হারবোর্ন উড়োজাহাজের জ্বালানি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত এবং তাঁর দেওয়া অর্থ নিয়ে বর্তমানে সংসদীয় তদন্ত চলছে।
দলের নেতা নাইজেল ফারাজ জলবায়ু পরিবর্তনে মানুষের কর্মকাণ্ডের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও তাঁর উপনেতা টাইস আরও সরাসরি জলবায়ু সংকটের অস্তিত্ব অস্বীকার করেছেন।
২০২৪ সালে টাইস বলেছিলেন, বিশ্ব জলবায়ু জরুরি অবস্থায় নেই এবং কোনো জলবায়ু সংকটও নেই। তবে জলবায়ু পরিবর্তন বাস্তব—কারণ লাখ লাখ বছর ধরেই এটি ঘটেছে এবং ভবিষ্যতেও ঘটবে।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 


















