০৭:১৮ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
তীব্র হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান হামলা, ৯৭ ডলারের কাছাকাছি তেলের দাম নেপালের জেন-জি আন্দোলনের এক বছর: বদলেছে সরকার, বদলায়নি আহতদের জীবন ১৮৮ কর্মকর্তার বদলিতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ, আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান ইরান যুদ্ধের সমীকরণ বদলে আঞ্চলিক পর্যায়ে নিয়ে গেছে: সেনা উপপ্রধান সার দিতে দেরি, ডিলারের গুদাম ভেঙে শতাধিক বস্তা সার লুট আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধের প্রজ্ঞাপনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট গর্ভনিরোধক সরবরাহ স্বাভাবিক হবে ২-৩ মাসের মধ্যে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী হামে মৃত্যু ৯৯৭, গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৩ শিশুর মৃত্যু ডেঙ্গুতে ২৪ ঘণ্টায় ৪ মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ১ হাজার ৩১৪ জন পাবনায় বিএনপি নেতাকে গুলি করে কুপিয়ে হত্যা

যুদ্ধের অভিঘাত এড়িয়ে চীন: ‘গডফাদার’ কূটনীতি ও জ্বালানি কৌশলে সুরক্ষা

ইরান যুদ্ধের বৈশ্বিক প্রভাব যখন বহু দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি খাতে চাপ তৈরি করছে, তখন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে চীন। দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত জ্বালানি কৌশল, বৈচিত্র্যময় উৎস এবং কূটনৈতিক দূরত্ব বজায় রাখার নীতির কারণে দেশটি এই সংকটের বড় অংশ এড়িয়ে যেতে পেরেছে।

যুদ্ধ শুরুর পর চীনের সাধারণ মানুষের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা থাকলেও তাদের উদ্বেগ তুলনামূলক কম। ইউরোপ বা অন্যান্য এশীয় দেশের মতো জ্বালানির দাম বা জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধির চাপ সেখানে তেমনভাবে অনুভূত হয়নি। এর মূল কারণ, চীনের জ্বালানির বড় অংশই আসে দেশের নিজস্ব উৎস থেকে।

চীনের মোট জ্বালানির প্রায় ৮৫ শতাংশ অভ্যন্তরীণভাবে উৎপাদিত হয়। পাশাপাশি দেশটির কাছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেলের মজুদ রয়েছে, যা কয়েক মাস পর্যন্ত চাহিদা মেটাতে সক্ষম। যদিও যুদ্ধের পর জ্বালানির দাম কিছুটা বেড়েছে, তবুও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ ও অন্যান্য স্থানীয় উৎসের কারণে সাধারণ মানুষের ব্যয়ে বড় প্রভাব পড়েনি।

Pedestrians walk and gather outside a Miniso Land store on Dongmen Pedestrian Street in Shenzhen, China.

তবে শিল্প ও উৎপাদন খাতে পরিস্থিতি ভিন্ন। পরিবহন, ইস্পাতসহ বিভিন্ন খাতে কাঁচামালের খরচ বেড়েছে। বৈশ্বিক অর্থনীতির ধীরগতির কারণে রপ্তানি আদেশও কমে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে গাড়ি রপ্তানি সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে, যা চীনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার।

অন্যদিকে, অনেক দেশ যখন জ্বালানি রেশনিং বা খাদ্যসংকটের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন চীন তুলনামূলকভাবে নিরাপদ অবস্থানে রয়েছে। এমনকি এই যুদ্ধের কিছু কৌশলগত সুবিধাও পাচ্ছে দেশটি—বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা ও বৈশ্বিক প্রভাবের কিছুটা ক্ষয়।

কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, ইরান যুদ্ধের মূল লক্ষ্য চীন। তাদের যুক্তি, ইরানের তেলের বড় অংশ চীনে যায়, ফলে সরবরাহ বন্ধ হলে চীন বড় ক্ষতির মুখে পড়বে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন।

চীনের মোট জ্বালানির মাত্র ১৫ শতাংশ আসে বিদেশ থেকে, যার একটি ছোট অংশই ইরান থেকে আমদানি করা হয়। ফলে ইরানের ওপর চীনের নির্ভরতা খুবই সীমিত। এই কারণে ইরানের পরিস্থিতি চীনের জন্য অস্বস্তিকর হলেও তা বড় ধরনের সংকট তৈরি করে না।

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চীন বহু বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছে। তেল ও গ্যাস আমদানিকারক হওয়ার পর থেকেই তারা বিভিন্ন উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও এই কৌশলের অংশ।

এটি চীনের যুদ্ধ নয়, তবে বহু বছর আগেই প্রস্তুত হওয়া শুরু করেছিল বেইজিং |  The Business Standard

একই সঙ্গে চীন একদিকে কয়লা ব্যবহার চালিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। বর্তমানে মোট জ্বালানির একটি বড় অংশ অ-জীবাশ্ম উৎস থেকে আসছে এবং ভবিষ্যতে এই অংশ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও চীনের অবস্থান স্পষ্টভাবে স্বার্থনির্ভর। তারা কোনো নির্দিষ্ট জোটে আবদ্ধ না থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ছাড়াও সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য অনেক বড় এবং বৈচিত্র্যময়।

এই অঞ্চলে চীনের বিনিয়োগ ও অবকাঠামোগত প্রকল্পের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য। তবে ইরানে বড় বিনিয়োগ পরিকল্পনা থাকলেও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত শুরু হলে চীন সাধারণত সরাসরি নেতৃত্ব দেয় না। বরং তারা অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রভাব বৃদ্ধির মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করে। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ এড়িয়ে চলা এবং সম্পদের সঠিক ব্যবহার তাদের কৌশলের অংশ।

বর্তমান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মজুদ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে কিছু সামরিক সম্পদ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে সরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নেওয়া হয়েছে, যা ভবিষ্যতে আঞ্চলিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে স্বল্পমেয়াদে চীন বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা কম। দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং রাজনৈতিক পরিকল্পনাই এখন তাদের প্রধান অগ্রাধিকার।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ইরান যুদ্ধের প্রভাব থেকে চীন পুরোপুরি মুক্ত না হলেও, তাদের পরিকল্পিত কৌশল এবং বাস্তববাদী নীতির কারণে দেশটি তুলনামূলকভাবে অনেকটাই সুরক্ষিত অবস্থানে রয়েছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

তীব্র হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান হামলা, ৯৭ ডলারের কাছাকাছি তেলের দাম

যুদ্ধের অভিঘাত এড়িয়ে চীন: ‘গডফাদার’ কূটনীতি ও জ্বালানি কৌশলে সুরক্ষা

০৩:২১:৪১ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬

ইরান যুদ্ধের বৈশ্বিক প্রভাব যখন বহু দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি খাতে চাপ তৈরি করছে, তখন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে চীন। দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত জ্বালানি কৌশল, বৈচিত্র্যময় উৎস এবং কূটনৈতিক দূরত্ব বজায় রাখার নীতির কারণে দেশটি এই সংকটের বড় অংশ এড়িয়ে যেতে পেরেছে।

যুদ্ধ শুরুর পর চীনের সাধারণ মানুষের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা থাকলেও তাদের উদ্বেগ তুলনামূলক কম। ইউরোপ বা অন্যান্য এশীয় দেশের মতো জ্বালানির দাম বা জীবনযাত্রার খরচ বৃদ্ধির চাপ সেখানে তেমনভাবে অনুভূত হয়নি। এর মূল কারণ, চীনের জ্বালানির বড় অংশই আসে দেশের নিজস্ব উৎস থেকে।

চীনের মোট জ্বালানির প্রায় ৮৫ শতাংশ অভ্যন্তরীণভাবে উৎপাদিত হয়। পাশাপাশি দেশটির কাছে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তেলের মজুদ রয়েছে, যা কয়েক মাস পর্যন্ত চাহিদা মেটাতে সক্ষম। যদিও যুদ্ধের পর জ্বালানির দাম কিছুটা বেড়েছে, তবুও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ ও অন্যান্য স্থানীয় উৎসের কারণে সাধারণ মানুষের ব্যয়ে বড় প্রভাব পড়েনি।

Pedestrians walk and gather outside a Miniso Land store on Dongmen Pedestrian Street in Shenzhen, China.

তবে শিল্প ও উৎপাদন খাতে পরিস্থিতি ভিন্ন। পরিবহন, ইস্পাতসহ বিভিন্ন খাতে কাঁচামালের খরচ বেড়েছে। বৈশ্বিক অর্থনীতির ধীরগতির কারণে রপ্তানি আদেশও কমে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে গাড়ি রপ্তানি সাময়িকভাবে বন্ধ রয়েছে, যা চীনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বাজার।

অন্যদিকে, অনেক দেশ যখন জ্বালানি রেশনিং বা খাদ্যসংকটের প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন চীন তুলনামূলকভাবে নিরাপদ অবস্থানে রয়েছে। এমনকি এই যুদ্ধের কিছু কৌশলগত সুবিধাও পাচ্ছে দেশটি—বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা ও বৈশ্বিক প্রভাবের কিছুটা ক্ষয়।

কিছু বিশ্লেষক মনে করেন, ইরান যুদ্ধের মূল লক্ষ্য চীন। তাদের যুক্তি, ইরানের তেলের বড় অংশ চীনে যায়, ফলে সরবরাহ বন্ধ হলে চীন বড় ক্ষতির মুখে পড়বে। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন।

চীনের মোট জ্বালানির মাত্র ১৫ শতাংশ আসে বিদেশ থেকে, যার একটি ছোট অংশই ইরান থেকে আমদানি করা হয়। ফলে ইরানের ওপর চীনের নির্ভরতা খুবই সীমিত। এই কারণে ইরানের পরিস্থিতি চীনের জন্য অস্বস্তিকর হলেও তা বড় ধরনের সংকট তৈরি করে না।

জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চীন বহু বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছে। তেল ও গ্যাস আমদানিকারক হওয়ার পর থেকেই তারা বিভিন্ন উৎস থেকে জ্বালানি সংগ্রহ এবং অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দিয়েছে। রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কও এই কৌশলের অংশ।

এটি চীনের যুদ্ধ নয়, তবে বহু বছর আগেই প্রস্তুত হওয়া শুরু করেছিল বেইজিং |  The Business Standard

একই সঙ্গে চীন একদিকে কয়লা ব্যবহার চালিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে। বর্তমানে মোট জ্বালানির একটি বড় অংশ অ-জীবাশ্ম উৎস থেকে আসছে এবং ভবিষ্যতে এই অংশ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও চীনের অবস্থান স্পষ্টভাবে স্বার্থনির্ভর। তারা কোনো নির্দিষ্ট জোটে আবদ্ধ না থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ছাড়াও সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য অনেক বড় এবং বৈচিত্র্যময়।

এই অঞ্চলে চীনের বিনিয়োগ ও অবকাঠামোগত প্রকল্পের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য। তবে ইরানে বড় বিনিয়োগ পরিকল্পনা থাকলেও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।

বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত শুরু হলে চীন সাধারণত সরাসরি নেতৃত্ব দেয় না। বরং তারা অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত প্রভাব বৃদ্ধির মাধ্যমে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করে। দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ এড়িয়ে চলা এবং সম্পদের সঠিক ব্যবহার তাদের কৌশলের অংশ।

বর্তমান সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক মজুদ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে কিছু সামরিক সম্পদ ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে সরিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে নেওয়া হয়েছে, যা ভবিষ্যতে আঞ্চলিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে।

তবে স্বল্পমেয়াদে চীন বড় ধরনের সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা কম। দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং রাজনৈতিক পরিকল্পনাই এখন তাদের প্রধান অগ্রাধিকার।

সব মিলিয়ে বলা যায়, ইরান যুদ্ধের প্রভাব থেকে চীন পুরোপুরি মুক্ত না হলেও, তাদের পরিকল্পিত কৌশল এবং বাস্তববাদী নীতির কারণে দেশটি তুলনামূলকভাবে অনেকটাই সুরক্ষিত অবস্থানে রয়েছে।