যুক্তরাষ্ট্রের ওপর দীর্ঘদিনের বাণিজ্যনির্ভরতা এবার নতুন বাস্তবতার মুখে পড়েছে কানাডার। ওয়াশিংটনের আরোপ করা শুল্ক এবং উত্তর আমেরিকার বাণিজ্যব্যবস্থা নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে কানাডা এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও গভীর করার পথে হাঁটছে। তবে এই নতুন যাত্রার সবচেয়ে বড় বাধা পণ্য বা শুল্ক নয়—বরং একে অন্যের বাজার সম্পর্কে দুই পক্ষের অজ্ঞতা।
৮ সেপ্টেম্বর থেকে প্রায় ২০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের মার্কিন পণ্যের ওপর সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত পাল্টা শুল্ক কার্যকর করার কথা কানাডার। এর আগে ২২ আগস্ট কানাডীয় পণ্যের ওপর একই হারে শুল্ক আরোপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। ফলে কয়েক দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারকে কানাডার ব্যবসার প্রায় নিশ্চিত আশ্রয় হিসেবে দেখার ধারণা এখন বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতা কমানোর তাগিদ
গত চার দশক ধরে কানাডার বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের বড় অংশই যুক্তরাষ্ট্রের বাজারকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক পরিস্থিতি দেখিয়ে দিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অবাধ প্রবেশাধিকার আর আগের মতো নিশ্চিত নয়।
২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে কানাডার পণ্য ও সেবা রপ্তানির প্রায় ৬৫ শতাংশের গন্তব্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৪ সালে এই হার ছিল প্রায় ৭৫ শতাংশ। অর্থাৎ নির্ভরতা ইতিমধ্যে কিছুটা কমেছে। তবে এই পরিবর্তনের বড় অংশ এসেছে তেল, সোনা ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের মতো কয়েকটি পণ্য থেকে।
কানাডার জন্য এখন সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হলো একক কোনো বাজারকে যুক্তরাষ্ট্রের বিকল্প হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা না করে একাধিক বড় ও দ্রুত বিকাশমান বাজার তৈরি করা। এতে ভবিষ্যতে ওয়াশিংটনের একতরফা কোনো সিদ্ধান্ত কানাডার জন্য জাতীয় অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থার বদলে সামলানো সম্ভব এমন একটি বাণিজ্যিক সমস্যা হয়ে উঠতে পারে।

জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় বড় সম্ভাবনা
এশিয়ায় কানাডার সম্ভাব্য অংশীদারদের মধ্যে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। দুটি দেশেই ক্রয়ক্ষমতা বেশি, আইনের শাসন শক্তিশালী এবং কানাডার সঙ্গে আগে থেকেই বাণিজ্যিক যোগাযোগ রয়েছে।
কানাডা জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ায় জ্বালানি ও কৃষিপণ্য সরবরাহ করতে পারে। বিপরীতে এই দেশগুলো কানাডার জন্য ব্যাটারি, অর্ধপরিবাহী, যন্ত্রপাতি এবং জাহাজ নির্মাণের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্পপণ্য ও সক্ষমতা দিতে পারে।
তাইওয়ানও কানাডার জন্য একই ধরনের সম্ভাবনা তৈরি করছে। দুই পক্ষের বাণিজ্য সহযোগিতার কাঠামো চুক্তি স্বাক্ষরের অপেক্ষায় রয়েছে।
জ্বালানি রপ্তানিতে প্রশান্ত মহাসাগরীয় নতুন পথ
এশিয়ার বাজারে কানাডার সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে জ্বালানি খাত ইতিমধ্যেই সবচেয়ে এগিয়ে। কানাডার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস প্রকল্পে মালয়েশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান ও চীনের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ রয়েছে। এরই মধ্যে কানাডা এশিয়ার বিভিন্ন দেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পাঠাচ্ছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া অন্য দেশগুলোতে কানাডার অপরিশোধিত তেল রপ্তানি ২০২৫ সালে প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। দৈনিক গড়ে প্রায় ৪ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেল তেল রপ্তানি হয়েছে এসব দেশে। ২০২৪ সালের আগে এই রপ্তানি কার্যত ছিল না।
২০২৬ সালের প্রথম চার মাসে চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ায় আলবার্টার তেল রপ্তানি যথাক্রমে ১২২ শতাংশ ও ২২৭ শতাংশ বেড়েছে। প্রশান্ত মহাসাগর পেরিয়ে এসব জ্বালানি সরবরাহ এমন পথ দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে কোনো বিতর্কিত সংকীর্ণ নৌপথ অতিক্রম করতে হচ্ছে না।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়ও বাড়ছে সম্ভাবনা
জ্বালানির পাশাপাশি কৃষি ও খাদ্যপণ্য, বনজ পণ্য, অ্যালুমিনিয়াম, যন্ত্রপাতি এবং ইন্টারনেটের মাধ্যমে সরবরাহ করা সেবার ক্ষেত্রেও এশিয়ায় কানাডার বড় সুযোগ রয়েছে।
ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর কানাডার সঙ্গে বহুপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির অংশীদার। ভিয়েতনামে দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উৎপাদনশিল্পের চাহিদা রয়েছে। মালয়েশিয়ায় শিল্পপণ্য ও প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের বাজারে সুযোগ তৈরি হতে পারে। আর সিঙ্গাপুর শুধু আঞ্চলিক বাণিজ্যকেন্দ্র নয়, উন্নত ও উচ্চমূল্যের বাজার হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ।
ভারত ও ইন্দোনেশিয়াও কানাডার জন্য সম্ভাবনাময়, যদিও এসব বাজারে প্রবেশ তুলনামূলক কঠিন। যন্ত্রপাতি, শিল্পপ্রযুক্তি, অবকাঠামো এবং বিশেষায়িত কাঁচামালের চাহিদা এসব দেশে দ্রুত বাড়ছে।
চীন অবশ্য কানাডার জন্য আরও সংবেদনশীল বাজার। জাতীয় নিরাপত্তা ও অতিরিক্ত উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ থাকায় দেশটি কানাডার জন্য বাছাই করা বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবেই থাকবে। তেল ছাড়া চীনের সঙ্গে কানাডার বাণিজ্যে পাল্প, কাগজ, শিল্প উপকরণ ও উচ্চমানের ভোগ্যপণ্যের গুরুত্ব বাড়তে পারে।
সবচেয়ে বড় বাধা জ্ঞানের ঘাটতি
কানাডার এশিয়ামুখী বাণিজ্য সম্প্রসারণের পথে সবচেয়ে বড় সমস্যা বাজারে প্রবেশের সুযোগের অভাব নয়। প্রয়োজনীয় বাণিজ্য চুক্তি, সরকারি সংস্থা, ব্যবসায়িক পরিষদ ও বাণিজ্য সংগঠন—সবই রয়েছে।
সমস্যা হলো, প্রশান্ত মহাসাগরের দুই পাশের ব্যবসায়ীদের বড় একটি অংশই একে অন্যের বাজার সম্পর্কে যথেষ্ট জানেন না।
এক জরিপে দেখা গেছে, কানাডার ৭৩ শতাংশ মানুষ দক্ষিণ কোরিয়া সম্পর্কে খুব কম বা কিছুই জানেন না। সিঙ্গাপুর সম্পর্কে একই কথা বলেছেন ৮২ শতাংশ এবং মালয়েশিয়া সম্পর্কে ৯০ শতাংশ। অথচ কানাডার বহুপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তিতে সদস্যপদকে ৭৮ শতাংশ কানাডীয় সমর্থন করেন।

অর্থাৎ কানাডীয়রা যে বাণিজ্যব্যবস্থাকে সমর্থন করছেন, সেই ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত অনেক দেশ সম্পর্কেই তাদের ধারণা অত্যন্ত সীমিত।
ইন্দোনেশিয়ার ব্যবসায়ীদের মধ্যেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে। ২৭৬টি প্রতিষ্ঠানের ওপর পরিচালিত এক জরিপে ৮৪ শতাংশ ব্যবসায়ী জানিয়েছেন, কানাডার সঙ্গে ইন্দোনেশিয়ার মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সম্পর্কে তারা কখনো শোনেননি অথবা খুব সামান্য জানেন। এমনকি যারা চুক্তিটির কথা জানতেন, তারাও এর আওতা নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন ধারণা পোষণ করতেন।
ব্যবসায়ীদেরই নিতে হবে প্রথম পদক্ষেপ
শুধু বাণিজ্য চুক্তি থাকলেই নতুন বাজার তৈরি হয় না। কোনো দেশের ব্যবসায়ীরা যদি চুক্তির সুবিধা, বাজারের চাহিদা ও ব্যবসায়িক পরিবেশ সম্পর্কে না জানেন, তাহলে সেই সুযোগ কাজে লাগানো সম্ভব নয়।
এ কারণে কানাডা ও এশিয়ার বিপুলসংখ্যক ব্যবসায়ীকে এখন একে অন্যের বাজার সম্পর্কে জানার উদ্যোগ নিতে হবে। সরকারি উদ্যোগ প্রয়োজন, কিন্তু সরকারের একার পক্ষে এই কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব নয়।
ব্যবসায়ীদের নিজেদের বাজার গবেষণা করতে হবে, সম্ভাব্য অংশীদারদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে হবে, সরাসরি বিভিন্ন দেশে যেতে হবে এবং নতুন পণ্য নিয়ে বাজার পরীক্ষা করতে হবে।
কানাডা ও এশিয়ার মধ্যে বাণিজ্য বৈচিত্র্য আনার জন্য প্রয়োজনীয় কাঠামো ইতিমধ্যেই অনেকাংশে তৈরি। এখন প্রয়োজন সেই সুযোগকে বাস্তব ব্যবসায় রূপ দেওয়া। যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরতার যুগে পরিবর্তন আসছে—আর সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হয়ে উঠতে পারে এশিয়া।
কানাডার সামনে তাই প্রশ্ন আর এশিয়ার দিকে যাবে কি না, সেটি নয়; বরং কত দ্রুত এবং কতটা কার্যকরভাবে এই নতুন বাজারগুলোকে নিজেদের বাণিজ্যিক অংশীদারে পরিণত করতে পারবে, সেটিই এখন বড় বিষয়।
সারাক্ষণ রিপোর্ট 



















