০১:০৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জলবায়ু ঝুঁকির প্রমাণ আছে, এবার নেপালের দরকার কার্যকর পদক্ষেপ জার্মানির স্যাক্সনি-আনহাল্টে উগ্র ডানপন্থীদের বড় জয়, চাপে মূলধারার রাজনীতি নেপালের ‘জেন জি’ আন্দোলনের এক বছর, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে না: কার্কি ‘ক্লিন ব্রেক’ থেকে অন্তহীন যুদ্ধ: প্রতিরোধমূলক যুদ্ধ কীভাবে বদলে দিচ্ছে নিরাপত্তা নীতি চার প্রদেশ নিয়েই অখণ্ড থাকবে পাকিস্তান, নতুন প্রদেশের প্রস্তাব নাকচ সিন্ধুর মুখ্যমন্ত্রীর নিউইয়র্কে বসছে ভোগ বিজনেসের বৈশ্বিক সম্মেলন, টিকিট বিক্রি শুরু ‘ক্লিন গার্ল’ যুগের বিদায়, বসন্ত-গ্রীষ্ম ২০২৭-এ আসছে নতুন ফ্যাশন ধারা দামি গয়না খোঁজার নতুন ঠিকানা কি টিকটক? বদলে যাওয়া শরীরের জন্য বিলাসবহুল ফ্যাশন, নতুন বাজার তৈরি করছে ওয়েলডান আমেরিকা কতটা সমাজতন্ত্র গ্রহণ করতে প্রস্তুত?

নারকেল চাষে টেকসই জাতই ভবিষ্যতের ভরসা, শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না

দেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ঘোষিত ‘নারকেল উন্নয়ন কর্মসূচি’ ঘিরে কৃষকদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। পুরোনো ও অনুৎপাদনশীল বাগান পুনরুজ্জীবিত করা এবং উপকূলীয় অঞ্চলে নতুন বাগান গড়ে তোলাই এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বেশি ফলনশীল চারা বিতরণে সীমাবদ্ধ থাকলে এই উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ উৎপাদন নয়, জলবায়ু পরিবর্তন ও রোগব্যাধি।

জলবায়ু পরিবর্তন ও রোগের দ্বৈত চাপ

ভারত বিশ্বে সবচেয়ে বড় নারকেল উৎপাদক ও ভোক্তা দেশ। দেশীয় বাজারে নারকেল ও ডাবের দাম আন্তর্জাতিক দামের তুলনায় অনেক বেশি, যদিও গাছপ্রতি উৎপাদন ইতিমধ্যেই শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন বা ইন্দোনেশিয়ার চেয়ে বেশি। তামিলনাড়ুর কিছু অঞ্চলে একটি গাছ থেকে বছরে ২৫০ থেকে ৩০০টি পর্যন্ত ডাব পাওয়া যাচ্ছে।

নারিকেল চাষ করে সাফল্য পাবেন যেভাবে

তবু আশঙ্কা বাড়াচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০৫০ সালের মধ্যে নারকেল চাষের এলাকায় তাপমাত্রা প্রায় ১.৬ থেকে ২.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে, আর ২০৭০ সালের মধ্যে তা ৩ ডিগ্রিরও বেশি হতে পারে। বৃষ্টিপাত একই থাকলেও বাড়তি তাপমাত্রা খরার চাপ বাড়াবে। কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ুর দক্ষিণাঞ্চল এবং পূর্ব উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা ভবিষ্যতে নারকেল চাষের জন্য কম উপযোগী হয়ে পড়তে পারে।

পশ্চিম উপকূলে শিকড় পচা রোগের থাবা

পশ্চিমঘাট ও কেরালা উপকূলীয় অঞ্চল এখনও তুলনামূলকভাবে উপযোগী থাকলেও সেখানে শিকড় পচা রোগ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। আলাপ্পুঝা ও পোল্লাচির মতো এলাকায় অসংখ্য বাগান ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলে স্পষ্ট হচ্ছে, শুধু উচ্চ ফলনশীল জাত নয়, রোগসহনশীল ও জলবায়ু সহনশীল জাত উদ্ভাবনই এখন সময়ের দাবি।

রাষ্ট্রায়ত্ত উদ্যানতত্ত্ব দপ্তর ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা জমিতে মাতৃগাছ বাগান গড়ে তুলে জলবায়ু সহনশীল ও রোগপ্রতিরোধী চারা ব্যাপক হারে উৎপাদনের উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি গবেষণা জোরদার করে তাপ ও খরা সহনশীল নতুন জাত উদ্ভাবনে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

নারকেল গাছে ফলন বৃদ্ধিতে সার প্রয়োগের পরিমাণ ও কীট পরিচালনা (Management Of  Coconut Tree)

ভর্তুকির বদলে সরাসরি সহায়তা

উৎপাদন বাড়ানোর অংশ হিসেবে বিভিন্ন জৈব উপাদান বা মাইক্রোবায়াল উপকরণ বিতরণের পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে অনেক সময় নিম্নমান বা সংরক্ষণ ত্রুটির কারণে সেগুলোর কার্যকারিতা কমে যায়। তাই কৃষকদের হাতে সরাসরি আর্থিক সহায়তা দিলে তারা নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ, মাটি উন্নয়ন বা শ্রম ব্যয় করতে পারবেন। এতে ফলও হবে কার্যকর।

মূল্য সংযোজন ও বিপণনের বাস্তবতা

অনেক এলাকায় উৎপাদনই যখন চাহিদা পূরণে হিমশিম খাচ্ছে, তখন বড় আকারে প্রক্রিয়াজাতকরণ ইউনিট স্থাপন ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। অতীতে এমন বহু প্রকল্পে যন্ত্রপাতি বসিয়ে পরে তা অকেজো পড়ে থাকার উদাহরণ রয়েছে। উচ্চ বিনিয়োগের বাধা ও জটিল নিয়মের কারণে কৃষক সংগঠনগুলো কার্যকরভাবে অংশ নিতে পারেনি।

তিন বছরেই নারকেল, ফল দেবে টানা ৮০ বছর!

এক্ষেত্রে বড় কেন্দ্রীয় ক্লাস্টারের বদলে ছোট আকারে পরীক্ষামূলক মডেল চালু করে, অভিজ্ঞ বিপণন সংস্থার সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা বেশি ফলপ্রসূ হতে পারে। তিপতুর, আনাইমালাই বা পোল্লাচির মতো বিশেষায়িত অঞ্চলে ছোট কিন্তু সুশৃঙ্খল প্রকল্প ভবিষ্যতের দিকনির্দেশ দিতে পারে।

নীতিনির্ধারণে বাস্তব অভিজ্ঞতার গুরুত্ব

নারকেল চাষিরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী কণ্ঠস্বর পান না। ফলে অনেক নীতি মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে মিল খায় না। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সরেজমিনে গেলে বোঝা যায়, শিকড় পচা রোগ ও জলবায়ু চাপ কেবল তাত্ত্বিক আশঙ্কা নয়, এটি জীবিকার বাস্তব সংকট।

এই প্রেক্ষাপটে ‘নারকেল উন্নয়ন কর্মসূচি’কে কেবল উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা হিসেবে না দেখে জলবায়ু সহনশীল ও রোগপ্রতিরোধী জাত উদ্ভাবনের সুযোগ হিসেবে নিতে হবে। কৃষকের ওপর আস্থা, অতীত ব্যর্থতার সৎ মূল্যায়ন এবং টেকসই কৌশলই পারে দেশের নারকেল চাষকে দীর্ঘমেয়াদে সুরক্ষা দিতে।

 

জনপ্রিয় সংবাদ

জলবায়ু ঝুঁকির প্রমাণ আছে, এবার নেপালের দরকার কার্যকর পদক্ষেপ

নারকেল চাষে টেকসই জাতই ভবিষ্যতের ভরসা, শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না

০৩:৪৬:১৮ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩ মার্চ ২০২৬

দেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ঘোষিত ‘নারকেল উন্নয়ন কর্মসূচি’ ঘিরে কৃষকদের মধ্যে আশাবাদ তৈরি হয়েছে। পুরোনো ও অনুৎপাদনশীল বাগান পুনরুজ্জীবিত করা এবং উপকূলীয় অঞ্চলে নতুন বাগান গড়ে তোলাই এই কর্মসূচির মূল লক্ষ্য। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু বেশি ফলনশীল চারা বিতরণে সীমাবদ্ধ থাকলে এই উদ্যোগ দীর্ঘমেয়াদে কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না। এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ উৎপাদন নয়, জলবায়ু পরিবর্তন ও রোগব্যাধি।

জলবায়ু পরিবর্তন ও রোগের দ্বৈত চাপ

ভারত বিশ্বে সবচেয়ে বড় নারকেল উৎপাদক ও ভোক্তা দেশ। দেশীয় বাজারে নারকেল ও ডাবের দাম আন্তর্জাতিক দামের তুলনায় অনেক বেশি, যদিও গাছপ্রতি উৎপাদন ইতিমধ্যেই শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন বা ইন্দোনেশিয়ার চেয়ে বেশি। তামিলনাড়ুর কিছু অঞ্চলে একটি গাছ থেকে বছরে ২৫০ থেকে ৩০০টি পর্যন্ত ডাব পাওয়া যাচ্ছে।

নারিকেল চাষ করে সাফল্য পাবেন যেভাবে

তবু আশঙ্কা বাড়াচ্ছে জলবায়ু পরিবর্তন। গবেষণায় দেখা গেছে, ২০৫০ সালের মধ্যে নারকেল চাষের এলাকায় তাপমাত্রা প্রায় ১.৬ থেকে ২.১ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে, আর ২০৭০ সালের মধ্যে তা ৩ ডিগ্রিরও বেশি হতে পারে। বৃষ্টিপাত একই থাকলেও বাড়তি তাপমাত্রা খরার চাপ বাড়াবে। কর্ণাটক, অন্ধ্রপ্রদেশ, তামিলনাড়ুর দক্ষিণাঞ্চল এবং পূর্ব উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকা ভবিষ্যতে নারকেল চাষের জন্য কম উপযোগী হয়ে পড়তে পারে।

পশ্চিম উপকূলে শিকড় পচা রোগের থাবা

পশ্চিমঘাট ও কেরালা উপকূলীয় অঞ্চল এখনও তুলনামূলকভাবে উপযোগী থাকলেও সেখানে শিকড় পচা রোগ মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। আলাপ্পুঝা ও পোল্লাচির মতো এলাকায় অসংখ্য বাগান ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলে স্পষ্ট হচ্ছে, শুধু উচ্চ ফলনশীল জাত নয়, রোগসহনশীল ও জলবায়ু সহনশীল জাত উদ্ভাবনই এখন সময়ের দাবি।

রাষ্ট্রায়ত্ত উদ্যানতত্ত্ব দপ্তর ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা জমিতে মাতৃগাছ বাগান গড়ে তুলে জলবায়ু সহনশীল ও রোগপ্রতিরোধী চারা ব্যাপক হারে উৎপাদনের উদ্যোগ নিতে হবে। পাশাপাশি গবেষণা জোরদার করে তাপ ও খরা সহনশীল নতুন জাত উদ্ভাবনে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

নারকেল গাছে ফলন বৃদ্ধিতে সার প্রয়োগের পরিমাণ ও কীট পরিচালনা (Management Of  Coconut Tree)

ভর্তুকির বদলে সরাসরি সহায়তা

উৎপাদন বাড়ানোর অংশ হিসেবে বিভিন্ন জৈব উপাদান বা মাইক্রোবায়াল উপকরণ বিতরণের পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে অনেক সময় নিম্নমান বা সংরক্ষণ ত্রুটির কারণে সেগুলোর কার্যকারিতা কমে যায়। তাই কৃষকদের হাতে সরাসরি আর্থিক সহায়তা দিলে তারা নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী সেচ, মাটি উন্নয়ন বা শ্রম ব্যয় করতে পারবেন। এতে ফলও হবে কার্যকর।

মূল্য সংযোজন ও বিপণনের বাস্তবতা

অনেক এলাকায় উৎপাদনই যখন চাহিদা পূরণে হিমশিম খাচ্ছে, তখন বড় আকারে প্রক্রিয়াজাতকরণ ইউনিট স্থাপন ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। অতীতে এমন বহু প্রকল্পে যন্ত্রপাতি বসিয়ে পরে তা অকেজো পড়ে থাকার উদাহরণ রয়েছে। উচ্চ বিনিয়োগের বাধা ও জটিল নিয়মের কারণে কৃষক সংগঠনগুলো কার্যকরভাবে অংশ নিতে পারেনি।

তিন বছরেই নারকেল, ফল দেবে টানা ৮০ বছর!

এক্ষেত্রে বড় কেন্দ্রীয় ক্লাস্টারের বদলে ছোট আকারে পরীক্ষামূলক মডেল চালু করে, অভিজ্ঞ বিপণন সংস্থার সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা বেশি ফলপ্রসূ হতে পারে। তিপতুর, আনাইমালাই বা পোল্লাচির মতো বিশেষায়িত অঞ্চলে ছোট কিন্তু সুশৃঙ্খল প্রকল্প ভবিষ্যতের দিকনির্দেশ দিতে পারে।

নীতিনির্ধারণে বাস্তব অভিজ্ঞতার গুরুত্ব

নারকেল চাষিরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী কণ্ঠস্বর পান না। ফলে অনেক নীতি মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার সঙ্গে মিল খায় না। ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় সরেজমিনে গেলে বোঝা যায়, শিকড় পচা রোগ ও জলবায়ু চাপ কেবল তাত্ত্বিক আশঙ্কা নয়, এটি জীবিকার বাস্তব সংকট।

এই প্রেক্ষাপটে ‘নারকেল উন্নয়ন কর্মসূচি’কে কেবল উৎপাদন বৃদ্ধির পরিকল্পনা হিসেবে না দেখে জলবায়ু সহনশীল ও রোগপ্রতিরোধী জাত উদ্ভাবনের সুযোগ হিসেবে নিতে হবে। কৃষকের ওপর আস্থা, অতীত ব্যর্থতার সৎ মূল্যায়ন এবং টেকসই কৌশলই পারে দেশের নারকেল চাষকে দীর্ঘমেয়াদে সুরক্ষা দিতে।