মিশরের এল আলামেইন আন্তর্জাতিক এয়ারশো এবার শুধু সামরিক প্রযুক্তি প্রদর্শনের আয়োজন ছিল না; বৈশ্বিক অস্ত্রবাজারের পরিবর্তিত চরিত্রেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। ৮ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর এল আলামেইন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় এই এয়ারশোতে রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ইউরোপের শীর্ষ প্রতিরক্ষা শিল্পের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার ক্রেতা ও সামরিক প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
৫০টি দেশের ২৫০টির বেশি প্রতিষ্ঠান এতে নিজেদের পণ্য প্রদর্শন করে এবং ১২ হাজারের বেশি প্রতিরক্ষা শিল্পসংশ্লিষ্ট পেশাজীবী প্রদর্শনীতে উপস্থিত ছিলেন। আকাশে ছিল বিভিন্ন দেশের যুদ্ধবিমান ও অ্যারোবেটিক দলের প্রদর্শনী, আর মাটিতে চলেছে অস্ত্র বিক্রি ও বহু বিলিয়ন ডলারের চুক্তি নিয়ে দর-কষাকষি।
এই আয়োজনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক ছিল রাশিয়ার উপস্থিতি। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার দীর্ঘ চাপের পরও মস্কোর প্রতিরক্ষা শিল্প যে আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রেতাদের আগ্রহ ধরে রেখেছে, এল আলামেইনের প্রদর্শনী তারই একটি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে।
নিষেধাজ্ঞার পরও কেন রাশিয়ার অস্ত্রে আগ্রহ
রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় অস্ত্র রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান রোসোবোরোনএক্সপোর্ট প্রদর্শনীতে ৫০০টির বেশি সামরিক পণ্য উপস্থাপন করে। রুশ প্যাভিলিয়নে বিদেশি প্রতিনিধিদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। এর পেছনে রাজনৈতিক কারণের পাশাপাশি একটি বাস্তব সামরিক বিবেচনাও কাজ করছে—আধুনিক যুদ্ধে অস্ত্রের কার্যকারিতা সরাসরি যাচাই করার সুযোগ।
বর্তমান সংঘাতগুলো সামরিক প্রযুক্তির জন্য আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় কঠিন পরীক্ষা তৈরি করেছে। ড্রোন, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, আধুনিক নজরদারি ব্যবস্থা এবং স্তরভিত্তিক আকাশ প্রতিরক্ষার উপস্থিতিতে কোনো অস্ত্র শুধু পরীক্ষাগারের ফলাফল বা বিপণন প্রচারের ওপর নির্ভর করে নিজের সক্ষমতা প্রমাণ করতে পারে না।
রাশিয়া তার সামরিক সরঞ্জামের ক্ষেত্রে সাম্প্রতিক যুদ্ধের অভিজ্ঞতাকে বড় একটি সুবিধা হিসেবে তুলে ধরছে। বিশেষ করে বিমান, আকাশ প্রতিরক্ষা এবং মনুষ্যবিহীন ব্যবস্থাগুলোর নকশা ও ব্যবহারিক সক্ষমতা যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতায় প্রভাবিত হয়েছে—এমন বার্তাই মস্কো ক্রেতাদের সামনে তুলে ধরছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মূল্য ও চুক্তির বিষয়টি। রুশ পক্ষের যুক্তি হলো, তাদের সঙ্গে সামরিক সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় কম রাজনৈতিক শর্ত থাকে। আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিকার অনেক দেশের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা। এর ওপর রয়েছে পুরোনো সামরিক সম্পর্ক। সোভিয়েত আমল থেকে বহু দেশ রুশ অস্ত্র ব্যবহার করে আসছে। ফলে তাদের সেনাবাহিনী, রক্ষণাবেক্ষণ কাঠামো ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার সঙ্গে এসব সরঞ্জামের সামঞ্জস্য রয়েছে।
নতুন প্রজন্মের যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা
এল আলামেইনে রাশিয়ার সবচেয়ে আলোচিত প্রদর্শনীগুলোর একটি ছিল Su-57E। পঞ্চম প্রজন্মের এই বহুমুখী যুদ্ধবিমান উড্ডয়ন প্রদর্শনীতেও অংশ নেয়। সুখোইয়ের প্রধান পরীক্ষামূলক পাইলট সের্গেই বোগদানের উড্ডয়ন প্রদর্শন বিমানের কৌশলগত সক্ষমতার পাশাপাশি এর উন্নত নকশার দিকটিও সামনে আনে।
Su-57E-এর গুরুত্ব শুধু এর উড্ডয়নক্ষমতায় নয়। অভ্যন্তরীণ অস্ত্রবহন ব্যবস্থা, বিভিন্ন পাল্লার আকাশ-থেকে-আকাশ ক্ষেপণাস্তর এবং আকাশ-থেকে-ভূমি আঘাত হানার অস্ত্র—সব মিলিয়ে এটি রাশিয়ার ভবিষ্যৎ রপ্তানি কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
আরেকটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন Yak-130M। প্রশিক্ষণ বিমান হিসেবে পরিচিত Yak-130-এর এই উন্নত সংস্করণে পূর্ণাঙ্গ রাডার এবং অধিকতর নির্ভুল অস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতা যুক্ত করা হয়েছে। ফলে এটি কেবল প্রশিক্ষণের প্ল্যাটফর্ম নয়, তুলনামূলক কম খরচে হালকা যুদ্ধ ও আক্রমণ মিশনে ব্যবহারের উপযোগী বিমান হিসেবেও বাজারজাত করা হচ্ছে। প্রদর্শনী চলাকালেই বিদেশি ক্রেতার সঙ্গে এর প্রথম সরবরাহ চুক্তি স্বাক্ষরের ঘোষণা আসে।
তবে রাশিয়ার এবারের প্রদর্শনীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাগুলোর একটি এসেছে ড্রোন ও দূরপাল্লার আঘাত হানার অস্ত্র থেকে। S-71M Monokhrom, S-71K Kover এবং S8000 Banderol—এই তিন ধরনের মনুষ্যবিহীন বা ড্রোনভিত্তিক আঘাত ব্যবস্থা প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে দেখানো হয়।
এগুলোর নকশা ও ব্যবহারের ধারণা থেকে বোঝা যায়, আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে রাশিয়া শুধু প্রচলিত যুদ্ধবিমানের ওপর নির্ভর করছে না। মনুষ্যবিহীন প্ল্যাটফর্মকে বিমান, ক্ষেপণাস্ত্র ও ইলেকট্রনিক যুদ্ধব্যবস্থার সঙ্গে সমন্বিত করে ব্যবহারের দিকে জোর দেওয়া হচ্ছে।

আকাশ প্রতিরক্ষাও নতুন অগ্রাধিকার
ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহারের ফলে আকাশ প্রতিরক্ষার চিত্রও বদলে গেছে। তুলনামূলক সস্তা UAV ঠেকাতে অত্যন্ত ব্যয়বহুল ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করা দীর্ঘমেয়াদে কতটা কার্যকর—এই প্রশ্ন এখন প্রায় সব আধুনিক সামরিক বাহিনীর সামনে।
এল আলামেইনে রাশিয়া এ কারণেই নতুন কয়েকটি স্বল্প ও মধ্যপাল্লার প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সামনে আনে। TKB-1167 চারনলবিশিষ্ট অ্যান্টি-ড্রোন যুদ্ধ মডিউল স্বয়ংক্রিয়ভাবে ড্রোন শনাক্ত ও মোকাবিলা করার জন্য তৈরি। পাশাপাশি ZAK-30 Citadel ৩০ মিলিমিটার স্বয়ংক্রিয় কামানভিত্তিক ব্যবস্থা, Pantsir-SMD-E এবং Verba ম্যানপ্যাডসও প্রদর্শন করা হয়।
এখানে মূল বিষয়টি হলো, রুশ প্রতিরক্ষা শিল্পের পণ্য তালিকায় এখন এমন প্রযুক্তির গুরুত্ব বেড়েছে, যেগুলো সাম্প্রতিক যুদ্ধের বাস্তব চাহিদা থেকে উঠে এসেছে। ড্রোন প্রতিরোধ, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, নির্ভুল আঘাত এবং আকাশ প্রতিরক্ষা—সবগুলো ক্ষেত্র পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে একটি নতুন যুদ্ধব্যবস্থার জন্ম দিচ্ছে।
একটি বহুমেরু অস্ত্রবাজারের প্রতিচ্ছবি
এল আলামেইনে রাশিয়ার সাফল্যকে অবশ্যই অন্য দেশগুলোর উপস্থিতি থেকে আলাদা করে দেখা যায় না। বরং প্রদর্শনীটি দেখিয়েছে, বৈশ্বিক প্রতিরক্ষা বাজার এখন ক্রমেই বহুমেরু হয়ে উঠছে।
চীন সেখানে বড় ধরনের উপস্থিতি দেখিয়েছে। দেশটির J-16 যুদ্ধবিমান এবং YY-20 আকাশে জ্বালানি সরবরাহকারী বিমান প্রদর্শিত হয়। মিশরের সঙ্গে চীনের সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এই উপস্থিতির আলাদা তাৎপর্য রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রও তার পরিচিত সামরিক প্ল্যাটফর্ম নিয়ে হাজির হয়। A-10 Thunderbolt II, F-15E Strike Eagle, F-16 Fighting Falcon এবং C-130 Hercules-এর মতো বিমান প্রদর্শনীতে ছিল। এগুলোর অনেকগুলোই বহু বছর ধরে মার্কিন প্রতিরক্ষা রপ্তানি ও সামরিক উপস্থিতির পরিচিত প্রতীক। তবে এল আলামেইনে তাদের উপস্থিতির একটি বড় অংশকে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক সক্ষমতার প্রদর্শন হিসেবেও দেখা যায়।
ফ্রান্স নিয়ে আসে Rafale যুদ্ধবিমান। মিশরের সম্ভাব্য আরও ২৪টি Rafale কেনার আলোচনার সময়েই এই প্রদর্শনী হওয়ায় ফরাসি উপস্থিতির বাণিজ্যিক গুরুত্বও ছিল স্পষ্ট। তুরস্ক অন্যদিকে TAI ও ASELSAN-এর মাধ্যমে ড্রোন এবং কৌশলগত ইলেকট্রনিক যুদ্ধ প্রযুক্তির ওপর জোর দেয়। আফ্রিকার মতো যুদ্ধক্ষেত্রে এসব প্রযুক্তির সম্ভাব্য ব্যবহারের বিষয়টিও তুরস্কের প্রদর্শনীর কেন্দ্রে ছিল।
পরিবর্তিত বাজারের সংকেত
এল আলামেইনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত কোনো একটি নির্দিষ্ট যুদ্ধবিমান বা ক্ষেপণাস্ত্রের সাফল্য নয়। বরং এটি দেখিয়েছে, অস্ত্র কেনাবেচার সিদ্ধান্ত এখন আগের তুলনায় বেশি বাস্তববাদী এবং বহুমুখী হয়ে উঠছে।
পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা রাশিয়াকে আন্তর্জাতিক অস্ত্রবাজার থেকে পুরোপুরি সরিয়ে দিতে পারেনি। একই সঙ্গে চীন, তুরস্ক, ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র ও অন্যান্য দেশও নিজেদের প্রযুক্তি নিয়ে নতুন বাজার খুঁজছে। ক্রেতা দেশগুলোর হাতে ফলে আগের চেয়ে বেশি বিকল্প তৈরি হচ্ছে।
এই প্রতিযোগিতায় শুধু রাজনৈতিক জোট বা কূটনৈতিক সম্পর্ক যথেষ্ট নয়। অস্ত্র কতটা কার্যকর, তার মূল্য কত, সরবরাহ কতটা নির্ভরযোগ্য, রক্ষণাবেক্ষণ কতটা সহজ এবং ক্রেতার বিদ্যমান সামরিক অবকাঠামোর সঙ্গে তা কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ—এসব প্রশ্ন ক্রমেই বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
এল আলামেইন সেই পরিবর্তনের একটি দৃশ্যমান উদাহরণ। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা রাশিয়ার প্রতিরক্ষা শিল্পকে চাপে ফেলেছে, এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু একই সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পাওয়া অভিজ্ঞতা ও নতুন প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করে রাশিয়া তার অস্ত্র রপ্তানির জন্য নতুন যুক্তি তৈরি করছে।
অন্যদিকে ক্রেতা দেশগুলোও কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিভিন্ন উৎস থেকে সামরিক প্রযুক্তি সংগ্রহের পথ খুঁজছে। ফলে বৈশ্বিক অস্ত্রবাজারে পশ্চিমা আধিপত্যের পাশাপাশি রাশিয়া, চীন ও তুরস্কের মতো শক্তির প্রতিযোগিতা আরও দৃশ্যমান হচ্ছে।
এল আলামেইন আন্তর্জাতিক এয়ারশো তাই শুধু আকাশে যুদ্ধবিমানের মহড়া কিংবা মাটিতে সামরিক সরঞ্জামের প্রদর্শনী নয়। এটি এমন এক প্রতিরক্ষা বাজারের প্রতিচ্ছবি, যেখানে বাস্তব যুদ্ধের অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, মূল্য এবং রাজনৈতিক স্বাধীনতা—সবকিছু মিলিয়েই ভবিষ্যতের ক্রেতাদের সিদ্ধান্ত নির্ধারিত হবে।
দিমিত্রি করনেভ 


















