০১:০৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
জলবায়ু ঝুঁকির প্রমাণ আছে, এবার নেপালের দরকার কার্যকর পদক্ষেপ জার্মানির স্যাক্সনি-আনহাল্টে উগ্র ডানপন্থীদের বড় জয়, চাপে মূলধারার রাজনীতি নেপালের ‘জেন জি’ আন্দোলনের এক বছর, দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতাও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারে না: কার্কি ‘ক্লিন ব্রেক’ থেকে অন্তহীন যুদ্ধ: প্রতিরোধমূলক যুদ্ধ কীভাবে বদলে দিচ্ছে নিরাপত্তা নীতি চার প্রদেশ নিয়েই অখণ্ড থাকবে পাকিস্তান, নতুন প্রদেশের প্রস্তাব নাকচ সিন্ধুর মুখ্যমন্ত্রীর নিউইয়র্কে বসছে ভোগ বিজনেসের বৈশ্বিক সম্মেলন, টিকিট বিক্রি শুরু ‘ক্লিন গার্ল’ যুগের বিদায়, বসন্ত-গ্রীষ্ম ২০২৭-এ আসছে নতুন ফ্যাশন ধারা দামি গয়না খোঁজার নতুন ঠিকানা কি টিকটক? বদলে যাওয়া শরীরের জন্য বিলাসবহুল ফ্যাশন, নতুন বাজার তৈরি করছে ওয়েলডান আমেরিকা কতটা সমাজতন্ত্র গ্রহণ করতে প্রস্তুত?

বোর্দোর আঙুরখেতে দাবানলের ছায়া: জলবায়ু সংকট, বাজারের মন্দা আর শুল্কের চাপে অস্তিত্বের লড়াই

ফ্রান্সের বিশ্ববিখ্যাত বোর্দো অঞ্চলের আঙুরখেতগুলো যেন একের পর এক দুর্যোগের মুখোমুখি হচ্ছে। বহু শতাব্দীর ঐতিহ্য বহন করে চলা এই অঞ্চল এখন দাবানল, খরা, তীব্র তাপপ্রবাহ, অর্থনৈতিক মন্দা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতির চাপ—সবকিছুর সঙ্গে একযোগে লড়াই করছে। সাম্প্রতিক ভয়াবহ বনাগ্নি সেই সংকটকে আরও গভীর করে তুলেছে। আগুন এখনও অনেক আঙুরখেতে পৌঁছায়নি, কিন্তু তার ধোঁয়া, অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যতের আশঙ্কা ইতোমধ্যেই পুরো অঞ্চলের মদ উৎপাদন শিল্পকে নাড়া দিয়ে দিয়েছে।

বোর্দোর পশ্চিমাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া এই দাবানল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্সের অন্যতম ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আগুনের কারণে দুই লক্ষ বিশ হাজারেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বহু গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, শত শত বাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আগুনের লেলিহান শিখা বোর্দোর ঐতিহাসিক শাতো স্মিথ ও লাফিত-এর আঙুরখেতের মাত্র ষোলো কিলোমিটার দূর পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। শতাব্দীপ্রাচীন এই এস্টেটের মালিক ও কর্মীদের কাছে এটি ছিল এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা।

Mr. Fradin standing outdoors wearing an open-collared shirt, with sunglasses on the front. His hands are raised and open.

এই শাতোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক লুডোভিক ফ্রাদাঁ বলেন, মদ উৎপাদন শিল্পের ওপর যেন একের পর এক নতুন বিপদ এসে পড়ছে। কখনও খরা, কখনও অস্বাভাবিক গরম, কখনও বিক্রি কমে যাওয়া, আবার কখনও আন্তর্জাতিক শুল্কনীতি। তার ওপর এবার যোগ হয়েছে ভয়াবহ দাবানল। তিনি বলেন, প্রতিটি নতুন সংকট তাদের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলছে। তাই এখন এমন পরিস্থিতির জন্যও প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে, যা কয়েক বছর আগেও অকল্পনীয় ছিল—যদি আগুন একদিন তাদের স্থাপনায় পৌঁছে যায়।

এই আশঙ্কা থেকেই শাতো কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে জরুরি পরিকল্পনা তৈরি করেছে। সেখানে থাকা ঘোড়া, ছাগল, মুরগি এবং লামাসহ সব প্রাণীকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ফ্রাদাঁর ভাষায়, আঙুরলতা মূল্যবান হলেও জীবন্ত প্রাণীর জীবন রক্ষা করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

তবে আগুনের চেয়ে আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো ধোঁয়া। আগুনের ধোঁয়া যদি দীর্ঘ সময় ধরে আঙুরের ওপর ভেসে থাকে, তাহলে ফলের স্বাদ ও গুণগত মান বদলে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আঙুর যখন সবুজ থেকে লাল হতে শুরু করে এবং ফসল কাটার আগ পর্যন্ত সময়টি সবচেয়ে সংবেদনশীল। ঠিক সেই সময়েই বোর্দোর বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছে।

ফ্রাদাঁ অবশ্য কিছুটা আশাবাদী। তার মতে, বোর্দোর সমতল ভূমি এবং পরিবর্তনশীল বাতাসের কারণে ধোঁয়া খুব বেশি সময় এক জায়গায় থাকে না। ফলে ক্যালিফোর্নিয়ার নাপা উপত্যকার মতো পরিস্থিতি এখানে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম। নাপা উপত্যকার দুই পাশের পাহাড় ধোঁয়াকে আটকে রাখে, ফলে আঙুর দীর্ঘ সময় ধোঁয়ার সংস্পর্শে থাকে এবং স্বাদে প্রভাব পড়ে। বোর্দোতে এখনও পর্যন্ত কোনো আঙুরখেত আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। কিন্তু বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, এ বছরের ফলনে ধোঁয়ার প্রভাব পড়বে কি না, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

Wildfires threaten Bordeaux vineyards and France's economy | AP News

এরই মধ্যে প্রকৃতিও এই বছরের ফসলকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। শীতকালে অস্বাভাবিক বৃষ্টি হলেও পরে রেকর্ড পরিমাণ গরম এবং দীর্ঘদিন বৃষ্টির অভাবে আঙুর স্বাভাবিক সময়ের আগেই পেকে গেছে। ফলে এ বছর এমনিতেই ফলন কম হওয়ার আশঙ্কা ছিল। দাবানল সেই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

বোর্দোভিত্তিক মদবিশেষজ্ঞ ও লেখক জেন অ্যানসন বলেন, এই অঞ্চলের মদচাষিদের ওপর একের পর এক আঘাত নেমে আসছে। জলবায়ু পরিবর্তন, বাজারের সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতির চাপ সামাল দিতেই তারা হিমশিম খাচ্ছিলেন। এখন আবার দাবানল নতুন করে মানসিক চাপ তৈরি করেছে। তার মতে, মানুষ হিসেবে তারা আর কত লড়াই করবে—সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে উঠছে।

এই সংকটের মধ্যেও অনেক মদচাষি মানবিক দায়িত্ব পালন করছেন। কোথাও অগ্নিনির্বাপণ বাহিনীর জন্য বড় বড় পানির ট্যাংক প্রস্তুত রাখা হয়েছে, কোথাও আবার ট্র্যাক্টর ও কৃষিযন্ত্র উদ্ধারকাজে ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়েছে। নিজেদের সম্পদ রক্ষার পাশাপাশি প্রতিবেশীদের পাশে দাঁড়ানোর এই উদ্যোগ বোর্দোর মানুষের সংহতির পরিচয় বহন করছে।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জানান, এই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে আরও কয়েক সপ্তাহ লেগে যেতে পারে। উচ্চ তাপমাত্রা এবং শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এত ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ফ্রান্স আগে দেখেনি।

দাবানলের ধোঁয়া পৌঁছে গেছে ছোট আকারের মদ উৎপাদক গ্যাব্রিয়েল বারের আঙুরখেতেও। স্ত্রীকে নিয়ে তিনি বছরে প্রায় পঁচিশ হাজার বোতল মদ উৎপাদন করেন। কিন্তু এবার তিনি নিশ্চিত নন, এই ধোঁয়া তার আঙুরের স্বাদে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে। হাসতে হাসতেই তিনি বলেন, হয়তো এ বছরের মদে ধোঁয়ার স্বাদ মিশে যাবে।

Wildfires threaten Bordeaux vineyards and France's economy | AP News

তবে ধোঁয়ার চেয়েও তাকে বেশি ভাবাচ্ছে জলবায়ুর পরিবর্তন। অতিরিক্ত গরমে আঙুরে চিনির পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। ফলে বোর্দোর ঐতিহ্যবাহী ভারসাম্যপূর্ণ স্বাদ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। একসময় যে মদের পরিচয় ছিল কোমলতা ও ভারসাম্যে, এখন তা অনেক বেশি মিষ্টি ও তীব্র স্বাদের হয়ে যাচ্ছে। তার মতে, এটি বোর্দোর পরিচয়কেই বদলে দিচ্ছে।

অর্থনৈতিক বাস্তবতাও সমান কঠিন। গ্যাব্রিয়েল বারের মতে, বোর্দোর মদ এখনও অনেকের কাছে বিলাসিতা ও অভিজাত সংস্কৃতির প্রতীক। তুলনামূলক কম দামের, সাহসী স্বাদের মদ তৈরি করে যে নতুন প্রজন্মের ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা যায়, সে পথে বোর্দো খুব বেশি এগোতে পারেনি। অন্যদিকে তরুণদের মধ্যে মদ্যপানের প্রবণতাও আগের তুলনায় কমে যাচ্ছে। ফলে বাজার ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।

ঋণের বোঝা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ক্রমাগত আর্থিক ক্ষতির মুখে গ্যাব্রিয়েল বারে একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, এ বছরের ফসলই হবে তার শেষ ফসল। পারিবারিক এই ব্যবসা তিনি আর ছেলের হাতে তুলে দিতে চান না। কারণ তিনি মনে করেন, এমন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের বোঝা সন্তানের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া অন্যায় হবে।

Wildfires near Bordeaux bring more troubles to France's wine industry

প্রতিটি বোতলের গায়ে তিনি ভালোবাসার সঙ্গে লেখেন—‘ভালোবাসা দিয়ে তৈরি’। কিন্তু সেই ভালোবাসার পেশাটিই আজ তার কাছে হারিয়ে যেতে বসা এক পৃথিবীর প্রতীক। তিনি বলেন, মদ তৈরির জগতে মৌলিক পরিবর্তন ঘটে গেছে। এ বছর যেন সবকিছুই অন্য এক গ্রহের মতো মনে হচ্ছে। বন্ধুদের সঙ্গে ফোনে এসব নিয়ে কথা বলার সময়ও তারা চেষ্টা করেন, যেন সন্তানরা কিছু না শোনে। কারণ এই বাস্তবতা শিশুদের মনেও ভয় তৈরি করছে।

একসময় বোর্দোর আঙুরখেত ছিল সৌন্দর্য, ঐতিহ্য এবং স্থিতিশীলতার প্রতীক। আজ সেই একই ভূখণ্ড দাঁড়িয়ে আছে অনিশ্চয়তার সামনে। দাবানল হয়তো একদিন নিভে যাবে, কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, বাজারের রূপান্তর এবং মানুষের বদলে যাওয়া জীবনধারা যে দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি করেছে, তার সমাধান এত সহজে মিলবে না। বোর্দোর মদশিল্প এখন শুধু প্রকৃতির সঙ্গে নয়, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গেও এক কঠিন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

জলবায়ু ঝুঁকির প্রমাণ আছে, এবার নেপালের দরকার কার্যকর পদক্ষেপ

বোর্দোর আঙুরখেতে দাবানলের ছায়া: জলবায়ু সংকট, বাজারের মন্দা আর শুল্কের চাপে অস্তিত্বের লড়াই

০৩:৫১:১৮ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই ২০২৬

ফ্রান্সের বিশ্ববিখ্যাত বোর্দো অঞ্চলের আঙুরখেতগুলো যেন একের পর এক দুর্যোগের মুখোমুখি হচ্ছে। বহু শতাব্দীর ঐতিহ্য বহন করে চলা এই অঞ্চল এখন দাবানল, খরা, তীব্র তাপপ্রবাহ, অর্থনৈতিক মন্দা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতির চাপ—সবকিছুর সঙ্গে একযোগে লড়াই করছে। সাম্প্রতিক ভয়াবহ বনাগ্নি সেই সংকটকে আরও গভীর করে তুলেছে। আগুন এখনও অনেক আঙুরখেতে পৌঁছায়নি, কিন্তু তার ধোঁয়া, অনিশ্চয়তা এবং ভবিষ্যতের আশঙ্কা ইতোমধ্যেই পুরো অঞ্চলের মদ উৎপাদন শিল্পকে নাড়া দিয়ে দিয়েছে।

বোর্দোর পশ্চিমাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া এই দাবানল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফ্রান্সের অন্যতম ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। আগুনের কারণে দুই লক্ষ বিশ হাজারেরও বেশি মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। বহু গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, শত শত বাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আগুনের লেলিহান শিখা বোর্দোর ঐতিহাসিক শাতো স্মিথ ও লাফিত-এর আঙুরখেতের মাত্র ষোলো কিলোমিটার দূর পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। শতাব্দীপ্রাচীন এই এস্টেটের মালিক ও কর্মীদের কাছে এটি ছিল এক অভাবনীয় অভিজ্ঞতা।

Mr. Fradin standing outdoors wearing an open-collared shirt, with sunglasses on the front. His hands are raised and open.

এই শাতোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক লুডোভিক ফ্রাদাঁ বলেন, মদ উৎপাদন শিল্পের ওপর যেন একের পর এক নতুন বিপদ এসে পড়ছে। কখনও খরা, কখনও অস্বাভাবিক গরম, কখনও বিক্রি কমে যাওয়া, আবার কখনও আন্তর্জাতিক শুল্কনীতি। তার ওপর এবার যোগ হয়েছে ভয়াবহ দাবানল। তিনি বলেন, প্রতিটি নতুন সংকট তাদের জীবনকে আরও কঠিন করে তুলছে। তাই এখন এমন পরিস্থিতির জন্যও প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে, যা কয়েক বছর আগেও অকল্পনীয় ছিল—যদি আগুন একদিন তাদের স্থাপনায় পৌঁছে যায়।

এই আশঙ্কা থেকেই শাতো কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে জরুরি পরিকল্পনা তৈরি করেছে। সেখানে থাকা ঘোড়া, ছাগল, মুরগি এবং লামাসহ সব প্রাণীকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ফ্রাদাঁর ভাষায়, আঙুরলতা মূল্যবান হলেও জীবন্ত প্রাণীর জীবন রক্ষা করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

তবে আগুনের চেয়ে আরেকটি বড় উদ্বেগ হলো ধোঁয়া। আগুনের ধোঁয়া যদি দীর্ঘ সময় ধরে আঙুরের ওপর ভেসে থাকে, তাহলে ফলের স্বাদ ও গুণগত মান বদলে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আঙুর যখন সবুজ থেকে লাল হতে শুরু করে এবং ফসল কাটার আগ পর্যন্ত সময়টি সবচেয়ে সংবেদনশীল। ঠিক সেই সময়েই বোর্দোর বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়েছে।

ফ্রাদাঁ অবশ্য কিছুটা আশাবাদী। তার মতে, বোর্দোর সমতল ভূমি এবং পরিবর্তনশীল বাতাসের কারণে ধোঁয়া খুব বেশি সময় এক জায়গায় থাকে না। ফলে ক্যালিফোর্নিয়ার নাপা উপত্যকার মতো পরিস্থিতি এখানে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা কম। নাপা উপত্যকার দুই পাশের পাহাড় ধোঁয়াকে আটকে রাখে, ফলে আঙুর দীর্ঘ সময় ধোঁয়ার সংস্পর্শে থাকে এবং স্বাদে প্রভাব পড়ে। বোর্দোতে এখনও পর্যন্ত কোনো আঙুরখেত আগুনে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার খবর পাওয়া যায়নি। কিন্তু বিজ্ঞানীরা সতর্ক করে বলেছেন, এ বছরের ফলনে ধোঁয়ার প্রভাব পড়বে কি না, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়।

Wildfires threaten Bordeaux vineyards and France's economy | AP News

এরই মধ্যে প্রকৃতিও এই বছরের ফসলকে কঠিন পরীক্ষার মুখে ফেলেছে। শীতকালে অস্বাভাবিক বৃষ্টি হলেও পরে রেকর্ড পরিমাণ গরম এবং দীর্ঘদিন বৃষ্টির অভাবে আঙুর স্বাভাবিক সময়ের আগেই পেকে গেছে। ফলে এ বছর এমনিতেই ফলন কম হওয়ার আশঙ্কা ছিল। দাবানল সেই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

বোর্দোভিত্তিক মদবিশেষজ্ঞ ও লেখক জেন অ্যানসন বলেন, এই অঞ্চলের মদচাষিদের ওপর একের পর এক আঘাত নেমে আসছে। জলবায়ু পরিবর্তন, বাজারের সংকট এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতির চাপ সামাল দিতেই তারা হিমশিম খাচ্ছিলেন। এখন আবার দাবানল নতুন করে মানসিক চাপ তৈরি করেছে। তার মতে, মানুষ হিসেবে তারা আর কত লড়াই করবে—সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে উঠছে।

এই সংকটের মধ্যেও অনেক মদচাষি মানবিক দায়িত্ব পালন করছেন। কোথাও অগ্নিনির্বাপণ বাহিনীর জন্য বড় বড় পানির ট্যাংক প্রস্তুত রাখা হয়েছে, কোথাও আবার ট্র্যাক্টর ও কৃষিযন্ত্র উদ্ধারকাজে ব্যবহারের জন্য দেওয়া হয়েছে। নিজেদের সম্পদ রক্ষার পাশাপাশি প্রতিবেশীদের পাশে দাঁড়ানোর এই উদ্যোগ বোর্দোর মানুষের সংহতির পরিচয় বহন করছে।

ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে জানান, এই আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে আরও কয়েক সপ্তাহ লেগে যেতে পারে। উচ্চ তাপমাত্রা এবং শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল হয়ে উঠেছে। তিনি বলেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এত ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ফ্রান্স আগে দেখেনি।

দাবানলের ধোঁয়া পৌঁছে গেছে ছোট আকারের মদ উৎপাদক গ্যাব্রিয়েল বারের আঙুরখেতেও। স্ত্রীকে নিয়ে তিনি বছরে প্রায় পঁচিশ হাজার বোতল মদ উৎপাদন করেন। কিন্তু এবার তিনি নিশ্চিত নন, এই ধোঁয়া তার আঙুরের স্বাদে কী ধরনের প্রভাব ফেলবে। হাসতে হাসতেই তিনি বলেন, হয়তো এ বছরের মদে ধোঁয়ার স্বাদ মিশে যাবে।

Wildfires threaten Bordeaux vineyards and France's economy | AP News

তবে ধোঁয়ার চেয়েও তাকে বেশি ভাবাচ্ছে জলবায়ুর পরিবর্তন। অতিরিক্ত গরমে আঙুরে চিনির পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে। ফলে বোর্দোর ঐতিহ্যবাহী ভারসাম্যপূর্ণ স্বাদ ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে। একসময় যে মদের পরিচয় ছিল কোমলতা ও ভারসাম্যে, এখন তা অনেক বেশি মিষ্টি ও তীব্র স্বাদের হয়ে যাচ্ছে। তার মতে, এটি বোর্দোর পরিচয়কেই বদলে দিচ্ছে।

অর্থনৈতিক বাস্তবতাও সমান কঠিন। গ্যাব্রিয়েল বারের মতে, বোর্দোর মদ এখনও অনেকের কাছে বিলাসিতা ও অভিজাত সংস্কৃতির প্রতীক। তুলনামূলক কম দামের, সাহসী স্বাদের মদ তৈরি করে যে নতুন প্রজন্মের ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা যায়, সে পথে বোর্দো খুব বেশি এগোতে পারেনি। অন্যদিকে তরুণদের মধ্যে মদ্যপানের প্রবণতাও আগের তুলনায় কমে যাচ্ছে। ফলে বাজার ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।

ঋণের বোঝা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ক্রমাগত আর্থিক ক্ষতির মুখে গ্যাব্রিয়েল বারে একটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, এ বছরের ফসলই হবে তার শেষ ফসল। পারিবারিক এই ব্যবসা তিনি আর ছেলের হাতে তুলে দিতে চান না। কারণ তিনি মনে করেন, এমন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের বোঝা সন্তানের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া অন্যায় হবে।

Wildfires near Bordeaux bring more troubles to France's wine industry

প্রতিটি বোতলের গায়ে তিনি ভালোবাসার সঙ্গে লেখেন—‘ভালোবাসা দিয়ে তৈরি’। কিন্তু সেই ভালোবাসার পেশাটিই আজ তার কাছে হারিয়ে যেতে বসা এক পৃথিবীর প্রতীক। তিনি বলেন, মদ তৈরির জগতে মৌলিক পরিবর্তন ঘটে গেছে। এ বছর যেন সবকিছুই অন্য এক গ্রহের মতো মনে হচ্ছে। বন্ধুদের সঙ্গে ফোনে এসব নিয়ে কথা বলার সময়ও তারা চেষ্টা করেন, যেন সন্তানরা কিছু না শোনে। কারণ এই বাস্তবতা শিশুদের মনেও ভয় তৈরি করছে।

একসময় বোর্দোর আঙুরখেত ছিল সৌন্দর্য, ঐতিহ্য এবং স্থিতিশীলতার প্রতীক। আজ সেই একই ভূখণ্ড দাঁড়িয়ে আছে অনিশ্চয়তার সামনে। দাবানল হয়তো একদিন নিভে যাবে, কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তন, বাজারের রূপান্তর এবং মানুষের বদলে যাওয়া জীবনধারা যে দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি করেছে, তার সমাধান এত সহজে মিলবে না। বোর্দোর মদশিল্প এখন শুধু প্রকৃতির সঙ্গে নয়, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গেও এক কঠিন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছে।