১২:২৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বড় ক্লাসের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে শিক্ষার্থী, বদলাতে হবে শিক্ষার পদ্ধতি গ্যাস স্টেশনে বসল বিয়ের আসর, তিন পোশাকে চমকে দিলেন ড্রামার কনে ট্রাম্পের মানচিত্রে ‘মার্কিন’ আইসল্যান্ড, ক্ষুব্ধ রেইকিয়াভিক তলব করল মার্কিন রাষ্ট্রদূত এনভিডিয়া–হাগিং ফেস চুক্তিতে বদলে যেতে পারে প্রতিষ্ঠানের এআই কৌশল মেয়ের জন্মের স্মৃতি ধরে রাখতে টেলর সুইফটের প্রিয় গয়না-শিল্পীর অনন্য আংটি ১০–৩০ কাউন্ট সুতা আমদানিতে বন্ড সুবিধা বাতিল, আপত্তি বিজিএমইএ-বিকেএমইএর সৌদি আরবে সড়ক দুর্ঘটনায় সিলেটের চার প্রবাসীর মর্মান্তিক মৃত্যু মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি: মিসরের সামনে যোগ দেওয়ার চেয়েও বড় প্রশ্ন কাঁচা সবুজ টমেটো সংরক্ষণ করুন শীতের জন্য, সহজেই তৈরি করুন মজাদার আচার ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের যেকোনো প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করল মিসর

পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের স্মৃতিকথা (পর্ব-১৩০)

  • Sarakhon Report
  • ১১:০০:৫০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৫
  • 104

ধীরেনদের বাসায়

ধীরেনদের বাড়িতে বাংলা বই-এর খুব ভালো একটি লাইব্রেরি ছিল। এখানে হিতবাদী প্রকাশিত একখানা রবীন্দ্র গ্রন্থাবলী ছিল। পড়ার অবসরে সেই পুস্তকখানা আমি পড়িয়া শেষ করিলাম। তারপর মোহিতচন্দ্র সম্পাদিত রবীন্দ্র গ্রন্থাবলী পড়িলাম। সব বুঝিতে পারিতাম না। কিন্তু ভালো লাগিত। ধীরেনের দাদারা ভালো কবিতা আবৃত্তি করিতে পারিতেন, বিশেষ করিয়া ধীরেনের বড় দাদা শ্রীইন্দ্রমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি মাঝে মাঝে রবীন্দ্রনাথের বই হইতে আবৃত্তি করিতেন। পুরাতন ভৃত্য, বন্ধু, সোনার তরী, দুই বিঘা জমি প্রভৃতি কবিতাগুলি তিনি অতি সুন্দরভাবে আবৃত্তি করিতেন। মাঝে মাঝে থিয়েটারের বই হইতে অংশবিশেষ য্যাক্ট করিয়া শুনাইতেন। সেই পড়ার কোনো তুলনা মেলে না। মাঝে মাঝে তিনি শেস্পিয়ারের নাটক হইতেও অংশবিশেষ পড়িয়া শুনাইতেন। তিনি খুব রাগী মানুষ ছিলেন। কাছে ভিড়িবার উপায় ছিল না। কিন্তু তিনি যখন কবিতা বা নাটকের অংশবিশেষ আবৃত্তি করিতেন তখন তিনি আমার অন্তরের অন্তরঙ্গ হইয়া পড়িতেন।

বাড়ি যাইয়া পদ্মার তীরে দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া তাঁহার সেই আবৃত্তির অংশগুলি অনুকরণ করিতাম। সঙ্গে বই থাকিত না। ইচ্ছামতো বানাইয়া বানাইয়া ইন্দ্রদাদার মতো আবৃত্তি করিতে চেষ্টা করিতাম। ইহাতে আমার বাংলা উচ্চারণের সমস্ত জড়তা কাটিয়া গেল।

আমাদের পড়াশুনা শেষ হইলে ধীরেনের খুড়াতো ভাই রাসমোহন দাদা নভেল পড়িয়া শুনাইতেন। মন্ত্রশক্তি, দিদি, শরৎচন্দ্রের ‘দত্তা’ প্রভৃতি বহু বই আমরা এইভাবে রাত জাগিয়া উপভোগ করিয়াছিলাম।

ধীরেনের বাবা খুব অল্প খরচে সংসার চালাইবার পক্ষপাতী ছিলেন। তিনি প্রতি সপ্তাহের খরচের জন্য একটি নির্দিষ্ট অর্থ ধীরেনের মায়ের হাতে দিতেন। মা আবার সেখান হইতে কিছু বাঁচাইয়া জমা করিতেন। প্রতি সপ্তাহে কতটা কেরোসিন তৈল ব্যবহার হইবে তাহা তিনি পরিমাণ করিয়া লইতেন।

ধীরেন আর তাহার দাদারা উপরতলায় থাকিত। রাসমোহন দাদা নিচের তলায় থাকিতেন। আমরা যখন অনেক রাত্রে নভেল পড়িতাম মা পা টিপিয়া টিপিয়া আসিয়া আমাদিগকে নভেল পড়িতে দেখিয়া আমাদের হারিকেন বাতিটি নিবাইয়া দিয়া যাইতেন, তখন হয়তো নভেলের নায়িকা এমন একটি অবস্থার মধ্যে আসিয়া পড়িয়াছে, তারপর কি হইবে জানিবার জন্য আমরা নিশ্বাস পর্যন্ত বন্ধ করিয়া আছি। মা বাতি নিবাইয়া দিলে তাঁকে দেখাইয়া দেখাইয়া আমরা শুইয়া পড়িয়া কৃত্রিম নাক ডাকাইতাম। তিনি অনেকক্ষণ আড়ালে থাকিয়া তাহা নিরীক্ষণ করিয়া উপরে চলিয়া যাইতেন। তখন আমরা ধীরে ধীরে দেয়াশলাই জ্বালাইয়া হারিকেন ধরাইতাম। তারপর রাসমোহন দাদা আবার পড়া আরম্ভ করিতেন। এইভাবে কোনো কোনো সময় আমরা সারারাত জাগিয়া নভেল পড়িতাম।

চলবে…

জনপ্রিয় সংবাদ

বড় ক্লাসের ভিড়ে হারিয়ে যাচ্ছে শিক্ষার্থী, বদলাতে হবে শিক্ষার পদ্ধতি

পল্লী কবি জসীমউদ্দীনের স্মৃতিকথা (পর্ব-১৩০)

১১:০০:৫০ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২১ ফেব্রুয়ারী ২০২৫

ধীরেনদের বাসায়

ধীরেনদের বাড়িতে বাংলা বই-এর খুব ভালো একটি লাইব্রেরি ছিল। এখানে হিতবাদী প্রকাশিত একখানা রবীন্দ্র গ্রন্থাবলী ছিল। পড়ার অবসরে সেই পুস্তকখানা আমি পড়িয়া শেষ করিলাম। তারপর মোহিতচন্দ্র সম্পাদিত রবীন্দ্র গ্রন্থাবলী পড়িলাম। সব বুঝিতে পারিতাম না। কিন্তু ভালো লাগিত। ধীরেনের দাদারা ভালো কবিতা আবৃত্তি করিতে পারিতেন, বিশেষ করিয়া ধীরেনের বড় দাদা শ্রীইন্দ্রমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি মাঝে মাঝে রবীন্দ্রনাথের বই হইতে আবৃত্তি করিতেন। পুরাতন ভৃত্য, বন্ধু, সোনার তরী, দুই বিঘা জমি প্রভৃতি কবিতাগুলি তিনি অতি সুন্দরভাবে আবৃত্তি করিতেন। মাঝে মাঝে থিয়েটারের বই হইতে অংশবিশেষ য্যাক্ট করিয়া শুনাইতেন। সেই পড়ার কোনো তুলনা মেলে না। মাঝে মাঝে তিনি শেস্পিয়ারের নাটক হইতেও অংশবিশেষ পড়িয়া শুনাইতেন। তিনি খুব রাগী মানুষ ছিলেন। কাছে ভিড়িবার উপায় ছিল না। কিন্তু তিনি যখন কবিতা বা নাটকের অংশবিশেষ আবৃত্তি করিতেন তখন তিনি আমার অন্তরের অন্তরঙ্গ হইয়া পড়িতেন।

বাড়ি যাইয়া পদ্মার তীরে দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া তাঁহার সেই আবৃত্তির অংশগুলি অনুকরণ করিতাম। সঙ্গে বই থাকিত না। ইচ্ছামতো বানাইয়া বানাইয়া ইন্দ্রদাদার মতো আবৃত্তি করিতে চেষ্টা করিতাম। ইহাতে আমার বাংলা উচ্চারণের সমস্ত জড়তা কাটিয়া গেল।

আমাদের পড়াশুনা শেষ হইলে ধীরেনের খুড়াতো ভাই রাসমোহন দাদা নভেল পড়িয়া শুনাইতেন। মন্ত্রশক্তি, দিদি, শরৎচন্দ্রের ‘দত্তা’ প্রভৃতি বহু বই আমরা এইভাবে রাত জাগিয়া উপভোগ করিয়াছিলাম।

ধীরেনের বাবা খুব অল্প খরচে সংসার চালাইবার পক্ষপাতী ছিলেন। তিনি প্রতি সপ্তাহের খরচের জন্য একটি নির্দিষ্ট অর্থ ধীরেনের মায়ের হাতে দিতেন। মা আবার সেখান হইতে কিছু বাঁচাইয়া জমা করিতেন। প্রতি সপ্তাহে কতটা কেরোসিন তৈল ব্যবহার হইবে তাহা তিনি পরিমাণ করিয়া লইতেন।

ধীরেন আর তাহার দাদারা উপরতলায় থাকিত। রাসমোহন দাদা নিচের তলায় থাকিতেন। আমরা যখন অনেক রাত্রে নভেল পড়িতাম মা পা টিপিয়া টিপিয়া আসিয়া আমাদিগকে নভেল পড়িতে দেখিয়া আমাদের হারিকেন বাতিটি নিবাইয়া দিয়া যাইতেন, তখন হয়তো নভেলের নায়িকা এমন একটি অবস্থার মধ্যে আসিয়া পড়িয়াছে, তারপর কি হইবে জানিবার জন্য আমরা নিশ্বাস পর্যন্ত বন্ধ করিয়া আছি। মা বাতি নিবাইয়া দিলে তাঁকে দেখাইয়া দেখাইয়া আমরা শুইয়া পড়িয়া কৃত্রিম নাক ডাকাইতাম। তিনি অনেকক্ষণ আড়ালে থাকিয়া তাহা নিরীক্ষণ করিয়া উপরে চলিয়া যাইতেন। তখন আমরা ধীরে ধীরে দেয়াশলাই জ্বালাইয়া হারিকেন ধরাইতাম। তারপর রাসমোহন দাদা আবার পড়া আরম্ভ করিতেন। এইভাবে কোনো কোনো সময় আমরা সারারাত জাগিয়া নভেল পড়িতাম।

চলবে…