পাকিস্তান ও রাশিয়ার সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে ধীরে ধীরে নতুন মাত্রা পাচ্ছে। সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ বন্ধে পাকিস্তানের মধ্যস্থতামূলক ভূমিকা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিলেও, একই সময়ে রাশিয়ার সঙ্গে ইসলামাবাদের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা তুলনামূলকভাবে কম মনোযোগ পেয়েছে। অথচ অর্থনীতি, জ্বালানি, আঞ্চলিক যোগাযোগ ও আফগানিস্তান পরিস্থিতির কারণে দুই দেশের সম্পর্ক পাকিস্তানের জন্য ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায়
পাকিস্তান-রাশিয়া সম্পর্কের সাম্প্রতিক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল ২০২৪ সালের অক্টোবরে রুশ প্রধানমন্ত্রী মিখাইল মিশুস্তিনের ইসলামাবাদ সফর। সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার সরকারপ্রধানদের বৈঠকে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনাও করেন। আলোচনায় অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
তবে আফগানিস্তানের তালেবান সরকারকে রাশিয়ার স্বীকৃতি পাকিস্তানের জন্য কিছুটা বিস্ময়ের কারণ হয়েছে। তালেবান সরকারকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম এবং এখন পর্যন্ত একমাত্র দেশ রাশিয়া। পাকিস্তানসহ অধিকাংশ দেশ এখনো সেই স্বীকৃতি দেয়নি।
এর পেছনে পাকিস্তানের নিরাপত্তা উদ্বেগও রয়েছে। আফগানিস্তানের মাটিতে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের ঘাঁটি ও কার্যক্রম নিয়ে ইসলামাবাদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে। পাকিস্তানের দৃষ্টিতে আফগান তালেবানের এই অবস্থান দুই দেশের সম্পর্ককে জটিল করে তুলেছে।
ইমরান খানের রাশিয়া সফর

রাশিয়ার সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মস্কো সফরের কথাও সামনে আসে। ইউক্রেনে রুশ সামরিক অভিযান শুরুর ঠিক আগে তাঁর এই সফর পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছিল।
ইমরান খান তখন বারবার বলেছিলেন, পাকিস্তানের ভয়াবহ জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় রাশিয়া থেকে সস্তায় তেল ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস সংগ্রহের লক্ষ্যেই তিনি মস্কো সফর করেছিলেন। তবে পশ্চিমা দেশগুলোর অনেকেই সফরটিকে বৃহত্তর কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখেছিল।
পরে অনাস্থা ভোটে ইমরান খান ক্ষমতাচ্যুত হলে তিনি অভিযোগ করেন, রাশিয়া সফরের কারণেই যুক্তরাষ্ট্র তাঁর সরকারকে সরিয়ে দিতে ভূমিকা রেখেছিল। সেই অভিযোগ অবশ্য ওয়াশিংটন প্রত্যাখ্যান করেছিল।
পাকিস্তানের জন্য রাশিয়ার জ্বালানি কেন গুরুত্বপূর্ণ
রাশিয়ার বিপুল তেল ও গ্যাসের মজুত পাকিস্তানের জন্য সবচেয়ে বড় আকর্ষণ। রাশিয়া যদি তুলনামূলক কম দামে পাকিস্তানে বড় পরিমাণে তেল ও গ্যাস সরবরাহ করতে পারে, তাহলে দেশটির দীর্ঘদিনের জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
একই সঙ্গে এতে পাকিস্তানের তেল আমদানির ব্যয়ও কমতে পারে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের ওপর পাকিস্তানের জ্বালানি নির্ভরতা অনেক বেশি। রাশিয়া থেকে তেল ও গ্যাস আমদানি বাড়াতে পারলে সেই নির্ভরতা কিছুটা কমিয়ে জ্বালানি সরবরাহের উৎসে বৈচিত্র্য আনা সম্ভব হবে।
রাশিয়ার জন্যও এই সহযোগিতা কেবল অর্থনৈতিক বিষয় নয়। পাকিস্তানের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ রাশিয়া থেকে পূরণ হলে ইসলামাবাদ ও মস্কোর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি পারস্পরিক নির্ভরতা তৈরি হতে পারে। এর ফলে দক্ষিণ এশিয়ায় রাশিয়ার কূটনৈতিক প্রভাবও বাড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বড় বাধা
তবে রাশিয়ার সঙ্গে বড় ধরনের জ্বালানি সহযোগিতার পথে পাকিস্তানের জন্য অন্যতম বড় বাধা হলো যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর সম্ভাব্য বিরোধিতা।
রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর সম্প্রসারণকে নিজের নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে দেখে আসছে। ইউক্রেন সংকটের ক্ষেত্রেও মস্কো ন্যাটোর পূর্বমুখী সম্প্রসারণকে তার নিরাপত্তা উদ্বেগের অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরেছে।
এই পরিস্থিতিতে পাকিস্তান যদি রাশিয়ার সঙ্গে ব্যাপক জ্বালানি ও অর্থনৈতিক সহযোগিতায় যায়, তাহলে ওয়াশিংটনের সঙ্গে ইসলামাবাদের সম্পর্কের ওপরও তার প্রভাব পড়তে পারে। পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুর্বলতার কারণে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করার ঝুঁকি ইসলামাবাদ সহজে নিতে পারছে না।
তেল ও তরল গ্যাস নিয়ে আলোচনা

রাশিয়ার জ্বালানি সহযোগিতা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে ইতোমধ্যে আলোচনা হয়েছে। রুশ জ্বালানিমন্ত্রী নিকোলাই শুলগিনভের পাকিস্তান সফরের সময় দেশ দুটি পাকিস্তানে অপরিশোধিত তেল সরবরাহের বিষয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছানোর কথা জানায়।
তবে কম দামে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহের ক্ষেত্রে রাশিয়া তখন তাৎক্ষণিকভাবে সক্ষম নয় বলে পাকিস্তানকে জানায়। এর পরিবর্তে রুশ জ্বালানি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সরাসরি আলোচনার পরামর্শ দেওয়া হয়।
দুই দেশ অবশ্য জ্বালানি সহযোগিতার বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হওয়ার কথা জানিয়েছে। কিন্তু নীতিগত সম্মতি আর বাস্তব চুক্তির মধ্যে বড় ব্যবধান রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সম্ভাব্য বিরোধিতা, পাশাপাশি পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ নীতিনির্ধারণী অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে এই সহযোগিতা কতটা এগোবে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতার সম্ভাবনা
অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি পাকিস্তান ও রাশিয়ার মধ্যে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতা বাড়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। তবে এই ক্ষেত্রটি অত্যন্ত সংবেদনশীল।
রাশিয়ার সঙ্গে পাকিস্তানের সামরিক সহযোগিতা বাড়লে যুক্তরাষ্ট্র, ভারতসহ বিভিন্ন দেশের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্যের বিষয়টি সামনে আসবে।
তবে পাকিস্তানের দৃষ্টিকোণ থেকে পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক অনিশ্চিত হয়ে পড়লে রাশিয়ার মতো একটি বড় শক্তির সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সম্পর্ক কিছুটা কৌশলগত বিকল্প তৈরি করতে পারে।
আফগানিস্তান দুই দেশের অভিন্ন উদ্বেগ
আফগানিস্তান পাকিস্তান ও রাশিয়ার সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। ২০২১ সালে তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি দুই দেশের জন্যই উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
রাশিয়া তালেবান সরকারকে স্বীকৃতি দিলেও আফগানিস্তান থেকে কোনো সন্ত্রাসী বা রুশবিরোধী গোষ্ঠী কার্যক্রম চালাবে না—এমন নিশ্চয়তা বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
অন্যদিকে পাকিস্তান ইতোমধ্যে আফগান ভূখণ্ড থেকে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তানের কার্যক্রম নিয়ে গুরুতর নিরাপত্তা সমস্যার মুখোমুখি। ফলে তালেবানকে ঘিরে ইসলামাবাদ ও মস্কোর অবস্থানের মধ্যে পার্থক্য থাকলেও আফগানিস্তানের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দুই দেশের স্বার্থ অনেকটাই অভিন্ন।

ভৌগোলিক অবস্থানেও পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ
পাকিস্তানের ভূ-অর্থনৈতিক আকাঙ্ক্ষার কারণেও রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। রাশিয়ার রয়েছে বিপুল জ্বালানি সম্পদ। অন্যদিকে পাকিস্তান দক্ষিণ এশিয়া, মধ্য এশিয়া ও সম্ভাব্যভাবে ইউরোপমুখী বাণিজ্যপথের সংযোগস্থলে গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানে রয়েছে।
ফলে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নত হলে জ্বালানি ছাড়াও পরিবহন, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং আঞ্চলিক যোগাযোগে নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে ইসলামাবাদকে একই সঙ্গে রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, সৌদি আরব, তুরস্কসহ গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারদের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে। কোনো একটি দেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা যেন অন্য কোনো শক্তির সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় সংঘাত তৈরি না করে, সেটিই পাকিস্তানের জন্য বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
শত্রুতা থেকে বাস্তব সহযোগিতার পথে
পাকিস্তান ও রাশিয়ার সম্পর্কের ইতিহাস সহজ নয়। অতীতে দুই দেশ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক ইস্যুতে একে অপরের বিপরীত অবস্থানে ছিল। কিন্তু পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় সেই পুরোনো অবিশ্বাস ধীরে ধীরে কিছুটা কমছে।
দুই দেশের স্বার্থ সব বিষয়ে এক হবে—এমন প্রত্যাশাও বাস্তবসম্মত নয়। বরং জ্বালানি, বাণিজ্য, আঞ্চলিক যোগাযোগ ও আফগানিস্তানের মতো অভিন্ন স্বার্থের জায়গাগুলো চিহ্নিত করে বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা গড়ে তোলাই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর পথ।
পাকিস্তানের জন্য রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক সম্পর্ক জ্বালানি ও বিনিয়োগের উৎস বহুমুখী করতে পারে এবং তার কৌশলগত স্বাধীনতা বাড়াতে পারে। অন্যদিকে রাশিয়ার জন্য পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়ায় প্রবেশাধিকার এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক উপস্থিতি আরও শক্তিশালী করার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, দুই দেশ রাজনৈতিক সদিচ্ছাকে কতটা বাস্তব প্রকল্পে রূপ দিতে পারে। শুধু বৈঠক, ঘোষণা ও নীতিগত সমঝোতা যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক যোগাযোগ প্রকল্প।
পাকিস্তান ও রাশিয়া যদি সংবেদনশীল নিরাপত্তা ও কৌশলগত বিষয়ে প্রয়োজনীয় সতর্কতা বজায় রেখে অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে এগিয়ে নিতে পারে, তাহলে তাদের সম্পর্ক দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার শান্তি, যোগাযোগ এবং অর্থনৈতিক একীভূতকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সার্বিকভাবে, পাকিস্তান-রাশিয়া সম্পর্ক বর্তমানে যতটা গুরুত্ব পাচ্ছে, বাস্তব সম্ভাবনা তার চেয়েও অনেক বেশি। পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ইসলামাবাদ ও মস্কোকে তাদের পুরোনো সম্পর্ক নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করার সুযোগ দিয়েছে। এখন নির্ভর করছে দুই দেশ সেই সুযোগকে কতটা বাস্তব ও দীর্ঘস্থায়ী সহযোগিতায় রূপ দিতে পারে তার ওপর।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















