দক্ষিণ কোরিয়ায় সাম্প্রতিক দুটি ধর্মীয় সংগঠনকে ঘিরে আইনি পদক্ষেপ একটি অস্বস্তিকর প্রশ্ন সামনে এনেছে—রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনগুলোর জন্য এত কঠোর বিধিনিষেধ কেন থাকবে, যখন একই ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ অন্য কিছু সংগঠনের রয়েছে?
বিশ্বশান্তি ও ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য পারিবারিক ফেডারেশনের নেতা হান হাক-জা রাজনৈতিক অর্থায়নসহ বিভিন্ন অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়ে দুই বছরের কারাদণ্ড পেয়েছেন। ৮৩ বছর বয়সী এবং আইনগতভাবে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হানের বিরুদ্ধে সাবেক ফার্স্ট লেডি কিম কন-হিকে মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে বিলাসবহুল সামগ্রী দেওয়ার অনুমোদনের অভিযোগও ছিল। এর মধ্যে ছিল শ্যানেলের একটি হাতব্যাগ ও হীরার নেকলেস। তার বিরুদ্ধে আরও কিছু আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের বিচারও সামনে রয়েছে।
অন্যদিকে, শিনচনজি চার্চের নেতা লি মান-হির বিরুদ্ধে চলছে আলাদা বিচার। প্রসিকিউশন বলছে, তিনি সংগঠনের হাজার হাজার অনুসারীকে পিপল পাওয়ার পার্টিতে যোগ দিতে উৎসাহিত বা নির্দেশ দিয়েছিলেন, যাতে দলটির প্রার্থী বাছাই ও নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার করা যায়।
প্রসিকিউটরদের ভাষ্য অনুযায়ী, এটি ধর্মীয় ও রাজনৈতিক শক্তির গুরুতর যোগসাজশের ঘটনা। তাদের দাবি, কোনো ধর্মীয় সংগঠন তার বিশাল সাংগঠনিক শক্তি ব্যবহার করে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করেছে—এমন ঘটনা এই প্রথম শনাক্ত হয়েছে।
কিন্তু এখানেই মূল প্রশ্নটি আসে: গণতান্ত্রিক দক্ষিণ কোরিয়ায় এতে সমস্যাটা ঠিক কোথায়?
স্বৈরশাসনের অধীনে কোনো ধর্মীয় বা সামাজিক সংগঠন যদি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার বিরুদ্ধে কিংবা পক্ষে মানুষকে সংগঠিত করে, তার রাজনৈতিক তাৎপর্য সহজেই বোঝা যায়। কিন্তু একটি গণতন্ত্রে নাগরিকদের সংগঠিত হয়ে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে সমর্থন করতে বলা কেন অপরাধের পর্যায়ে যাবে?
বাস্তবে সাধারণ ভোটারের প্রতিক্রিয়াও অনেক সময় রাজনৈতিক পক্ষপাতের ওপর নির্ভর করে। নিজের পছন্দের দলকে কোনো সংগঠন সমর্থন করলে সেটিকে গণতান্ত্রিক অধিকার মনে হয়; বিপক্ষকে সমর্থন করলে একই কাজকে ষড়যন্ত্র বা হস্তক্ষেপ বলে মনে হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে ঘিরে তাই বাছাই করা আইনি প্রয়োগের প্রশ্ন উঠতে পারে। কারণ আদালতের কাঠগড়ায় থাকা দুটি নতুন ধর্মীয় সংগঠনই বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের সঙ্গে কোনো না কোনোভাবে যুক্ত ছিল বা তাদের সমর্থন করেছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
হান হাক-জার সংগঠনের রাজনৈতিক ভূমিকা অবশ্য সরল নয়। সাবেক ইউনিফিকেশন চার্চ হিসেবে পরিচিত এই সংগঠন সাধারণত কোনো একটি পক্ষের সঙ্গে স্থায়ীভাবে নিজেকে আটকে রাখে না। বড় ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলোর মতোই তারা ক্ষমতায় আসা নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী। ফলে তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখে, প্রভাব তৈরির চেষ্টা করে এবং নিজেদের জন্য দরজা খোলা রাখে। কিন্তু নির্দিষ্ট নীতির পক্ষে সক্রিয় রাজনৈতিক অবস্থান নেওয়া তাদের প্রধান লক্ষ্য নয়।
শিনচনজির ক্ষেত্রে চিত্রটি তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট। প্রসিকিউশন বলছে, ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ৫৬ হাজারের বেশি শিনচনজি অনুসারী পিপল পাওয়ার পার্টিতে যোগ দেন। এর পেছনে উদ্দেশ্য কী ছিল, তা নিয়ে নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। তবে সংগঠনটির সঙ্গে লি জে-মিয়ংয়ের দীর্ঘদিনের বিরোধ বিবেচনায় নিলে একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় তৎকালীন গিয়ংগি প্রদেশের গভর্নর লি জে-মিয়ং শিনচনজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। সংগঠনটির দাবি ছিল, তাদের বিরুদ্ধে এমন কিছু অভিযোগ প্রকাশ্যে তোলা হয়েছিল, যা তারা করেনি। তাদের নেতাকেও প্রকাশ্যে কঠোর সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল।
ধর্মীয় সংগঠনের অনুসারীদের কাছে প্রকাশ্য অপমানের স্মৃতি যে রাজনৈতিক বিরোধে রূপ নিতে পারে, তা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু তবুও প্রশ্ন থেকে যায়—কোনো ধর্মীয় সংগঠনের সদস্যরা যদি কোনো রাজনৈতিক নেতার বিরুদ্ধে ভোট দিতে চান, সেটি কি নিজেই অপরাধ?
দক্ষিণ কোরিয়ার বর্তমান আইনি কাঠামো বুঝতে হলে দেশটির কর্তৃত্ববাদী অতীতের দিকে তাকাতে হয়। অতীতে সরকার বিভিন্ন যুব সংগঠন, গ্রামভিত্তিক সংগঠন ও অন্যান্য সামাজিক কাঠামোকে রাজনৈতিক সমাবেশ এবং ভোটার সংগঠিত করার কাজে ব্যবহার করেছে। গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পরও সংগঠিত শক্তি দিয়ে ভোটকে প্রভাবিত করার ব্যাপারে সেই পুরোনো সন্দেহ পুরোপুরি দূর হয়নি।
ফলে এমন একটি অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে একজন নাগরিকের ব্যক্তিগত রাজনৈতিক স্বাধীনতা তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত, কিন্তু একই নাগরিক যখন কোনো সংগঠনের সদস্য হিসেবে সম্মিলিতভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নেন, তখন তার ওপর আইনি সীমাবদ্ধতা নেমে আসে।
নির্বাচনী আইন ও রাজনৈতিক সংগঠনের ক্ষেত্রে এই বৈপরীত্য আরও স্পষ্ট। এমনকি সংবাদপত্রও নির্বাচনের সময় প্রকাশ্যে কোনো প্রার্থীকে অন্য প্রার্থীর চেয়ে ভালো বলে সমর্থন করতে পারে না। কারণ গণমাধ্যমের জন্য রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের নিয়ে মন্তব্য ও সংবাদ পরিবেশনে ন্যায্যতার নীতি অনুসরণ করা বাধ্যতামূলক। ফলে নির্বাচনের সময় বড় দলগুলো প্রায় সমান গুরুত্ব পায়, এমনকি ছোট প্রার্থীরাও নির্দিষ্ট মাত্রায় সংবাদ কাভারেজ পান।
কিন্তু শ্রমিক ইউনিয়নের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আলাদা। আইন তাদের রাজনৈতিক প্রচারে তুলনামূলক বেশি স্বাধীনতা দিয়েছে এবং সাংবিধানিক আদালতও এই বিশেষ অবস্থানকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
এখানেই আইনের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কোনো অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশন নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীকে সমর্থন করতে না পারলেও অনেক নাগরিক সংগঠন একই ধরনের রাজনৈতিক প্রচারে অংশ নিতে পারে। তাহলে কোন সংগঠন রাজনৈতিকভাবে কথা বলতে পারবে আর কোনটি পারবে না—তার সীমারেখা কী?
সম্ভবত এখন সেই সীমারেখা নতুন করে ভাবার সময় এসেছে।
এর অর্থ অবশ্য এই নয় যে ধর্মীয় সংগঠনগুলোকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়ে দেওয়া উচিত। রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের আড়ালে ঘুষ, অবৈধ অর্থায়ন, ব্যক্তিগত সুবিধা আদায় কিংবা অন্য কোনো দুর্নীতি থাকলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া অবশ্যই প্রয়োজন।
কিন্তু দুর্নীতি আর রাজনৈতিক মতপ্রকাশকে এক করে দেখা উচিত নয়।
হান হাক-জা কিংবা লি মান-হি যদি সত্যিই দুর্নীতি বা বেআইনি আর্থিক কর্মকাণ্ডের জন্য দায়ী হন, তাহলে তাদের বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু কোনো সংগঠন যদি মনে করে কোনো দল বা প্রার্থী তার সদস্যদের স্বার্থ এবং দেশের জন্য ভালো, তাহলে সেই মতামত সদস্যদের জানানোকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে অপরাধ হিসেবে দেখার যুক্তি দুর্বল।
গণতন্ত্রের পরীক্ষাটি আসলে এখানেই। নাগরিকের পছন্দ আমাদের অপছন্দ হতে পারে, কোনো সংগঠনের রাজনৈতিক অবস্থান আমাদের কাছে অগ্রহণযোগ্যও হতে পারে। কিন্তু আইনের কাজ হওয়া উচিত রাজনৈতিক মতের পক্ষে-বিপক্ষে দাঁড়ানো নয়; বরং বৈধ রাজনৈতিক প্রচার এবং দুর্নীতির মধ্যে স্পষ্ট সীমা তৈরি করা।
* মাইকেল ব্রিন ‘দ্য নিউ কোরিয়ানস’ বইয়ের লেখক।
মাইকেল ব্রিন 



















