পাকিস্তানে বায়ুদূষণ এখন আর কেবল শীতকালীন কুয়াশা বা ধোঁয়াশার সমস্যা নয়। এটি সারা বছরজুড়ে জনস্বাস্থ্যের ওপর চাপ তৈরি করছে, মানুষের কর্মক্ষমতা কমাচ্ছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং সরকারি অর্থব্যবস্থা থেকে শুরু করে শিল্প ও আর্থিক খাতের জন্যও বড় ঝুঁকি হয়ে উঠছে। তাই পরিচ্ছন্ন বাতাস নিশ্চিত করা এখন পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
৭ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক পরিচ্ছন্ন বায়ু দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, পাকিস্তানকে এখন নীতিমালা প্রণয়নের পর্যায় পেরিয়ে সেগুলো বাস্তবায়নের দিকে যেতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য তথ্য, নির্দিষ্ট দায়িত্ব, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং দূষণ কমানোর পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য।
নীতিমালা আছে, বাস্তবায়নই বড় চ্যালেঞ্জ
পাকিস্তান ২০২৩ সালে জাতীয় পরিচ্ছন্ন বায়ু নীতি গ্রহণ করে। একই বছর পাঞ্জাবেও পরিচ্ছন্ন বায়ু নীতি ও ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন পরিকল্পনা অনুমোদিত হয়। কিন্তু শুধু নীতিমালা থাকলেই দূষণ কমবে না। এসব নীতিকে কার্যকর করতে হলে আইনগত দায়িত্ব নির্ধারণ, নির্ভরযোগ্য বায়ুমান তথ্য সংগ্রহ, খাতভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা এবং নিয়মিত অগ্রগতি প্রকাশ নিশ্চিত করতে হবে।
এ ক্ষেত্রে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিল্পে ঋণ দেওয়ার সময় কোনো প্রতিষ্ঠানের বায়ুদূষণ, পরিবেশগত নিয়ম না মানা, পুরোনো প্রযুক্তি কিংবা ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের ঝুঁকি বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে দূষণ কমানোর প্রমাণযোগ্য উদ্যোগ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার ব্যবস্থাও করা সম্ভব।
দূষণের অর্থনৈতিক ক্ষতি বিপুল
বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনের হিসাবে, বায়ুদূষণের কারণে পাকিস্তানের অর্থনীতিতে প্রতিবছর মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৬ দশমিক ৫ শতাংশ সমপরিমাণ ক্ষতি হতে পারে। পাঞ্জাবে সূক্ষ্ম কণাদূষণের বার্ষিক গড় মাত্রা প্রতি ঘনমিটারে প্রায় ৫২ মাইক্রোগ্রাম, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত বার্ষিক নির্দেশিকার তুলনায় ১০ গুণেরও বেশি। মধ্য লাহোরে এই মাত্রা কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১১০ থেকে ১৩০ মাইক্রোগ্রাম পর্যন্ত পৌঁছেছে।
২০১৯ সালের হিসাব অনুযায়ী, ঘরের ভেতর ও বাইরের সূক্ষ্ম কণাদূষণের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক অকালমৃত্যু ও অসুস্থতার সম্পর্ক রয়েছে। এর স্বাস্থ্যগত অর্থনৈতিক ব্যয় পাকিস্তানের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রায় ৯ শতাংশের সমপরিমাণ বলে অনুমান করা হয়েছে।
এই দুটি হিসাব একই ধরনের অর্থনৈতিক ক্ষতি বোঝায় না, তাই এগুলো যোগ করা যাবে না। তবে দুটিই স্পষ্ট করে যে বায়ুদূষণের ক্ষতি শুধু মানুষের স্বাস্থ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পুরো অর্থনীতিতে ছড়িয়ে পড়ছে।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে কারা
দূষণের প্রভাব সবার ওপর সমান নয়। রান্নার কাজে কঠিন জ্বালানি ব্যবহারের কারণে ঘরোয়া উৎস পাঞ্জাবের সূক্ষ্ম কণাদূষণের বড় একটি অংশের জন্য দায়ী। বিশেষ করে লাহোর মহানগর এলাকায় এর অবদান আরও বেশি।
রান্নার কাজে বেশি সময় ব্যয় করার কারণে নারী ও কিশোরীরা ঘরের ধোঁয়ার সরাসরি সংস্পর্শে তুলনামূলক বেশি আসতে পারেন। একই দূষিত বাতাসে থাকে শিশু ও নবজাতকরাও।
বয়স্ক মানুষ, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, খোলা জায়গায় কাজ করা শ্রমিক, নিম্নআয়ের পরিবার এবং সড়ক, ইটভাটা, শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোর কাছাকাছি বসবাসকারী মানুষও তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। ফলে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি নিশ্চিত করা একই সঙ্গে বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ, জনস্বাস্থ্য, নারী-পুরুষের সমতা এবং সাধারণ মানুষের সামর্থ্যের বিষয়।
দূষণের উৎস বুঝে ব্যবস্থা নিতে হবে
বায়ুদূষণ কমানোর প্রথম শর্ত হলো কোথা থেকে দূষণ ছড়াচ্ছে, তা নির্ভুলভাবে জানা। পাকিস্তানে বায়ুদূষণকারী উপাদানের জাতীয় হিসাব তৈরি হলেও সারা দেশে একই মানদণ্ডে সংগৃহীত, মাননিয়ন্ত্রিত পরিবেশগত সূক্ষ্ম কণার তথ্যভান্ডার এখনও প্রয়োজন।
পরিবহন, শিল্প, গৃহস্থালি, কৃষি, বর্জ্য, ধুলা কিংবা সীমান্তের ওপার থেকে আসা দূষণ—কোন উৎস কতটা ভূমিকা রাখছে, তা জানতে তুলনামূলক ও নির্ভরযোগ্য গবেষণা জরুরি। এই তথ্য ছাড়া কোন খাতে কত অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে কিংবা কোনো পদক্ষেপ আসলে কতটা কার্যকর হয়েছে, তা নির্ধারণ করা কঠিন।
পাকিস্তানের জাতীয় পরিচ্ছন্ন বায়ু নীতিতে ২০৩০ সালের মধ্যে সূক্ষ্ম কণার নির্গমন ৩৮ শতাংশ এবং ২০৪০ সালের মধ্যে ৮১ শতাংশ কমানোর লক্ষ্য রয়েছে। তবে এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে নিয়মিত তথ্য হালনাগাদ, খাতভিত্তিক মাইলফলক, দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান, অর্থায়ন এবং জনসমক্ষে অগ্রগতি প্রকাশ প্রয়োজন।
দূষণ কোনো সীমানা মানে না
একটি শহর বা প্রদেশের দূষণ অন্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। পাঞ্জাবের ক্ষেত্রে ২০২১ সালের একটি হিসাব বলছে, প্রদেশটির সূক্ষ্ম কণাদূষণের ৫৩ শতাংশ স্থানীয় উৎস থেকে এলেও ৯ শতাংশ এসেছে পাকিস্তানের অন্য প্রদেশ থেকে এবং ১৩ শতাংশ এসেছে অন্য দেশ থেকে।
তাই শুধু স্থানীয়ভাবে ব্যবস্থা নিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রাদেশিক পদক্ষেপের পাশাপাশি আন্তঃপ্রাদেশিক ও আঞ্চলিক সহযোগিতাও প্রয়োজন।
কালো কার্বন, মিথেন ও ওজোন তৈরির উপাদানের মতো স্বল্পস্থায়ী জলবায়ু দূষণকারী উপাদান নিয়ন্ত্রণেও আরও স্পষ্ট দায়িত্ব ও নিয়মিত নজরদারি দরকার।
অর্থায়নকে যুক্ত করতে হবে দূষণ কমানোর সঙ্গে
পরিচ্ছন্ন বাতাস নিশ্চিত করতে শুধু সরকারি অর্থের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। ব্যাংক, বিনিয়োগকারী এবং উন্নয়ন অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলো শিল্পের প্রযুক্তি নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তাই ঋণ, নিশ্চয়তা, সহজ শর্তের অর্থায়ন এবং শিল্পের পরিবর্তনকালীন অর্থায়নে পরিচ্ছন্ন বায়ুর মানদণ্ড যুক্ত করা যেতে পারে। কোনো প্রকল্পে বিনিয়োগের আগে তার দূষণঝুঁকি মূল্যায়ন এবং দূষণ কমানোর পরিমাপযোগ্য ফলাফল যাচাই করা হলে অর্থায়ন সরাসরি পরিবেশগত উন্নতির সঙ্গে যুক্ত হবে।
সামনে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ
পাকিস্তানের জন্য প্রথম প্রয়োজন জাতীয় পরিচ্ছন্ন বায়ু নীতির সময়সীমাবদ্ধ বাস্তবায়ন পরিকল্পনা। প্রতি বছর কী অর্জন করতে হবে, কোন প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব নেবে এবং কত অর্থ প্রয়োজন—সবকিছু স্পষ্ট করতে হবে।
এর পাশাপাশি প্রাদেশিক কর্তৃপক্ষের ক্ষমতা অক্ষুণ্ন রেখে একটি কার্যকর জাতীয় সমন্বয়ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার। সারা দেশে একই মানদণ্ডে বায়ুর মান পরিমাপ, দূষণের উৎস নির্ধারণ এবং নিয়মিত তথ্য প্রকাশের ব্যবস্থাও জরুরি।
ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঝুঁকি মূল্যায়নে বায়ুদূষণকে যুক্ত করার পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন প্রযুক্তিতে বিনিয়োগে উৎসাহ দিতে হবে। একই সঙ্গে পরিবহন, শিল্প, কৃষি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও ইটভাটার মতো উচ্চদূষণকারী খাতে বিনিয়োগযোগ্য প্রকল্পের তালিকা তৈরি করা প্রয়োজন।
এই পরিবর্তনের সময় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, শ্রমিক, কৃষক এবং নিম্নআয়ের পরিবার যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।
পরিচ্ছন্ন বাতাসই হতে পারে অর্থনৈতিক বিনিয়োগ
পাকিস্তানের সামনে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পরিচ্ছন্ন বাতাসের মধ্যে কোনো একটি বেছে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। বরং দূষিত বাতাসই অর্থনীতির ওপর বড় বোঝা তৈরি করছে। বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয়, কমছে শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা, ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষাজীবন, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে কৃষি এবং বাড়ছে শিল্প ও ব্যবসার পরিচালনাগত ঝুঁকি।
তাই প্রশ্ন এখন পরিচ্ছন্ন বাতাসের জন্য অর্থ ব্যয় করা হবে কি না—তা নয়। বরং দূষণের ক্ষতি হওয়ার পর তার মূল্য দেওয়া হবে, নাকি আগেই প্রতিরোধ ও প্রযুক্তিগত পরিবর্তনে বিনিয়োগ করা হবে, সেটিই মূল সিদ্ধান্ত।
পরিচ্ছন্ন বাতাস নিশ্চিত করতে বিজ্ঞানকে সমস্যার সঠিক চিত্র তুলে ধরতে হবে, সরকারকে দায়িত্ব নির্ধারণ করতে হবে, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিবর্তনের অর্থ জোগাতে হবে এবং জনগণকে সেই পরিবর্তনের ফলাফল যাচাইয়ের সুযোগ দিতে হবে। বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ সম্ভব—তবে এর জন্য পরিচ্ছন্ন বাতাসকে জাতীয় অগ্রাধিকার এবং পরিমাপযোগ্য সরকারি দায়িত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
পরিচ্ছন্ন বাতাসে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ—বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ, অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্যের সম্পর্ক নিয়ে বিশ্লেষণ।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















